হাত বাড়ালেই গল্প হয় সত্যি

খাদিজা ইয়াসমীন

স্কুলের ছুটির ঘন্টা বাজতেই সব ছাত্ররা হই হুল্লোর করে বেরিয়ে পড়লো, বন্ধুরা মজা করতে করতে বাড়ি যাচ্ছে। তারিক, জিসান, রাসেল ওরা তিন বন্ধু, ক্লাসের সেরা তিন ছাত্র। বেলকুচি উপজেলার এস কে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ে। জিসান আর রাসেলের বাবা ব্যাবসায়িক পার্টনার ও এলাকার ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। ওদের বাড়ি পাশাপাশি এবং জিসান ও রাসেল ছোট থেকে একই সাথে বেড়ে উঠেছে।
ওদের মায়েরাও শিক্ষিত ও চাকুরীজীবি। একটা পারিবারিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দুই পরিবারে।

তারিক পড়তো গ্রামের একটা স্কুলে। পঞ্চম শ্রেনীর সমাপনীতে ভালো রেজাল্ট করে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয় এস কে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে , এখানে সব ভালো ছাত্ররা পড়ে এবং কম্পিটিশন চলে বেশ। পারিবারিক অবস্থা সচ্ছল নাহলেও তারিকের মায়ের এক অদম্য স্বপ্ন ছেলেকে সৎ ও যোগ্য মানুষ করে তুলবে। তাই কষ্ট হলেও ছেলেকে একটা ভালো স্কুলে দিয়েছে। তারিকের বাবা একজন সবজি বিক্রেতা, দিন এনে দিন খেতে হয় এমন অবস্থা। আর্থিক অবস্থা খারাপ হলেও তারা মোটামুটি শিক্ষিত। কাজের বড়ত্বকে মূখ্য না, হালাল রিজক এটাই তাদের কাছে মূখ্য বিষয়।তারা যথেষ্ট আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষ এবং সন্তানের মধ্যেও সেগুলো অনুপ্রবেশ হচ্ছে বোঝা যায়। তারিক মায়ের ইচ্ছা পূরণে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে তারিক ক্লাস সেভেনে তৃতীয় স্থান করে নেয়।

জিসান ক্লাসে ফার্স্ট বয়, রাসেল দ্বিতীয়। প্রথম দিকে ওরা তারিক কে ওতটা গুরুত্ব দিতনা, ওদের সাথে স্ট্যাটাস মেলেনা বলে ক্লাসে যতই ভালো করুক ঠিক মত কথা বলতো না। কিন্তু ক্লাস সেভেনে প্লেস করায় ধীরে ধীরে ওদের মধ্যে মোটামুটি একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে। তারিকের ব্যাসিক মেধা ওদের থেকে ভালো, কোন প্রাইভেট টিউশন ছাড়া শুধু ক্লাস করে। আর অন্যদিকে জিসান ও রাসেল বাসায় টিউটর রেখে পড়ে।

জিসান ও রাসেল মাঝে মাঝে তারিক কে নিয়ে খুব হাসে আর খোঁচাখুঁচি করে। তারিক ওর মায়ের কাছে যা শেখে সেগুলো ওদের বলে বা শেখাতে চায়। এটা নিয়েই ওরা শ্লেষের হাসি হাসে। তারিক নিয়মিত কুরআন ও নামাজ পড়ে। জিসান ও রাসেলকে একদিন জিজ্ঞেস করে যে ওরা কুরআন পড়ে কিনা, নামাজ পড়ে কিনা?
ওরা জানায় সময় পায়না। ক্লাস টু থ্রিতে বাসায় হুজুর রেখে কিছুদিন শিখেছে কিন্তু পড়াশোনার চাপ থাকায় ওতটা সময় দিতে পারেনি। নামাজ পড়া যায় এমন কিছু সূরা শিখেছে কিন্তু ওই যে সময় পায়না বলে নামাজও পড়া হয়না। তারিকের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো।তারিক তার মায়ের কাছে শোনা কিছু কথা ওদের বলে -কুরআন মুসলমানদের পড়তে হয়, এটাই পথনির্দেশক, কুরআনেই লেখা আছে জীবন কিভাবে পরিচালিত করতে হয়। আর তোরা কি জানিস? ৭ বছর থেকে নামাজ শুরু করতে হয় আর ১০ বছর বয়স থেকে নামাজ ফরজ হয়ে যায়। তারিক আরো বলে আমি একটি হাদিস বইয়ে পড়েছি -“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর হলে তাদের সালাতের নির্দেশ দাও, তাদের বয়স দশ বছর হলে এ জন্য তাদের প্রহার করো এবং তাদের পরস্পরে বিছানা পৃথক করে দাও।’ [আবূ দাউদ : ৪৯৫; মুসনাদ আহমদ : ৬৬৮৯]
আমাদের বয়স এখন ১২ বছর, নামাজ আমাদের উপর ফরজ হয়েছে। দেখ দুনিয়ার জীবনের পরে আরেকটা জীবন আছে, সেই জীবনের জন্য নামাজ, রোজা করতে হয়।
জিসান আর রাসেল ওতটা পাত্তাই দিলোনা, একাডেমিক পড়া নিয়ে যতটা কনসার্ণ এ ব্যাপারে ততটাই উদাসীন ওরা। মূলত, তারিক স্টুডেন্ট ভালো বলে ওদের সাথে একটা বন্ধুত্ব হয়েছে, বাকি অন্যদিকে মেলেনা ওদের সাথে। তারিক ওর মায়ের কাছে যা শেখে সেগুলো ক্লাসে সবাইকে জানানোর চেষ্টা করে। ভালো কাজে বলা ও খারাপ কাজে না করা নাকি মুসলমানদের দায়িত্ব মায়ের কাছে জেনেছে। তারিক একদিন কুরআনেও পড়েছে এ ব্যাপারে
– “মুসলমানদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত,যারা মানুষকে সৎ কাজের আহ্বান জানাবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে। এরাই হলো সফলকাম।” (আল ইমরানঃ ১০৪)

তাই ক্লাসে কেউ কাউকে ছোট করলে, টিটকারি করলে, শিক্ষকদের সাথে বেয়াদবি করলে, কাউকে পড়ায় হেল্প না করলে তারিক সবাইকে বোঝায় এগুলো ঠিক না। মানুষ মানুষকে সাহায্য করবে এটাই স্বাভাবিকতা।

শীত চলে এসেছে ওরাও ক্লাস সেভেন থেকে এইটে ক্লাস শুরু করে দিয়েছে। জিসান আর রাসেল তারিকের সাথে মিশে মিশে এখন নামাজ পড়ার চেষ্টা করে। আগের মত ক্লাসে কাউকে ছোট করে কথা বলেনা।শিক্ষকদের বিরক্ত করেনা। ওদের অংক শিক্ষক মাহবুব উদ্দিন একদিন ক্লাসে শীতে মানুষের কষ্ট নিয়ে বলছিলো। এই যে তোমরা কত সুন্দর সুন্দর শীতের কাপড় পড়ছো, বুঝতেই পারছোনা শীতের কষ্ট কি!! তোমাদের কাছে শীত একটা উৎসবের মত। কিন্তু যাদের সোয়েটার নেই, পাতলা একটা জামাও হয়তো ম্যানেজ হয়না অনেকের, রাতে ঘুমানোর কম্বল নেই তাদের কাছে শীত মৃত্যুতুল্য। এবং এই শীতে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
এখন তোমরা বলো এদের জন্য সমাধান কি?
তারিক দাঁড়িয়ে বলতে লাগলো- স্যার আমরা স্কুলের প্রত্যেক স্টুডেন্ট যাদের সাম্যর্থ আছে তারা যদি একটু একটু করে কিছু অর্থ দেই এবং আমরা স্টুডেন্টরা মিলে গ্রুপ গ্রুপ করে নিজেদের আশেপাশে সাম্যর্থবান প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের কাছ থেকে কালেকশন করি তাহলে কিছু দুস্থদের আমরা সাহায্য করতে পারবো।
অংক স্যার তারিকের প্রশংসা করে বললো সাব্বাস বেটা! এই ছোট বয়স থেকেই মনটাকে উদার করতে হবে তোমাদের, তাহলে সমাজ অনেক উপকৃত হবে। সুনাগরিক হয়ে গড়ে উঠতে হবে, দেশকে ভালোবাসতে হবে, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে। শিক্ষা হতে হবে এমন শুধু নিজে ভালো থাকবোনা সবাইকে নিয়ে ভালো থাকবো। পুরা দেশকে সুস্থ ও ভালো রাখবো। স্যার আরো বললো তোমরা যদি অল্প পরিসরে কিছু করতে চাও তো ক্লাসে সবাই আলোচনা করে ঠিক করো, আমি তোমাদের পাশে থাকবো। এবং অন্যান্য শিক্ষদের সাথে আলোচনা করে স্কুলের পক্ষ থেকেই কাজ করবো।

তারিক, জিসান আর রাসেলকে প্রথমে ধরলো ওরা ওতটা আগ্রহ দেখাচ্ছিলোনা, খুব বুঝালো মানুষের জন্য কাজ করা কতটা সওয়াবের, যেখানে একটা মুচকি হাসি সাদকাহ হয়, সেখানে মানুষকে শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচানোর কাজে আল্লাহ অনেক খুশি হবে। দেখবি রেজাল্ট আরো ভালো হবে। আর মুসলিম হিসেবে এটা আমাদের দায়িত্ব ভাই!

একটা হাদিস বলি শোন-
“হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে যায়।’” (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি)।
জিসান আর রাসেল এবার রাজি হলো -ওরা তিনজন মিলে ক্লাসের সবাইকে রাজি করিয়ে নিলো, তারিক আরো বললো যারা কিছু দিতে পারবেনা তারা কাজ করে সাহায্য করবে। এটাও কোন অংশে কম না এবং লজ্জারও না।

তারিকরা সবাই মাহবুব স্যারের সাথে দেখা করলো, মাহবুব স্যার প্রধান শিক্ষকসহ অন্যদের সাথে আগেই কথা বলেছিলো। প্রধান শিক্ষক ওদের বাহবা জানালো। ওরা প্রথমে পুরা স্কুলে ক্যাম্পেইন করলো। প্রতিবেশি ও আত্মীয় স্বজনদের কাছে গিয়েই বাধলো ঝামেলা, জিসান আর রাসেলের বাবা রেগে গেলো, ওদের এ কাজ করতেই দিবেনা। তাদের একটা প্রেস্টিজ আছে, তাদের ছেলেরা মানুষের কাছে চেয়ে বেড়াবে তা হয়না। জিসান ও রাসেল তাদের বাবা মায়েদের অনেক কষ্টে বুঝিয়ে রাজি করালো। ওরা পূর্ণউদ্দোমে কাজ করলো, এ নিয়ে কিছু লোক হাসি ঠাট্টাও করলো, তারিক আগেই ওদের এসব বলে রেখেছিলো যে ভালো কাজ করতে গেলে কিছু বাধা আসে সেগুলো পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। আমাদের নবী মুহাম্মদ (সঃ) তার কাজে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন,তিনি ধৈর্য্য ধরে কাজ করেই গেছেন শুধু মাত্র মানুষের জন্য।

কালেকশন শেষে স্যারদের পরামর্শক্রমে ওরা গ্রুপে গ্রুপে এলাকায় লিস্ট করতে নেমে পড়লো, যাতে সত্যিকারের দুস্থ ব্যক্তিকে শীতবস্ত্র তুলে দিতে পারে। স্যারেরা কম্বল ও বাচ্চা ও বৃদ্ধদের জন্য সোয়েটার কেনার বন্দোবস্ত করলো। খুশির ব্যাপার হলো
প্রথমে জিসানের বাবা একটা বড় এমাউন্ট কন্ট্রিবিউট করলো, পরে রাসেলের বাবাও। যার ফলে আয়োজনটা জমে উঠলো।

সমস্ত কাজ শেষে কাঙ্গক্ষিত দিনে শীতবস্ত্র প্রদানের কাজ শুরু হলো, স্কুলের ছাত্ররা ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব পালন করলো। যাতে বিশৃংখলা না হয়। এলাকার কিছু গন্যমান্য ব্যক্তি ছেলেদের এ কাজকে খুব এপ্রেশিয়েট করলো, প্রধান শিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকরা তাদের বক্তব্যে সব বাবা মায়ের প্রতি আহবান রাখলো যে সন্তানকে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি মোরাল শিক্ষাটাও যেন তারা দেয়। স্কুল ও পরিবার দুটোই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখান থেকেই সন্তানেরা সু শিক্ষা পেয়ে থাকে। তারিক, জিসান, রাসেলের অনেক প্রশংসা করলো শিক্ষকেরা। অন্যান্য ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললো ওদের মত ভাবতে শেখো যাতে মানুষের কল্যাণ হয়।মানব সেবাই পারে মানবতাকে মুক্তি দিতে। জিসান ও রাসেলের বাবা মায়েরাও উপস্থিত ছিলো সেখানে।

পরদিন সকালে আঞ্চলিক এক পত্রিকায় তারিকদের কাজ ছাপা হয়েছে দেখে সবাই খুব খুশি হলো। জিসান ও রাসেলের বাবা মায়েরা আরো বেশি খুশি হলো তাদের ছেলেদের কৃতিত্ব প্রকাশ পেয়েছে বলে। তারিকের মা বাবাও খুব খুশি হলো এবং ওদের জন্য দিল ভরে দোয়া করলো তাদের সন্তান এরকমই মানুষের জন্য যেন আজীবন কাজ করে, সৎ কাজে মানুষকে ডাকে। সৎ ও যোগ্য সন্তান তাদের একমাত্র কাম্য যার মাধ্যমে তাদের দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ সাধিত হবে।

আরও পড়ুন