বাছুর তুমি কার?

মোঃ কামরুজ্জামান জেমস

অনেক দিন আগের কথা। সবুজে ঘেরা ছোট এক গ্রাম। সে গ্রামে বাস করতো একশত ঘর মানুষ। তারা খুব সুখে বাসবাস করতো। তারা সহজ সরল ছিল। তাদের মধ্যে দুজন ব্যক্তি ছিল আলাদা। তাদের একজন উসমান। সে ছিল ধনী। তার নিজস্ব ২৫ বিঘা জমি ছিল। সে ছিল স্বার্থ পর টাইপের মানুষ। সে সবকিছু নিজের করতে চাইত যদিও তার কোন কিছুর অভাব ছিল না। আরো একজন মানুষ ছিল যার নাম ইসাহাক। সে ছিল সহজ সরল মানুষ। সে ধনী হলেও উসমানের মতো ছিল না। তার জমি ছিল ১০ বিঘা।

উসমান গরু পুষতো। কিন্তু তার ৫ টি গরুই ছিল ষাঁড়। সেগুলোকে বাড়িতেই রেখে খাওয়াত। অন্যদিকে ইসাহাকের ৩ টি বকনা গরু ছিল। একটি গরু একটি বকনা বাছুর প্রসব করলো। বকনা বাছুরটি ইসাহাকের গরুর কাছে থাকতো না। বাছুরটি সবসময় উসমানের ষাঁড়ের কাছে থাকতো। একপর্যায়ে উসমান বাছুরটির মালিকানা দাবি করে বসলো এই বলে, “ বাছুরটি আমার ষাঁড়ের। তাই সবসময় তার কা্ছ থাকে।”
এসাহাক বলে, “ ষাঁড় কী কখনো বাছুর প্রসব করতে পারে?” কিন্তু কে শোনে কার কথা। উসমানের একই কথা , “ বাছুরটি তার।”

ইসাহাক গ্রামের মানুষের কাছে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য বিচার দেয। গ্রামের মানুষেরা বিচারে বসলে ইসাহাক বলে, “ আমার গরু বাছুর প্রসব করেছে। কিন্তু বাছুর উসমানের ষাঁড়ের কাছে থাকে । তাই সে বাছুর তার বলে দাবি করছে।”

উসমান তখন বলে, “ বাছুর ছেড়ে দিলে তার মায়ের কাছে যাবে। যেখানে যাবে বাছুরটি তার-এটাই স্বাভাবিক। তাই বাছুরটি আমার।”

গ্রামের মানুষ দুইভাগে ভাগ হয়ে গেল। তারা দেখল তাদের যুক্তি তো ঠিক। তারপরও অধিকাংশ মানুষ ইসাহাকের পক্ষে। কিন্তু জোর দিয়ে কিচু বলতে পারছে না। কারন বাছুর ছেড়ে দিলে উসমানের ষাঁড়ের কাছে থাকছে। তারা যদিও জানে, ষাঁড় কখনোও বাছুর প্রসব করতে পারে না। তাই তারা উসমানের পক্ষে রায় দেয়।

ন্যায়বিচার না পেয়ে ইসাহাক মনের দুঃখে গ্রাম ছেড়ে দূরে যেতে থাকে। অনেকদূর যাওয়ার পরে এক শিয়াল পন্ডিত -এর সাথে দেখা হয়। শিয়াল পন্ডিত ইসাহাককে ভারাক্রান্ত মনে দেখে জিঙ্গেস করলো, “ তোমার মন কেন খারাপ?” সে আগে থেকেই ইসাহাককে চিনত।

ইসাহাক তাকে সব ঘটনা খুলে বললো। সব শুনে শিয়াল পন্ডিত তাকে বললো, “ আপনি বাড়ি যান আর আগামী সোমবার বিকাল ৪.০০ টায় বিচার ডাকেন। আমি যথাসময়ে হাজির হয়ে ন্যায়বিচার করবো।”

শিয়াল পন্ডিতের কথা শুনে ইসাহাক আশ্বস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেল। সোমবারে আবার বিচার ডাকলো। গ্রামের সকলকে সেইদিন উপস্থিত থাকার জন্য বলা হলো। গ্রামের সবাই ইসাহাকের কথা শুনে আশ্চর্য
হলো। তারা মনে করলো, “ ইসাহাক আবার পরাজিত হওয়ার জন্য বিচার ডেকেছে।”

সোমবার দিনে বিকাল ৪.০০ টায় সবাই বসে আছে। এভাবে দীর্ঘ
১ ঘন্টা কেটে গেল। শিয়াল পন্ডিতের দেখা মেলে না। মানুষ বসে থেকে বিরক্ত হয়ে গেল। সবাই শিয়াল পন্ডিতের আসার রাস্তার দিকে বারবার চাচ্ছে। কিন্তু তার টিকিরও খবর নেই। গ্রামের মানুষ ইসাহাক ও শিয়াল পন্ডিতের উপর খেপে যায় এতক্ষন বসে রাখানোর জন্য।
ইসাহাক উপায়ান্তর না দেখে আর কিছুক্ষণ সময় নিতে চাইলে সবাই বললো, “ ঠিক আছে, আর ৩০ মিনিট সময় দেওয়া গেল্” । ৩০ মিনিট সময় চলে গেলে সবাই দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে আর দেখছে সূর্য অস্ত যাওয়ার পথে। তাই সবাই বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। এমন সময় তারা কিছু একটা আসার মতো দেখতে পায়। কাছে আসলে দেখে শিয়াল পন্ডিত একটি লাঠির উপর ভর দিয়ে ধীরে ধীরে আসছে।

শিয়াল পন্ডিত কাছে আসলে সবাই খেপাখেপি শুরু করে। এতক্ষণ বসিয়ে রাখার জন্য তারা তাকে ভৎসনা করে। শিয়াল পন্ডিত তখন বলে, “ আপনাদেরকে এতক্ষণ বসিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত দুঃখিত। আমি আসার পথে আত্রাই নদীতে আগুন লাগা দেখতে পাই। আর মাছগুলো উপরে আসতে থাকে। মাছগুলো দেখে আমি লোভ সামলাতে পারিনি। তাই খেতে খেতে দেরি হয়ে গেছে।”

তখন গ্রামের মানুষেরা বলতে থাকে, “ আপনি পাগল। তাছাড়া পানিতে কোন দিন আগুন লাগে?”
তখন শিয়াল পন্ডিত মাথা ঝাকাতে ঝাকাতে বলে, “ ষাঁড়ে কী কখনো বাছুর প্রসব করে?”
তখন সবাই একযোগে বলে , “ না, প্রসব করে না।”
তখন শিয়াল পন্ডিত বলে , “যদি তাই হয় তবে বাছুর ইসাহাকেরই হয়, উসমানের হয় না।”
তখন সবাই ভুল বুঝতে পেরে তাদের বিচার তুলে নেয় এবং ইসাহাককে বাছুর দিয়ে দিতে বলে। অবশেষে উসমানও রায় মেনে নেয়।
জ্ঞান ও বুদ্ধির কাছে এভাবেই সবার মাথে নত করতে হয়।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন