লাল সোয়েটার  ও একটা নীল ঘুড়ি

আরণ্যকে শবনম

ডিসেম্বর মাস।শীতের ছুটি পড়েছে ক্যাম্পাসে, হল ছেড়ে বাড়ির পানে ছুটবার দিন।সেমিস্টার ফাইনাল শেষ,বেশ আয়েশ করে পিঠাপুলি খাওয়া যাবে-আনমনে আতিকা ভাবে।মায়ের মলিন মুখখানা কেমন হাসিতে ভরে উঠবে,ছোট্টবোনের গল্প বলা বুবুকে পাশে পাওয়ার খুশি।বাবার সাথে সকালের চায়ের কাপে জীবনানন্দ আর আল-মাহমুদের কবিতার রিনঝিন আর ভবিষ্যতের দিনগুলোর আনাগোনা। ভীষণ ভীষণ প্রতীক্ষার দিনগুলো অবশেষে কড়া নাড়ছে দ্বোরে। টিউশনিতে ছুটি,বেশ কদিন নির্ঝঞ্ঝাট জীবনের হাতছানি। আতিকা গুনগুন করে প্রিয় গান সুর গাইতে গাইতে ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ছোট্ট বোন আমিনা বড্ড বায়না করে,আতিকাও ভালোবাসে এটা-সেটা কিনে বোনের জন্য নিয়ে যেতে,কমিকস,গল্পের বই,গয়না,রাজকন্যার মতো ফ্রক।এবার তার নাকি একটা লাল রঙের সোয়েটার চাই,গলায় থাকবে মুক্তোদানার মতো পু্ঁতির কাজ।কলিজার টুকরো বোনের আবদার বলে কথা,ব্যাগ গুছিয়ে রেখে নিউমার্কেটের দিকে বের হয় আতিকা,সাথে বান্ধবীকে নিয়ে।এ দোকান,সে দোকান করেও মনের মতো না পেয়ে প্রায় হতাশ হচ্ছিলো এমন সময় বান্ধবী হামিদার নজরে এলো সুন্দর একটা লাল টুকটুকে সোয়েটার। গলায় সুন্দর কারুকাজ   যত্ন করে বোনা,কেমন উষ্ণতার ছোঁয়া জড়িয়ে আছে।দামাদামি করতে হলো না,বিক্রেতা আতিকাকে চিনতো। প্যাক করে দিতে দিতে হাসিমুখ করে  বললেন,ছোট্ট বোনের জন্য নিচ্ছো বুঝি,মা…”।জ্বি, চাচা,বলেই সামনে চললো ওরা।হাফ ছেড়ে যেন বাঁচলো আতিকা,না হলে বিচ্ছুটার আড়ি ভাঙানোর জন্য কতো কাঠখড় পোহাতে হতো।রাগ করে গাল ফুলায়ে থাকতে সে বড়ো পাকা বুড়ি।ভাবতে ভাবতে রিকশা হলের কাছে এসে থামলো।

পরদিন সকালের ট্রেন,রাতটা কোনমতে ঘুম-নির্ঘুমেই করেই কেটে গেলো।সকালে ক্যান্টিন থেকে ব্রেকফাস্ট করে, গরম এক কাপ চা খেয়ে, রুমমেটদের কাছে থেকে বিদায় নিয়ে,স্টেশনের দিকে রওনা হলো আতিকা।স্টেশনে পৌছাতেই গিয়ে দেখে ট্রেন পৌছাতে কিছুটা দেরী,বাড়িতে ফোন করলো সে।আম্মা বললেন,আম্মু,ভালো করে চাদর জড়িয়ে নিও মাথায়,পথে উল্টোপাল্টা কিছু খেয়ো না,…এমনি প্রিয় মধুর উপদেশ, ফোনে অপর প্রান্তে আমিনার কন্ঠ, বুবু আসছে.. কথা বলবো আমি, দাও দাও…”কথা শেষ করে স্টেশনের প্লাটফর্মের একটা কোনে গিয়ে বসলো সে,একটু দূরে চোখে পড়লো তার,সেখানে ছোট একটা মেয়ে, তার চেয়েও ছোট শিশুকে নিয়ে বসে আছে রোদের আশায়,গায়ে শতময়লা একটা ফ্রক।এবছর বড্ড শীত দুপুরের আগে রোদের দেখা নাই।বাচ্চা মেয়েটা কি এমন করে ঠকঠক করে কাঁপতে দেখে,আতিকা আর বসে থাকতে পারে না।এগিয়ে যায় সামনে ,বাচ্চা মেয়েটা হাসি হাসি মুখে তাকায়,বলে, “আফা,কিছু লাগবো,আমি মাল বইবার পারি..,”শীতে ফেটে যাওয়া ঠোঁটের কোনে সেই অপার্থিব হাসি।আতিকা বলে,আজ কিচ্ছু লাগবে না,তোমার জন্য একটা গিফট দিতে চাই।মেয়েটি বলে এমনি সে উপহার নিতে চায় না,সে একটা কিছু দিতে চায়,আতিকা রাজি হয়।ছোট্ট শিশুটাকে আতিকার কোলে দিয়ে,দৌড়ে গিয়ে একটা নীল ঘুড়ি নিয়ে আসে কোথা থেকে। আতিকা লাল সোয়েটারের প্যাকেটটা তুলে দেয় মেয়েটার হাতে একটা নীল ঘুড়ি।আমিনার জন্য নিয়ে যাচ্ছে এক অপার্থিব ভালোবাসার দান।ট্রেনের হুইসেল শোনা যায় অদূরে।আতিকা পা বাড়ায় সেদিকে ভালোবাসা সিক্ত উষ্ণতা নিয়ে।
আরণ্যকে শবনম কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন