রাত্রি নামে অমাবস্যা’ পর্ব-৪ (একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প)

হাসিনা সাঈদ মুক্তা

রাশেদ পরদিন বইটা এনে তার নিজের কাছেই রাখে।
পাঁকামোতে সেরা সীমান্ত ভ্রটা বাঁকিয়ে খেয়াল করে তার প্রিয় স্যারের চপলতা।
স্যারকে তার কেমন যেন মনে হয়।
মনে মনে রাশেদও নার্ভাস।
সীমান্ত বলে,
-স্যার আপনার পড়া শেষ?
-হ্যাঁ।
-পুরো রচনাসমগ্র একরাতে পড়ে ফেলেছেন…?
-আহা বলেছি তো আমি শুধু দেবদাসটা শেষ করেছি।
-ঠিক আছে স্যার বইটা দিন বুবুকে দিয়ে আসি।
বইটা নিতে হাত বাড়াতেই,রাশেদ বল্ল
-সীমান্ত তুমি আগে পড়া শেষ করে নাও তো,বই  পালিয়ে যাচ্ছে না,এখানেই আছে।

এবার রেগে যায় যেন রাশেদ।
সীমান্তর কাছে মনে হলো রাশেদ ঘামছে,মুখটাও কাঁচুমাচু কিন্তু কেন বুঝে উঠতে পারে না,সেও কেমন অসহায় হয়ে পড়ে তার স্যারের এই দশা দেখে।
সেদিন ছিল পবিত্র শবে বারাতের রাত।
সন্ধ্যার পরে পড়ানো হয়ে গেলে সীমান্তর মা খেয়ে যেতে বলে রাশেদকে।সীমান্ত আর তার স্যারের জন্য টেবিলে খাবার দেয়া হয়।
ডায়নিং রুমে টেবিলে সুসজ্জিত খাবার আর ঘ্রান শুঁকেই মন ভরে যায় রাশেদের।
চালের রুটি,ভুনা খিচুড়ী,গরুর গোশত ভুনা,ডাল সবজি,দুধের সেমাই আর অন্য একটি বড় ট্রে তে নানারকম হালুয়া।
চোখ জুড়িয়ে গেল রাশেদের!
-আলহামদুলিল্লাহ্‌ এত দেখছি এলাহি আয়োজন?
-জ্বী স্যার খাওয়া শুরু করি আসেন।
-সীমান্ত এইসবই খালাম্মা বানিয়েছেন?
-হুম আম্মা বানিয়েছেন, খালা,চাচী তারাও পাঠিয়েছেন হালুয়াগুলো।
-আচ্ছা,হালুয়া ছাড়া বাদবাকি খাবার আর কে বানিয়েছে?রাশেদ এর দৃষ্টি এবার অন্য কিছু খোঁজে ফের।
-আম্মা আর বুবু…।
সীমান্তের মা ডাইনিং রুমে আসেন। রাশেদকে খাবার এগিয়ে দেন তিনি।
রাশেদের পছন্দ,চালের রুটি ও গরুর গোশত ভুনা।
খিঁচুড়ীও তুলে দেয় সীমান্তের মা হনুফা বেগম।
-খালাম্মা অনেক দিন পর এত সুস্বাদু খাবার খেয়েছি।
গরুর গোশত তো অসাধারন! সত্যি খালাম্মা আপনার হাতের জবাব নাই?
হনুফা বেগম খুশী হোন শুনে,
-তাই বাবা…খিঁচুড়ী ভালো হয়নি?গরুর গোশত আমার ভাগ্নী রেঁধেছে,নাও আর একটু….।
রাশেদ এবার সীমান্তের দিকে তাকায়।
সীমান্ত হেসে ওঠে স্যারের চাহনী দেখে,সে যেন বুঝে গেছে যে রাশেদ আসলে কার কথা জানতে চেয়েছে।
-স্যার আম্মা বুবুর কথা বলেছে…।
-ও তাই?
-তা বাবা রাশেদ বাসায় সবাই কেমন আছে তোমার?তোমার আম্মা,আব্বার শরীর ভালো তো?
তার পাশের ঘরেই পাঁয়চারী করছিল রাত্রি।রাত্রিও শোনে তাদের কথা।
-আম্মার কথা কি বলবো খালাম্মা,হঠাৎ ভালো থাকেন, হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যান।ছোটবোনটা একা সব সামলাচ্ছে।আর আব্বা আল্লাহর রহমতে ভালো আছেন,বোনের বিয়ে নিয়ে তার পেরেশানি এখন।
-বোনের বিয়ে পরে দিও , তুমি নিজে একটা বিয়ে করে নাও বোনটাকে কটা দিন জিরোতে দাও।
মৃদু হাসে রাশেদ।
-তোমার খালু বলছিল সরকারি কলেজে নাকি তোমার চাকরী হবার কথা।
-জ্বী খালাম্মা আশা তো করছি।কিছুদিনের ভেতরেও জানতে পারবো আমার জন্য দোয়া করবেন খালাম্মা।

রাশেদ এবার বইটা হাতে দেয় সীমান্তের। বইটা রাশেদের হাতে বেশ শক্ত করে ধরা,যেন ভেতরে কিছু একটা পড়ে যেতে পারে সেই ভয় তার।
সীমান্তের কাঁধে হাতটা রেখে রাশেদ বলে,
-শোনো সীমান্ত তুমি জানো যে আমি মিথ্যা বলতে পারিনা,এর ভেতরে একটা জিনিস আছে।
-কি জিনিস?
-ময়ুরের পালক
-ময়ুরের পালক!
-হ্যাঁ তুমি না বলেছো তোমার বুবুর একটা ময়ুরের পালক ছিল হারিয়ে গেছে,তাই আমারটা দিলাম।তাকে দিও।তবে…?
-কি স্যার?
-তুমি এখন সোজা তোমার বুবুর কাছে যাবে আর বইটি একদম এই অবস্থায় দিবে,তুমি বই খুলবেনা আমাকে কথা দাও।
সীমান্ত পুরোই অবাক বনে যায় তার স্যারের কথায়।
স্যারকে তার এর আগে এত শংকিত মনে হয়নি।
-ঠিক আছে স্যার কিন্তু একটা কথা জানতে পারি?
-বলো
-বুবুকে হঠাৎ আপনি ময়ুরের পালক দিচ্ছেন?
-কারন তোমার বুবু অনেক মজার রান্না জানেন।এমন পাঁকা রাঁধুনী আমি খুব কমই দেখেছি তাই তাকে এটা দিয়ে একটা ধন্যবাদ জানালাম…।
সীমান্ত কি বুঝলো কে জানে,তবে রাশেদের মনে হলো সীমান্তের কাছে তার চুরি ধরা পড়ে গেছে।সীমান্ত ও আর কথা বাড়ায় না,সে  তার স্যারের কথামতোই বাধ্য অনুগত শীস্যের ন্যায় তার বুবুকে দিয়ে আসে বইটা।

রাত্রিও অবাক হয়, রাশেদ যে এত তাড়াতাড়ি তার প্রিয় বইটা ফেরত দিবে।
-রাত্রিবুবু এই নাও তোমার বই।
-টেবিলে রেখে যা সীমান্ত…।কি রে কিছু বলবি?
– দেবদাস তোমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে রাত্রিবুবু… !জিভ কেটে দুষ্টুমী সীমান্তের
-কি বল্লি?দেবদাস আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে মানে?
-না মানে রাশেদ স্যার তোমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে, দেবদাস ভুলে বলেছি।
-কি বলতে কি বলিস তুই! মাথা ঠিক আছে ?দেখ সীমান্ত আজকাল অনেক বেশী বাঁদরামো বেড়ে গেছে তোর আমি কিন্তু মামাজানকে বলে দিবো
-আচ্ছা বইলো আগে ধন্যবাদটা দেখো!
-ধন্যবাদ দেখবো?এই কি বলিস এসব?ধন্যবাদ আবার দেখবো মানে?
-আমার কি দোষ…! রাশেদ স্যারের যে কি হয়েছে,বলেছে এই বই এর ভেতর ময়ূরের পালক, তোমার ধন্যবাদ আর কি কি জানি বল্ল আমি গুলিয়ে ফেলেছি,আমি বাপু এখান থেকে যাই তোমাদের দুজনের পাল্লায় পড়লে আমার মাথাও খারাপ হয়ে যাবে।

বলেই বিড়বিড় করে চলে যায় সীমান্ত।
রাত্রি কিছুই বুঝতে পারে না যে তার মামাতো ভাইটা আসলে কি বল্ল আর কি বোঝাতে চাইলো।
বইটা খুল্ল এবার রাত্রি….।
আসলেই একটা সুন্দর ময়ুরের পালক!
দেখে ভীষন ভালো লাগে রাত্রির!রাত্রির খুব প্রিয় একটা ময়ূরের পালক ছিল এই বইটির ভেতরেই।কিন্তু সেটা মামার বাসায় আসার আগে হারিয়েছে না পরে, তা বলতে পারছেনা।সীমান্তকে জানিয়েছিল সে কথা,সীমান্ত আবার  রাশেদকে জানায় এটি কথারচ্ছলে।ময়ূরের পালকটা হাতে নেয়ার পর আরেকটা জিনিস এবার বইটা থেকে মেঝেতে পড়ে।
রাত্রি সেটা তুলে নিয়ে হাতে নেয়।
সেটা আর কিছু নয় ভাঁজ হওয়া চারকোনা কাগজ।
তার গায়ে লেখা সুরঞ্জনা।
কাগজটা খুলতেই বুঝতে আর বাকি রইলোনা এটি একটি চিঠি,
তাতে লেখা ভালোবাসার অণুকাব্য
রাত্রি বিস্ময়ের মাত্রা যেন আরো বেড়ে যায় চিঠির কথা গুলো পড়ে।

চলবে

৩য় পর্বের লিংকঃ

রাত্রি নামে অমাবস্যা পর্ব-৩ (একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প)

হাসিনা সাঈদ মুক্তা কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন