“রাত্রি নামে অমাবস্যা’ পর্ব-৯ (একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প)

 হাসিনা সাঈদ

রাত্রিরা পৌঁছানোর পর, মা আয়েশা সুলতানা ব্যস্ত হয়ে পড়েন প্রিয়জনদের আদর আপ্যায়নে।
রাত্রিকে দেখে মমতাময়ী মা জড়িয়ে ধরেন আদরের উষ্ণতায়।
আশফাক আলমকে প্রতিবারের মতো কদমবুসি করেন তিনি।আশফাক আলম তাদের মায়ের নামে স্কুলটা দেখে আসতে চলে যান সাথে সাথে।সীমান্তও যায় তার সাথে।
রাত্রিকে কাছে পেয়ে মায়ের যেন চিন্তার শেষ নেই,তাতে রীতিমতো অবাক রাত্রি।
ঘরে নিয়ে গিয়ে মা মেয়ের আলাপন,
-এমন শুখায়া গেসোছ ক্যান রাত্রি?
-কই মা আমি কই শুকাইসি?শুকায় গেসো তো তুমি…?
-আমি ওখন বুড়া হইসি,আমি শুখাইলে কোনো ক্ষতি নাই..হ্যারে মা রাত্রি তোর মামীমা কেমন করে?তোরে আদর টাদর করে তো?খাইতে দেয় ঠিক মতো?
-তুমি যে কি কও না মা! মামীমারে তোমার ঐরকম মনে হয়? সে অনেক ভালো মানুষ আমারে অনেক আদর করে, বরং আমি চলে আসছি তাই মন খারাপ করে ছিল।
-করি কি আর সাধে…? তোর বড় মামীর কথা মনে নাই…?কি যেন ভাবেন আয়েশা সুলতানা।
ফের বলে রাত্রি,
-ছাড়ো তো মা এইসব?যে চলে গেসে তার কথা ক্যান মনে রাইখ্যা কষ্ট পাও?আল্লাহর কাসে তার জন্য দোয়া করো,আর ঐসব ভুইল্যা যাও মা…।
রাত্রির মামা আশফাক আলম দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন।প্রথম স্ত্রী কলেরায় মারা যান।প্রথম স্ত্রী
অনেক সুন্দরী রমনী ছিলেন।দেশ বিভাগের পর তার সেই বড় মামী আর তার পরিবার ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন।মামার অফিসের কলিগের চাচাতো/ফুপাতো বোন। মামা নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন তাকে।সেই ঘরে বড় সন্তান শফিক আলম।সীমান্ত ও চুমকী দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে জন্ম।
বড় মামীর অতি অহংকারী আচরনে রাত্রির মা আয়েশা সুলতানা খুব কষ্ট পেয়ে ছিলেন।
রাত্রি তখন খুব ছোট কোনো এক অজানা কারনে রাত্রির বড় মামী আফরোজা বেগম অতিথিদের সামনে তার ঘর থেকে চলে যেতে বলেছিলেন।
তারপর রাত্রির বাবাও তখন মারা যায় কিন্তু অভিমানে রাত্রির মা আয়েশা আর ভাই এর বাসায় ওমুখো হয়নি।
আশফাক আলমের সাথেও এ নিয়ে মনমালিন্য হয়েছিল।তারপর স্ত্রী গত হবার পর আয়েশাই সব ভুলে গিয়ে ভাইয়ের কাছে ছুটে যান।সেসব কথা ভেবেও মাঝে মাঝে শংকিত হোন আয়েশা সুলতানা।
তাই যতটা সম্ভব ইচ্ছে করেই বড়ভাই এর থেকে দূরে থাকতে চান তিনি।পুরনো কোনো কিছু পুনরাবৃত্তি হোক চান না তিনি কোনোভাবেই।
কিন্তু রাত্রির কাছে তার প্রিয় মামাজানকে কখনো এমন মনে হয়নি।বরং যতবারই রাত্রি তার মামার নিকটে এসেছে তার কাছে তার হারানো বাবার ছায়াকেই খুঁজে পেতে চেয়েছে।
হয়তো একটা বয়সে বা সময়ে মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়ে, আপনজনদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি এভাবেই দূরত্ব ঘটায়। তাই এই দূরত্ব ঘোচাতে কাউকে না কাউকে তো ছাড় দিতে হয়,ভুলে যেতে হয় অতীত দুঃসময়… বোঝায় রাত্রি তার স্নেহময়ী মাকে।

রাত্রি রান্না ঘরে যেয়েও অবাক হয় মায়ের কান্ডে,
কত কি রান্না করেছেন তার মা!
হাসের মাংস,চিনিগুড়া চালের পোলাও,হাসের ডিমের কোরমা,গুরু গোশত ভুনা,নানারকম পাঁচমিশালী সবজি, ভর্তা, ডাল,বড় চিংড়ি দোঁপেয়াজা, খাটি গুরুর দুধের ছানার পায়েশ পর্যন্ত আছে ।বিকেলে দুধ পুলিও করা হবে।মাটির উনুনে বড় হাড়িটাতে দুধ চাপানো আছে।বড় চামিচ দিয়ে নাড়াচাড়া করছে রাত্রির ছোট ফুপু বেনু।
রাত্রির মায়ের সবজি বাগান,গরু রাখার গোয়াল ঘর থেকে শুরু করে হাস,মুরগীর খোয়ারও আছে।
আগে রাত্রির বাবা সোলেমান সুরুজও এসব দেখাশোনা করতেন।
তিনি মসজিদের একজন বড় হুজুর ও ক্বারী মাওলানা ছিলেন।রাত্রির বাব,দাদারা পীরের বংশ বলেও তাদের গ্রামে সুবিখ্যাত। রাত্রির বাবা মারা যাবার পর এক হাতে সব সামলাম আয়েশা।মেয়ে রাত্রি একটু বড় হবার পর মোমেনশাহীতে পড়ালেখার জন্যে পাঠিয়ে দেন।সেখানে রাত্রির আরেক ছোট বোন পুস্পিতাও থাকে।
রাত্রিরা দুই বোন।একটা ভাইও আছে তাদের।সে বয়সে অনেক ছোট। রাত্রি আর পুস্পিতার একমাত্র  আদরের ভাই ওর নাম ফারুক।

রাত্রির ছোট মামা আজগর তিনি ময়মনসিংহ সদরে থাকেন।হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক উনি।
রাত্রি ভাবছিল বড় মামাকে আরেকবার বলবে,ছোট মামাকে দেখালে কেমন হয় তাঁর মাকে।

তাছাড়া রাত্রির মা আয়েশা ও মামা আশফাক আলমের নিজস্ব জমিতে চিংড়ির ঘের আছে।আছে নিজস্ব ক্ষেতে ফসল,গাছপালা ও রাত্রির নানা নানী অর্থাৎ তাদের মায়ের নামে বিদ্যালয় ও বাবার নামে মসজিদ,যা গ্রামাঞ্চলে তাদের অন্যসব আত্মীয় স্বজন দেখাশোনা করে থাকে।

রাত্রি বাসায় আসলে মায়ের সব কাজ সে একা করতে চায়।তবে পড়ালেখায় অনেক ভালো রাত্রিকে নিয়ে বড় মামা ও চিন্তা করেন কিছু বিষয়।

খেতে বসার সময় ভাই,বোনের মাঝে কথা হয় এবার,
ভাই এর প্লেটটাতে বড় চিংড়ি, পোলাও আর হাসের মাংস বেড়ে দিতে থাকে বোন আয়েশা।
– হ্যারে আয়েশা বেনু কি এখানেই থাকে?
-জ্বী ভাইজান ও আর কই যাইবো,ওর সোয়ামী তো কয়া দিসে ওরে আর ঘরে নিতো  না।আপনেগো জামাই এর ভিটা থ্যাইকা তারে কিসু লিইখ্যা দিমু কিনা ভাবতেসি।
-ঐসব কাজ ভুলেও করতে যাবিনা আয়েশা।যে স্বামী নিজের বউ বাচ্চা ফালায়া সব ভুইল্যা থাকতে পারে সে ভিটা নিয়া দুইদিন পরই যে আবার এই কাজ করবো না তার কি নিশ্চয়তা?তুই তোর স্বামীর এক কানিও কাউকে দিবিনা।আর বেশী বাড়াবাড়ি করলে ওর সুবন্দোবস্ত করে দিবো…সোজা জেলের চৌদ্দ শিকায় ঢুকায় দিবো..।ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে আশফাক আলম।
প্রসঙ্গটি বদলাতে চায় আয়েশা, ফের বলে,
-শফিক কবে আইবো ভাইজান?ওর কি বিলাত পড়া শেষ হয় নাই?
-তুই যে কি বলিস না আয়েশা?বিলাত না ব্যারিস্টারি পড়া… হ্যা এই তো বিলেত থেকে আসবে আর কিছুদিন পর পড়া প্রায় শেষ এখন দোয়া কর।আচ্ছা রাত্রিকে নিয়ে কিছু ভাবছিস আয়েশা?
-কি ভাববাম ভাইজান?
-ওর বিয়ে শাদী এইসব আরকি…।তোর মেয়েটা এত ভালো করে আয়ে পাশ করলো।ওকে আরও পড়াবি নাকি…?
-মাইয়া ডাঙ্গর হইসে আর কত পড়তো?আপনে কি কন?
-তোর যদি আপত্তি না থাকে আমি তোকে একটা প্রস্তাব দিতে চাই।
-কি প্রস্তাব ভাই?
-আমার শফিকের সাথে রাত্রির মায়ের শাদী…তোর কোন আপত্তি নাই তো?
-কি কইলেন ভাইজান…!
আয়েশা সুলতানার চোখ দুটো ছলছল হয়ে ওঠে প্রায় সাথে সাথে…তার ভাই যে এমন প্রস্তাব করবে আয়েশার  যেন কিছুতেই বিশ্বাস হতে চায় না।
জানালার ওপাশ থেকে কথাটা কানে যায় রাত্রির..।
তা শোনার পর ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে…।
কি করে থামাবে এ উথাল পাথাল প্রলয়?
ভাবনায় ব্যাকুল রাত্রি…।(চলবে)

আগের পর্বের লিংকঃ

“রাত্রি নামে অমাবস্যা ‘ পর্ব-৮ (একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প)

হাসিনা সাঈদ সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন