দুধওয়ালী মরিয়ম এবং কুকুরের ধাওয়া

মো ইব্রাহীম খলিল

আমার কাজিন সাইফুল তখন এসএসসি পরিক্ষা দিবে। এটা সেই সময়কার ঘটনা। আমাদের বাড়িতে পাশের বাড়ির হুরমুজ চাচার কাজের মেয়ে মরিয়ম দৈনিক হাফ লিটার দুধ দিতে আসতো।
মরিয়ম কাজের মেয়ে হলেও রুপে গুনে থুক্কু চেহারার ঢক ছিলো মাশাল্লাহ। দুধওয়ালী হলেও মরিয়ম ছিলো শান্ত আর চরম লাজুক টাইপের একটি মেয়ে। আমি খেয়াল করেছি,সে যখনই আমাদের বাসায় দুধ দিতে আসতো,তখনই মাথায় ঘোমটা থাকতো।
এই মরিয়মের জন্যই আমাদের সাইফুল জানে দেওয়ানা ছিলো। মরিয়মের জন্য সে কিনা করেনি! বরাবরই আমি সাহিত্যের মানুষ ছিলাম বলে সেটা সাইফুল জানতো,তাই প্রেমপত্রটা আমার হস্তগতই লিপিবদ্ধ হয়েছিলো। বেশি কিছু লিখিনি। ছন্দে কয়েক লাইন প্রেম প্রপোজ কবিতা লিখে দিলাম—ওগো, দুধওয়ালী,
ইদানিং আমার মন করে টালিবালি।
তোমার প্রেমে হাবুডুবু
মজিয়াছি চোরাবালি।
আমার প্রেমের দাও গো সাড়া,
ওগো দুধওয়ালী মরিয়ম,
আদর করে ডাকতে চাহি
ওগো আমার প্রিয়তম।
কবিতাটি সাইফুল নিজ হাতেই মওকা বুঝে মরিয়মকে দিয়েছিলো। কিন্তু একদিন, দুদিন,তিনদিন অবগত হবার পরও যখন সাড়া পেলো না, তখন চতুর্থ দিন মরিয়ম আমাদের বাসায় দুধ দিতে এলে সাইফুল মরিয়মকে সরাসরি প্রশ্ন করে বসে,সে প্রেমে সহমত কিনা?
কিন্তু মরিয়ম সরাসরিই বারন করে দিয়ে ঘোমটা টেনে চলে গেলো।
আহা! বেচারা সাইফুল প্রেমে সাড়া না পেয়ে কিছুটা মনমরা হয়ে আমার দারস্থ হলো। যেভাবেই হোক,ছলে বলে কৌশলে সে মরিয়মকে চায়,আমি তাকে যেনো কোনো বিকল্প বুদ্ধি দেই।
ঐ সময় আমাদের পাশ্ববর্তী গ্রামে কানাই ফকির ছিলো নামকরা কামাখ্যা কবিরাজ। অনেক দূর দূরান্ত থেকে লোকে টোটকা নিয়ে যায়,কাজ হয় কিনা জানিনা,তবে বহু লোকের সমাগম হয় শুনেছি। সাইফুলকে কানাই ফকিরের দরবারে যাওয়ার কথা বললাম, যথারীতি সাইফুল ঘরের গোলা থেকে চুরি করে আধমন চাউল পাশের বাড়ির মকিমের মায়ের কাছে বিক্রি করে যা পেয়েছে,তার সাথে আরো কিছু মিলিয়ে ১০০০টাকা নিয়ে কানাই কবিরাজের কাছে যায়।কানাই কবিরাজ তাকে ১০০১টাকার বিনিময়ে যে টোটকাটি দেয়,সেটার শানে নাযুল হলো-যেভাবেই হোক,মেয়ের শরীরে এই টোটকাটি ছোঁয়াতে হবে।গাত্রে স্পর্শ করালেই মেয়ে সাইফুলের প্রেমে হাবুডুবু করবে। বাড়ি এনে সাইফুল পড়লো আরেক মসিবতে। এখন এই টোটকা মরিয়মের গায়ে স্পর্শ করবে কিভাবে! অনেকটা বিড়ালের গলায় ইদুরের ঘন্টা লাগানোর মত কঠিন হয়ে গেলো। কথায় আছে, যত মুশকিল,ততো আসান। আমার মাথায় হুট করে বুদ্ধি আসলো-আমাদের বাসায় ঢুকতে গেইটের সামনে বসার সিড়ি আছে,সেটা টপকিয়েই যে কাউকে ভিতরে ঢুকতে হয়। সাইফুলকে বুদ্ধি দিলাম,লম্বা একটা চিকন বাঁশের বেতের আগায় টোটকাটা সূতা দিয়ে বেঁধে সিড়িতে বসবি, মরিয়ম যখন সিড়ি বরাবর আসবে,তখন পিছন থেকে বেতের আগাটা ওর মাথা,কিবা গলার পিছনে একটু আলতু করে ছুয়াবি,কারন কবিরাজ তো বলেছেই,ছোঁয়াতে পারলেই কাজ। হাত দিয়ে বেগানা মেয়েকে ধরলে দোষ হবে,কিন্তু বেতের আগা দিয়ে পিছনে আলতু করে স্পর্শ করলে তেমন দোষনীয় কিছু নয়,যেমন ভাবা তেমন কাজ। আমার এই আইডিয়াটা সাইফুল খুব পছন্দ করলো।যথারীতি পরেরদিন সেই কৌশল মোতাবেক মরিয়মের ঘাড়ের পিছনে বেতের আগায় টোটকাটা স্পর্শ করায় সাইফুল। যদিও ভাগ্য ভালো ছিলো,মরিয়ম একটুও টের পায়নি। স্পর্শ করার তিনদিন অতিবাহিত হলো,কিন্তু মরিয়মের কোনো খবর নাই। কাজ না হওয়াতে কানাই কবিরাজের চৌদ্দ গোষ্ঠি উদ্ধার করে আবার কানাই কবিরাজের কাছে সাইফুল গেলো। কিন্তু এবার কবিরাজ যেটা বলল,তা হলো-গ্রহ মিলেনি। শনি রেখায় হস্ত প্রেমরেখা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে,এখন এই বাঁধাপ্রাপ্ত রেখা রাশি একাভূত করতে হলে কুত্তা ভোজন করাতে হবে। নিয়মটা হলো–দুই টাকা দামের গোল পাউরুটি গুলো যাকে আঞ্চলিক ভাষায় গোল বন বলে। সেই বনরুটি গুলো(৭টি)হয়ত সাদা নয়ত লাল,কিবা কালো কুকুরকে খাওয়াতে হবে। মানে সাতটি রুটি সাতটি এক কালারের কুকুরকে খাওয়াতে হবে। কুকুর খেলেই নাকি বাঁধা রাশি কেটে যাবে।
আবার ৪১০টাকা দিয়ে ৭টি বনরুটি সাইফুল আনলো। তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সাইফুলের কাছে দেখলাম আরো ৫০০টাকা পকেটে। যদিও ঐ সময় আমার ৫০০টা টাকা খুব দরকার ছিলো। সাইফুলের কাছে ধার চাইতেই বলল,সে টাকাটা আমাকে এমনিই দিবে,তবে শর্ত হলো,তার সাথে কুকুর খুঁজতে হবে। সাত কুকুরকে বনরুটি খাওয়ানোর পরই সে আমায় ৫০০টাকা দিবে। যখন শুনলাম, সাত কুকুরকে রুটি খাওয়ানোর বিনিময়ে ৫০০টাকা দিবে,তখন অমনি রাজী হয়ে গেলাম। এবার শুরু হলো দুই ভাইয়ের এক কালারের কুকুর খোঁজা। শুরুতেই পেলাম কালো কুকুর। হুট করে কালো কুকুরকে একটি খাওয়ালাম।আরো একটু সামনে গিয়ে দেখি দুটি লাল কুকুর। দুটি লাল কুকুর দেখে দুই ভাই আফসোস করতে লাগলাম। উফস্.কালো কুকুরটাকে না খাওয়াইয়া যদি দুটি লাল কুকুরকে খাওয়াতাম,তাহলে রুটির সংখ্যা দুটি কমে যেতো। কিন্তু এখন তো তা আর করা যাবেনা। কারন,বাকী ছয়টি বনরুটি যে কালো কুকুরকেই খাওয়াতে হবে। রাত আটটা বাজে,তখন এলাকা ছেড়ে চৌরাস্তার মোড়ে এলাম। তখন অব্দি কালো কুকুর খুঁজে পাচ্ছি না। একটু সামনে যেতেই দেখি তিনটি অর্ধ কালো আর অর্ধ সাদা কুকুর। দুই ভাই টেনশনে পড়ে গেলাম। এই অর্ধ সাদা কালো কুকুর গুলোকে খাওয়ানো যাবে কিনা। দুই ভাই কবিরাজকে মনে মনে গালি দিতে লাগলাম, শালা প্রতিটা টোটকায় কোনো না কোনো ঝামেলা দিয়েই রাখে। অন্য সময় অহরহ কত শত কুকুর চোখের সামনে দেখি, আজ কুকুর দেখতে পাইনা। একদিকে শীতের রাত, আরেক দিকে রাত বাড়ছে। রাস্তাঘাটও নির্জন হয়ে আসছে। কিছুদূর যেতেই একটি মোটাতাজা কালো কুকুর পেয়ে গেলাম। যেই না মাত্র ২য় রুটিটি দিলাম, কুকুরটা ঝপ করে মুখে নিয়ে গিলে ফেললো। আমরা যেই না মাত্র তৃতীয় কুকুরের সন্ধানে এগোতে লাগলাম,অমনি পিছন থেকে সেই মোটা দৈত্যকার কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করে জানান দিতে লাগলো,আমাদের হাতে আরো যে পাঁচটি রুটি আছে,সেগুলোও যেনো তাকে দেই। আমাদের না সূচক ইঙ্গিত বুঝতে পেরে এবার দৈত্যকার কুকুরটি আরো উত্তেজনামূলক হাঁক দিয়ে আমাদের দিকে তেড়ে আসতে লাগলো। কি আর করা। ছাইড়া দে মা, কাইন্দা বাঁচি। দুই ভাই দিলাম ভৌ দৌড়। দৌড়াতে দৌড়াতে সাইফুলকে বললাম,রুটিটা ফেলে দে?
সাইফুল দৌড়াতে দৌড়াতেই বলল,জীবন গেলেও ফেলবো না, আরো ৫ কুত্তারে রুটি না খাওয়ালে মরিয়মরে পামু না। সামনে মাদ্রাসার বিশাল দিঘি। পিছনে কুকুরের ধাওয়া,সামনে দিঘি। কোনো উপায়ন্তর না দেখে দুই ভাই দিঘিতেই ঝাপ দিলাম। কুকুরও আমাদের সাথে ঝাপ দিলো আমাদের চিৎকারে মাদ্রাসা থেকে ছাত্র ও হুজুররা বেরিয়ে এলো। তারা যদি ঐদিন আমাদের উদ্ধার না করতো,তাহলে সে রাতে আমরা দুই ভাই মরেই যেতাম। পরের কাহিনী আর নাই বা বললাম। তবে মরিয়মকে নিয়ে সাইফুলের জীবনে আরো তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। সেইসব দুধওয়ালী মরিয়মস লাভ্স কাহিনী পরে শেয়ার করবো।

(চলবে)

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন