“রাত্রি নামে অমাবস্যা ‘ পর্ব-৮ (একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প)

হাসিনা সাঈদ

রাত্রি আমতা আমতা করছে কি উত্তর দিবে বুঝে উঠতে পারেনা আবার মিছে কথাও সে বলতে পারেনা।মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই সীমান্ত আসে ঘরে।
সে জানায়
-আব্বাজান ফুল গুলা তো স্যার দিয়েছেন…!
-কি বল্লি স্যার দিয়েছেন! কোন স্যার?
সীমান্তও আমতা আমতা করে ফের বলে,
-রাশেদ স্যার..।
রাত্রি এবার পুরোই ঘাবড়ে যায়,ওর মনে হচ্ছে এখন মাথায় হাত দিতে হবে,তার মামাতো ভাই তাকে বিপদে ফেলছে…আর রক্ষে নেই।
-রাশেদ!রাশেদ রাত্রিকে ফুল দিয়েছে?
-না আব্বা…
-তাহলে?
-আরে আব্বাজান রাশেদ স্যার ফুলগুলো তার পকেটে রেখেছিলেন তারপর আমাকে পড়ানোর সময়, ওগুলা টেবিলে রেখে যান,আর নিয়ে যান নাই…আমি সেইগুলা বুবুকে দিয়েছি….।
-তাই বল…তা তোর রাশেদ স্যার কি তোকে ঠিকমতো পড়ায় নাকি পকেটে পকেটে শুধু ফুল নিয়ে ঘোরে?
-স্যার তো খুবই ভালো পড়ান আব্বা আপনি তো তা জানেন।আর স্যারের তো কলেজের চাকরীও হয়ে গেছে…।
-তাই নাকি?ভালোই তো হলো তোর মাষ্টারের একটা গতি হলো…এখন কি তাহলে তোর জন্য নতুন মাষ্টার ঠিক করতে হবে?তোর স্যার কি সময় পাবে তোকে পড়াতে?জয়েন করেছে কলেজে?…বলেছে কিছু?
-জ্বী না সবে তো চাকরী হয়েছে তাই জানালো।
-ঠিক আছে…।এখন যা তোরা শুয়ে পড়, সকালেই বের হতে হবে।
বলেই চলে গেলেন চিফ জাস্টিস আশফাক আলম।
-আল্লারে আল্লা আব্বাজান যেভাবে একটার পর একটা কথা জিজ্ঞেস করতেছিলেন তাতে তো মনে হচ্ছে চিফ জাস্টিসের চাইতে দারোগা বেশী!
রাত্রি এবার কটমট চোখে তাকায় সীমান্তের দিকে।
-কি হইলো এইভাবে তাকায় আছো কেন?
-কিছু না তুই এখন যা তো সীমান্ত ঘুমাবো আমি…।
নিজের রাগকে চাপিয়ে রাখে রাত্রি দাঁতে দাঁত ঘষে।
-ঠিক আছে যাচ্ছি ….কি জমানা পড়লো বাপু…যার উপকার করি সেই কয় চোর…!বলে সীমান্তও গটগট করতে করতে চলে যায়।
রাত্রিও যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে… না হলে সীমান্ত যা বলছিল আর একটু হলেই নির্ঘাত ধরা পড়ে যেতো।
-কিন্তু সীমান্ত জানলো কি করে এ ফুলগুলো রাশেদ সাহেব আমাকে দিয়েছে?ও কি আজকের ঘটনা দেখে ফেলেছে তাহলে!

খুব ভোরেই বৃহত্তর মোমেনশাহী যাওয়ার জন্য রওনা হয় রাত্রি তার মামা আশফাক আলমের সাথে।রাত্রির দেশের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার জামালপুরে।
ট্রেনে করে পৌঁছে যায় তারা।
সীমান্তও আসে তাদের সাথে।ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবার পূর্বে ফুফু আম্মার সাথে দেখা করতে চায়।দাদা, দাদী গত হবার পর ফুফু আয়েশার মাঝে দাদীর আদর খোঁজে সীমান্ত। সীমান্তের ছোট বোন চুমকী মাত্র দুবছর,তাকে ভীষন ভালোবাসে রাত্রি।মামার বাসায় আসলেই চুমকী, সারাক্ষন রাত্রির কাছে থাকে।
ওকে কোলে নেয়া,খাওয়ানো,গোসল করা সব রাত্রিই করে মমতা মাখানো যতনে।তাতে তার মামীমা ভীষন খুশি হোন।চুমকীও যেন কিচ্ছুটি বোঝেনা তার বুবু রাত্রিকে ছাড়া।
চোখের আড়াল হলেই কেঁদে ওঠে তাই।
চুমকী ঘুম থেকে ওঠার আগেই রওনা করে তারা।
মামীমাও কিছু খাবার ও পিঠা দিয়ে দেন সাথে।
ট্রেনের সিটে বসে একে একে সবার কথা ভাবে রাত্রি।
হঠাৎ একটা মানুষের কথা মনে হতেই উদাস হয় সে।
-কি হলো বুবু মন খারাপ কেন?
-কই মন খারাপ?
-তাহলে এতো চুপচাপ কেন?
-চুমকীর জন্য একটু খারাপ লাগছে,ও ঘুম থেকে উঠলেই তো আমাকে খুঁজবে…!
-রাত্রি বুবু তুমি চুমকীকে এত বেশী ভালোবাসছো পরে বুঝবে?বিজ্ঞদের মতো ভাব সীমান্তের।
-পরে কি বুঝবো?
-তুমি কি আর সারাজীবন আমাদের সাথে থাকবে?তোমার বিয়ে হয়ে গেলে তখন বুঝবে আর এখনি তো কেমন মুখ ভার করে রাখছো?ফের পন্ডিতি সীমান্তের।
-দেখ সীমান্ত, তুই সবসময় একটু বেশী বুঝিস!আর শোন আমার বিয়ে নিয়ে তোর এত ভাবনা কেন শুনি?
-ভাববো না? আমাকেই তো ভাবতে হবে দেখো তুমি পাঁকনামি হাসি সীমান্তের।
-কি ভাবতে হবে সীমান্ত?মামা ষ্টেশন মাষ্টারের সাথে কথা সেড়ে কামরায় ওঠেন।
-কিছু না আব্বা,বুবুর চুমকীর জন্য মন কেমন করছিলো তো তাই বলছিলাম।
-হুম চুমকীটাও রাত্রিকে বড় ভালোবাসে।  রাত্রিমা, বিয়ে হয়ে গেলে দুজন দুজনকে ছাড়া থাকবি কি করে?
রাত্রি ভীষন লজ্জা পায় মামার কথা শুনে,ওর মনটাও আনমনা হয় ফের।
সীমান্ত আবারো মিটিমিটি হাসে লাজুক বনের লজ্জা লাল হওয়া দেখে।

রাশেদের মনটা প্রচণ্ডরকম খারাপ।যদিও সকাল থেকে ফুরফুরে মেজাজে ছিল।ওর জয়েনিং আগামী সোমবার থেকে।নেত্রকোনা থেকে তার বাবাও শহীদুল ইসলাম এসেছেন। জয়নাব আজকেও নানারকম পিঠা বানিয়ে পাঠিয়েছে।পাটিসাপটা, আর নকশী ফুলের পিঠা, দুধ পুলি পাঠায়নি নষ্ট হবার ভয়ে।চিঠিতে জানিয়েছে সেকথা।মায়ের শরীরটা আবারো খারাপ করেছে।বিষন্নতা শহীদুল ইসলাম সাহেবের।
-বাবা রাশেদ আল্লাহর অসীম রহমতে তোমার চাকরী হয়ে গেছে এবার বিয়েথা করো।
-কি বলেন আব্বা?আম্মার এই অবস্থা,ঘরে বিবাহ উপযোগী বোন আর এখন বিয়ে করতে বলছেন?
-হ্যা বলছি কারন তোমার মায়ের যে অবস্থা, আমারও বয়স হয়েছে বালা মুসিবত কখন এসে যায় তা কেউ বলতে পারেনা। আমি তোমার আর জয়নাবের জন্য ঘটককে বলে রেখেছি ভালো পাত্র,পাত্রী পেলে আমি কিন্তু দেরী করবো না।দুজনের একজনের বিয়েটা অন্তত দেখে যেতে চাই..।
-এভাবে বলছেন কেন আব্বা..! আজ পর্যবত আপনার কোনো কথার অবাধ্য হইনি।আপনি জয়নাবের আগে বিয়ে দেবার চেষ্টা করেন।আর আম্মাকে কি ডাক্তার দেখাবেন ঢাকায়?
-সেটাই ভাবছিলাম বাবা।ঢাকায় আমার তেমন কোনো আত্মীয়স্বজন নেই তোমার ছাত্রের পরিবার ছাড়া। কিন্তু তাদের বাসায় তোমার আম্মাকে এনে কি রাখা যাবে?
-আমি কথা বলে দেখবো,খালাম্মা, খালু দুজনেই ভালো মানুষ উনাদের বিষয়টি জানিয়ে আপনাকে জানাবো।
-ভালো মানুষ সে আমি জানি। কিন্তু বিপদে পড়লে আত্মীয় স্বজনও মুখ ফিরিয়ে নেয় তাই তাদের নিকটও অতবেশী সুবিধা নিতে যেওনা।
-আপনি খুব বেশী চিন্তা করছেন… যা হবার আল্লাহ করবেন।
বাবার সাথে কথা শেষ হবার পর রাশেদ যখন পড়াতে গেলো তখন শুনলো সীমান্ত নেই,সাথে রাত্রিও গেছে বাড়িতে।
তার মাকে সীমান্তের বাসায় একদিন রাখা যাবে কিনা অনুনয় জানায় সীমান্তের মায়ের কাছে।
বোনের বানানো পাটিসাপটা পিঠা আর চাকরীর মিষ্টি রেখে যায় রাশেদ কেউ তৃপ্তি আর আনন্দ নিয়ে খাবে সে আশায়।কিন্তু সেটি হবার উপায় নেই এখন ভেবে বিষাদগ্রস্থ হয়ে ফিরে যায় রাশেদ।

(চলবে)

আগের পর্বের লিংকঃ

“রাত্রি নামে অমাবস্যা ‘পর্ব-৭ (একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প)

হাসিনা সাঈদ সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন