“রাত্রি নামে অমাবস্যা ‘পর্ব-৭ (একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প)

হাসিনা সাঈদ

-আসসালামু আলাইকুম রাত্রি…?
-ওয়ালাইকুম আসসালাম।
-কেমন আছেন?
-ভালো…।
এক অদ্ভুত মায়া মুখটায় লাজুকলতার যেন শেষ নেই রাত্রির।গায়ে জড়ানো টাঙাইলের তাতের শাড়ি,জলপাই আর লাল রঙের।লাল সবুজ রেশমি কাঁচের চুড়ি দুহাতে ছয়টি করে।চুল গুলো ঝাড়ন দিয়ে ঝাড়ছিল, রাশেদের পায়ের আওয়াজ পেয়ে সেটি বন্ধ করে ভেজা চুলে ঘোমটায় জড়িয়ে মাথা নীচু করে থাকে লাজুক লতা রাত্রি।
রাত্রির ফরসা হাতগুলো খেয়াল করে রাশেদ।
চিকনচাকন হাতদুটো রাত্রির, তার উপর আঙুলগুলোতে মেহেদিতে লাল টকটকা, আরও বেশী ভালোলাগাকে বাড়িয়ে দেয় রাশেদের।
আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে ফের জিজ্ঞেস করে,
-আপনার হাতের কি অবস্থা এখন?
রাত্রি এবার মুখ তুলে তাকায়,কিছুটা অবাক
-কেন?
-ঐযে সেদিন না কেঁটে গেলো?
-ও আচ্ছা ওটা তো সেড়ে গেছে সেদিনই ক্ষত তো গভীর ছিল না ওতো…আপনি মনে রেখেছেন?মৃদু হাসি রাত্রির।
-মনে কেন রাখবোনা…?অনেকখানিই তো কেঁটে ফেলেছিলেন…তারপর রুমালটাও ফিরিয়ে দিলেন।
ফের মৃদু হাসি রাত্রির।
-রুমাল দিলে কিন্তু ঝগড়া হয়…।
-আচ্ছা সেজন্যে কি ফেরত দিলেন?পাল্টা জিজ্ঞাসা রাশেদের।
রাত্রি মাথা নাড়িয়ে বলে,
-হুম তাই,আর..।
-আর?
-আপনার বোন সেলাই করে, কত না যত্ন করে বানিয়েছে আপনার জন্যে, সেটি নিজের কাছে রাখাটা ঠিক মনে করিনি তাই…।
-যা কিছু আমার তা আজ থেকে তোমার,তাকি ভাবতে পারো না রাত্রি?
-কি বল্লেন আপনি?অবাক জিজ্ঞাসা রাত্রির।
-সব বলবো… আমি আপনাকে অধিকার করে তুমি বলে ফেলেছি,আপনি রাগ করেননি তো?
রাশেদের অনুনয়।
রাত্রি কিছুক্ষণ চুপ।রাশেদের কথাগুলো শুনে ওর দুরুদুরু বুকের ভেতর অশান্ত এক ঢেউ শীতল হয়ে কড়া নাড়ে কেবলই।কি বলবে ভেবে পায় না রাত্রি।
-আচ্ছা… এখন যাওয়া দরকার।
-অবশ্যই…আপনি রাগ করেছেন?
মাথা নাড়িয়ে না জানায় রাত্রি।
-ঠিক আছে আমি বরং নেমে যাই আগে,তারপর আপনি নামবেন…আর হ্যা একটা সুখবর আছে।
-কি সুখবর?
-কলেজের চাকরীটা হয়ে গেছে আমার।
-তাই?
-হুম।আজ মিষ্টি আনতে পারিনি তবে অবশ্যই খাওয়াবো।তবে একটা জিনিস এনেছি।
-কি জিনিস?
রাত্রিকে অবাক করে দিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে চারটা সাদা ফুল বের করে রাশেদ।
-কাঁঠালি চাপা ফুল,আমার হল থেকে বের হলেই এফুলগুলোর শোভা আর সুগন্ধ আমাকে মাতিয়ে রাখে আজ আপনার জন্য এনেছি প্রিয় এই ফুল।
-তাই! এই ফুল আপনি আমার জন্য এনেছেন?

-জ্বী সুরঞ্জনা,আর শুনুন সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নামবেন, সিঁড়িগুলো বেশ উঁচু… সেদিনের মতো হাত কেঁটে, আবার আজ পড়ে যায়েন না…বিদায় রাত্রি…।
হাত বাড়িয়ে ফুল গুলো নেয় রাত্রি তারপর সেও বিদায় জানায় রাশেদকে।

বৈকালে খাবারের পর রাত্রির মন যেন ময়ূরের মতো কেবল পেখমমেলতে ইচ্ছে করে,রাত্রি তার শোবার ঘরে একটা সুদৃশ্য কাঁচের বাটিতে ফুলগুলো পানির মধ্যে ভাসিয়ে রাখে।
রাশেদের পাঞ্জাবিতে যখন ছিল তাতে ঘ্রান অনেক খানি কমে গিয়েছিল এখন অনেক বেশী তরতাজা হয়ে উঠেছে।
রাত্রি আঙুল দিয়ে সেগুলো নাড়াচাড়া করে আর রাশেদের সেই কথাগুলো ভাবতে থাকে আনমনে।
-কি রে মা রাত্রি? ঘুমাস নি…?
রাত্রির ঘরে তার মামা প্রবেশ করেন।
ফুল গুলো থেকে প্রায় সাথে সাথেই হাত সরিয়ে ফেলে রাত্রি।
-জ্বী… এই তো ঘুমিয়ে যাবো এখুনি…কিছু বলবেন মামাজান?
-শোন আগামীকাল বাড়ি যেতে পারি,আয়েশার সাথে ফোনে কথা হয়েছিল তোকে নিয়ে যেতে বলেছে।
-তাই নাকি মামাজান?মায়ের শরীরটা কেমন আছে কিছু বলেছে?
-তোর মা কি কোনকালে কোনো কথা শুনেছে আমার,এত করে বল্লাম এখানে এসে চিকিৎসাটা করিয়ে নিতে। ওর সারা শরীরে শুধু ব্যাথা বাতের ব্যামো।এর জন্যে কোথায় কোথায় কার কাছে ঝাড়ফুঁক নিয়ে শরীরটা আরও খারাপ করেছে।
-জ্বী মামা,মা ঝাড়ফুক নেন কিছুদিন ভালো থাকেন তারপর আবার ব্যাথাটা শুরু হয় আর কি যে যন্ত্রনা সেই ব্যাথার তাতে খুব কষ্ট পান মা।আর সেটা দেখে আমরা যে কষ্ট পাই সেটা বোঝে না।
-তুই কোনো চিন্তা করিস না কাল তোকে নিয়ে তোদের বাড়ি যাবো আগে। এসব নিয়ে কথা বলবো আর ও যদি ঢাকায় না থাকতে চায় সদরে কোথাও ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করাবো।
-জ্বী ঠিক আছে।
হঠাৎ মামার চোখ পড়ে যায় ফুলগুলোতে,
-হ্যারে রাত্রি তোর ঘরে ফুল এলো কোত্থেকে? কোথাও গিয়েছিলি?
রাত্রি আমতা আমতা করে এবার। মামার কাছে ধরা পড়ে গেল কিনা চমকে যায়,কি জবাব দিবে এখন ভেবে পায় না….।(চলবে)

আগের পর্বের লিংকঃ

“রাত্রি নামে অমাবস্যা ‘পর্ব-৬ (একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প)

হাসিনা সাঈদ সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন