ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম (পর্ব-৯)

আরশাদ উল্লাহ্‌

আকিহিরো ইয়ুকিকে ঘরে নিয়ে এসেছে আজ দু’দিন হয়েছে।ফুরুকাওয়া বাধা দিতে চেয়েছিল কিন্তু তার সে বাধায় কোন জোর ছিল না। বলেছিল, “ইয়ুকি আমার মেয়ে তুমি তাকে নিতে পারবে না!”

তার কথার জবাব দিলেন আকিহিরোর মা কজিমা সান। তিনি বললেন, “যদি আত্মবিশাস থাকে কথায় জোর দিয়ে বলেন। আপনাকে বাঁচাবার জন্যই ইয়ুকিকে নিয়ে যাচ্ছি। সে একটি এতিম মেয়ে – আপনার মনে যা চায় তা এখন করতে পারবেন না। আমি সব জেনেছি। পরবর্তিতে যদি পুলিশ আসে তখন আপনার লুকাবার রাস্তা থাকবে না। আপনাকে সেই বিড়ম্বনা থেকে বাঁচাবার জন্যই ইয়ুকিকে নিয়ে যেতে চাই!”

ফুরুকাওয়ার বয়স ষাট। সে তাতামি ফ্লোরের উপর রাখা কুশনের উপর বসা ছিল। কজিমা সানের কথা শুনে তার দুই কনুই সামনে রাখা দেড় ফুট উঁচু কাঠের নির্মিত টেবিলের উপর রেখে দুহাত মুখে চেপে ধরে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। অদূরে টেবিল থেকে সামান্য দূরে বসা তার স্ত্রী তমোক ফুরুকাওয়া। কজিমা সান ফুরুকাওয়ার দিকে চেয়ে বসে আছেন।

কজিমা সান আবার বললেন, “আপনার যদি আপত্তি থাকে আমরা চলে যাব!”

ফুরুকাওয়া মাথা তুলে সোঝা হয়ে বসলেন। তার মুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। তিনি এতক্ষণ নিরবে কেঁদেছেন। তাই চোখ দুটি সামান্য লাল দেখা যাচ্ছে। ছোট টাউয়েল দিয়ে মুখ মুছে বললেন, “হ্যাঁ কজিমা সান। আপনি ঠিক বলেছেন। আমি ভুল করেছি। ইয়ুকিকে আর এই বাড়িতে রাখা সম্ভব নয়। আপনি আমার ইজ্জত রক্ষা করেছেন। নইলে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যেত।” এতটুকু বলে সে তার স্ত্রীকে চা দিতে বলল। তারপর ফুরুকাওয়া উঠে বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে এসে বললেন, “ঠিক আছে, ইয়ুকিকে আপনার হেফাজতে দিলাম। তাকে সঙ্গে নিয়ে যান!”

ট্যাক্সি ডেকে আনল আকিহিরো। ইয়ুকিকে সঙ্গে নিয়ে তারা কজিমা সানের ঘরে ফিরল।

ইয়ুকি এখন কিছুটা সুস্থ।এখানেও ডাক্তার তাকে নিয়মিত দেখতে আসেন। ফুরুকাওয়াও এসে তাকে দেখে গেছেন।তিনি আকিহিরোর মাকে বললেন, “আমি এখন অনেক চিন্তা মুক্ত।আপনাদের নিকট আমি কৃতজ্ঞ। যে সহযোগিতা আমাকে করেছেন সারা জীবন মনে রাখব।”

আকিহিরোর মা বললেন, পুলিশের ঝামেলা হয়নি বলে আপনি বেঁচে গেছেন। নইলে বড় সমস্যা হত আপনার। সে যাই হোক, যার শেষ ভাল তার সব ভাল। এখন আপনি চিন্তা মুক্ত থাকুন। ইয়ুকিকে মাঝে মাঝে এসে দেখে যাবেন।

ফুরুকাওয়া নিম্ন কন্ঠে কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, আকিহিরোর মা, ইয়ুকির চিকিৎসা ও হাত খরচ বাবদ আমি কিছু টাকা দিতে চাই! তার হয়ে আশাকরি আপনি তা গ্রহণ করবেন।

আমি রাজি নই ফুরুকাওয়া সান, “ইয়ুকিকে না বলে টাকা গ্রহণ করব না।মেয়েটির পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ নেই।তার দুঃখ কষ্টের কথা শোনার জন্য তার নিকটতম কেউ নেই। অথচ কারো ধন সম্পত্তির উপরেও তার কোন লোভ নেই। আপনার বাড়িতে নিজেকে সে একজন ‘মেইড’ ছাড়া কিছু ভাবে নি। তাছাড়া, আপনি তার পারিশ্রমিক নির্ধারণ করেন নি। সেটা অবশ্য ভাল করেন নি।এই মেয়েকে যদি তার পারিশ্রমিক হিসাবে কিছু দিতে চান, তাও আমি তার অনুমতি ছাড়া গ্রহণ করব না। আপনি একটু অপেক্ষা করুণ ইয়ুকির মতামত নিয়ে আপনাকে এই ব্যাপারে জানাব।”

ফুরুকাওয়া বললেন, “দয়াকরে আপনি তাকে জিজ্ঞাসা করে দেখেন। আমি অপেক্ষা করব।”

ইয়ুকি দু’তলায় তার বিছানায় অর্ধশায়ীত অবস্থায় গভীর ভাবে কি যেন ভাবছে। আকিহিরোর মা গিয়ে বললেন, “এখন তুমি ভাল বোধ করছ তো, মা!”

“হ্যাঁ, খালাম্মা, এখন আমি নিজেকে সুস্থ মনে করছি। আপনি কি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করবেন?” ইয়ুকি বিছানায় উঠে বসল। বাম হাতে বালিশটি টেনে কোলে রেখে ডান হাতে তার কপালের উপর ঝুলন্ত চূলগুলি সরাল। তার পরনে বাদামি রঙের জামা এবং সাদা পাজামা। তারপর বাম হাতের বেন্ডেজের দিকে এক নজর দেখে বলল, “বলুন খালা!”

“একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে আসলাম, “ফুরুকাওয়া এসেছেন টের পেয়েছ কি?”

“হ্যাঁ, তার গলার শব্দ আমি শুনেছি। তিনি কি বলেছেন?”

“তিনি তোমার পারিশ্রমিক এবং চিকিৎসা বাবদ কিছু টাকা দিতে চেয়েছেন। আমি অবশ্য বলেছি যে তোমার মতামত না নিয়ে টাকা নিব না।” কজিমা সান বিছানার পাশে রাখা কাঠের চেয়ারটিতে বসে বললেন।

“ওরে বাবা…,” ইয়ুকি মৃদু হাসল। তারপর বলল, “আমার নয় বৎসরের পারিশ্রমিক তো বড় অংকের টাকা হবে।এত টাকা আমি রাখব কোথায়!”

আকিহিরোর মা ইয়ুকির কপালে হাত রেখে জ্বর আছে কি না দেখে বললেন, “পাগলামি করো না, ইয়ুকি। এটা তোমার প্রাপ্য টাকা, নিবে না কেন?”

ইয়ুকি ব্যান্ডেজের উপর তার ডান হাতের আঙ্গুল রেখে বলল, “না, খালা এই টাকা আমি কিছুতেই নিব না!”

“কেন নিবে না, একটা কারণ তো বলতে হবে?”

ইয়ুকি কেঁদে ফেলল, “অপ্রাপ্ত বয়সে এসে দীর্ঘ নয় বৎসর তাঁর বাড়িতে কাজ করে প্রাপ্ত বয়স্কা হয়েছি। তারপর বুঝের হয়ে তার মারধরও খেলাম। এখন তিনি কি বুঝে আমাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করতে এসেছেন। যখন সাহায্য করার প্রয়োজন ছিল তখন তিনি আমাকে দাসী বানিয়ে রেখেছিলেন। রুমাল দিয়ে চোখের পানি মুছে ইয়ুকি বলল, “না, খালাম্মা, আমি কিছুতেই তার টাকা গ্রহণ করব না। আমি আবার নতুন করে স্বাধীন জীবন যাপন করব। প্রয়োজনে আমি ফ্যাকটরিতে কাজ করব। দয়াকরে তাকে বলে দিন যে কিছুতেই আমি তার টাকা নিব না। তবে ফুরুকাওয়ার স্ত্রীর কাছে আমার একটি টিনের কৌটা গচ্ছিত রেখেছিলাম। সেটা আমাকে মা দিয়েছিলেন। যদি সম্ভব হয় সেই কৌটাটি আমাকে ফেরত দিতে বলবেন!”

“কাজটা কি ভাল হবে, ইয়ুকি? এই টাকা তোমার প্রাপ্য টাকা, অবশ্যই তা তুমি জান।”

“খালা তা জানি। আমার গায়ে হাত তোলার প্রতিশোধ নিবার জন্য তার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করতে সে টাকা আমি নিব না সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাকে আমি বুঝাতে চাই যে সর্বহারা এতীম ইয়ুকির মনে কোন অর্থের লোভ নেই।তখন তো কিছুই বুঝতাম না, এখন আমি সব বুঝি। বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি না বুঝলেও সামাজিক রীতিনীতি মানুষের মন মানসিকতা বুঝি। এ কথা আমি সুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তা করে বললাম!” ইয়ুকি বালিশটি পূর্বস্থানে রেখে ডান হাতে তাতে চাপ দিয়ে বলল ইয়ুকি।

আকিহিরোর মা আর কথা না বাড়িয়ে নিচের তলায় গিয়ে ফুরুকাওয়াকে বললেন, দুঃখিত ফুরুকাওয়া সান।সে আপনার টাকা কিছুতেই গ্রহণ করবে না বলে দিয়েছে।

ফুরুকাওয়া উঠে দাঁড়ালেন।তারপর বললেন, আকিহিরোর মা, টাকাটা গোপনে আপনি গ্রহণ করুন। সে আপনার ছেলেকে ভালবাসে। সামনের দিনগুলিতে তার টাকার প্রয়োজন হবে। তখন আপনি আপনার টাকা বলে তাকে এই টাকা দিয়ে সাহায্য করবেন।

“না, ফুরুকাওয়া সান, তা সম্ভব নয়। এ টাকা গ্রহণ করে ইয়ুকির নিকট আমি ছোট হতে পারব না। আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন!”

ফুরুকাওয়া উঠে দাঁড়ালেন। কজিমা সানের দিকে একবার তাকিয়ে কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু কিছু ভেবে বিরত রইলেন। বিড়বিড় করে অস্ফুট স্বরে কি যেন বলে বের হয়ে গেলেন।

দরজার বাইরে গিয়ে এক মিনিট চিন্তাকরে আবার ঘরে প্রবেশ করে বললেন, “যে কোন প্রয়োজনে আপনি আমাকে খবর দিলে আসব!”

আকিহিরোর মা তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, “তার কোটাটি নিয়ে একবার আসবেন। আপনার স্ত্রীর নিকট তার একটি টিনের কৌটা গচ্ছিত আছে বলেছে!”

“তাই না কি? ঠিক আছে সেটি নিয়ে আবার আমি আসব। আওমরিতে বসন্ত কালেও শীত থাকে। ঘর থেকে বের হয়ে তিনি তার উইন্ড ব্রেকার লেদার কোটটি পরে ঘারের উপর কলার উঠিয়ে হাঁটতে লাগলেন।

আকিহিরোর রেজ়াল্ট আউট হয়েছে।আকিহিরোর মা উলের ছাই রঙের কোটটি পরে বের হয়ে গেলেন। পনের মিনিট পর ফিরে এসে কেক এনে সবাইকে খেতে দিলেন। রাতে সবাই একসঙ্গে সেই গানটি গাইল।

“ইয়ুকি ইয়া কন্‌কন্‌

আরারে ইয়া কন্‌কন্‌…”

ইয়ুকিও তাদের সাথে সুর মিলিয়ে সামান্য গাইল। তারপর দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে হাসল। তমহিরোক বলল, “ইয়ুকি আপা আপনি থামলেন কেন?”

ইয়ুকি আবার হাসল। বলল, “আমার নাম ‘ইয়ুকি’ তাই তোমরা এই গান গেয়েছ, তাই না? না, ভাই আমি এখন গাইব না। তোমরা বরং গেয়ে যাও!”

পরের দিন সকাল ন’টায় ফুরুকাওয়া এসে দোকানের পাশে রাখা চেয়ারে বসলেন। আকিরোর মা তাকে দেখে চা এনে দিল। ফুরুকাওয়া কিছু না বলে গ্রীন টী খেলেন। তারপর তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে ইয়ুকির কোয়টাটি বের করে দিলেন। দুতলায় ইয়ুকি একা। তমোহিরো স্কুলে গিয়েছে। আকিহিরো তার অফিসে।

আকিহিরোর মা কজিমা সান কৌটাটি নিয়ে পাশে রেখে ফুরুকাউয়াকে বললেন, “এটার ভিতরে কি আছে দেখেছেন?

“না, দেখিনি!” আপনি দেখতে পারেন।

কজিমা সান বললেন, “এটা আমি এখন খুলব না। ইয়ুকির সামনে খুলব।”

ফুরুকাউয়া আরেকটি পুঁটলি কজিমা সানের হাতে দিয়ে বললেন, “এটাও তার!”

কজিমা সান অবাক হয়ে ফুরুকাওয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এটা আবার কি? ইয়ুকি শুধু কৌটার কথা বলেছে!”

তারা যখন কথা বলছে ইয়ুকি দুতলায় ফ্লোর ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে বারান্দায় লেপ তোষক রৌদ্রে শুকাতে দিল। সে ফুরুকাওয়ার কন্ঠ শুনেও কোন আগ্রহ প্রকাশ করল না। কিচেনে ঢুকে ধোয়া-মোছার কাজে মনোনিবেশ করল।

কজিমা সান পুঁটলিতে কি আছে জানতে চাইলেন।

ফুরুকাওয়া বললেন, “এতে ইয়ুকির মাসিক বেতনের টাকা হিসাব করে একত্রে দিলাম। হয়তো এই টাকা তার ভবিষ্যতে অনেক কাজে লাগবে। তাকে আমার মেয়ে করতে চেয়েছিলাম এবং বিয়ে দিয়ে ঘর জামাই এনে বৃদ্ধ বয়সে একটু বিশ্রাম নিব ভেবেছিলাম।” এ পর্যন্ত বলে ফুরুকাউয়া রুমাল বের করে চোখের পানি মুছলেন!”

কজিমা সান তার কথা শুনে চুপ করে রইলেন। তিনি বুঝতে পাড়লেন ফুরুকাওয়া ইয়ুকির ব্যাপারে অনুতপ্ত।

ফুরুকাওয়া আবার বললেন, “হ্যাঁ, মানুষ অনেক ভুল করে। প্রত্যেক মানুষ জীবনে অনেক ভুল করে সংশোধিত হয়। সে ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। আমি যে ভুল করেছি – তার সংশোধন সম্ভব নয়। অনেক দেরি হয়ে গেছে। সে যাই হোক, আপনি দয়াকরে টাকাটা রাখুন। ইয়ুকিকে বুঝিয়ে তার পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে বলবেন। এটা তার প্রাপ্য।”

প্রতি উত্তরে কজিমা সান কিছু বললেন না। তিনি ভাবছেন ইয়ুকি আদৌ এটাকা গ্রহণ করবে কি না।

হাতের ডান দিকে জানালা। ফুরুকাওয়া জানালার দিকে চেয়ে আছেন। বাইরে বসন্তের হাওয়ার প্রবাহ। অনেক চেরী গাছ দেখা যাচ্ছে। আওমরিতে এপ্রিলের শেষার্ধে চেরী ফুল ফুটে। এখন নিস্পত্র গাছগুলির ডালার মাথার দিক কিছুটা ফুলে রয়েছে। সামান্য উষ্ণ হাওয়া প্রবাহিত হলেই চেরীর ডালাতে প্রথমে হালকা পিংক বর্ণের ফুল ফুটবে। সে চেরী ফুলের উজ্জ্বলতায় জাপানের রূপ বদলে যাবে। তারপর প্রচন্ড শীতে যে সকল পাখি দক্ষিণের উষ্ণ অঞ্চলে চলে গেছে – সেগুলি আবার ঝাকে ঝাকে ফিরে আসবে। এতক্ষণ যাবত কজিমা এবং ফুরুকাওয়ার মধ্যে কোন কথা হয়নি। এবার কথা বললেন কজিমা সান, “আপনি তো জানেন যে ইয়ুকি বদরাগি মেয়ে। উপরে গিয়ে তার মতামত জেনে আসি!”

তিনি যখন কাঠের সিড়ির কাছে গেলেন তখন পিছন থেকে একজন ডাক দিলেন, “কজিমা সান শুনুন!”

পিছনে ফিরে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলেন কুবো সান একটি গিফ্‌ট প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।

“কি ব্যাপার কবো সান। হঠাৎ আপনি…?

কথা শেষ হওয়ার আগেই কবো সান তার হাতের প্যাকেটটি কজিমার হাতে দিয়ে বললেন, “ইয়ুকিকে এটি দিবেন। আমি তাকে সিল্কের একটি ‘কিমনো’ দিলাম। হয়তো অচিরে আপনার ছেলের সাথে তার বিয়ে হবে। বিয়ের দিন এটা সে পরবে!”

কজিমা সেটা গ্রহণ করে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন, “আপনি আগাম এমন ভাবলেন কেমনে কুবো সান? আমিতো এখনো ইয়ুকির মতিগতি বুঝতে পারছি না। বিয়ে হবে কি হবে না তা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। আমি আকিহিরোর মা, তাদের সিদ্ধান্তে বাধা দিব না!”

কবো সান পিছনে তাকিয়ে দেখলেন ফুরুকাওয়া বসে আছেন। তাকে দেখে চমকে উঠলেন তিনি। তারপর বললেন, “আরে, ফুরুকাওয়া তুমি এখানে?”

ফুরুকাওয়া শুষ্ক কন্ঠে বললেন, “কিছুক্ষণ হল এসেছি!”

কুবো সান আরেকটি কাঠের চেয়ার টেনে ফুরুকাওয়ার সামনে বসে বললেন, “কেমন আছ?”

এমন সময় কজিমা সান বললেন, “আপনারা কথা বলুন, “আমি উপর তলায় গিয়ে ইয়ুকির সাথে কথা বলে আসি।”

ফুরুকাওয়া কুবোর প্রশ্নের উত্তর দিলেন না।দুপায়ের হাঁটুতে হাত রেখে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

কুবো সান আবার বললেন, “কি ব্যাপার ফুরুকাওয়া? এসব কিছু দেখে মনে হচ্ছে বড় জটিল নাটক হচ্ছে!”

এবার কুবো সানের দিকে তাকালেন ফুরুকাওয়া। হাত দিয়ে কোটের বোতাম খুলতে খুলতে বললেন, “হ্যাঁ, সব কিছু নাটকের মতোই মনে হচ্ছে। সে নাটকের বিশেষ ভূমিকাতে আমিও একজন রয়েছি। ভাগ্যের পরিহাস বটে! তিনি কোটটি ভাজ করে ওয়ালের হ্যাঙ্গারে রেখে নিজের চেয়ারে বসে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটের ফাঁকে রেখে দিয়াশলাই দিয়ে আগুন দিয়ে ধূমপান করতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পরে চা নিয়ে নেমে আসলেন কজিমা সান আর ইয়ুকি। টাকার পুটলিটি ফুরুকাওয়াকে ফেরত দিয়ে বললেন, “ইয়ুকি টাকা নিবে না বলেছে!”

ফুরুকাওয়া ইয়ুকির দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। ইয়ুকি ঠোঁট চেপে কোণাকোণি ভাবে দাঁড়িয়ে ওয়ালের দিকে চেয়ে রইল। তার চেহারা দেখে কুবো সান এবং ফুরুকাওয়া উভয়ে বুঝতে পাড়লেন যে ইয়ুকি কিছু বলতে এসেছে। কিন্তু প্রথমে সে কিছু বলল না।

কথা বললেন ফুরুকাওয়া। তিনি ছাইদানিতে সিগারেটটি নিবিয়ে রেখে বললেন, “এটা তোমার প্রাপ্য টাকা ইয়ুকি!”

ইয়ুকির ঠোঁট দুবার নড়ল। কিন্তু কোন কথা বের হল না। তার পরনে স্কার্ট ও লাল সোয়েটার।মাথার লম্বা চূল কাল রিবনে বাধা। তৃতীয়বার শুধু ঠোট নড়ল না, স্পষ্ট কথা বলল ইয়ুকি, “ এটা আমার প্রাপ্য টাকা বলছেন। আগেতো বলেন নি যে আমি টাকা পাওনা আছি! বলেছেন যে এটা আমার প্রাপ্য টাকা কোন হিসাবে টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করলেন?” এতটুকু বলে ইয়ুকি থামল, ফুরুকাওয়া, কুবো সান এবং মিসেস কজিমা চুপ করে রইলেন। পুনরায় কথা বলল ইয়ুকি, “এটা আমার প্রাপ্য টাকা নয়। আপনি দয়াকরে আমাকে দিতে চাচ্ছেন। এ টাকা আমি নিব না!”

এবার কথা বললেন কুবো সান, “তুমি টাকাটা নাও ইয়ুকি। তুমি তো অনেক বছর ফুরুকাওয়ার বাড়িতে কাজ করেছ। আমিও মনে করি এটা তোমার প্রাপ্য টাকা।”

ইয়ুকি রেগে বলল, “তিনি আমাকে কত করে বেতন দিবেন তা নির্ধারণ করেন নি। হ্যাঁ, আমি তার নিকট কৃতজ্ঞ যে আমার প্রয়োজনীয় জামাকাপড় দিয়েছেন। খাবার দিয়েছেন। তার বাড়িতে কাজ না পেলে আমার কি যে হতো ভাবতেও পারি না। তার নিকট বড় কৃতজ্ঞ আমি। কিন্তু টাকা নিব না। তার নিকট থেকে বড় হয়েছি ঠিক – তার টাকা নিব কেন?”

“তিনি তোমাকে সন্তান ভাবতেন। তাকে এমন ভাবে অবহেলা করাটা খারাপ দেখায় ইয়ুকি!” কুবো সান বললেন।

“কি যে বলেন আপনি!” হাসল ইয়ুকি। তারপর বলল, “কয়েক মাস পূর্ব থেকে তিনি আমাকে সন্তান ভাবছেন। কিন্তু আমার জীবনের সকল স্বপ্ন তিনি নষ্ট করে দিলেন। একটি এতিম আমি। আমাকে তিনি প্রথম থেকেই সন্তান করতে পারতেন। তাহলে আমি স্কুলে লেখাপড়া করতে পারতাম। আমি তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছি। আমি লেখাপড়া করে তার সন্তান হলে কোন আপত্তি ছিল না। কিন্তু ফুরুকাওয়া আমাকে হাউজ মেইড ছাড়া কিছু ভাবতেন না।তিনি কোনদিন জিজ্ঞাসাও করে জানতেও চান নি আমার পিতামাতার কথা। আমার দুঃখের কথা। আমার এতিম হওয়ার কাহিনী। (চলবে)

আগের পর্বঃ

ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম (পর্ব-০৮)

আরশাদ উল্লাহ্‌ জাপান প্রবাসী লেখক।

আরও পড়ুন