আমি নসিমনঃ এইচ বি রিতা

আমি নসিমনঃ এইচ বি রিতা

পর্ব-০৭
চেতনা ।
পথে হেঁটে যাওয়া পথিক যেতে যেতে ছুঁয়ে দেখে বৃক্ষরাজি, সবুজের সমারোহে কচি পত্র-পল্লব। রং মিশিয়ে প্রকৃতির সাথে খোঁপায়গুঁজে দেয় গোলাপ ফুল। চিত্তাকর্ষণে মুগ্ধতা নিয়ে জেনে নেয় জীবন বড় সুন্দর; বেঁচে থাকা প্রাপ্তির অভিলাষ। একই পথে হেঁটে যাওয়া ভিন্ন পথিক, খুঁটিয়ে দেখে জীবনের বৈরীতা। ছুঁয়ে দেখে ঝরে পড়া পাতা কেমন বিরহ শোকে বিছিয়ে থাকে বৃক্ষতল জমিনে।ফুল ছিঁড়ার বাসনা নয়, কাঁটাসমেত ঢালটি স্পর্শের ভয় তাকে ঘিরে থাকে অনন্তকাল।
একই পথে বহুবার দৃশ্যমান প্রেক্ষাপট বদলে যায় ব্যক্তি ও ক্ষেত্র বিশেষে। এ কেবল অবলোকিত দৃষ্টিশক্তির ভিন্নতা নয়; এ এক পূর্বলব্ধ জ্ঞানের সমষ্টিগত পরিণাম যা অস্বীকার করার উপায় মানবকুলের জানা নেই। অনন্ত রাত্রিকে বুকে পুষে ভোরের আলোকে দেখেছে?

ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদে জল পতনের শব্দে যখন জেগে উঠি, মনে পড়ে দাদীমার কথা! দেশের সমগ্র শহর এলাকায় আধুনিকতার ছোঁয়া তথা গ্যাস, ই-ইটার, বন্ধু চুলা ইত্যাদি বিলাস বহুল জ্বালানী উপকরণ থাকলেও গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেই সুবিধাগুলো তখনো পৌছেনি। রান্নায় জ্বালানী কাজে দাদীমা ব্যবহার করতেন গৈ-লাঠি। আমাদের ছিল মাটির ঘর-বাড়ী। গোবরজলে ঘর-উঠোন লেপার কাজটিও তিনি খুব যত্ন সহকারে করতেন। লেপার কালে প্রায়ই আমি নাক চেপে দূরে বসে দেখতাম। দাদীমা লক্ষ্য করতেন। একদিন দাদীমাকে বললাম, ‘দাদীমা! এই বাড়ীতে ফেরেশতা আসবেনা কোনদিন। এই ঘর, এই উঠান, রান্নাঘর… সব নাপাক।’ দাদীমা লেপন রেখে আমাকে দেখলেন। তারপর বললেন, ‘শোন নসিমন! পেটে ক্ষিদে নিয়ে উপাসনা হয় না।’
জীবনকে তখন দেখেছি কেবল ভিন্নতা নিয়ে উপস্থিত হতে। আজ সেই উপস্থিতির কারণ ও দর্শন টের পাই। আজ বুঝে যাই, দাদীমা কি বলতে চেয়েছিলেন।

ঝড়ের দাপটে যে পাখী নীড়হারা, সে কি সামান্য বাতাস সইতে পারে? চিত্ত বিগলিত রুগ্ন শোকাহত মানুষ, মৃত্যু স্মরণে ভীত হবেনা, তা কি হয়? জীবনকে যে জেনেছে খুব কাছ থেকে, জীবনের রুঢ়তায় হাঁটুজল কাদামাটি যে চেখে দেখেছে, সেই বুঝে স্বাদেরভিন্নতা। সেই জানে স্বাদ নিতে কেবল ইচ্ছে শক্তিই যথেষ্ট নয়, জিহ্বার সুস্থ্যতাও প্রয়োজন। ঘুম ঘুম নিবিড় আলাপনে যার স্বপ্নময়ভোরের শুরু, সে জানেনা দুঃস্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে মধ্যরাতের আকাশ কেমন ফুপিয়ে কাঁদে।
আবেগ দ্বারা সৃষ্ট কল্পনা, প্রতীক, সত্যের সমন্বয়ে চেতনার উদ্ভব। চিত্ত যা ভাবে তাই চেতনা। অভাবী চিত্তের বৈরীতায় বিক্ষিপ্তচেতনাদ্বয়ের উদ্ভব হয়। সেই বিক্ষিপ্ত চেতনাদ্বয় কেমন বৈরী স্বভাবে জীবননকে খুচিয়ে যায় তা মূলত দৃশ্যত। অদৃশ্য অন্তরালে যা, তা কেবলই সত্য শ্বাশত। একই পথে তুমি-আমি। গোলাপ দেখে তুমি উল্লাসিত বিগলিত প্রাণে ছুঁয়ে দেখো প্রস্ফুটিত রং।
কাঁটার সূক্ষ্ণাগ্র অবলোকনে ভীত আমি ছুটি সম্মূখপানে।

পর্ব-০৮.
প্রভেদ ।
ভিন্নতা দ্বারা অন্ধ হয়ে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে আমরা সবাই উপাদান ও উপকরণে একই। আমাদের মানগত বৈশিষ্ট ভিন্ন হতেপারে, ব্যক্তিবোধ ও নীতিবোধ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মূল কথা যা, তা হল- টিকে থাকার জন্য, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যআমরা সবাই যুদ্ধ করি।
সে যুদ্ধে প্রায়শই নৈতিকতা ও মানবতা ধরাশায়ী হয় বিবেকের কাছে। নিজেকে টিকিয়ে রাখার যুদ্ধে ভেদাভেদ টানি ধর্মে, ভেদাভেদটানি শ্রেণিতে, পার্থক্য নির্ণয় করি মানুষে মানুষে।
অথচ পার্থক্য নির্ণয়কালে আমরা ভুলে যাই জন্ম নেয়ার সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে- লাভ ও ক্ষতির অভিজ্ঞতা মোকাবিলা করা। যদিজন্মের পর চিরসত্য বলে কিছু থেকে থাকে, তবে তা হল, যতই ভিন্নতায় আমরা নিজেদের জীবন কাটাই না কেন, একদিনহারানোর অভিজ্ঞতা আমাদের হ্নদয়কে ব্যথীত করবেই। কিংবা নিজেরাই হয়তো অন্যদের সে অভিজ্ঞতা দিয়ে হারিয়ে যাবো।
আমরা লক্ষ্য করিনা কিভাবে প্রতিটি অনুকনা পরিচালিত হয়। লক্ষ্য করিনা কিভাবে আমরা শুধু একটি নির্দিষ্ট যাত্রা থেকেপৃথিবীতে এসেছি। আমরা লক্ষ্য করিনা কিভাবে রাতের আঁধারে সূর্যরশ্মি অদৃশ্য হয়ে যায়! আমরা ছুটি পৃথকীকরণে, আমরা দেখি পার্থক্য; বুঝি মানুষে মানুষে বিভেদ।

বাবা বলতেন,
“নদীরে তোর ভাটা দেখে আমার লাগে ভয়
কবে যানি তোর মত আমার একি দশা হয়।”

আমার বাবা ছিল অদৃশ্য এক জ্ঞানশক্তি যিনি জীবন ও যাপনকে মিলাতে কখনো ভুল করেননি। আমি বাবার মত জ্ঞানী নই।আমি পৃথিবীর জমিনে হেঁটে বেড়ানো ক্ষুদ্র এক পিপীলিকা। সবুজের গায়ে দানা দানা ভোরের শিশিরে হুটহাট মিলিয়ে যাই। বাবাখুঁজতেন বেঁচে থাকার মানে। আমি খুঁজি সংকটপূর্ণ ঘোর অন্ধকারে বিপন্ন আত্মায় স্মৃতিচিহ্ন! জীবনভর বেঁচে থাকার লড়াইয়েজীবনের মানে খুঁজে যাওয়াই আমাদের আরেক লড়াই। সেই লড়াইয়ে আমরা ভুলে যাই পৃথিবীতে অবিনশ্বর বলে কিছু নেই, সুখ-দুঃখের কোন অনুভূতি নেই।

লড়াইয়ের আরেক নাম স্টিফেন উইলিয়াম হকিং, মহাবিশ্বের দুর্বোধ্যতার সাথে সাপলুডো খেলে যাওয়া অবিশ্বাস্য বিজ্ঞানী যিনিপড়া ফেলে বেপরোয়াভাবে নৌকো বাইতে ভালবাসতো একদিন, তিনি বোধহয় কখনও ভাবেনিননি যে তার জীবনের শেষ দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে তিনি শুধু নিশ্চুপ বসে মহাবিশ্বের সাথে কথা বলবেন নিজ মনে। হুইলচেয়ারে বসে অসাড় দেহ আর অসীম মেধানিয়ে শুকিয়ে আসা স্নায়ু আর পেশিকে অগ্রাহ্য করে নিঃশব্দ কল্পনার সাহচর্যে তিনিও লড়েছিলেন অমোঘ সব গবেষণাপত্র আরগ্রন্থাবলী পৃথিবীকে উপহার দিতে। টিকে থাকার লড়াই কাকে বাদ রাখে তবে?
কিছুই রবে না একদিন জেনেও কি ভয়াবহ মোহে অন্ধকারে ডুবে যাই আমরা। অস্তিত্ব রক্ষায় শ্রেণি বিভেদ, ধর্মান্ধতা, মানবিকতা ও নৈতিকতাবোধ নিষ্পেষিত করে মানুষে মানুষে ব্যবধান খুঁজি। খেঁটে খাওয়া দিন মজুর থেকে শুরু করে যে শিশুটি পথের ধারে ইটভেঙ্গে জলশূন্য চোখে আকাশকে দেখে, কিংবা যে নারী রাতের আঁধারে বসনহীন শুয়ে পড়ে কারো লোমশ উন্মূক্ত বুকে, সেওজীবন ও যাপনের সন্ধিক্ষনে টিকে থাকার জন্যই লড়ে। স্টিফেন উইলিয়াম হকিংয়ের সাথে তাদের পার্থক্য শুধু অবস্থানগত।উদ্দেশ্যগতভাবে আমি-আমরা-ওরা সকলেই এক লড়াইয়ে নিমজ্জিত।

লেখিকা -এইচ বি রিতা
পেশায় শিক্ষক হলেও কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও সমাজকর্মী হিসেবে সমাদৃত । প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার নিয়মিত লেখিকা তিনি, সোস্যাল মিডিয়াতে লেখিকা তিনি ডার্ক এভিল নামে পরিচিত ।

আরও পড়ুন