ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম (পর্ব-৭)

আরশাদ উল্লাহ্‌

অতর্কিতে পার্ল হারবার আক্রমণ করে অ্যামেরিকার নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি করেছে জাপান। এই আক্রমণ পরিচালনা করেন জাপানের এডমিরাল ইছরকু ইয়ামামতো। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে তিনি চাননি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপান জড়িত হোক। তিনি একজন চৌকশ এডমিরাল ছিলেন। তার কথা থেকে বুঝা যায় যে প্রলম্বিত যুদ্ধ হলে জাপান প্রতিকুল অবস্থায় পড়বে। জাপান অধিকৃত এলাকা দখলে রাখতে পারবে না। এই পরিণতির কথা জেনেও তিনি জাপানের বিশাল নৌবাহিনীর নেতৃত্ব দেন। কারণ, ইয়ামামতো জানতেন যে বিশ্ব রাজনৈতিক মঞ্চ বড় উত্তপ্ত। চীনের সাংহাই মাঞ্চুরিয়া দখল করাতে আমেরিকা জাপানের উপর লোহা ও প্রেট্রল আমদানিতে অবরোধ আরোপ করেছে। ফিলিপাইন অ্যামেরিকার উপনিবেশ। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিংগাপুরে বৃটীশ, ফ্রান্স ও হল্যান্ডের অবস্থান। তাই তিনি যুদ্ধে জড়িত হতে বাধ্য হন। তিনি বলেছিলেন, “আমি দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত সকল বিদেশি কলোনিগুলি প্রথম আক্রমণে একের পর এক গুঁড়িয়ে দিয়ে দখলে নিয়ে আসব। কিন্তু প্রলম্বিত যুদ্ধ যদি হয় – পরবর্তি পরিণতি কি হবে জানি না। এডমিরাল ইয়ামামতো ঠিক তাই করেছিলে এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন।

এসব কথা তমকো ফুরুকাওয়া তার হাতের বইটি পড়ে জানতে পেরেছেন। কিন্তু তার মনে বইটির একটি পর্বের কিছু কথা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল। সে কথাটি হল, “অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট পূর্ব থেকে জানতেন যে জাপান পার্ল হারবার আক্রমণ করবে। কিন্তু আগাম জেনেও তিনি জাপানের নৌবাহিনীকে প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা কেন নিলেন না – সেটাই সবার মনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল!” রাজনীতির মারপ্যাঁচ বড় জটিল!

অনেক ইতিহাস বিশেষজ্ঞ লিখেছেন যে তখন অ্যামেরিকার জনসাধারণ মহাযুদ্ধে যুদ্ধে অ্যামেরিকার জড়িত হওয়ার বিপক্ষে ছিল। অ্যামেরিকা নীরপেক্ষ থাকার পক্ষে ছিল।কিন্তু রুজভেল্ট যুদ্ধে জড়িত হওয়ার জন্য ছল চাতুরির পথ অবলম্বন করে।১৯৪০ সালে মাত্র সাত দিনের যুদ্ধে অন্যতম পরাশক্তি ফ্রান্স জার্মানির নিকট পরাজয় বরণ করে। তাতে রুজভেল্ট চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবলেন যে তারপর জার্মানির নিকট বৃটেন পরাজয় বরণ করতে পারে।যদি বৃটেন পরাজিত হয় – জার্মানি সমগ্র ইয়ুরোপে প্রাধান্য বিস্তার করবে। অ্যামেরিকা তা চায় না। বৃটেনের পরাজয় ঠেকাবার জন্য অ্যামেরিকা পঞ্চাশটি যুদ্ধ জাহাজ দিল। বিনিময়ে বৃটেন থেকে ৯৯ বৎসর লীজে আটটি নৌঘাটি ব্যবহারের সুযোগ আদায় করল।

বড় রহস্যের কথা হল অ্যামেরিকা গোয়েন্দা মারফত ও জাপানের সেনাবাহিনীর গোপন সাংকেতিক বার্তাগুলির পাঠোদ্বার করে জেনেছে যে জাপানের নৌবাহিনী পার্ল হারবারের দিকে এগুচ্ছে। তখন অ্যামেরিকাতে নির্বাচনের সময়। ১৯৪০ সালে পুনঃননির্বাচনি ভাষণে জোর দিয়ে রুজভেল্ট বলেন যে মহাযুদ্ধে অ্যামেরিকা নিরপেক্ষ থাকবে। রুজভেল্টের প্রতিদ্বন্ধি ছিলেন ওয়েন্ডেল উইল্‌কি।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে রুজভেন্ট চাচ্ছিলেন জাপান আমেরিকা প্রথমে আক্রমণ করুক। আর, জাপানের আক্রমানাত্মক মনোভাব সৃষ্টি করার পিছনে বানিজ্য অবরোধ ছিল অন্যতম। তিনি মনে করতেন যদি জাপান আমেরিকা প্রথম আক্রমণ করে – তাহলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জড়িত হলেও সেটাকে কারণ হিসাবে দেখিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করবেন। তাই পার্ল হারবারের দিকে জাপানি নৌবহর যাচ্ছে জেনেও পার্ল হারবারে অবস্থানরত তার নৌবহরের কমান্ডারকে আগাম কিছু জানান নি।

ইয়ুকি সকল রান্নার কাজ রেডি করে তমকোকে লাঞ্চ খেতে বলল। তমকো হাতের বইটি রেখে ইয়ুকিকে বলল, ‘এই বইটি পড়ে যুদ্ধের অনেক রহস্য জেনেছি। তোমাকে সময় মত বলব।’

ইয়ুকি বলল, “আমার শোনার সময় কোথায় খালা। এখন খালুর লাঞ্চ নিয়ে মাঠে যেতে হবে!

সময় পেলে শুনব!” দেরি না করে রান্নাঘরের দিকে দ্রুত চলে গেল ইয়ুকি।

কুবো সানের ছেলে রিউতারো জুনিয়ার হাই স্কুলে আকিহিরোর সহপাঠি ছিল। তার বাবা একজন জেলে। তার ছোট আকৃতির দু’টো ট্রলার আছে।জাপান সাগরে মাছ ধরে অকশনে বিক্রি করে তাদের সংসার চলে। এই গ্রামের একটি স্বচ্ছল পরিবার। বাবাকে সাহায্য করার জন্য রিউতারো জুনিয়ার স্কুল পর্যন্ত পড়াশোনা করে স্কুল ছেড়েছে। সে তার বাবার সাথে সমুদ্রে মাছ শিকার করতে যায়। তার বাবা কুবো সান অবশ্য আকিহিরোর বাবার সহপাঠি ছিলেন। গত কয়েক মাস রিউতারো তার বাবাকে সাহায্য করেছে। এখন সে গভীর সমুদ্রে গিয়ে মাছ শিকার করা পছন্দ করে না। একদিন সে তার বাবাকে জানিয়ে দিয়েছে মাছ ধরা তার পছন্দ নয়।

ছেলের কথা শোনে রিউতারোর বাবা মনে কষ্ট পেলেও তিনি তাকে প্রতিদিন মাছ শিকারে যাওয়ার জন্য বেশী চাপ দেন নি।একদিন ছেলেকে কুবো সান জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “মাছ ধরা যদি তোর পছন্দ না হয় তাহলে অন্য কোন পছন্দের কাজ থাকলে আমাকে বল। আমি সে ব্যাপারে কি করা যায় চিন্তা করব।”

কিন্তু রিউতারো তার কোন পছন্দের কাজ আজোবধি খুঁজ়ে পায়নি। সে এখন গ্রামের এদিক সেদিক টু টু করে ঘুরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে রিউতারো বাজারে এসে চায়ের ষ্টলে বসে চা সিগারেট খায়।আকিহিরোর মায়ের দোকানেও মাঝে মাঝে সিগারেট কিনতে যায়। একদিন সে দোকানে ইয়ুকিকে দেখে আকিহিরোর মাকে সে জিজ্ঞাসা করেছিল, “এটা কার মেয়ে, কজিমা খালা?”

আকিহিরোর মা বলেছিলেন, ফুরুকাওয়ার মেয়ে।

এতোদিন তো আমি তাকে দেখিনি! বাবা বলেছিলেন ফুরুকাওয়ার কোন সন্তান নেই। এখন আপনি বলছেন মেয়েটা ফুরুকাওয়া সানের। আমার নিকট ব্যাপারটা পরিষ্কার মনে হচ্ছে না।

আকিহিরোর মা বললেন, “হ্যাঁ, তার নাম ইয়ুকি। ফুরুকাওয়ার মেয়ে।”

যুদ্ধে নিহত হয়েছেন কজিমা সানের স্বামি। তাই এতীম ইয়ুকিকে ছোট করে দেখানো তার পছন্দ নয়। এই সুশ্রী মেয়েটিকে তিনি স্নেহ করেন।

সেদিন রিউতারো ইয়ুকিকে দেখে কিছু জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার কঠিন মুখের দিকে চেয়ে কথা বলে নি। ঘরে ফিরে গিয়ে রিউতারো তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছে, “বাবা, তুমি বলেছিলে ফুরুকাওয়ার কোন সন্তান নেই। আজ কজিমা সানের দোকানে দেখলাম ফুরুকাওয়ার মেয়ে কেনাকাটা করতে এসেছে!”

কুবো সান বললেন, পাগল নাকি! ফুরুকাওয়ার এখন সন্তান এলো কোথা থেকে। না, তার কোন সন্তান নেই।তবে অনেক আগে শুনেছিলাম একটি মেয়ে তার বাড়িতে মেইডের কাজ করে। তুই সে মেয়েটির কথা বলছিস না তো?

রিউতারো প্রতিবাদ করে বলল, “কজিমা সান আমাকে বললেন যে মেয়েটি ফুরুকাওয়ার নিজের মেয়ে।ইচ্ছা থাকে তো তুমি গিয়ে ফুরুকাওয়াকে জিজ্ঞাসা করে দেখ!”

কুবো সান ছেলের সাথে সেদিন কথা না বাড়িয়ে বললেন, “একদিন ফুরুকাওয়ার বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে জেনে আসব”।

এক রোববারে কুবো সান ফুরুকাওয়ার বাড়িতে গেলেন। অনেক দিন পরে কুবো সানকে দেখে ফুরুকাওয়া তাকে সমাদর করে ঘরে বসিয়ে অনেক কথা বলেন। ইয়ুকি চা এনে দেওয়ার সময় তাকে দেখে কুবো সান বললেন, ফুরুকাওয়া, এই মেয়েটি কে?

ফুরুকাওয়া জবাব দিলেন, “আমার মেয়ে!”

“তোমার আবার মেয়ে আসল কোথা থেকে?”

ফুরুকাওয়া হেসে এবার সত্য কথাটি বললেন, “আসলে আমার পালক মেয়ে।নিজের মেয়ে করে নিব ভাবছি।”

কাউন্সিল অফিসে রেজিষ্ট্রি করেছ?

না, এখনো করিনি।তবে সাপ্তাহ খানেকের মধ্যে করব।

“কার মেয়ে কার নাতিন তা তুমি কিছুই জান না। নয় বৎসর তোমার বাড়িতে সে কাজ করছে। এতোদিন পরে তাকে তুমি নিজের মেয়ে করার চিন্তা করছ! সে যাই হোক, তা তোমার ইচ্ছা”।তারপর নিম্ন স্বরে বললেন, “বেশ মিষ্টি মেয়ে তো! এমন সুন্দরী মেয়ে আমাদের গ্রামে দু’টো দেখিনি। লেখাপড়া কতটুকু করেছে, তা জানো কি?”

“প্রাইমারী স্কুলও পাশ করেনি।দুঃখি মেয়ে, নয় বৎসরের মাথায় সে তার মা বাবাকে হারিয়েছে!”

“কোন এলাকার মেয়ে?”

“কিউশিও এলাকার।”

“কিন্তু তুমি একটি কাজ ভাল করনি।তাকে স্কুলে পাঠানো তোমার কর্তব্য ছিল!”

ফুরুকাওয়া বললেন, “তখন আমাদের কাজের মেয়ের দরকার ছিল। তাই স্কুলে পাঠাই নি!”

স্কুলে পাঠাইনি বললেই সব দায়দায়িত্ত শেষ হয়ে যায়নি তোমার। চিন্তা করে দেখ কাজটা ভাল করনি।এ কথা বলে সেদিন কুবো সান চলে গেলেন।

ডিসেম্বর মাসে প্রচুর তুষারপাত হয় আওমরিতে। খাল বিল জমিন সর্বত্র কোমল শুভ্র তুষারপাতে চতুর্দিক সফেদ-সাদা হয়ে যায়।এই সময় জাপানের প্রকৃতি ভীন্ন রূপ ধারণ করে। এই এলাকায় ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত তুষারপাত হয়। কখনো কখনো নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তুষার পড়ে।তাপমাত্রা হিমাংকের নিচে চলে যায়। যেদিন তুষার পড়ে সেদিন বাতাস কম থাকে বলে অতিরিক্ত ঠান্ডা বোধ হয় না। কিন্তু তার পরের দিন যখন উত্তরের কনকনে শীতল বাতাস বইতে শুরু করে তখন অসহ্য শীত। এখানে শিশু এবং যুবক যুবতীরা শীত কালে সাদা তুষারের উপর খেলা করে।কিন্তু মুস্কিল হয় বয়স্ক লোকদের।তারা তখন হীটার জ্বালিয়ে ঘরে বসে থাকে।তাছাড়া জাপানি রাইস ওয়াইন খেয়ে অনেকে শরীর গরম করে ঘুমায়। মহিলারা ঘরে টুকটাক কাজ করে। তুষার যখন শক্ত হয়ে বরফে পরিণত হয়, তখন রাস্তা দিয়ে চলা ফেরা করার সময়ে পা পিছলে অনেকে হাত পায়ে আঘাত পায়।অনেকের হাড় ভেঙ্গে যায়। সবাই তখন সাবধানে হাঁটে।

ইয়ুকি এই বরফের উপর দিয়ে হেঁটে আকিহিরোর মায়ের দোকানে কেনাকাটা করতে আসে। যেদিন অতিরিক্ত তুষারপাত হয় সেদিন সে আসে না।

এদিকে কিছুদিন পূর্বে রিউতারো একটি মটর সাইকেল কিনেছে। সেটা চালিয়ে সারা গ্রাম টুটু করে ঘুরে বেড়ায়।সে প্রায় দিনেই চায়ের ষ্টলে বসে আড্ডা দেয়। একদিন সে ইয়ুকিকে বরফের উপর দিয়ে আকিহিরোর মায়ের দোকানে যেতে দেখে তার পিছে পিছে দোকানে প্রবেশ করে ইয়ুকিকে জিজ্ঞাসা করল, “এই মেয়ে, তোমার নাম কি?”

“ইয়ুকি!”

“তুমি ফুরুকাওয়া সানের মেয়ে?”

“না, আমি তাঁর বাড়িতে কাজ করি!”

“তোমার সাথে বন্ধুত্ত করতে চাই। আমার বন্ধু হবে কি?” কোন প্রকার ভনিতা না করেই রিউতারো সরাসরি নির্লজ্জের মতো কথাটা বলে ফেলল।

“আমি মেয়ে মানুষ, আমার সাথে কি ধরণের বন্ধুত্ব করতে চান?”

“কি যে বল তুমি, মেয়ে বলে কি বন্ধুত্ব করা নিষেধ?”

সেদিন ইয়ুকি কোন কথা না বলে চুপ করে রইল।

রিউতারো বলল, ‘ইয়ুকি।’

‘বলুন।’

এখান থেকে তোমার অনেক পথ হেঁটে যেতে হয়, তাই না? আমি তোমাকে আমার মোটর সাকেলে তোমার বাড়িতে পৌছে দিব!”

‘প্রয়োজন নেই।’ বিলম্ব না করে তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল ইয়ুকি।

“প্রয়োজন নেই বলছ কেন?’ আমি যদি তোমাকে মোটর সাইকেলে করে পৌছে দেই – তাহলে কি লজ্জার কিছু আছে। কেউ কি তোমাকে কিছু বলবে?”

লজ্জার কিছু আছে কি নেই সেকথা আপনাকে বলার প্রয়োজন মনে করি না। আমি হেঁটে এসেছি, হেঁটে ফিরে যেতে পারব।আপনাকে আমি চিনি না। আমি কেন আপনার মোটর সাইকেলে উঠে ঘরে ফিরব?”

“বুঝেছি। তুমি আমাকে চিনতে পারনি, তাই সঙ্কুচ করছ। আমার নাম রিউতারো কুবো।আমি এই গ্রামের বাসিন্দা।তাছাড়া আমার বাবাকে ফুরুকাওয়া সান চিনেন। তারা দু’জন স্কুল জীবন থেকে বন্ধু।

ইয়ুকির তখন মনে পড়ল কুবো সান একদিন ফুরুকাওয়ার বাড়িতে গিয়েছিল। সেদিন ইয়ুকি কুবো সানের সব কথা আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনেছে। তখন তার মনে হয়েছিল কুবো সান খারাপ লোক নয়। কেননা, ফুরুকাওয়া সানকে তিনি ইয়ুকিকে ‘স্কুলে না পাঠানোর জন্য’ শক্ত কথা বলেছিলেন। ইয়ুকিকে স্কুলে না পাঠানোর জন্য এই প্রথম একজন লোক নাকাজাতো গ্রামে প্রতিবাদ করেছিল। এখনো কুবো সানের কথাগুলি ইয়ুকির কানে বাজে।

ততক্ষণে আকিহিরোর মা কেনাকাটার থলেটি ইয়ুকির হাতে দিয়ে বললেন, “শোন, বরফের উপর দিয়ে সাবধানে হেঁটে যাবে, নইলে আছাড় খেয়ে পায়ে চোট লাগতে পারে।”

রিউতারো তখন বলল, “আমি মোটর সাইকেলে করে তাকে পৌছে দিব, খালা!”

তা কি করে সম্ভব।তোমাকে তো ইয়ুকি চিনে না।আর, প্রথম সাক্ষাতে কোন যুবতি মেয়েকে এই ধরণের প্রস্তাব করা অশোভনীয়।

রিউতারো লজ্জা পেল।সে লজ্জিত ভাবে বলল, “আমি তার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইছি মাত্র।”

এক জনকে এক নজর দেখে, তার সম্পর্কে না জেনে না শোনে কি করে বন্ধুত্ব করার কথা বলছ? কিন্তু মেয়েটি নিরিহ, সে তোমাকে চিনেনা বলেছে। তাকে তুমি পিড়াপিড়ি করবে না, রিউতারো!

রিউতারো বলল, আমি দুঃখিত খালা। তারপর নিরবে সে দোকান থেকে বের হয়ে তার মোটর সাইকেল ষ্টার্ট করল।

ইয়ুকি বলল, “খালা আজ আমার একা যেতে ভয় লাগছে। দয়াকরে আমাকে সাহায্য করুন!”

অজানা অচেনা লোক দেখলে ইয়ুকি বড় ভয় পায়। আমেরিকার সৈন্যগুলি যখন সাইয়োরি ও তার মাকে গুলি করে হত্যা করেছিল – সে কথা তার মনে পড়ে যায়। আজ গায়ে পড়ে রিউতারুর কথা বলাটা ইয়ুকির ভাল লাগেনি।

এখন সমস্যায় পড়লেন আকিহিরোর মা।ইয়ুকি আজকের মত এর আগে তো কোন দিন তার নিকট সাহায্য প্রার্থণা করেনি। একে তো রস্তা-ঘট সব বরফে আবৃত – কিন্তু ইয়ুকি আজ সে জন্য সাহায্য করার জন্য বলেনি মনে হচ্ছে। কারণ, তার মতো তরুণিএতটুকু পথ হেঁটে যেতে পারবে।রিউতারোর ভয়ে এ কথা বলছে না তো?। বড় ভাবনায় পড়লেন মহীলা।

কজিমা সান বললেন, “এখন কাকে তোমার সঙ্গে পাঠাই বল। আকিহিরো স্কুল থেকে ফিরলে তাকে না হয় বললতাম।”

ইয়ুকি বলল, “আমি কি কিছুক্ষণ আপেক্ষা করব, খালা?”

“ঠিক আছে, তুমি অপেক্ষা কর!”

কিন্তু সেদিন আকিহিরোর ঘরে ফিরতে দেরী হয়ে গেল। কারণ, বরফের উপরে সাইকেলের চাকা পিছলে পড়ে গিয়ে সে তার পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। আর্ধেক রাস্তা সে তার সাইকেলে ভর করে আস্তে আস্তে হেঁটে ঘরে ফিরেছে।

ইয়ুকি তার ফিরে আসার পথ অধির আগ্রহের সাথে দেখছে। আকিহিরো পায়ে ব্যাথা নিয়ে ঘরে ফিরার কারণে সে এখন কি করবে ভাবছে। ইয়ুকি আকিহিরোর পায়ের কাছে বসে বলল, “পা ব্যাথা করছে তোমার, ডাক্তার ডাকব?”

তার পিছে আকিহিরোর মা দাঁড়িয়ে সব কিছু লক্ষ করছিলেন। আকিহিরো ইয়ুকির প্রশ্নের উত্তরে বলল, “এখন তেমন ব্যাথা নেই।গরম পানি দিয়ে গোসল করলে আশা করি বাকি ব্যাথাটা চলে যাবে।”

ইয়ুকি দৌঁড়ে বাথরুমের গিয়ে পানি গরম করার জন্য যেতে যাচ্ছিল। কিন্তু আকিহিরোর মাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল সে। তার এই দ্বিধান্বিত অবস্থা দেখে হাসলেন আকিহিরোর মা।তারপর বললেন, “ইয়ুকি ঘরে ফিরতে তোমার দেরী হয়ে যাবে না তো?”

‘তাইতো’, নিজের অজান্তেই বলল, ইয়ুকি। “কিন্তু…কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “এখন আমি কি করব বলুন।এখন তো চারিদিক অন্ধকার। এদিকে আকিহিরো পায়ে ব্যথা পেয়েছে।

আমি তমোহিরোকে বলছি তোমার সাথে যেতে। কজিমা সানের ছোট ছেলে তমোহিরো।

তখন আকিহিরো বাধা দিয়ে বলল, “মা, ইয়ুকিকে আজ আমাদের ঘরে রেখে দাও।তুমি বরং তার বাজারের থলেটি তমহিরোকে দিয়ে ফুরুকাওয়া সানের বাড়িতে পাঠিয়ে দাও। তৎসঙ্গে ফুরুকাওয়া সানকে একটা চিঠিও লিখে দাও। তাহলে তিনি চিন্তামুক্ত থাকবেন!”

“কি লিখব চিঠিতে?”

লিখে দাও যে ইয়ুকি আজ রাতে আমাদের ঘরে থাকবে এবং কাল সকালে সে ঘরে ফিরে যাবে। তাছাড়া আজ বেশ তুষারপাত হচ্ছে। আমি আশাকরি তিনি কিছু মনে করবেন না।,

আকিহিরোর মা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ কিছু বলতে পারলেন না। আবার এই ব্যাপারে কি করবেন কোন সিদ্ধান্তেও পৌছতে পারলেন না।

আকিহিরো বলল, “মা, কিছু মনে করো না।আজ আমরা রাত জেগে ইয়ুকির জীবন কাহিনী শোনব। তুমি তো জান যে তার অতীত জীবন বড় দুঃখ জনক।”

আকিহিরোর মা কোন মন্তব্য না করে নিচে নেমে একটি চিঠি লিখে থলে ও চিঠিটি তমহিরোর হাতে দিয়ে বললেন, “এই চিঠি এবং বাজারের থলেটি নিয়ে ফুরুকাওয়ার ঘরে দিয়ে আস!”

তমহিরো কোন মন্তব্য না করে থলে ও চিঠিটি হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

ইয়ুকি বলল, খালা আমি কি গোসলের পানি গরম করব?

“করে দাও!”

ইয়ুকি মৃদু হেসে গোসল খানায় গেল।

সেই দিনটি এই কজিমা পরিবারের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য এবং বছরের একটি ব্যতিক্রমধর্মি দিন ছিল। যা নাকি আজব্দি তাদের ঘরে আর হয়নি। গোসলের পানি রেডি করে ইয়ুকি দৌড়ে মহিলার পাশে গিয়ে তাঁর রান্নার কাজেও সাহায্য করল।

বিগত কষ্টকর জীবনের দিন গুলির কথা ভেবে এই প্রথম আকিহিরোর মা বুঝতে পারলেন যে ইয়ুকি যদি আকিহিরোর বউ হয়ে এই বাড়িতে আসে – তাহলে সে একাই সংসারের সব কাজ সামলাতে পারবে। কিন্তু সে কথা তিনি সেদিন মুখে প্রকাশ করেন নি। তমোহিরো ফিরে আসার পরে সবাই যখন এক সাথে রাতের খাবার খাচ্ছিল।তখন তমহিরো বলল, রিউতারো কুবোকে ফুরুকাওয়ার বাড়িতে দেখে আসলাম।

তার কথা শোনে চমকে উঠল ইয়ুকি।মনে মনে বলল, “এই তুষারপাতের দিনে সে গিয়েছে?”

কিন্তু কিছু মন্ত্যব্য না করে নিরবে খাচ্ছিল।

খাবার শেষে আকিহিরো বলল, “ইয়ুকি তুমি তোমার মা বাবার কথা আমাদের শোনাও।

তাঁদের সম্পর্কে জানতে বড় ইচ্ছে হয়। ইয়ুকি বলল, খালার নিকট ইতিমধ্যে আমার জীবনের সব কথা বলেছি। তবুও যখন তোমরা শুনতে চাচ্ছ, আমি পুনরায় বলব। তারপর ইয়ুকি সংক্ষেপে তার জীবন কাহিনী বলল। নতুন কথা যা বলল, তা হল, সেই বিভিষিকাময় রাতের কথা, যে রাতে আমেরিকার সৈন্যটি ঘরে ঢুকে সাইয়োরি ও তার মাকে হত্যা করেছে। সেই হত্যাকান্ডের কথা আর না খেয়ে থাকার কথা ও ফ্যাকটরীতে তার মায়ের লাশ সনাক্ত করতে না পারার সেই বিভৎস ও ভয়াবহ কাহিনী। এক পর্যায়ে ইয়ুকি বলল, “এসব কথা আমি কাউকে বলিনি। কারণ, সেদিনের এই ঘটনার কথা স্মরণ করলে সারাটা দিন আমি অস্থির অবস্থায় থাকি, খাবারে রুচি থাকে না।তাছাড়া রাতে ভয়ের স্বপ্ন দেখি।যথা সম্ভব অতীতের সব কথা আমি ভুলে থাকার চেষ্টা করি!”

ক্ষমা চেয়ে আকিহিরো বলল, “আজ তোমাকে সে সব কথা শোনাবার কথা না বললেই ভাল হত, তাই না ইয়ুকি? আমি তোমার মনে কষ্ট দেওয়ার জন্য দুঃখিত!”

“দুঃখ প্রকাশ করার কোন মনে হয়না আকিহিরো। আমি বরং আজ সেই দুর্দিনের কথাগুলি তোমাদের বলে এখন কিছুটা হালকা বোধ করছি!”

ইয়ুকি আবার বলল, “দিনের পর দিন রাতের পর রাত সেখানে আমরা বিভীষিকার মধ্যে কাটিয়েছি।বাবা ও মাকে হারিয়ে মনে হয়েছিল পৃথিবীতে আমার আর কেউ রইল না। তখন আমি কিছুই বুঝতাম না। আর, সে জন্যই হয়তো আমি আত্মহত্যা করিনি। তোমরা যারা জাপানের উত্তর অঞ্চলে আছ, দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ কষ্টের কথা কিছুই জান না। তোমরা তোমাদের বাবাকে হারিয়েছ, তা দুঃখজনক বটে, কিন্তু তোমাদের মা তো বেঁচে আছেন।কোন কিছুর জন্য আব্‌দার করার জন্য তোমাদের এই মা তো রয়েছেন। আমি কার নিকট আব্‌দার করব। কে আছে আমার? আমার মনের দুঃখের কথা বলার এতদিন কেউ ছিল না।”

এতটুকু বলে ইয়ুকি হঠাৎ চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।

আকিহিরোর মা তাকে বুকে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্তনা দিয়ে বললেন, আর কখনো আমরা তোমাকে সেই সব দু্ঃখের কথা বলার জন্য বলব না, ইয়ুকি। এখন তুমি আর কেঁদো না, মা!” তিনি আকিহিরোকে লক্ষ করে বললেন, “তোমরা এখন অন্য প্রসঙ্গে কথা বল!”

ইয়ুকি বলল, “না, খালা। আপনাদের প্রতি আমি মোটেই অসন্তুষ্ট নই। আমি বরং আনন্দিত হয়েছি।কারণ, বহু দিন পরে আমার দুঃখের কথা বলার লোক আজ আমি পেয়েছি। আজ আমি নিজেকে বড় ভাগ্যবতী মনে করছি। কারো কাছে গিয়ে বুকের জমাট ব্যাথাগুলিকে বলে যে এক মুহূর্তের জন্য হালকা বোধ করব তেমন কেউ তো আমার ছিল না!

ইয়ুকি বলছে, “এই নাকাজাতো গ্রামটিতে আমি নয় বৎসর যাবত আছি। কিন্তু কেউ কোনদিন আমার মনের জমাট বাধা দুঃখের কথা জানার বা শোনার তেমন আগ্রহ দেখায় নি। এখানে সবাই জানে আমি একজন অনাথ এতীম। পৃথিবীতে আমার আপন বলতে কেউ নেই!” তারপর ইয়ুকি কিছুক্ষণ চুপ করে কি যেন চিন্তা করে নিল। ইয়ুকি বলল, “হ্যাঁ, কিউশিওর সেই হিয়োসি গ্রামে আমার মা মৃত্যু বরণ করার পরেও আমি দেখেছি আমার জন্য অনেক দয়ালু কিছু লোক ছিলেন।যাঁদের কাছে থেকে বাকি দিনগুলি আমি সেখানে অতিবাহীত করেছি। সেখানে তারা কেউ আমাকে ঠেলে ঘর থেকে বেড় করে দেননি। যদিও তাদের দিন গুলি ভাল যাচ্ছিল না। আমার সমবয়সী সাইয়ুরি এবং তার মাকে আমার সামনে শত্রুসৈন্য গুলি করে হত্যা করেছে। তাদের হত্যার বিচার করার যে সেখানে কেউ সেখানে ছিলনা। আমার বাবা ও মা মৃত্যু বরণ করেছেন। আমাকে দেখা শোনা করার কেউ রইল না।আমাকে কেউ স্কুলে পাঠাল না।এখানে আমার কাজের জন্য কোন পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়নি। তবুও আমি খুশি এই জন্য যে আমি এখানে কাজ করে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম এবং এখনো বেঁচে আছি। অন্তত এই আশাটুকু তো আমার পূর্ণ হয়েছে, তাই না খালা?”

আকিহিরোর মা বললেন, “এখন তুমি শান্ত হও ইয়ুকি। তোমার বাকি জীবন তোমার সামনে পড়ে রয়েছে। এখন থেকে নতুন করে তোমার জীবন গড়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হও এবং নিজেকে গড়ে তোল!”

তিনি আরো বললেন, “দুঃখ চীরদিন কারো সাথী হয়না, ইয়ূকি।দুঃখের পরে সুখ আসে।পৃথিবীতে সব কিছুর পরিবর্তন হয়।যেমন ধরো এখন শীত কাল।শীতের পরে বসন্তকাল আসবে।গাছে গাছে আবার নতুন কচি পাতা আসবে, ফুলে ফলে ছেয়ে যাবে সারা দেশ। মানুষের জীবনও ঠিক সে রকম। মানুষের জীবন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই উঠানামা করে। কাজেই আমিও আমার দু’টি সন্তান নিয়ে মরতে চাইনি। আমি বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম বলেই আজ আমি বেঁচে আছি। তুমি কি তোমার খালার কষ্টের কথা চিন্তা করে দেখেছ? পৃথিবীর সব দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের জীবন নাটকের মতো। ধরে নাও তোমার আমার জ়ীবন।আমরা আমাদের অজান্তে পৃথিবীর বিভিন্ন অদৃশ্য দর্শক বিহীন নাট্যশালায় অভিনয় করছি মাত্র। সুন্দর এবং সুখের দিন অপেক্ষা করছে। তাই তোমাকে আরো ধৈর্য্য ধরে তোমার ভবিষ্যতের সুদিন আসার দিনটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে!”

আকিহিরোর মায়ের কথাগুলি শোনে ইয়ুকি মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ বসে রইল। নিরবতা ভঙ্গ করল আকিহিরো। সে বলল, “এখন ভোর দু’টা বেজে গেছে। আমাদের ঘুমাবার দরকার, তাই না ইয়ুকি?”

ইয়ুকি সঙ্কুচ করে বলল, “এই শীতের রাতে বিছনা পত্র খুঁজা খুঁজি করে বের করার দরকার নেই।আমরা আরো কিছুক্ষণ গল্প করে রাত কাটিয়ে দিব। সকালে গিয়ে ফুরুকাওয়াদের নাস্তা তৈরী করে খাওয়াতে হবে।

সেদিন সারা রাত এরা তিনজন জেগে কাটাল। ইয়ুকি যাবার সময় আকিহিরো বলল, “ভাল কথা, ঘরে ফিরার পর ফুরুকাওয়া সান জিজ্ঞাসা করলে কি জবাব দিবে?”

“সে ভাবনা তোমাকে করতে হবে না!” ইয়ুকি মৃদু হেসে বলল।

“না, তবু বল যদি প্রশ্ন করে তাদের তুমি কি বলবে?”

“যা সত্য তা বলব! আমি মিথ্যা কথা বলিনা।তারা ভাল জানেন।”

“তা না হয় বললে, “কিন্তু কি রকম সত্য কথাটি বলবে আমাকে বলতে কি তোমার আপত্তি আছে?” আকিহিরো ইয়ুকিকে চাপ দিয়ে বলল।

“না, আপত্তি থাকবে কেন। আমি বলব তোমার পায়ে ব্যাথার কথা। তুমি অসুস্থ ছিলে, তাই তোমাদের ঘরে তোমার মাকে সাহায্য করতে রাতে ছিলাম!” তারপর রেগে বলল, “আমার যা ইচ্ছা তাই বলব। তুমি আমার জন্য কোন চিন্তা করবে না!”

ইয়ুকি ঘর থেকে বের হয়ে আধা পথ যাওয়ার পরে রিউতারোর সাথে দেখা হয়ে গেল।তখন সকাল সাতটা বাজে। রাস্তায় গতকালের তুষার জমে গিয়ে পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছে। সে তার মোটর সাইকেলে করে বাজারের দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু ইয়ুকির সামনে এসে থেমে মোটর সাইকেলের উপরে বসে জিজ্ঞাসা করল, “ইয়ুকি তুমি কি আকিহিরোকে ভালবাস?”

এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের জন্য ইয়ুকি প্রস্তুত ছিল না। তাছাড়া এমন ভাবে গায়ে পড়ে – যার সাথে ঘনিষ্ঠতা নেই। এমন একজন লোকের সাথে কথা বলার ইচ্ছা তার বিন্দুমাত্র নেই।ইয়ুকি রিউতারোর প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে হাঁটতে লাগল। কিন্তু রিউতারো তাকে আবার বলল, “আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে কি তোমার কোন অসুবিধা হবে, ইয়ুকি?”

এবার ইয়ুকি ঘুরে দাঁড়াল, তারপর বলল, “হ্যা, আমি তাকে ভালবাসি। তাতে আপনার কোন আপত্তি আছে কি?”

“না, আপত্তি থাকবে কেন।”

তা হলে আমাকে যেতে দিন! ইয়ুকির মনে আরো একটি প্রশ্ন জেগেছিল। তা হলো গতকাল সন্ধ্যার পরে সে ফুরুকাওয়ার বাড়িতে কেন গিয়েছিল সে ব্যাপারে প্রশ্ন করবে ভাবছিল। কিন্তু নিজের ইচ্ছাকে দমন করে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল।

এবার রিউতারো তার মটর সাইকেল থেকে নেমে ইয়ুকির পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। ইয়ুকি বিরক্তি বোধ করছিল, কিন্তু কোন মন্তব্য না করে হাঁটতেছে।

‘ইয়ুকি,’ রিউতারো তার নাম ধরে এবার ডাক দিল। কিন্তু ইয়ুকির তরফ থেকে কোন জবাব পেল না।

তাই পুনরায় রিউতারো বলল, “ইয়ুকি, আমি কি তোমার অপছন্দ?”

ইয়ুকি বলল, “দেখুন প্রথমে আপনার প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। একটি নারী দু’জনকে ভালবাসা দিতে পারে না। পছন্দ অপছন্দের কথা জানতে চাওয়া – তারপর যুক্তিযুক্ত নয়।”

তাহলে তুমি আমাকে পছন্দ করনা কেন?

ইয়ুকি বলল, “আবার একই প্রশ্ন। আপনি বোকা!”

আমাকে তুমি ঘৃণা কর?

“না, আপনাকে আমি ঘৃণা করব কেন? এই গ্রামের সন্তান আপনি – শ্রদ্ধা করি।”

রিউতারো বলল, “তাহলে তুমি আমাকে পছন্দ করনা কেন?”

এর জবাব তো দেয়া হয়েছে।দয়া করে আমাকে যেতে দিন।আমি ঘরে ফিরতে চাই। আর কোন কথা না বলে দ্রুত হাঁটতে লাগল, ইয়ুকি।

গতকাল এই লোকটির ভয়ে ইয়ুকি সন্ধ্যায় একা ঘরে ফিরতে চায় নি। যদিও রিউতারো তাকে কোন ব্যাপারে ভয় দেখায়নি। তবু কেন জানি অপরিচিত ছেলেরা যখন তার দিকে তীর্যক ভাবে তাকায় তখন সে সত্যিই ভয় পায়।

ঘরে ফিরে প্রথমেই ইয়ুকি ফুরুকাওয়া দম্পতিকে দেখে যথারীতি ‘সুভ সকাল’ বলল। তারাও প্রতিউত্তরে ‘শুভ সকাল’ বললেন।

ফুরুকাওয়ার স্ত্রী বললেন, কজিমা সানের ঘরে কেমন কাটল তোমার?

“খুব ভাল কেটেছে, সারারাত আমরা কথা বলে কাটিয়েছি। ঘুমাই নি!”

“ রাতভর কি কথা বলেছ?

তারা আমার বাবা মায়ের ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলেন।

ভাল! সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করলেন মহিলা।

আমি ছিলাম না বলে আপানাদের কি কোন অসুবিধা হয়েছে, খালা?

“না, আমাদের কোন অসুবিধা হয়নি। কাল কুবো সানের ছেলে রিউতারো এসেছিল।”

“আমি শুনেছি।”

“কার কাছে শুনেছ?

“তমোহিরো বলেছে, সে আকিহিরোর ছোট ভাই।”

খুব ভাল ছেলে রিউতারো।

ইয়ুকি আর কোন মন্তব্য না করে চুপ করে রইল।

ইয়ুকি সেদিন রান্না ঘরে গিয়ে কাজ করছিল আর ভাবছিল এই বাড়িতে রিউতারোর আগমনের কথা। কি কারণে সে এসেছিল তার জানতে ইচ্ছা হল। “কিন্তু না, আমার পক্ষে তা জানা সম্ভব নয়”, ইয়ুকি মনে মনে বলল।

এখানে শীত কালের রূপ ভীন্ন রকম।ভোরে উঠে মাঠের দিকে তাকালে বুঝা যায় এখন শীতকাল। এদেশে শীতকালেরও একটা আলাদা রূপ আছে। জাপানের শীত কালের বৈচিত্র সহজেই চোখে পড়ে। দিনের পর দিন এখন নরম তুষার পড়ে সেগুলি শক্ত বরফে পরিণত হয়। এখন সব রাস্তা বরফে ঢেকে গেছে। গ্রামের লোকেরা একত্রিত হয়ে শাবল দিয়ে জমাট বাধা তুষার ও বরফ সরিয়ে রাস্তার দু’দিকে রাখছে। নইলে চলাচলের বিঘ্ন হয়। এই সময়ে সবধানে চলাফিরা করতে হয়। তদুপরি উত্তরের বাতাস বইলে প্রচন্ড শীত লাগে। ইয়ুকি এখন কেনাকাটা করতে আরো সকালে ঘর থেকে বের হয়। শীতকালে জাপানের দিন ছোট হয়ে যায়। বিকাল চারটার পরে সূর্য দেখা যায় না। ইতিমধ্যে অধিকাংশ গাছের পাতা ঝড়ে গেছে। তবুও এর মধ্যে কিছু গাছ আছে যেগুলির পাতা ঝড়েনা। তাই সবুজের সমারোহ একেবারে চলে যায়না। অতিরিক্ত তূষারপাত হলে পাখিদের খাবারও দুর্লভ হয়ে যায়। চড়ুই পাখিগুলি সকালে ঘরের কোণায় কিচির মিচির করে ডাকে। ইয়ুকি তখন বুঝতে পারে যে তারা খাবার চাচ্ছে। তখন সে ধানের গোলা থেকে ধান এনে ছিটিয়ে দেয়। চড়ুইগুলি ঝাকে ঝাকে উড়ে এসে সেগুলি খায়। এই সময়ে বড় পাখি এখন খুব কম দেখা যায়। সেগুলি শীতকালে দক্ষিণ অঞ্চলে আরো উষ্ণ এলাকায় শত শত মাইল উড়ে চলে গেছে। শীত কমে গেলে বসন্তের আগমে তাপ বৃদ্ধি পাবে। সেগুলি আবার এই এলাকায় ফিরে আসবে।

এই শীতের দিনগুলি কেন জানি ইয়ুকির বড় নিঃসঙ্গ মনে হয়। রাতে বিছানায় গড়াগড়ি করে সময় কাটায়। মাঝে মাঝে আকিহিরোর কথা চিন্তা করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। একদিন সকালের খাবার খাওয়ার সময়ে ফুরুকাওয়া সান বললেন, “তোমাকে আমরা আমাদের মেয়ে করে নিয়েছি, মা!”

এই কথা শোনা মাত্র ইয়ুকি প্রতিবাদ করে বলল, “এই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আশা করেছিলাম আপনারা আমার সাথে আলোচনা করবেন। আমি এখন সেই ছোট মেয়েটি নই। আপনাদের নিকট আমি চীরদিন কৃতজ্ঞ থাকব। কিন্তু দয়া করে আমার স্বাধীনতার উপর আপনারা কোন হস্তক্ষেপ করবেনা না!”

আমরা কি কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি বলতে চাও? তমকো ফুরুকাওয়া জিজ্ঞাসা করলেন।

“হ্যা, ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি দৃঢ়তার সাথে এর প্রতিবাদ করছি। আপনাদের এই সিদ্ধান্ত ভুল হয়েছে।কারণ, আমি এই বাড়িতে চীর দিন থাকতে চাইনা!”

‘ইয়ুকি!’ ফুরুকাওয়া বললেন, “আমাদের কোন সন্তান নেই। তোমাকে আমাদের সন্তান করে নিয়েছি বলে কি আমাদের অপরাধ হয়েছে?”

অপরাধ হয়েছে কি না সে ব্যাপারে অবশ্য আপনাদের সাথে এখন আলোচনা করতে চাই না। আপনাদের এই বাড়িতে মেইডের কাজ করছি নয় বৎসরের উপর হয়েছে। যখন আমি নয় বৎসর বয়সের ছিলাম। যখন আমি সর্বহারা ছিলাম।তখন আপানারা আমাকে যদি দয়া করে আমাকে মেয়ে করে নিতেন, তখন আমি ভাবতাম যে আমার মা বাবাকে হারিয়ে আবার তাঁদের আমি আপনাদের মাঝে ফিরে পেয়েছি। কিন্তু আপানারা তখন চুপ করেছিলেন কেন? আপনাদের মুখে সে ধরণের কথা আমি যদি একবার শুনতাম তা হলে আজ আমি কোন প্রতিবাদ করতাম না।

লেখকঃ কবি,সাহিত্যিক এবং প্রবাসী বাংলাদেশী, জাপান

 

উপন্যাসের আগের পর্ব –

ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকু একটি মেয়ের নাম (পর্ব-৬)

আরও পড়ুন