ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম (পর্ব-০৮)

আরশাদ উল্লাহ

মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে আট বৎসর হল। জাপান এখন শান্ত। কিন্তু লক্ষ লক্ষ নরনারী ও শিশু যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে। যুদ্ধ থেকে প্রাণে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইয়ুকির বাবা ওকিনাওয়া থেকে স্ত্রী সন্তানকে সরিয়ে কিউশিওর হুয়ুশি গ্রামে রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার বাবা যুদ্ধক্ষেত্র ওকিনাওয়াতে ফিরে গিয়ে নিহত হন। তার এই ভাগ্য বিড়ম্বনার জন্য এই মহাযুদ্ধ দায়ি। মনে মনে ইয়ুকি এসব কথা ভাবে এবং চোখের জল ফেলে। নইলে সে আজ কলেজে পড়াশুনা করত। কেন এই যুদ্ধ বেধে গেল তাও সে জানে না। কিন্তু যুদ্ধের নির্মমতা যে কেমন তা অনুভব করতে পেরেছে।

এডমিরাল ইয়ামামতোর প্ল্যান ছিল দক্ষিণ প্রশান্ত মহানগরের দেশগুলি থেকে পশ্চিমাদের কলোনিগুলি কব্জাগত করা। আধুনিক ইন্দোনেশিয়ার তখন জন্ম হয়নি। সহস্র দ্বীপমালা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জন্ম হয়েছে যুদ্ধের পরে। তার পূর্বে সে এলাকা ডাচ, ফ্রান্স ও বৃটেনের কলোনি ছিল।

ইয়ামামতো পরিকল্পনা ছিল সুদূর ফিজি ও নিউক্যালেডোনিয়া দখল করে অষ্ট্রেলিয়াকে ঘেরাও করবেন। তারপর আলাস্কার নিকটবর্তি এল্যুশিয়ান দ্বীপগুলি দখল করবেন। ডাচ ও বৃটিশ কলোনিগুলি মুক্ত করে সলোমন দ্বীপমালার গোয়াডাল্ক্যনালে একটি ছোট বিমান বন্দর ছিল। সেটাও দখলে নিয়ে আনলেন। অন্যদিকে এল্যুশিয়ান সাগরের দুটি দ্বীপ আত্তো এবং কিস্‌কা দখল করলেন। এসব দ্বীপ ছিল জনবিরল। কারণ সেখানে নয় মাস প্রচন্ড শীত থাকে। তবে কিছু এস্কিমো ছিল। এই দ্বীপগুলি ছিল অ্যামেরিকার।

দক্ষিণ প্রশান্ত সাগরের দ্বীপগুলির মধ্যে ফিজি ও নিউক্যালেডোনিয়া দখল করার পূর্বেই যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হল।

অ্যামেরিকা মনে করল এল্যুশিয়ানে জাপান তার মূল ভূখন্ড দখল করেছে। স্পার্সলি দ্বীপও জাপান দখল করল।

হাওয়াইয়ের পার্ল হার্বারে অ্যামেরিকার যুদ্ধ জাহাজের আধিক্য দেখে ইয়ামামতো পার্ল হার্বার দ্বিতীয়বার আক্রমণ করা থেকে বিরত রইলেন। তিনি অ্যামেরিকার যুদ্ধবিমান বহনকারি ফ্লিটগুলিকে ধ্বংস করার জন্য মনযোগি হলেন। এগুলিকে তিনি জাপানের জন্য প্রধান হুমকি মনে করতেন। পার্ল হার্বারে অ্যামেরিকার শক্তি বৃদ্ধি দেখে তিনি জনবিরল মিডওয়ে প্রবাল দ্বীপটিকে দখলে রাখার জন্য প্রস্তুতি নিলেন। দ্বীপটির অবস্থান হাওয়াই ও জাপানের মধ্যবর্তি এলাকাতে। তার পূর্বেই অ্যামেরিকা ১৯৪২ সালের ১৮ এপ্রিল ১৬টি বি-২৫ মিচেল বিমান দিয়ে টোকিও ও ইয়োকহামার উপর আক্রমণ করে এক বিস্ময়ের সৃষ্টি করল। শুধু তাই নয়। বিমানগুলি জাপান অধিকৃত চীনের মাঞ্চুরিয়াতেও বোমা ফেলেছে। বিমানগুলি ইউ এস এস হরনেট থেকে উড্ডয়ন করেছিল। সে কারণে ইয়ামামতো তার রণকৌশল পাল্টান। তিনি বিশাল নৌবহর নিয়ে মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মিডয়ের দিকে যাত্রা করলেন। উল্লেখ্য যে, মিডওয়েতে অ্যামেরিকার একটি অবজারভেশন স্টেশন ছিল। ইয়ামামতোর সাথে আরো তিনজন এডমির‍্যাল ছিলেন। তার বহরে ছিল ৪টি ফ্লীট ক্যারিয়ার, ২টি ব্যাটল শিপ, ২টি হেভি ক্রুজার, ১২টি ডেস্‌ট্রয়ার, ২৪৮টি ক্যারিয়ার ভিত্তিক যুদ্ধ বিমান এবং ১৬টি ফ্লোট প্লেন।

ইয়ামামতোর নেতৃত্তে এই আভিযান ছিল। মিডওয়ের নিকট অ্যামেরিকার ৩টি ক্যারিয়ার ফ্লিট, ২৩৩টি ক্যারিয়ার ভিত্তিক যুদ্ধ বিমান এবং ১২৭টি ল্যান্ড ভিত্তিক যুদ্ধ বিমান ও ১৬টি সাবমেরিন নিয়ে জাপানি বাহিনীকে মোকাবিলা করে।

মিডওয়ে দখল করতে গিয়ে জাপানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। যে ক্ষতি পরবর্তিতে ইয়ামামতো পূর্ণ করতে পারেন নি। শক্তির দিক দিয়ে বিবেচনা করলে বুঝা যাবে যে জাপান কোন দিক দিয়ে কম ছিল না। রণকৌশলের ভ্রান্তি কিনা জানি না। এই যুদ্ধে জাপান পরাজীত হয়েছে। জাপানের ৪টি ক্যারিয়ার ডুবিয়ে দিয়েছে। অন্য দিকে অ্যামেরিকার ১টি ক্যারিয়ার ডুবে গেছে। ২৪৮টি যুদ্ধ বিমানের সবগুলি ধ্বংস হয়েছে। অন্যদিকে অ্যামেরিকার ১৫০টি যুদ্ধ বিমান ধ্বংস হয়েছে। জাপানের মোট সৈন্য নিহত হয়েছে ৩,০৬৭ জন। আর, আমেরিকার মাত্র ৩১০ জন সৈন্য নিহত হয়েছে। মিডওয়ে যুদ্ধকে বলা হয় জাপানের পরাজয়ের প্রথম টার্নিং পয়েন্ট। দ্বিতীয় টার্নিং পয়েন্ট ছিল সলোমন দ্বীপমালার গোয়াডালক্যানাল যুদ্ধ।

অষ্ট্রেলিয়ার নিকটবর্তি দ্বীপ গোয়াডালক্যনাল রক্ষা করার জন্য জাপানের হাতে কোন যুদ্ধবিমান ছিল না। রাবাউল থেকে বোমারু বিমানে গোয়াডালক্যানাল যাওয়ার পথে এডমির‍্যাল ইয়ামামতো নিহত হন। ইয়ামামতোর বিমান যাত্রার খবর অ্যামেরিকার সৈন্য পূর্ব থেকেই

জানতে পারে এবং যুদ্ধ বিমান পাঠায়। সেই যুদ্ধ বিমানের একটি ইয়ামামতোর বিমানটি গুলিকরে ভূপাতিত করেছে। তারপর জাপানের যুদ্ধের গতি সম্পূর্ণ পাল্টিয়ে গেল। জাপান সর্বশেষ প্রতিবদ্ধকতা সৃষ্টি করেছিল ওকিনাওয়াতে। রক্তক্ষয়ি সে যুদ্ধেও জাপান পরাজীত হল। দ্বীপটিতে তিন থেকে চারশত ওকিনাওয়ার বাসিন্দাকে জীবিত পাওয়া যায়।

……

একদিন সকালে রিউতারোর পিতা কুবো সান ফুরুকাওয়ার বাড়িতে আসলেন। সাত আট মাস আগেও তিনি একবার এসেছিলেন। ফুরুকাওয়ার সাথে বসে চা সিগারেট খেতে খেতে অনেক্ষণ তিনি কথা বলেছিলেন। ইয়ুকিকে স্কুলে না পাঠানোর জন্য কুবো সান ফুরুকাওয়াকে অভিযুক্ত করেছিলেন। আজ তিনি কিছু মাছ নিয়ে এসেছেন। তারা, বুড়ি, ইকা, আরো অনেক সামুদ্রিক মাছ। ফুরুকাওয়ার সামনে সেগুলি রেখে কুব সান বললেন, “তোমার জন্য কিছু মাছ নিয়ে আসলাম।”

“এইসব আনার কি প্রয়োজন ছিল!” ফুরুকাওয়া আপত্তি করে বললেন।

গতকাল রাতে ভাল মাছ পাওয়া গেছে। তাই ভাবলাম তোমার জন্য কিছু নিয়ে যাই।

তোমাকে অনেক ধন্যবাদ দিচ্ছি, ফুরুকাওয়া বললেন। তারপর ইয়ুকিকে ডেকে মাছগুলি নিয়ে যেতে বললেন।

চা সিগারেট খাওয়ার সময় কুবো সান কথাটা পারলেন। বললেন, “আমার ছেলে রিউতারো মাছ শিকারে যেতে চায় না। তাই অন্য লোক নিয়ে মাছ শিকারে যাই। যদি ছেলেটা যেতো বেশ রোজগার হতো, অন্য লোক নিয়ে গেলে লভ্যাংশের পয়সা অর্ধেক তারে দিতে হয়। সমস্যাটা হল এখানে।”

ফুরুকাওয়া বললেন, “তোমার ছেলেটা একদিন আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল।”

“তাই নাকি!” বিস্মিত হলেন কুবো সান। বললেন, “সে এখন অন্য পেশা নিতে চায়। তাকে নিয়ে কি করা যায় ভাবছি।” তারপর নিম্নস্বরে বললেন, “ইয়ুকিকে তোমার মেয়ে করে নিয়েছ কি?”

“হ্যাঁ, ডিক্ল্যার দিয়ে নিজের মেয়ে করে নিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো ইয়ুকি এই ব্যাপারে প্রতিবাদ করছে!”

“এ আবার কেমন কথা!” কুব সান বললেন, “কি কারণে সে প্রতিবাদ করছে?”

ইয়ুকি প্রতিবাদ করে বলেছে যে সে চীর দিনের জন্য এই বাড়িতে থাকবে না।

“একথার মানে কি চিন্তা করে দেখেছ?” কুব সান জানতে চাইলেন।

ফুরুকাওয়া বললেন, “হ্যাঁ, কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। কজিমা সানের বড় ছেলে আকিহিরোর সাথে তার ভালবাসার সম্পর্ক রয়েছে আমি জানি।”

সে তো খুবই ভাল কথা। এখন কজিমার ছেলের সাথে তার বিয়ে দিয়ে আকিহিরোকে তোমার ‘অমুকো সান’ (ঘরজামাই) করে নিয়ে আসলেই হল। তোমার গৃহস্থির কাজ ঠিক মতো চলবে!”

‘কিন্তু…,’ কিছু বলতে চাইলেন ফুরুকাওয়া।

‘কিন্তু আবার কি?’ কুবো সান জিজ্ঞাসা করলেন।

‘আকিহিরো সিনিয়র হাই স্কুলে ফাইন্যাল ইয়ারের ছাত্র। সে এই পেশা গ্রহণ করবে বলে মনে হয় না!’

কুবো সান বললেন, “তুমি বরং আকিহিরোর মায়ের সাথে কথা বল। আশা করি তিনি রাজী হবেন।”

“দেখি কি করা যায়।” ফুরুকাওয়া বললেন। একদিন আমি প্রস্তাব নিয়ে যাব। আমি জানি মহিলা খুবই ভাল।ইয়ুকি প্রতি সাপ্তায় কজিমা সানের দোকান থেকেই আমার জন্য চা সিগারেট মশলা কিনে আনে।”

পরের দিন ফুরুকাওয়ার স্ত্রী তমকো ইয়ুকিকে তাদের সন্তান হওয়ার জন্য বললেন। তৎসঙ্গে আরো বললেন, “তুমি আসার পরে আমি কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি। নইলে সমস্ত সংসারের দায়ীত্ব আমাকে একাই করতে হত। আমি চাই না যে তুমি কোন ছেলেকে ভালবেসে এই বাড়ি ছেড়ে ছলে যাও। কারণ, আমি তোমাকে সন্তানের মত স্নেহ করি!”

এসব কথা ইয়ুকি শোনে সে আরো রেগে গেল। কারণ, সে পরিস্কার বলে দিয়েছে যে এই বাড়িতে চীরদিন সে থাকবে না। অথচ ফুরুকাওয়া তার সে কথার মুল্যায়ন করছে না। “এটা বড় ঝুলুম। আমি এখন স্বাধীন। ইচ্ছামত বিয়ে করে স্বাধিন ভাবে থাকব। কিন্তু এই বাড়িতে কিছুতেই আমি থাকব না!” ইয়ুকি বিরক্ত হয়ে বলল।

পরের দিন কুবো সানের সাথে রাতের খাবার খেতে খেতে রিউতারো বলল, “বাবা, ইয়ুকি মেয়েটিকে আমি পছন্দ করি। তাছাড়া চাষাবাদের কাজ আমি করতে পারব। যেমন করেই হোক ইয়ুকির সাথে আমার বিয়ের ব্যবস্থা কর।”

ছেলের কথা শোনে কুবো সান বিস্মিত হয়ে বললেন, “তা কি করে সম্ভব হবে! আমি ফুরুকাওয়ার মুখে শোনেছি ইয়ুকি আকিহিরোকে পছন্দ করে। আর ইয়ুকি বলেছে ফুরুকাওয়ার বাড়িতে সে চীরদিন থাকবে না। এমন অবস্থায় আমি কিছু করতে পারব না। তারপর রিউতারোকে বললেন, “তুমি কিন্তু এই ব্যাপারে আর এগুবে না!”

রিউতারো তার বাবার কথা শোনে হতাশ হল বটে কিন্তু আশা ছেড়ে দিল না। সে ভীন্ন ভীন্ন ফন্দি ফিকির করতে লাগল। এক দিন ইয়ুকিকে রাস্তায় পেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, “ইয়ুকি, তোমার জন্মদিন কখন আমাকে বলবে কি?”

“কেন? আমার জন্মদিনের কথা জেনে আপনার কি হবে?” ইয়ুকি রেগে জবাব দিল।

রিউতারো বলল, “আমি কিছু জিজ্ঞাসা করলে তুমি রেগে যাও কেন, ইয়ুকি?”

“রেগে যাওয়ার কারণ আছে বৈ কি? আমি লক্ষ করেছি দোকানে যাওয়ার সময়ে আপনি আমাকে অনুসরণ করেন। এই সব আমি পছন্দ করি না।”

রিউতারো জানে যে ইয়ুকির সাথে তর্ক করার কোন মনে হয় না। সে বলল, “যদি তোমার জন্ম তারিখের কথা বল, ভাবছি আমি সেদিন যাব। দয়াকরে আমার দিকে একটু নজর দাও, ইয়ুকি?”

ইয়ুকি পিছু ফিরে তাকাল। আর সেই মুহূর্তে রিউতারো বলল, “আমি কি খারাপ ছেলে, ইয়ুকি?”

“এখানে খারাপ কিংবা ভাল মন্দের কথা বলার শোনার প্রয়োজন বোধ করি না। এটা হল যার যার স্বাধীনতা, আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার অধিকার যেমন আপনার আছে, ঠিক তেমনি আমারও আপনাকে প্রত্যাক্ষাণ করার অধিকার আছে, নয় কি?”

রিউতারো বলল, “তুমি সুন্দরী মেয়ে বলে আমি তোমাকে দেখতে আসি। তুমি আমাকে আপমান করছ কেন?”

“অপমান!” ইয়ুকি রেগে গিয়ে বলল, “আপনাকে আমি অপমান করব কি জন্য বলুন তো শুনি? আপনি জানেন আমি ফুরুকাওয়ার বাড়ির একজন মেইড মাত্র। আমি আপনাকে কোন সাহসে অপমান করব? দয়াকরে আপনি আমাকে আর কোনদিন রাস্তায় বিরক্ত করবেন না!” একটু থেমে ইয়ুকি বলল, “আমি সুন্দরী! আমার মতো এমন বহু সুন্দরী মেয়ে এই গ্রামে আছে। আপনি অনেক ভাল ও অভিজাত ঘরের মেয়ের সাথে সম্পর্ক করতে পারেন। আমি তো ফুরুকাওয়ার বাড়ির একজন মেইড মাত্র!”

রিউতারো বলল, “অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্ক করতে পারব তা জানি। কিন্তু তুমি আমার পছন্দ ইয়ুকি।”

‘না!’ আমাকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিন। কারণ, আমি একজন কে ভালবাসি। যাকে আমি মন-প্রাণ দিয়েছি তার সাথে আমি প্রতারণা করতে পারব না। এখন আশাকরি যে আর কোনদিন আপনি আমার চিন্তা করবেন না!”

“তা না হয় মানলাম। তোমার জন্ম দিনের কথাও কি আমাকে বলবে না, ইয়ুকি?”

“শুনুন!” ইয়ুকি বলল, “আমি আপনার বাবাকেও চিনি। তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। আমার জন্ম দিন কখনো আমি পালন করিনি আর জন্মদিন পালন করার মত অবস্থানে আমি থাকি না। তবু আপনার অনুরোধে বলছি যে “পয়লা ফেব্রুয়ারী আমার জন্মদিন।”

রিউতারো আর কোন কথা বাড়াল না, ‘ধন্যবাদ,’ বলে সে তার মোটর সাইকেল স্টার্ট দিল।

আর চার দিন পরে ফেব্রুয়ারি মাস। আকিহিরো এখন রাত জেগে পড়াশোনা করছে। দোকানে গেলে ইয়ুকি বলে “আকিহিরো গাম্বাত্তে নে,” (আকিহিরো পাশ করার সংগ্রাম করে যাও!) জাপানীরা কাউকে উৎসাহ দিতে এই কথাটি বলে। এই কথাটি এক ধরনের আশীর্বাদের মতো।

ইয়ুকির গলার শব্দ শোনে আকিহিরো দু’তলা থেকে দৌঁড়ে নেমে এসে বলল, “ইয়ুকি তুমি ভাল আছ তো?”

তুমি ভাল থাকলে আমিও ভাল আছি মনে করবে এবং সে বলে বলিয়ান হয়ে পড়াশুনা করছি।” আকিহিরো বলল, “হ্যাঁ, ইয়ুকি, অবশ্যই ভাল পাশ করার জন্য সংগ্রাম করছি। এখন থেকে প্রতিদিন এসে আমাকে ডাক দিবে। তোমাকে দেখলে আমার আরো বেশী রাত জেগে পড়া শোনা করার স্পৃহা জাগে। তুমি জান না ইয়ুকি, তুমি যে আমার জীবনের বড় প্রেরণা!”

আবেগে ভরা আকিহিরোর কথা শোনে ইয়ুকির চোখে জল এসে গেল। তার মনে অনাকাংখিত এক অনুভূতি অনুভব করল। দুহাতে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ-মুখ মুছে মৃদু হেসে বলল, “সত্যি বলছ তো?”

হ্যাঁ ইয়ুকি, অবশ্যই সত্যি বলছি। রেজাল্ট আউট হলে দেখবে আমি ভাল পাশ করেছি।

অবশ্যই তুমি ভাল পাশ করবে আকিহিরো – আমি জানি। তোমার জন্য প্রতিদিন আমি মন্দিরে প্রার্থনা করি।

আকিহিরো পরীক্ষা দিয়ে বিলম্ব না করে ‘টাউন কাউন্সিল’ অফিসে পার্ট টাইম কাজ নিল। একদিন ইয়ুকি দেখা করে বলল, “আকিহিরো আজ সিরিয়াস একটি কথা বলতে এসেছি। আমি ভাবছি এখন আমাদের একটা সিদ্ধান্তে পৌছার দরকার। আমিতো মেয়ে মানুষ। আমার স্বাধীনতা সীমিত!”

“আমিও সেকথা ভাবছি। তবে এর পূর্বে আমাদের প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন আছে বৈ কি?” আকিহিরো নির্দ্বিধায় বলল। তারা দুজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলছে। সকাল নয়টা বাজার পনের মিনিট বাকি। আকিহিরো সাইকেলের হ্যান্ডেল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। নয়টার মধ্যে তাকে অফিসে যেতে হবে। সে ইয়ুকিকে বলল, “অফিসে যেতে দেরী হয়ে যাবে। এই ব্যাপারে বাদবাকি কথা পরে হবে। সে সাইকেল চালিয়ে চলে গেল। ইয়ুকি কজিমা সানের দোকানে প্রবেশ করল। অদূরে মোটর সাইকেলের উপরে বসে রিউতারো তাদের দেখেছে। কিন্তু কি কথা হয়েছে শুনতে পায় নি। তবে ইয়ুকি যখন রুমাল দিয়ে চোখের জল মুছতেছিল সে দৃশ্য দেখেছে। সকালে সূর্যের আলো ইয়ুকির মুখে প্রতিবিম্বিত হল। তার উজ্জ্বল মুখ জ্বলসে উঠল। তাকে অপূর্ব সুন্দর দেখা যাচ্ছে। রিউতারোর সাথে আবার চোখাচোকি হল। তাকে দেখে বড় বিরক্ত বোধ করল ইয়ুকি।

কিন্তু তাদের প্রস্তুতি নেয়ার পূর্বেই এক সমস্যার সৃষ্টি করল ফুরুকাওয়া সান।

একদিন সে আকিহিরোর মায়ের সাথে দেখা করে বলল, “আপনার ছেলে আমাদের ইয়ুকিকে ভালবাসে। আমি মনে করি এ ব্যাপারে এখন কথা বলা দরকার। আপনার মতামত জানাবেন কি?

আকিহিরোর মা বললেন, এই ব্যাপারে আমি অবগত আছি। আমি সাদাসিধা একজন সংগ্রামী নারী। আমি মনে করি যে আমার ছেলে যদি ইয়ুকিকে বিয়ে করে সুখি হয় তা হলে আমি রাজি আছি। আশাকরি যে আকিহিরো এ ব্যাপারে অমত করবে না। কারণ, ইয়ুকির মত সুন্দরী ও লক্ষী মেয়ে আর হয় না। আমি তার পৈতৃক পরিচয় জানিনা। কিন্তু তার মুখের কথা শুনে তার প্রতি আমার বিশ্বাস গাঢ় হয়েছে।

ফুরুকাওয়া বললেন, “বড় খুশি হলাম আপনার কথা শোনে। এখন আকিহিরোর সামনে বসে আমাদের কথা বলা দরকার।

সত্যি কথা বলছেন ফুরুকাওয়া সান। আমি নিজেও তা মনে করি। কিন্তু আজ তো সে কাজে গিয়েছে। আপনি যদি রোববারে আসেন তখন কথা বলা যাবে।

পরের রোববারে ফুরুকাওয়া বের হওয়ার জন্য যখন প্রস্তুত হচ্ছিলেন তখন কুবো সান এসে তার ঘরের দরিজার সামনে দাড়িয়ে বললেন, “ফুরুকাওয়া তোমার সাথে আজ একটি জরুরী কথা বলতে এলাম। কুবো সানকে দেখে তার হাত ধরে ঘরে এনে দু’জনে বসলেন।

প্রথমে কুবো সান কথা বললেন, “আমি ইয়ুকির ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি। তোমার যদি কোন আপত্তি না থাকে – আমার ছেলে রিউতারোর সাথে ইয়ুকির বিয়ে দাও!”

“তোমার ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়ার কথা বলছ?” অবাক হয়ে ফুরুকাওয়া বললেন।

“হ্যাঁ, সত্যি বলছি। এখন তুমি রাজী কি না তা বল!”

“কিন্তু…,” ইতস্তত ফুরুকাওয়া অস্ফুট কন্ঠে বললেন।

তার কথা শেষ করার আগেই কুবো সান বললেন, “কিন্তু আবার কি? আমার ছেলে ইয়ুকিকে ভালবাসে। কাল সে আমায় তোমার সাথে এই ব্যাপারে কথা বলতে জোর দিয়ে বলেছে!”

ফুরুকাওয়া বললেন, “রিউতারো কি “অমুকো সান” (ঘর জামাই) হয়ে আমার বাড়িতে আসবে?”

“হ্যাঁ, আসবে। সে ব্যাপারেও তার সাথে আমার কথা হয়েছে। সে মাছের ব্যাবসা পছন্দ করে না। সে অমুকো সান হয়ে তোমার বাড়িতে আসতে রাজি আছে!”

“সত্যি রাজি আছে বলছ?” একথা বলে কুবো সানের দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকালেন ফুরুকাওয়া।

“তোমার সাথে মিথ্যা বলার কোন কারণ নেই। আমরা একই গ্রামের বাসিন্দা, একসাথে স্কুলে পড়াশুনা করেছি। আমার সম্পর্কে তুমি ভাল জান।”

“ভাল কথা। কিন্তু ইয়ুকির সাথে কথা বলতে হবে।” ফুরুকাওয়া তার স্ত্রীকে ইয়ুকিকে ডেকে আনার জন্য বললেন।

ইয়ুকি তখন রান্না ঘরে ধোয়ামুছার কাজ করছিল। তাকে ডাকার পরে সে এসে দাঁড়াল।

ফুরুকাওয়া বললেন, “ইয়ুকি তুমি তো জান যে কুবো আমার ছোট বেলার বন্ধু। সে আজ তার ছেলের সাথে তোমার বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে এসেছে। এখন তোমার কিছু বলার থাকলে বল!”

ইয়ুকি এসে তাতামি মাদুরের উপর হাঁটু গেড়ে বসে প্রথামত তাদের ছালাম জানাল। তারপর বলল, “আমি দুঃখিত যে আপানার এ প্রস্তাবে রাজি নই। কারণ, আকিহিরোকে আমি ভালবাসি। আমি তাকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে রাজি নই,কাকা। আর, একথা আমি রিউতারোকে কয়েকবার বলেছি। তারপর কেন সে তার বাবাকে পাঠালেন তা বুঝতে পারছি না। আমি একটি এতীম মেয়ে। আমি আশাকরি আপনারা আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে যাবেন না!”

কুবো সান ইয়ুকির কথা শোনে বললেন, “তাই হোক, তুমি যদি আকিহিরোকে ভালবাস তাকেই বিয়ে করে সুখী হও!”

সেদিন কুবো সান ঘরে ফিরে তার ছেলে রিউতারোকে ডেকে সব খুলে বললেন। রিউতারো সব কথা শুনে বড় দুঃখ পেল। সে আর কোন কথা না বলে তার রুমে ফিরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে রইল। ঘর থেকে বের হয়ে সেদিন সে কোথাও যায়নি।

রোববারে ফুরুকাওয়া আবার আকিহিরোর মায়ের নিকট গেলেন।

সেদিন আকিহিরো ঘরেই ছিল।

ফুরুকাওয়া সরাসরি ইয়ুকির বিয়ের ব্যাপারে কথা বললেন।

আকিহিরো বলল, “কাকা, আপনাকে অনেক শ্রদ্ধা জানিয়ে বলছি যে আমরা দু’জন বিবাহ করার ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এখন শুধু সময়ের ব্যাপার, আমি এখন একটি পার্ট টাইম জব করছি। হাতে কিছু টাকা পয়সা হলে মাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ইয়ুকিকে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে আপনার নিকট যেতাম!”

ফুরুকাওয়া সান বললেন, “কিন্তু আমার একটি শর্ত আছে, আকিহিরো! তা হল আমি তোমাকে ‘ঘর জামাই’ হিসাবে পেতে চাই।’ তারপর ফুরুকাওয়া আকিহিরোর মাকে বললেন, আপনার দু’টি ছেলে আছে। আমি আকিহিরোকে আমার ছেলে হিসাবে চাই। আশা করি এতে আপনার কোন আপত্তি নেই!”

তারা তিন জন চেয়ারে বসে কথা বলছিল। ফুরুকাওয়া সানের কথা শুনে আকিহিরো উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি আপত্তি জানাচ্ছি, কাকা। আপনার প্রস্তাব আমি মেনে নিতে পারছি না!”

আকিহিরোর মা বললেন, “ছেলের মতই আমার মত। এই ব্যাপারে আমি ছেলের ইচ্ছার উপরে কিছু বলব না, ফুরুকাওয়া সান।”

ফুরুকাওয়া আকিহিরোকে বললেন, “দেখ, ভবিষ্যতে আমার সম্পত্তির মালিক হবে তুমি আর ইয়ুকি। তুমি শুধু আমার পারিবারের “ফুরুকাওয়া”নামটি গ্রহণ করবে। এতে কোন দোষ আছে কি? তাছাড়া গ্রাম ছেড়ে তোমাকে কোথাও যেতে হবে না। আর, বিয়ের যাবতীয় খরচ আমি নিজে বহন করব!”

আকিহিরো বলল, “এই ব্যাপারে ইয়ুকির মতামত কি তা আমি জানি না। তবে ‘ঘর জামাই’ আমি হব না। আমি লেখাপড়া করেছি। আশা রাখি কোন ভাল কোম্পানী আমাকে চাকুরীতে নিবে। চাষাবাদ আমার দ্বারা কখনো হবে না, কাকা!”

ফুরুকাওয়া বললেন, “ঠিক আছে। এটাই যদি তোমার মনের কথা হয়, আমি ইয়ুকিকে রিউতারোর নিকট বিয়ে দিব। আশা করি এতে তুমি আপত্তি করবে না!”

আকিহিরো হেসে বলল, “ইয়ুকিকে আপনি যদি রাজি করাতে পারেন বিয়ে দিন। আমি কোন আপত্তি করব না। তবে আমি মনে করি যে আপনি ইয়ুকিকে কিছুতেই রাজি হবেনা কাকা!”

‘আচ্ছা তাই হবে। ইয়ুকি বিয়েতে রাজি হবে কি হবে না তা আমি দেখব।” একথা বলে ফুরুকাওয়া ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

শীতের পর এখন জাপানে বসন্তকাল। উষ্ণ বাতাস সবার প্রাণকে আবার সজীব করেছে। চেরি ফুলে ছেয়ে গেছে চারিদিক, গাছে গাছে এসেছে নতুন সবুজ কচি পাতা। জাপানের প্রকৃতি আবার তার রূপ বদলিয়েছে। সবার মনে বসন্ত বরণের আনন্দ। কিন্তু এই সময়ে আকিহিরো ও ইয়ুকির মনে বিন্দু শান্তি নেই।

জন্মের পরে যৌবল কাল অত্যন্ত জটিল। এই সময়ে যুবক-যুবতির মন থাকে বড় সেন্‌সেটিভ এবং ইমোশন্যাল। প্রেম প্রকৃতি থেকে আসে। তা ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক। এই সময়ে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কোন যুবক বা যুবতি অস্বাভাবিক ও অপ্রিয় কিছু ঘটাতে পারে। সন্তানের অভিবাবক সেদিকে খেয়াল রাখেন। আজ ইয়ুকির মা বেঁচে থাকলে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতেন না। সকল মা সন্তানের সুখ ও শান্তি কামনা করেন। বর্তমান আধুনিক জাপানের রীতিনীতি পশ্চিমা ধরণের হলেও সেকালের জাপানের সংস্কৃতি অন্যান্য এশিয়ার দেশের মতই ছিল। পরিবার কেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থা ছিল। আজ থেকে সত্তর বৎসর পূর্বেও জাপানের সমাজ ব্যবস্থা অটুট ছিল। ইয়ুকির জন্ম সেই সময়ে। দুর্ভাগ্যবশত আজ ইয়ুকির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছেন ফুরুকাওয়া।

প্রায় চার পাঁচ দিন যাবত ইয়ুকি দোকানে যায় না। কারণ কি কজিমা পরিবারের কেউ জানে না। আকিহিরো মাঝে মাঝে সিদ্ধান্ত নেয় ফুরুকাওয়ার বাড়িতে যাবে। কিন্তু সে ফুরুকাওয়াকে বলেছে যে ইয়ুকিকে যদি রিউতারোর নিকট বিয়ে দেয় তাহলে সে কোন আপত্তি করবে না। তাই যাবার ইচ্ছা থাকলেও এখন যেতে পারছে না। এখন ফুরুকাওয়ার বাড়িতে কি হচ্ছে তা জানার বড় ইচ্ছা হচ্ছে তার। আকিহিরো মনকে প্রবোধ দিয়ে বলে, “ইয়ুকি বড় শক্ত ধাতুর মেয়ে। ফুরুকাওয়া কিছুতেই তাকে রাজি করাতে পারবেন না। এখন প্রশ্ন হল এই কয়েক দিন ইয়ুকি দোকানে আসছে না কি কারণে? এই প্রশ্নটি তাকে ব্যাকুল করে তুলেছে। সে ভাবছে ইয়ুকিকে দুর্ভাগ্যের নরকে ঠেলে দিতে পারে না। তারা দুজন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং সে জন্যই আকিহিরো চুপ করে ঘরে বসে থাকতে পারে না।

তার মা বললেন, “তুই তো ঠিক মতো খাওয়া দাওয়াও করছিস না। ইয়ুকির ব্যাপারে কি তোর মনে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে? কিছু বলার থাকলে আমাকে খুলে বল।

মায়ের কথা শোনে হাসল আকিহিরো। তারপর বলল, “ইয়ুকির জন্য আমি কোন চিন্তা করিনা মা। তার প্রতি আমার বিশ্বাস আছে। এই মেয়েকে ফুরুকাওয়া কিছুতেই অন্যত্র বিয়ে দিতে রাজি করাতে পারবেন না। এখন সে দোকানে আসছে না কেন আমি শুধু সে চিন্তা করছি!”

“একবার গিয়ে তাকে দেখে আসবি কি?”

“না, তা ঠিক হবে না, মা। কারণ, আমি কথা দিয়েছি যে এই ব্যাপারে আমি কোন আপত্তি করব না। এখন আমি যদি যাই ফুরুকাওয়া অন্যরকম মনে করবেন।”

কিন্তু পরের দিন বিকালে নাকাজাতো গ্রামে এক নাটকীয় ঘটনা ঘটে গেল। আকিহিরো ও তার মা দু’জনে হঠাৎ ফুরুকাওয়াকে দরজায় দাঁড়ানো দেখতে পেল। তারা তাদের নিজের চোখকে বিশ্বাষ করতে পারছিল না। আকিহিরোর মা দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “ফুরুকাওয়া সান কোন দুর্ঘটনা হয়েছে কি? আজ হঠাৎ আপনাকে দেখে মনে অনেক প্রশ্ন জেগেছে। ইয়ুকি ভাল আছে তো?”

ফুরুকাওয়া বললেন, মেয়েটা আজ তিন দিন যাবত কিছু খাচ্ছে না। দয়াকরে আপনারা দুজন আমাদের বাড়িতে চলুন।

কোন কথা না বাড়িয়ে আকিহিরো ও তার মা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। ফুরুকাওয়ার সাথে তার বাড়িতে গেলেন। ইয়ুকির রুমের দরজার সামনে গিয়ে আকিহিরো চিৎকার করে বলল, “ইয়ুকি তুমি ভাল আছ তো? আমি আকিহিরো।”

কিন্তু আকিহিরোর কথার কোন প্রতিউত্তর আসল না। তারা দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে দেখতে পেল ইয়ুকি মৃত লাশের মত বিছানায় শোয়ে আছে। তার হাতের কবজি থেকে রক্ত ঝড়ছে।

ইয়ুকি, “এটা তুমি কি করলে। শেষ পর্যন্ত আমাকে ভুলে গিয়ে তুমি আত্মহত্যা করলে? আমি তা বিশ্বাষ করি না। ইয়ুকি দোহাই তোমার, তুমি অন্তত আমার জন্য হলেও বেঁচে থাক। আমি তোমার জন্য সব কিছু করব। আকিহিরো চিৎকার করে কাঁদছিল আর বলছিল মা সর্বনাশ হয়ে গেছে, ইয়ুকি আত্মহত্যা করেছে।

আকিহিরোর মা মুহূর্তের মধ্যে সব কিছু অনুধাবন করতে পারলেন। তিনি দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গিয়ে পনের মিনিট পর ডাক্তার ডেকে আনলেন।

ইয়ুকির হাত দিয়ে তখনো রক্ত ঝড়ছে। ডাক্তার ষ্টেথো দিয়ে পরিক্ষা করে বললেন, “মনে হয় তাকে বাঁচানো যাবে। তারপর হাতে সেলাই করে ব্যান্ডেজ বেধে ইঞ্জেকশন দিলেন। শরীরে বল ফিরে আসার জন্য ডাক্তার আরেকটি ইঞ্জেকশন দিলেন। তারপর তিনি বললেন, “আশা করি সম্বিত ফিরে আসবে। মেয়েটি অনাহারে আরো বেশী দুর্বল হয়ে গেছে!”

আকিহিরো ডাক্তারের বাহু ধরে বলল, “যতক্ষণ পর্যন্ত ইয়ুকির সম্বিত ফিরে না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত দয়া করে আপনি অপেক্ষা করুন, ডাক্তার সাহেব!”

ডাক্তার ইয়ুকির কাছে বসে রইলেন। তাঁকে ঘিরে অধীর আগ্রহে বসে আছে আকিহিরো, তার মা, ফুরুকাওয়া ও তাঁর স্ত্রী। প্রায় বিশ মিনিট পরে ইয়ুকির সম্বিত ফিরে পেল। সে চোখ মেলে আস্তে আস্তে তার অবস্থান বুঝার চেষ্টা করল। ঠিক সেই সময় আকিহিরো ডাক দিল, “ইয়ূকি চেয়ে দেখ আমি আকিহিরো, এই বলে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে বলল, “ইয়ুকি তোমার মনে কি এই ছিল! তুমি আমাকে ফেলে কেন মরতে চেয়েছ, বল? মরতে চাও তো আমাকে সঙ্গে নিয়ে মর। এই পৃথিবীতে তোমাকে ছাড়া আমি বেঁচে থাকতে চাই না।”

ইয়ুকি তার বাম হাতের রগ ধারালো ব্লেড দিয়ে কেটে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু কেন এবং কি জন্য সে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল তা আকিহিরো ও তার মা এখনো জানে না। আকিহিরো সন্দেহ করছে ফুরুকাওয়াকে। সে নিশ্চিন্ত যে ফুরুকাওয়া কোন ব্যাপারে ইয়ুকির উপরে চাপ প্রয়োগ করেছে। তাই ইয়ুকি এই পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু কেন? যেখানে এই দু’জনের দু’টি হৃদয় অদৃশ্য রশিতে বাধা রয়েছে, যেখানে একের দুঃখ- সুখের ভাগ আরেকজন মনের গভীরে বহন করছে, সেখানে ইয়ুকি আজ কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিল? কেন ইয়ুকি এ বাড়ি থেকে পালিয়ে আকিহিরোর নিকট চলে গেল না। এই সব নানাহ প্রশ্ন একের পর এক আকিহিরোর মনে উদয় হচ্ছে।

আকিহিরো! ইয়ুকি ক্ষিণ কন্ঠে ডাকল।

আকিহিরো জবাব দিয়ে বলল, “ইয়ুকি! তুমি কি এখন কিছুটা সুস্থ বোধ করছ? তুমি কি তাহলে আমার জন্য বেঁচে রয়েছ? তুমি কি সত্যি আমাকে ভুলে যাও নি?”

এক সঙ্গে এত প্রশ্ন করায় আকিহিরোর মা তাকে বাধা দিয়ে বললেন, “তুই কি পাগল হয়ে গেলি আকিহিরো? এত প্রশ্ন এখন করা উচিৎ নয়। ইয়ুকি এখনো পুর্ণ সুস্থ হয় নি। মহিলা তখন ইয়ুকির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।

আকিহিরোর কথাগুলি ইয়ুকি শুনে তার দু’চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। পৃথিবীর সবগুলি মান অভিমান একসঙ্গে এসে যেন এখন তার মাথায় ভর করেছে। এখন অজানা এক আনন্দ মিশ্রিত উত্তেজনা তার শরীরের প্রবাহমান রক্ত স্রোতের সাথে মিশে গিয়ে কেমন এক প্রতিক্রিয়া ইয়ুকির হৃদয়ের মধ্যে আন্দোলন করছে। সে কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু নিজের আবেগ প্রদমিত করে চুপ করে রইল। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। আকিহিরোর মা রুমাল দিয়ে তার চোখের পানি বারবার মুছে দিচ্ছেন।

ইতিমধ্যে ডাক্তার সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “এখন আমি যাই। আশা করি এখন থেকে ইয়ুকি ধীরে ধীরে সুস্থ হবে। দয়াকরে আপনারা তাকে একা ফেলে কোথাও যাবেন না। কাল সকালে আমি আরেক বার এসে তার হাতের ব্যান্ডেজ খুলে দেখব।

আকিহিরো ইয়ুকির মাথার কাছে গিয়ে বসে বলল, “ইয়ুকি সত্যি কি তুমি আমার উপর অভিমান করেছ। আমি কি কোন ভুল করেছি?”

ইয়ুকি ক্ষিণ কন্ঠে বলল, “আমি তোমাকে দোষারোপ করছি না। এসব আমার অদৃষ্টে ছিল। জন্মের পরেতো আমার কোন ছুটির দিন ছিল না। সামান্য বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলাম মাত্র। এর জন্য তোমাদের আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি, তোমরা সবাই দয়াকরে আমাকে ক্ষমা করে দাও!”

আকিহিরো চিৎকার করে বলল, “তুমি আমাকে আর দুঃখ দিওনা ইয়ুকি, এবার তুমি আমাকে দয়া কর। এমন কথা তুমি আর আমাকে শুনাবেনা!” তখন আকিহিরোর দু’চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল।

ইয়ুকি যা বলছিল তা শোনে আকিহিরো ও তার মা আশ্বস্ত হতে পারলেন না। সেই রাতে তারা ইয়ুকির রুমে রয়ে গেল। ফুরুকাওয়ার স্ত্রী এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছিলেন। তিনিও এমন ঘটণার জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছেন। চরম এই অবস্থাতেও তিনি তাদের জাপানি ‘কারি রাইস’ দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। আকিহিরোর মা ইয়ুকিকে সামান্য জাপানি মিছসুপ খাওয়ালেন।

সকালে উঠে আকিহিরো ও তার মা ডাক্তার আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন। এই সময় আকিহিরো সুযোগ পেয়ে ইয়ুকিকে এই ঘটনার ব্যাপারে সংক্ষেপে বলতে অনুরোধ করল। কিন্তু ইয়ুকি মুখ খুলল না। এদিকে আকিহিরোর মা ফুরুকাওয়ার স্ত্রীকেও ঘটনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছেন। কিন্তু তিনিও কোন জবাব পান নি। তাই মা ও ছেলে দু’জনের নিকট ব্যাপারটা বড় রহস্যজনক মনে হল।

এদিকে ফুরুকাওয়া সকালে ঘর থেকে বের হয়ে কোথায় যে গিয়েছেন তা কেউ জানে না।। এমতাবস্তায় তাদের এখন কি করা উচিৎ সেকথা ভাবছিল। একটু পরে আকিহিরোর মা বললেন, “আমরা এখন যাই, ইয়ুকি। কথাট ইয়ুকি শুনতে পেয়ে বলল, “না, যাবেন না। যদি ঘরে ফিরে যেতে চান, দয়াকরে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন!” তারপর ইয়ুকি উঠে বসার চেষ্টা করল। কিন্তু আকিহিরোর মা নিষেধ করাতে সে নিরবে শুয়ে রইল।

আকিহিরো এবং তার মা এমন অবস্থায় তাদের কি করা উচিৎ কিছু ভেবে পাচ্ছিল না।

এই সময় ফুরুকাওয়ার স্ত্রী গ্রীন টী নিয়ে আসলেন। আকিহিরোর মা চায়ের কাপটি হাতে নিয়ে ফুরুকাওয়ার স্ত্রীকে পাশের রুমে যেতে ইঙ্গিত করলেন। দু’জনে পাশের রুমে গিয়ে বসার পরে প্রথমে আকিহিরোর মা কথা বললেন। তিনি তাকে ইয়ুকির এমন অবস্থা কেন হল তার কারণ বলার জন্য অনুরোধ করলেন।

কিন্তু ফুরুকাউয়ার স্ত্রী কিছু বলতে রাজী হলেন না। তিনি শুধু বললেন, এই ব্যাপারে আপনারা আমার স্বামীর কাছ থেকে জেনে নিবেন। আপনারা দয়াকরে আমাকে এই ব্যাপারে কোন প্রশ্ন করবেন না!

আকিহিরোর মা বললেন, ‘দেখুন, আমরা কাল থেকে এক কাপড়ে আপনার বাড়িতে আছি। ঘটনার সম্পর্কে যদি আমাদের কিছু না বলেন, তা হলে আমরা এখানে থাকব কেন বলুন! আর আমাদের এখানে ডেকে আনার কি কারণ ছিল?

এমন ভাবে চাপ দিয়ে কথা বলার পরেও ফুরুকাওয়ার স্ত্রী চুপ করে রইলেন। তার মুখ দিয়ে একটি কথাও বের হল না।

ঘন্টা খানেক পরে ফুরুকাওয়া ফিরলেন। তাকে তখন বড় নার্ভাস মনে হচ্ছিল। আকিহিরোর মা এগিয়ে গিয়ে প্রথমে কথা বললেন, “ফুরুকাওয়া সান, আপনি আমাদের ঘরে রেখে কোথায় গিয়েছিলেন বলবেন কি?”

ফুরুকাওয়া ক্ষমা চেয়ে বললেন, “আপনাদের এমন পরিস্থিতিতে ফেলে রেখে আমি কুবো সানের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমার অন্যায় হয়েছে, আমাকে ক্ষমা করে দিন।

আকিহিরোর মা বললেন, “ক্ষমা করব বৈ কি। তার আগে আপনি আমাদের ঘটনা সম্পর্কে খুলে বলবেন কি? সকাল থেকে আপনাকে আমাদের নিকট অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। তারপর আপনাদের বাড়িতে এসে ইয়ুকির এই অবস্থা দেখে ডাক্তার ডেকে আনলাম। আমি মনে করছি যে সর্বপ্রথম আপনার ডাক্তারকে খবর দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে আপনি এদিক সেদিক দৌড়াচ্ছেন। এর মানে কি বলুন!”

সে সময় আকিহিরোও তার মায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

ফুরুকাওয়া এক গ্লাস পানি খেয়ে বললেন, আমি বুঝতে পারিনি যে ইয়ুকি এমন কাজ করবে। আমি তাকে আমার নিজের মেয়ে করে নিয়েছিলাম। কিন্তু সে জন্য সে মোটেই সন্তুষ্ট নয়। আমি ইয়ুকিকে কুবো সা?

আগের পর্বের লিংকঃ

ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম (পর্ব-৭)

আরশাদ উল্লাহ কবি সাহিত্যিক  ও জাপান প্রবাসী  বাংলাদেশী।

আরও পড়ুন