ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম (পর্ব-১০)

আরশাদ উল্লাহ্‌

ইয়ুকি কথাগুলি বলে কাঠের সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে কিচেনে গিয়ে দুপুরের খাবারের আয়োজনের কথা ভাবছে। কাঁচা বাজারে না গেলেই নয়। সবজি ও মাছ কিনতে হবে। সে আবার নিচে নেমে এল। কজিমা সানকে বলল, “মাছ সবজি কিনতে হবে।”

এতক্ষণ কোন কথা হয়নি। কজিমা সান ইয়ুকির কথায় সম্বিত ফিরে পেলেন। তিনি টাকার পুটলিটি ফুরুকাওয়ার হাতে দিয়ে বললেন, ‘টাকাটা নিন। ইয়ুকি টাকা নিবেনা বলে দিল!’ তারপর কুবো সানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “চা তো ঠান্ডা হয়ে গেল। খেয়ে নিন!’

ফুরুকাওয়া তার লেদার কোটের বোতাম লাগালেন। সম্ভবত চলে যাবেন। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ইয়ুকির সামনে গিয়ে বললেন, “আমার যে ভুল হয়নি – সেকথা বলছি না। মানুষ মাত্রই ভুল করে। আমিও ভুল করেছি। তোমাকে আমি টাকাটা দিতে চাই। তোমাকে বেতন দিতে হবে সেকথা আমার মনে ছিল। ভেবেছিলাম যে সময় হলে সে টাকা তোমাকে দিব। এখন তোমাকে টাকাটা দিতে চাই। তা তুমি গ্রহণ কর। আর, আমার বাড়ি ছেড়ে যখন এখানে চলে এসেছ – এখন তোমার টাকার প্রয়োজন হবে।”

ইয়ুকি ফ্লোরের দিকে চেয়ে ফুরুকাওয়ার কথাগুলি শুনল। তার ঠোঁট কয়েকবার নড়ল। মনে হল কিছু বলবে। কিন্তু ফুরুকাওয়াকে সে কিছু বল না। কজিমা সানকে বলল, “খালাম্মা, যদি আজ্ঞা করেন – আমি মাছ ও সবজি কিনে নিয়ে আসব। লাঞ্চ রেডি করতে হবে!”

কজিমা সান তার দোকানের বাক্স থেকে কিছু টাকা এনে ইয়ুকির হাতে দিল। সিড়ির নিকট একটি থলে ছিল। ইয়ুকি সেটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় ফুরুকাওয়া ব্যস্ত হয়ে বললেন, “ইয়ুকি টাকাটা তুমি গ্রহণ কর!”

‘না’, পিছনে ফুরুকাওয়ার দিকে না ফিরেই বলল ইয়ুকি, “আপনার টাকা আমি নিব না। কক্ষনো নিব না!” ইয়ুকি ঘর থেকে বের হয়ে দ্রুত হেঁটে চলে গেল।

ফুরুকাওয়া স্তব্ধ হয়ে গেলেন। কিছু বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বললেন না। তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হল না।

কুবো সান বললেন, “ফুরুকাওয়া তুমি বস। তোমার সাথে অনেক কথা আছে। চা খেয়ে নাও!”

তখন সকাল এগারটা বাজে। বসন্তের হাওয়া প্রবল বেগে প্রবাহিত হচ্ছে। বায়ুতে শীতলতার প্রভাব। কয়েক মাইল দূরের পাহাড়গুলির চূড়া এখনো সাদা বরফে ঢাকা। সেই বরফ ছুঁয়া বাতাস শীতল।

চা পান করে কুবো সান সিগারেটে আগুন দিলেন।

নিরবতা ভঙ্গ করে কুবো সান বললেন, “বড় বাঁচা বেঁচে গেছ ফুরুকাওয়া। নইলে মহাবিপদে পড়তে তুমি!”

“ফুরুকাওয়া চায়ের কাপটি টেবিলে রেখে বললেন, “কিসের বিপদের কথা বলছ?”

“কিসের বিপদ তুমি তা ভাল জান। সব কথা রিয়ুতারোর মুখে শুনেছি। কজিমা সান ও তার সন্তান আকিহিরো তোমাকে সে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে। এই বয়সে যুবক-যুবতিদের মন বড় সেন্‌সেটিভ থাকে। একথাটি তুমি জেনেও কেন এমন ভুল করতে গেলে? তারা যদি এগিয়ে না যেত আমার সন্তানকেও পুলিশ ধরে নিয়ে যেত। সামান্য দেরি হলে তো ইয়ুকির মৃত্যু হত। তা কি তুমি বুঝ নি?’

“ফুরুকাওয়া কুবোর কথার জবাব খুঁজে পেলেন না মনে হয়। তিনি প্রতি উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলেন।

“তুমি তো যুদ্ধের বছরগুলিতে অনেক টাকা অর্জন করেছ। নিঃসন্তান তুমি। ত্রিগুণ বেশি দরে চাউল ধান বিক্রয় করে ধনী কৃষকে পরিণত হয়েছ। এক কাজ কর। অবশ্য যদি তোমার মনে চায়!

“কি কাজ?”

কুবো সান এক মুখ ধুয়া ছেড়ে বললেন, “তুমি খারাপ লোক নও ফুরুকাওয়া। আমরা জানি ইয়ুকিকে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে রক্ষা করে তাকে লালন পালন করেছ। বড় মহৎ কাজ করেছ। সেজন্য এলাকাবাসী তোমাকে মূল্যায়ন করে। অন্যায় যেটা করেছ তা হলো এই এতিম সুশ্রী মেয়েটিকে তুমি প্রথম থেকে নিজের কন্যা করে নিয়ে সন্তানের মায়ামমতা দিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে সুশিক্ষিত যদি করতে ইয়ুকি তোমাকে পরিত্যাগ করে আজ কজিমা সানের আশ্রয়ে আসত না!”

“এখন আমার কি করা উচিত?” বিব্রত হয়ে ফুরুকাওয়া বললেন।

কুবো সান বললেন, “ইয়ুকি এখন বাইরে গেছে। তুমি কজিমা সানকে ইয়ুকির টাকাটা গচ্ছিত রাখতে দাও!”

“কিন্তু তিনি তো ইয়ুকির টাকা গচ্ছিত রাখতে নারাজ!”

“আমি তাকে বুঝিয়ে বলব ফুরুকাওয়া। কজিমা সান একটি গ্রোসারি শপ চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। ইয়ুকি যদি এখানে থেকে যায়, তার খরচ বাড়বে। তবে হ্যাঁ, এই সাহসি মহিলা এপর্যন্ত যেভাবে তার দুটি পুত্র সন্তানকে লালনপালন করেছেন – তার প্রশংসা করি!” এতটুকু বলে কজিমা সানকে টাকাটা ইয়ুকির হয়ে গ্রহণ করতে অনুরোধ করলেন কুবো সান।

সব কথা শুনে কজিমা সান বললেন, “এই টাকা না রাখলেও ইয়ুকির ভরণ পোষণ করতে আমার কষ্ট হবে না, কুবো সান। আকিহিরো কাজ করছে। সরকার আমাকে স্বামির পেনসনের টাকা দিচ্ছে। আমার অসুবিধা হবে না। ইয়ুকির অজান্তে এই টাকা আমি গ্রহণ করব না।”

“কজিমা সান, আমি আপনাকে আরো দূরদর্শি হতে অনুরোধ করছি। টাকাটা সময়ে তার কাজে লাগবে। সেকথা কেন ভাবছেন না?”

কজিমা সান গালে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে নিলেন। তারপর কুবো সানকে বললেন, “ঠিক আছে। আপনার উপস্থিতিতে কতটাকা গুণে নিব!” একথা শুনে ফুরুকাওয়া খুশি হলেন। তিনি মৃদু হেসে টাকার পুটলিটা কজিমা সানের হাতে দিলেন।

পুটলিটি খুলে টাকা গুণে নিলেন আকিহিরোর মা কজিমা সান। পর্যাপ্ত টাকা। যা দিয়ে একটি ঘর ক্রয় করা যাবে।

ফুরুকাওয়াকে বললেন, “আমি এটাকা গচ্ছিত রাখলাম। আশাকরি আপনি এখন কিছুটা স্বস্তি বোধ করবেন।”

ফুরুকাওয়া কিছু বললেন না। তিনি কুবো সানের সাথে বের হয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পরে স্যামন মাছ ও কয়েক প্রকার সবজি নিয়ে ইয়ুকি ফিরে এসে রান্নাঘরে চলে গেল। সবজির মধ্যে পালংশাক, বাঁধাকপি ও ফুলকপি। ইয়ুকি সিড়ির নিকট গিয়ে খালাম্মা বলে ডাক দিল। কজিমা সান উপরে উঠে গেলেন। ইয়ুকি তাকে কি রান্না করবে জিজ্ঞাসা করল।

কজিমা সান বললেন, “শুনেছি ফুরুকাওয়ার বাড়িতে তুমি রান্না করতে। আজ আমি তোমাকে কিছু বলব না। তোমার ইচ্ছা মত রান্না কর!” একথা বলে তিনি দোকানে ফিরে গেলেন।

ঘন্টা খানেক পরে আকিহিরো অফিস থেকে লাঞ্চ খেতে আসল। ইয়ুকি খাবারগুলি আগে থেকেই টেবিলের উপরে সাজিয়ে রেখেছে। খাবারের একাধিক আইটেম দেখেই বুঝে ফেলল আকিহিরো। সে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “রান্না কি ইয়ুকি করেছে, মা?”

“কি করে বুঝলে?”

“বুঝা খুবই সহজ। তুমি শুধু একটি আইটেম রান্না কর। আজ দেখছি সালাদ, পালংশাখ ভাজি, মিছসুপ এবং স্যামন মাছ!”

ইয়ুকি মৃদু হাসল। কিন্তু কোন উত্তর দিল না।

কজিমা সান বললেন, “দোকানে খরিদ্দার এসে দাঁড়িয়ে থাকে। তাই আমি লাঞ্চের জন্য শুধু একটি আইটেম রাঁধতাম সময় কম বলে। কিন্তু রাতে তো কয়েক প্রকার রান্না করতাম!”

“তা আমি জানি মা। আজ ব্যতিক্রম দেখে জানতে চেয়েছি।” আকিহিরো, কজিমা সান ও ইয়ুকি এক সাথে লাঞ্চ খেল। তারা দুজন সুস্বাদু খাবার রান্না করে খাওয়াবার জন্য ইয়ুকিকে ধন্যবাদ দিল।

কজিমা সান বললেন, “এখন থেকে ইয়ুকি রান্না করবে, কি বল?” তিনি ইয়ুকির মন্তব্য শোনার জন্য জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি এই দায়িত্ব নিয়ে আমাকে রেহাই দিবে কি?”

হাসল ইয়ুকি। কিন্তু কিছু মন্তব্য করল না। সে তার কপালের উপর থেকে চুলগুলি ডান হাতে সরাল। তারপর টেবিল থেকে থালা বাসন হাতে নিয়ে কিচেনে চলে গেল।

আকিহিরো বলল, “কোন জবাব দিলে না যে ইয়ুকি?”

ইয়ুকি স্বশব্দে হেসে বলল, “এই দায়িত্ব খালাম্মা আমাকে দিলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব আকিহিরো। আমাকে তো কিছু কাজ নিয়ে থাকতে হবে। আমার সাধ্যমত ঘরের সব কাজ আমি করব।”

ইয়ুকির কথা শুনে কজিমা সান আশ্বস্ত হলেন। তাকে আবার ধন্যবাদ দিয়ে দোকানে চলে গেলেন।

আকিহিরো বলল, “সারাদিন ঘরে থাক। তোমার খারাপ লাগে না ইয়ুকি?”

“ঘরে থাকবো না তো কোথায় থাকব। আমি তো ছেলেদের মত বাইরে ঘুরতে পারব না। আমি যে মেয়ে মানুষ!” জানালার কাছে গিয়ে পর্দা টেনে ঠিক করে বলল ইয়ুকি।

আকিহিরো কিছুক্ষণ চিন্তা করে অফিসের ব্যাগটি হাতে নিয়ে সিড়ির নিকট গিয়ে এক পা পিছনে এসে ইয়ুকির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি জানি এই এলাকায় কোথাও তুমি যাও নি। কিছুদিন পরে চেরী ফুটবে। গ্রামের মন্দিরে পুরানো চেরীগাছে বিস্তর চেরী ফুটে। তখন আমার ‘গোল্ডেন উইকের’ ছুটি থাকবে। আমি সেখানে তোমাকে নিয়ে যাব। লাঞ্চ প্যাকেট ওখানে কিনতে পাওয়া যায়। ছবা নুডল কিনে খাব।”

কথা শুনে খুশি হয়ে ইয়ুকি।বলল, “তোমার দেরি হয়ে যাবে। হ্যাঁ, যাব বৈ কি। খালাম্মাকেও সঙ্গে নিব!”

আকিহিরো ধীরে ধীরে সিড়ি দিয়ে নেমে গেল।

ইয়ুকি দ্রুত জানালার নিকটে গিয়ে পর্দা সরিয়ে মাথা নুইয়ে বাইরে চেয়ে রইল। সে নিরবে দেখছে আকিহিরো সাইকেল চালিয়ে দক্ষিণের রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে। যতক্ষণ তার দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেছে – ততক্ষণ সে আকিহিরোর পথের দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে রইল। তার হাত জোর করে প্রভুর নিকট বিড়বিড় করে প্রার্থনা করল। মনে হল আকিহিরোর মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করল।

ইয়ুকি কিচেনে গিয়ে সবুজ চা বানিয়ে কাপে নিয়ে নিচে নেমে কজিমা সানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “খালাম্মা চা নিন!”

অবাক হলেন কজিমা সান। বললেন, “ওমা তুমি চা এনেছ! আসলে চা খাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছিল আমার, ধন্যবাদ ইয়ুকি!”

ইয়ুকি যখন উপরে যেতে পা বাড়াল তখন কজিমা সান বললেন, “তুমি ওখানে বস ইয়ুকি!” অদূরে কাঠের চেয়ারটি দেখিয়ে বললেন, “এখন দোকানে লোকজন নেই। দুটো কথা বলব এমন কেউ আমার নেই। আজ তোমাকে কিছু প্রশ্ন করব। তুমি স্মরণ করে উত্তর দিবে!”

ইয়ুকি চেয়ারে বসার পর কজিমা সান বললেন, “তুমি যখন ওকিনাওয়া ছিলে তখন সম্ভবত তোমার বয়স আট বৎসর তাই না?”

ইয়ুকি নিরবে মাথা নাড়ল।

“আচ্ছা তখন তোমার দাদা-দাদি বা তোমার নানা-নানির কথা কি মনে আছে?”

ইয়ুকি বলল, “হ্যাঁ, কিছু মনে আছে। দক্ষিণের সমুদ্র তটের নিকটে দাদা ও দাদি একটি মিন্‌শুকু হোটেল পারিচালনা করতেন। শত্রুদের জঙ্গি বিমান একদিন অতর্কিতে আক্রমণ করল। হোটেলটি পুড়ে যায় এবং দাদা প্রাণে বেঁচে গেলেও দাদি মারা যান। তারপর দাদা বাবাকে আমাদের কিউশিও সরিয়ে নিতে বলেছিলেন। আর, আমার দুজন কাকা ছিলেন। তারা ইম্পেরিয়াল সেনা বাহিনীতে যোগদান করেছিলেন। তারপর তারা সিঙ্গাপুরে কর্মরত ছিলেন। তারা বেঁচে আছেন কি না জানি না। নানা-নানির কথাও জানি না!”

গভীর আগ্রহ নিয়ে ইয়ুকির কথাগুলি শুনে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কজিমা সান। কোন মন্তব্য করলেন না। দোকানে কয়েকজন কাষ্টমার প্রবেশ করার পরে ইয়ুকি দুতলায় উঠে গেল।

সন্ধ্যায় আকিহিরো ফিরে এল। তমহিরো তার পড়ার রুমে বই নিয়ে বসেছে। সে এখন একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। আগামি সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে উঠবে।

“আগামি সাপ্তাহ থেকে ‘গোল্ডেন উইকের ছুটি’ ইয়ুকি।” অফিসের কাপড় বদলিয়ে বলল আকিহিরো। জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “চেরী গাছগুলি ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে!” অদূরে ছোট বড় কিছু চেরী গাছ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের পাশে রয়েছে। সেগুলি দেখে বলল আকিহিরো।

ইয়ুকি চা এনে হাতে দিয়ে বলল, “চা খাও!” তার বাম হাতে আরেকটি চায়ের কাপ। সেটা তমহিরোর টেবিলে রাখল। তমহিরো তাকে ধন্যবাদ দিল। তারপর ইয়ুকি আবার আকিহিরোর কাছে গেল। জানালা দিয়ে পশ্চিম আকাশের শুকতারাটি দেখে বলল, “দেখো আকিহিরো আজকের শুকতারাটিকে অনেক বড় এবং উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। আকিহিরো সেটা দেখে বলল,” তাইতো, মনে হয় আরেকটি চাঁদ!”

“হুম, চাঁদের মতই উজ্জ্বল। যদি আকাশে দুটি চাঁদ থাকতো খুব সুন্দর হত, তাই না আকিহিরো?”

“দুটি চাঁদ হলেতো সুন্দর হতো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্য অন্যরকম হয়ে যেত।”আকিহিরো বলল।

“কেন?” উৎসুক ইয়ুকি জানতে চাইল।

“সে অনেক কথা। সহজ ব্যাখ্যা যদি দেই , সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার উপর বিরূপ প্রভাব পড়ত। সমুদ্র স্রোত বদলে যেত। পৃথিবীর মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীরা একটি চাঁদ ও পৃথিবীর সম্পর্কের সাথে নিজস্ব জীবন যাত্রা খাপ খাইয়ে নিয়েছে। দুটি চাঁদ হলে প্রাণীদের জীবন যাত্রা এবং আকৃতি প্রকৃতি হয়তো বদলে যেত!”

ইয়ুকি জোয়ার ভাটার কথা বুঝতে পারল। কিন্তু বাকি কথা বুঝতে পারল না। জোয়ার ভাটা কেমন তা সে জানে। চাঁদের আকর্ষণে তা হয়।। কিছুক্ষণ পর বলল, “আকিহিরো আমি যদি তোমার মত স্কুলে পড়াশোনা করতাম, তোমার বাকি কথাগুলিও বুঝতে পারতাম।।”

“অবশ্যই পারতে। সে জন্য হতাশার কিচ্ছু নেই। আমি তোমাকে যথাসম্ভব শিখাবো!”

“সত্য বলছ?”

“হ্যা!” তোমাকে আমি শিখাব!” আকিহিরো দৃঢ়তার সাথে বলল।

ইয়ুকি তার মনের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। কারো স্বপ্ন যদি বাস্তবে পরিণত হয় তার চেয়ে আনন্দের আর কি আছে। সে আকিহিরোকে জড়িয়ে ধরে তার চোখে চোখ রাখল। কিন্তু ক্ষণিকের জন্য। মহূর্তের মধ্যে আকিরোকে ছেড়ে দিয়ে দেয়ালের দিকে ফিরে দুহাতে মুখ ঢাকল। আকিহিরো “কি হল” বলে দুপা এগিয়ে ইয়ুকির কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করল। লক্ষ করল ইয়ুকির দুচোখ দিয়ে আবিরাম অশ্রু ঝরছে। ইয়ুকি ফরসা মুখ লাল বর্ণ দারণ করেছে। তাকি আনন্দের নাকি লজ্জার তা বুঝতে পারলনা।

সে ইয়ুকির কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে চেয়ারে বসে বলল, “আজকে একটি আনন্দের কথা বলব ভেবেছিলাম। কিন্তু এমন করলে কেমনে বলব!”

ইয়ুকি কোন প্রতিউত্তর করল না। তার বাম হাতে টেবিলে রাখা হাত-ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে চোখের পানি মুছল। তারপর বাথরুমে গিয়ে পানি দিয়ে মুখ মুছে আকিরোর সামনে দাঁড়িয়ে অস্ফুট কন্ঠে বলল, “আমি খুব দুঃখিত আকিহিরো। তোমার সামনে কেঁদে আমি তোমাকে চিন্তায় ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও!”

“এমন কোন সমস্যা হয়নি আমার। আমি কেন চিন্তিত হব?” ইয়ুকিকে ইশারায় কাছে ডেকে বলল, “গোল্ডেন উইকে আমরা হাচিনোহে বেড়াতে যাব। হাচিনোহে আওমরি বিভাগের রাজধানী তাতো জান?”

“জানি।সঙ্গে আর কে যাবে?”

কে আর যাবে? মা যদি যেতে চায় নিয়ে যাব।”

“খালাম্মা কি দোকান ফেলে যাবেন?”

“বললে যাবেন। আসলে তোমাকে অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে মনের ক্লান্তি দূর করতে চাই। এ পর্যন্ত তো ফুরুকাওয়ার বাড়িতে নয়টি বৎসর কাটিয়ে দিলে!”

“হাচিনোহে গিয়ে আমাকে বিশেষ কি দেখাবে?”সমুদ্রবন্দরে বড় বড় জাহাজ। মাছ ধরার ট্রলার আর তটে রয়েছে ফ্রেশ শাশিমির রেস্টুরেন্ট ও মিনশুকু হোটেল। সে হোটেলে মা সহ আমরা তিন দিন থাকবো।”

“তমোহিরোকে সঙ্গে নিবে না?”

“সে যাবে না। স্কুলে ক্লাব এক্টিভিটিতে জড়িত। বেসবল খেলে সে।”

ইয়ুকি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। চোখ বুঝে কিছু ভাবল। তারপর হাসি দিয়ে বলল, “কদমারি বন্দরে যেতে ইচ্ছা হয় আমার!”

“কদমারি তো ছোট গ্রাম্য বন্দর। ওখানে দেখার তেমন কিছু নেই। ছোট ছোট কিছু ট্রলার ছাড়া কিছু নেই।”

“কিন্তু সেখানে যেতে মন চায় আমার। কারণ, আমিতো কদমারি দিয়ে কিউশিও থেকে এসেছিলাম। সেখানে মধ্য বয়সের এক মহিলার দোকান ঠেকে বাদাম কিনেছিলাম। সে বাদাম খেয়ে আমি দীর্ঘ পথ হেঁটে এখানে এসেছি। সম্ভব হলে আমাকে ওখানে নিয়ে যাও!”

ইয়ুকির কথা শুনে কোন প্রতিবাদ করেনি আকিহিরো। বলল, “ঠিক আছে। আমরা কদমারি যাবো!”

দুদিন পর ট্যাক্সিতে আকিহিরো তার মা ও ইয়ুকিকে নিয়ে কদমারি সমুদ্র তটের নিকটে একটি হোটেলে গিয়ে উঠল। জাপানি মিনশুকু হোটেল। ফ্লোর গ্রাস ম্যাটে তৈরী তাতামি। ওয়াল টু ওয়াল বসানো। এই তাতামি বেশ ভারি। তিন পয়েন্ট তিন বর্গমিটারে দেড় ইঞ্চি পুরু একটি তাতামি। একমাত্র জাপানে তাতামি ব্যবহৃত হয়। কাঠের ঘরে তাতামি ম্যাট বেশ ম্যাচ করে। তার উপরে তোশক ও লেপ। একবার এতে ঘুমিয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেলে খাট-পালং আর ভাল লাগবে না। বড় ন্যাচারেল জিনিষপত্র দিয়ে জাপানি কাঠের ঘরগুলি দক্ষহাতে তৈরী করা হয়। তারা একটি প্রশস্ত রুমে আলাদা তিনটি বিছানাতে শুয়ে পড়ল। তখন বেলা সকাল এগারটা বাজে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বারটার দিকে তিনজন একটি জাপানি শাশিমি রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ খেতে গেল। শাশিমি আকিহিরোর মা বেশি পছন্দ করেন। সঙ্গে মিছ-সুপ রয়েছে। কয়েক জাতের মাছের শাশিমি, টুনা, স্যামন, ইয়েলোটেইল (বুরি), হামাচি টুনা, ওয়েষ্টার ছাড়াও অনেক প্রকার কাঁচা মাছ স্লাইস করে কাঠের প্লেটে সাজিয়ে প্রসস্ত খাটো টেবিলে রেখেছে। তারা তিন জন চপস্টিক দিয়ে খেল। রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে হেঁটে বন্দরের নিকট গেল। ইয়ুকি চারিদিক বিস্ফারিত চোখে দেখছে। নয় বৎসর পূর্বে নয় বৎসর বয়সের ইয়ুকি এখানে জাহাজ থেকে নেমেছিল। এখন এখানে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। দালানকোঠা অনেক। আগের সেই মহিলার দোকানটি নেই। সে মহিলার দোকান থেকে বাদাম কিনেছিল। সে স্থানে একটি সুপার মার্কেট হয়েছে। নতুন কিছু বাড়ি ঘর হয়েছে। বন্দর সম্প্রসারিত করে বড় করেছে। অনেক পরিবর্তন লক্ষ করল ইয়ুকি। সে কজিমা সানকে বলল, “ব্যাপক পরিবর্তন খালাম্মা। মনে হয় সুপার মার্কেটটি সেই মহিলার ছোট দোকান ছিল। ওই খানে আমি বসে বিশ্রাম নিবার সময় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিউশিও থেকে পুরানো জাহাজে যারা আমার সঙ্গে এসেছিল। তারা কোন দিকে গিয়েছে জানি না। কিন্তু একটি কথা পরিষ্কার যে তাদের মধ্যে অন্তরঙ্গতা ছিল না। নইলে তারা আমাকে একা ফেলে যেত না। ”

কজিমা সান বলেন, “বিপদে বন্ধুর পরিচয় হয়। তারা তোমার মত ছোট একটি মেয়েকে ফেলে যাওয়া অমানুষিকতার কাজ। মনে হয় তারাই বেশি বিপদগ্রস্ত ছিল। তবে পুরুষ লোকের কর্তব্য শিশু ও নারীদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানো। কিন্তু তা করেনি। জন্মের পর প্রতিটি মানুষের শৈশব ও যৌবন কালে অনেক বন্ধু থাকে। যে বন্ধুটি তোমার জীবনের দুর্গতির সময় খবরা খবর নিবে এবং প্রয়োজনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে। সেই ব্যক্তিটি হবে নিখাদ ও অন্তরঙ্গ বন্ধু। তবে তেমন বন্ধু কম মানুষের ভাগ্যে থাকে। আমার জীবনের কথা ভেবে দেখো। চরম দুঃখের দিন গুলিতে বন্ধুরা অনেকে দূরে সরে গিয়েছিল। দুটি সন্তান নিয়ে আমি অনেক কষ্ট করেছি।”

জাপানি মিনশুকু হোটেলে থাকলে শুধু সকাল ও রাতের খাবার পরিবেশন করে। দুপুরে পর্যটকেরা বাহিরে খেয়ে নেয়। পরের দিন ভোরে আকিহিরো বলল, “আমরা সমুদ্র তটে হাঁটব। তারা সকালের খাবার খেয়ে তটের দিকে হেঁটে গেল। কিছু দূরে গিয়ে একটি দোকান দেখতে পেল। দোকানটিতে ছিপ দিয়ে মাছ ধরার সব কিছু আছে। শুধু ছিপ নয়, আদার ও মাছ ধরে রাখার নেটের ছোট খাঁচা রয়েছে। নির্দিষ্ট টাকায় ছিপ, মাছের আদার ও জালের খাঁচা নিয়ে তিনজন হার্বারের দিকে গেল। সমুদ্র থেকে ট্রলার গুলি মাছ নিয়ে এখানে নোঙ্গর করে। ভোরে ট্রলার নেই। প্রায় একশত মিটার দীর্ঘ, পাশে তিন মিটার এমন কংক্রিটের ওয়াল সমুদ্রের দিকে নব্বই ডিগ্রি এঙ্গেলে রয়েছে। আকিহিরো, তার মা ও ইয়ুকি তিনটি ছিপ নিয়ে সেটার উপর দিয়ে হেঁটে গেল। তারপর আদার গেঁথে মাছ ধরতে ফেলল। ইয়ুকি কোনদিন ছিপ দিয়ে মাছ ধরেনি। কিন্তু আকিহিরোর কাছ ঠেকে শিখে নিল। মাত্র আধা ঘন্টায় তিন জন দুই কেজির মত আজি মাছ (Horse mackerel) ধরে ফেলল। আজি মাছ শরপুটির সমান। সবাই অনেক আনন্দে মাছগুলি নেটের খাচায় রাখল। নেটের রশি বেঁধে পানিতে রেখেছে। তাই মাছগুলি মরেনি। ঘন্টা খানেক পর দোকানে ফিরে ছিপ ও নেটের খাঁচা ফেরত দিল। মাছগুলি দোকানদার একটি মোটা কাগজের পুটলিতে বেঁধে দিল। তারপর আকিহিরো ট্যাক্সি ডেকে তাদের নিয়ে নাকাজাতো ফিরল। ঘরে ফিরে ইয়ুকি লাঞ্চ রেডি করার জন্য মাছগুলি কেটেছে। কজিমা সানও তাকে কাটার কাজে সাহায্য করলেন।

সেদিন লাঞ্চ খাওয়ার পর কজিমা সান বললেন, “ইয়ুকি তোমার কৌটার ভিতরে কি আছে আমাকে তো দেখালে না।!”

ইয়ুকি বলল, “এখন দেখবেন?”

“তোমার যখন ইচ্ছা তখন দেখাবে!”

“ইয়ুকি হাসল। কজিমা সানের সামনে বসে বলল, “তাতে তেমন কিছু নেই। মায়ের কিছু জিনিষ আছে। সামান্য টাকাও ছিল। আমার বিপদের সময় কিছু খরচ করেছি।”

ইয়ুকি তার রুম থেকে কৌটাটি নিয়ে আসল। পুরানো স্কার্ফ দিয়ে কৌটাটি পেঁচিয়ে যত্নের সাথে গিট দিয়ে রেখেছে। আকিহিরোও কাছে এসে বসল। ইয়ুকি টিনের কৌটাটি খুলে দেখাল। তাতে তার মায়ের একটি স্বর্ণের চেইন। তাতে পকেট ঘড়ির মত একটি লকেট। একটি মুক্তা বসানো স্বর্ণের আংটি আর কিছু টাকা। তাবিজের মত ভাজ করা ছোট একটি কাগজ। সেটাও খুলল ইয়ুকি। তাতে জাপানিতে ইয়ুকির বাবার ওকিনাওয়ার ঠিকানা লেখা রয়েছে।

(চলবে)

আরশাদ উল্লাহ্‌ সাহিত্যিক ও জাপান প্রবাসী।

আরও পড়ুন