নায়রি (পর্ব-০১)

ফারহানা শরমীন জেনী

হঠাৎ নায়রি— নায়রি— বলে একটা চিৎকার শুনে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেল তৃণার।এর আগেও প্রথম যেদিন এ গ্রামে আসে সেদিনও এই শব্দটা সে অনেক ক্ষীণ কন্ঠে শুনেছে। কিন্তু এতটা আমলে নেয়নি। কিন্তু আজ কেন যেন খুব অস্থির লাগছে। সাথেই বাদুড়ের একটানা পাখা ঝাপ্টানোর শব্দ আর রাত চড়া পাখিদের হঠাৎ হঠাৎ ডেকে ওঠা যেন রাতের নিঃস্তব্ধতার ছেদ ঘটাচ্ছে। একটু ভয় ভয়ও করতে লাগলো তৃণার নতুন পরিবেশে।আর নায়রি ডাকটাও কেন যেন তার ভেতরটায় একটা বিষন্নতা ছুঁয়ে দিয়ে গেল।

নতুন এলাকায় এসেছে তৃণা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা হয়ে। প্রথম পোস্টিং, বাবা সাথে এসেছিলেন। প্রথম দুদিন থেকে এক মহিলা  সহকর্মী আন্জু আপার বাসার একটা ঘরে সাবলেট ঠিকঠাক করে বাবা চলে গিয়েছেন।আন্জু আপা স্কুলের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষিকা। তার বাবা ছিলেন একসময় শ্যামপুর প্রাইমারী স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক।  যদিও রাজশাহী থেকে খুব দূরে নয় তবুও ঘরটা ভাড়া নিল তৃণা। কারণ এখানে যাতায়াতটা খুব সুবিধার নয়।

চর শ্যামপুর নদীঘাটে নৌকায় চড়ে মাঝনদীতে জেগে ওঠা চরে এই স্কুল, গুচ্ছ গ্রামের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে। প্রথম দুদিন কাটলো বেশ ব্যাস্ততায়। যে কারণে শোয়া মাত্র ঘুম চলে আসতো। বাবা চলে যাওয়ার পর নতুন জায়গা বলে কিনা সহজে ঘুম আসতে চায়না।  আর চরটা এমন চারিদিকে নদী মাঝে সরকার প্রদত্ত একশ ঘর নিয়ে একটা গ্রাম। একটা ত্রিতল ভবন প্রাইমারি স্কুলের আর একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স তার সাথে ছোট্ট একটা পুলিশ ফাঁড়ি। তবে তৃণা অবশ্য থাকে নদীর পাড় ঘেঁসে গড়ে ওঠা পানি শোধনাগারের পাশে যে বসতি সেখানে। সেখানে তার সহকর্মী আন্জু আপার পৈতৃকনিবাসে। রাতে এক ঝিঁঝিঁপোকার ডাক,শিয়াল কুকুরের ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যায়না।

বাবা চলে যাওয়ার পর একা ঘরে ঘুমাতে বেশ একটা ভয় ভয় লাগে।  ঘুম আসতেও বেশ দেরি হয়। নেটওয়ার্ক ভালো না পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটানো বেশ দুরূহ। কয়েক দিনের মাথায় একদিন রাতে আকাশে ভারী হয়ে মেঘ নামলো। চোখটাও ধরে আসছে, হঠাৎ দূর থেকে যেন একটা গগনবিদারী আর্তনাদ আকাশ ফুঁড়ে নদী কাঁপিয়ে ভেসে আসছে, “না-য়-য়-রি মা কোথাআআআয় তুই? না-য়-য়-রি-ই-ই-ই……” হঠাৎ যেন এই আর্তনাদ তৃণার বুকের মাঝে যেয়ে আঘাত হানলো!প্রথম যেদিন শব্দটা কানে আসে সেদিনও ভেবেছে তৃণা এটা তার মনের ভ্রম।কিন্তু আজ শব্দটা ক্রমেই নিকটে এগিয়ে আসছে। খুব কাছে এসে আবারও আাকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সেই ডাক। এর সাথে শুরু হলো বজ্র সহ আষাঢ়ের গুড়ুম গুড়ুম মেঘের গর্জন। কিছুক্ষণ পরই আকাশ ভেঙে নামলো বৃষ্টি ঠিক নায়রী ডাকে সাড়া দিয়ে আকাশও যেন ক্রন্দনরত আহাজারিতে সামিল। আর ঘুম আসলোনা। একসময় রাত শেষে আসলো ফজরের আজান ভেসে। মুয়াজ্জিনের সুললিত কন্ঠের “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম” আহবানে তৃণা উঠে অযু করে নামাজ পড়লো। গ্রামের ভোরের সূর্য ওঠা এগুলোর যেন আলাদা সৌন্দর্য।যেন মনে হয় নদীর ভেতরে পূর্ব প্রান্তে সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল।ফজরের আজান আর পাখির কলতানে আয়েশি ঘুম ছেড়ে সিঁদুর রাঙা হয়ে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠছে।কিছুতেই বিছানায় থাকা যায়না।

টঙ দোকানে বসে শুরু হয়ে যায় সকাল থেকেই চা দোকানীর চায়ের আসর। হাটতে বের হয়ে তৃণার খুব লোভ হয় টঙ চায়ের দোকানে চা খেতে। কিন্তু গ্রামের পরিবেশে মহিলাদের টঙে বসে চা খাওয়া মানানসই নয়।

চলবে—-

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন