প্রেমা

আসাদুজ্জামান জুয়েল

প্রেমা পেশায় ডাক্তার। এবারই ইন্টার্নি শেষ করলো। ডাক্তার ছেলে-মেয়েদের প্রতি আমার ভীষণ দূর্বলতা। তবে প্রেমার প্রতি এ কারণে দূর্বলতা তৈরি হয়নি বরং তার সাহিত্যের অগাধ জ্ঞান আমাকে মুগ্ধ করেছে।

একদিন হঠাৎ করে ইনবক্সে একটি চিঠি পাই। আপনার লেখাগুলো ভাল লাগে টাইপ লেখা ইদানিং প্রতিনিয়তঃ আসে ইনবক্সে। বন্ধু হতে চাই টাইপ লেখাও আসে। যারা সেসব চিঠি পাঠান আমি তাদের নাম দিয়ে আমার পোস্টগুলো চেক করি। অনেককেই দেখি লাইকও দেননি, কমেন্টও করেননি। অনেকে আবার চরম দুঃখের একটা লেখায় হাহাহা রিএ্যাক্ট দিয়েছেন দেখেই বোঝা যায় আসলে উনি লেখাটাই পড়েননি। না পড়ে রিএ্যাক্ট করেছেন।

প্রথম প্রথম বয়সের দোষেই হয়তো খুব আপ্লুত হতাম সেসব চিঠি পড়ে। বিশেষ করে কোন তরুণীর চিঠি পেলে তো কথাই নেই। এখন বুঝি, ওসব ভার্চুয়াল প্রশংসায় খুশি হওয়ার চাইতে মদনগিরি আর নেই। আমাকে যারা প্রশংসার বন্যায় ভাসান, আমার মত অধিকাংশের লেখাতেই তারা একই রকম প্রশংসা করেন। কোথাও কোথাও এক কাঠি বেশি সরেস হতেও দেখেছি তাদের। প্রেমার বিষয়টা ঠিক সেরকমই ভেবেছিলাম।

ইদানিং আর ইনবক্সের চিঠি সাধারণত পড়িনা। নোটিফিকেশন আসার পরে, প্রেমার প্রোফাইল পিকচারটা দেখে ভালো লাগলো। শাড়ি আর শিউলি ফুলের মালায়, বাঙালিয়ানা চেহারার কারণেই প্রেমার চিঠিটি খুললাম। অনেক বড় চিঠি, আমার বেশ কয়েকটি লেখার দূর্বল দিকগুলো ধরিয়ে দিয়ে ভদ্র ভাষায় সে লিখেছে, আপনার লেখাগুলো ঠিক গল্প হয়ে উঠছেনা। আরো অনেক পড়তে হবে আপনাকে। বিশেষ করে আধুনিক গল্প।

নিজের কুৎসিত সন্তানও মা-বাবার কাছে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে বেশি সুন্দর হয়। আমার হাজারো দূর্বল লেখাগুলোও আমার কাছে তাই।  স্বাভাবিকভাবেই প্রেমার উপর রাগ হওয়ার কথা কিন্তু অদ্ভূত ব্যাপার, আমার রাগ হলো না।

আমি কিছুটা অবাক হলাম যখন কিছুক্ষণ চ্যাট করেই বুঝলাম, এই মেয়ে সাধারণ পাঠক নয়। আমি ইংরেজী সাহিত্যের স্টুডেন্ট ছিলাম শুনে, সে বার্ক, হোমার, সেক্সপীয়ার, কিটস নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। শেলি, বাইরন, ফ্রস্ট থেকে উদ্ধৃত করে করে সে লিখতে লাগলো, আর আমি অবাক হতে লাগলাম। একটা মানুষ এত জানে!

কয়েকদিন পর সে ফোন নম্বর নিলো। আমি বললাম, “ফোন নম্বর দিচ্ছি, তবে কল না করাই ভালো। আমি চাই, আপনি অদেখা, অশোনা বন্ধু হয়েই থাকেন।”

প্রেমা বললো, “না, আমি আপনার সাথে ঘুরতে চাই। আপনার সাথে ফটোগ্রাফি করে বেড়াতে চাই। আপনার সাথে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে চাই।”

আমি রাজি হইনি। রাজি না হওয়ার একমাত্র কারণ, প্রেমার সৌন্দর্য্য। আমি জানি, এই অদ্ভূত সুন্দর মেয়েটাকে দেখলে আমি তার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়বো। তার নাম থেকে আকার কেটে দিতে ইচ্ছে করবে তখন। তারচেয়ে ঢেড় ভালো, আমি তার থেকে দূরে থাকি।

প্রেমাকে যদিও বারবার বলেছিলাম, ফোন করবেন না, আমি আপনার কন্ঠস্বর শুনতে চাই না, তবুও সারাক্ষণই  তার ফোনের অপেক্ষা করতে লাগলাম। একদিন সারাদিন ফোন অফ থাকার পর যখন, ফোন অন করেছি তখন একটি মেসেজ পেলাম। অপরিচিত নম্বর থেকে আসা মেসেজটি খুব ছোট্ট। “খুব প্রয়োজন। মেসেজ দেখামাত্র ফোন করবেন প্লিজ। প্রেমা।”

আমি সে নম্বরে ফোন দিতেই প্রেমা খুব বকাঝকা করলো। ফোন বন্ধ দেখে সে অনেক টেনশান করেছে, সেটা জানালো। জীবনে এবারই প্রথম, এবারই শেষ আমাদের দেখা হওয়া দরকার সেটা বললো।

ঠিক হলো রাত তিনটায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগে সে থাকবে এবং সেখানেই আমাদের দেখা হবে।

প্রেমা ক্লিনিক শেষ করে এখানে একটা কাজ সেরে অপেক্ষা করছিলো। দেখা হতেই দুজন দুজনকে চিনলাম। কিছুটা আড়ষ্ঠভাব কাটতে সময় লাগলো এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে ফেললেন তরুণী ডাক্তার।

প্রেমা বললো, “আপনাকে আমার দুটো অনুরোধ করার আছে। না না, অনুরোধ মূলতঃ তিনটে।
১। আপনার কোন একটা গল্পে আপনি আমার নামটি ব্যবহার করবেন।
২। আজকের পরে আর কোনদিন আমরা চ্যাট করবো না, দেখা করবো না, কথা বলবো না। তবে নিশ্চিত থাকেন, আপনার সব লেখা আমি পড়বো। কিন্তু কোন রিএ্যাক্ট করবো না।
৩। আপনাকে এখন আমি একটা ঘটনা দেখাবো, সেটা নিয়ে একটু লিখবেন।”

আমি রাজার সামনে মন্ত্রী দাঁড়িয়ে যেমন কুর্ণিশ করে সব মেনে নেওয়ার স্বীকৃতি জানায়, সেভাবে সব মেনে নিলাম।

প্রেমা ঘটনাটি দেখাতে আমাকে মেডিকেলের বাইরে মাইক্রো স্ট্যান্ডে নিয়ে গেল। আমাদের দেখেই মাইক্রো ড্রাইভাররা ছুটে আসলো। সবাই চিৎকার করে হুড়োহুড়ি করে বলতে লাগলো, “স্যার, মাইক্রো লাগবে কি? আমারটায় আসেন স্যার। আমার মাইক্রোতে লাশ রাখার মত আলাদা বিছানার মত করা আছে। আস্তে আস্তে চালিয়ে যাবো স্যার। আমরা লাশ নিয়ে কখনো জোরে গাড়ি চালাই না।”

এবার বুঝলাম প্রেমা কেন এত রাতে দেখা করতে চেয়েছে। আমরা “গাড়ি লাগবেনা ভাই” বলতে বলতে কিছুটা দূরে চলে এলাম। একটা ছোট্ট টং দোকানে চা খেলাম। প্রেমা বললো, “জুয়েল ভাই। সেদিন ওভাবে মেসেজ দেওয়াটা আমার ঠিক হয়নি। সরি। আপনার লেখাগুলো সত্যিই গল্প মনে হয়না। আপনি তো বাস্তব ছবিগুলোই গল্পের মধ্যে লিখেন। খুব ভালো লাগে। আজকের যে মাইক্রো ড্রাইভারদের দেখলেন, এদের আমি গত ছয় বছর ধরে দেখছি। এরা একটা মানুষ মরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে। একজন মানুষ মারা গেলে এদের ভাড়া হবে। বাড়িতে হয়তো চাউল কিনতে হবে, বাচ্চার স্কুলের বেতন দিতে হবে! কি অদ্ভূত দেখেছেন! একজনের মৃত্যুর সাথে আরো কতগুলো মানুষের বেঁচে থাকা জড়িত।”

আমি স্তব্ধ হয়ে আছি। নির্বাক হয়ে প্রেমার দিকে তাকিয়ে আছি। সে চলে যাচ্ছে।
এবার নিয়ম ভাঙতে চাইলাম। বললাম, “প্রেমা, আমাদের কি কখনোই আর দেখা হবেনা? কথা হবেনা?”
প্রেমা যেতে যেতে শুধু বললো, “না।”

আমিও প্রেমাকে দেওয়া কথা রেখেছি। তার নামে, মাইক্রো ড্রাইভারদের নিয়ে গল্প লিখেছি। আর মোবাইল থেকে ডিলিট করে দিয়েছি তার সকল চিহ্ন। তাকে খুব মনে পড়ে। একবার শুধু জানতে ইচ্ছে করে, প্রেমা কি লেখাটা পড়েছে। সার্চ দিয়েও ভার্চুয়াল জগতে তাকে পাইনি। সে হয়তো আইডি বন্ধ করে দিয়েছে।

আজ শুধু বলতে চাই, “যেখানেই থাকবেন, ভাল থাকবেন প্রেমা। আমি আপনাকে ভীষণ রকম মিস করি।”

আসাদুজ্জামান জুয়েল লেখক ও ফটোগ্রাফার।

আরও পড়ুন