বিশ্বাস অবিশ্বাস

-সুমাইয়া আফরোজা

…আরে দোস্ত, বলতেছি তো যে আমি এখন টাঙাইলের ভেতরে,
তোরে কতবার বললে তুই বুঝবি বল তো,
…এইডা কোন কথা, তোর বার্থ ডের কথা আমি কেমনি ভুলি, আমি সেই ভোরে রওনা দিছি,
মন খারাপ করিস না দোস্ত, আর দু ঘন্টার মধ্যে আমি পৌঁছে যাবো দেখিস…
ফোনটা রেখে দিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মাহিন।
পাশের সীটে বসা বৃদ্ধ ভদ্রলোক একটু কেশে মাহিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সসংকোচে বললেন,
‘বাবা আমি বুড়ো মানুষ, ঢাকা শহরে একা কখনো যাই নি, ছেলেরা থাকে সেখানে, মাঝে মাঝে ওরাই নিয়ে যায়,
তা এবার বাবা, একাই যেতে হচ্ছে, কোমরের ব্যাথাটা একটু বেশি বেড়েছে কি না তাই আর কি,
ভাবলাম যাই দেখি আল্লাহর ওপর ভরসা করে,
ছেলেদের কাছে দুটো দিন থাকা হবে আবার ডাক্তারও দেখানো হবে।
তবে সমস্যা হলো গিয়ে আমি রাস্তাঘাট তেমন একটা চিনি না বাবা,
ওই গাবতলি গিয়ে নামব আর আমার ছোট ছেলে এসে নিয়ে যাবে ওখান থেকে,
তাই সাহস করে একাই বের হলাম আর কি,
তা বাবা, এটা কোন জায়গা বলতে পারো?
মাহিন বিরক্ত হলো মনে মনে,
ওহ্, কেন যে এমন বাচাল বুড়োর পাশেই সীটটা পড়তে হলো,
এত কথা বলতে পারে!

তবে বিরক্তি লুকিয়ে স্বাভাবিক ভদ্রতা দেখিয়ে উত্তর দিলো,
আমরা এখন বগুড়ায় চাচা,
আপনি একটা ঘুম দেন।
পাঁচ ঘন্টার আগে ঢাকা পাবেন না কোন ভাবেই।

বৃদ্ধ বিস্মিত হয়ে বলল,
সে কি বাবা!
একটু আগে যে ফোনে বললে আমরা টাঙাইল!
টাঙ্গাইলের পর বগুড়া কেমনে হয়!

এবার আর বিরক্তি লুকাতে পারে না মাহিন,
:আরে চাচা, বোঝেন না ক্যান, বন্ধুদের সবসময় ঠিক ঠিক তথ্য দেয়া যায় না, তাই মিথ্যে বলে ঝামেলা এড়াতে হয়।
: কিন্তু বাবা!
তুমি যে বললে দু ঘন্টার মাঝে ঢাকা পৌঁছুবে,
তখন যদি বন্ধু আবার জানতে চায় তখন কি বলবে?
:আরে চাচা! এইটুকু বিষয় নিয়ে ভাবতে বসলেন, তখন বলে দিবো যে জ্যামে আটকে গেছি,
ব্যাস, ঝামেলা খালাস! এমন সুপরিকল্পিত চিন্তা ভাবনা বৃদ্ধকে হতবাক করে দিলো,
তিনি একেবারে চুপ হয়ে গেলেন।
বাস চলছে,,,
রংপুরের সীমানা ছাড়িয়ে বগুড়া আর সিরাজগঞ্জ এর মাঝামাঝি।
হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রাকের গতিবেগের তীব্রতা স্পর্শ করল বাসটার গায়ে,
নিমিষেই বাস মহাসড়ক থেকে ছিটকে পড়ে গেলো পাশের খালে।
গগনবিদারী আর্তনাদ,,
কান্না চিৎকার আর রক্তে একাকার হয়ে যেতে থাকলো গ্লাসবিহীন বাস কঙ্কাল।

সবকিছু বুঝে ওঠার আগেই চেতনা হারিয়েছে মাহিন,
জানালার পাশে হওয়ায় আঘাতটাও লেগেছে সরাসরি মাথায়,
রক্ত তার আকাশী রঙের হাফ শার্টকে রঙিন করে তুলেছে,
মৃতের মত পড়ে আছে সে।
রাস্তার ওপরে মানুষের ভীড়,
তবে কেউ এগিয়ে আসছে না এই মরণাপন্ন মানুষদের দিকে,,,
যদিও উদ্ধারকর্মীর টীম চলে আসলো অল্প সময়ের ব্যবধানে।
যে পাঁচজন গন্তব্যপথ পরিবর্তন করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে ইতোমধ্যে তাঁদের থানায় পাঠিয়ে বাকীদের নিয়ে যাওয়া হলো জিয়াউর রহমান মেডিকেল এর জরুরী বিভাগে,
অচেতন মাহিনের কল লিস্ট থেকে কল করা হলো লিস্টের প্রথমে থাকা বন্ধু আবীরের কাছে,
কিন্তু তার ফোনে ব্যাল্যান্স না থাকায় অন্য ফোন থেকে কল করা হলো,
: হ্যালো, আপনি কি মাহিনের ফ্রেন্ড আবীর বলছেন?
:জ্বি বলুন।
:আপনার ফ্রেন্ড মাহিনের রোড এক্সিডেন্ট হয়েছে।
:বলেন কি? ও কোথায় এখন?
:এক্সিডেন্টটা বগুড়ায় হয়েছে আমরা উনাকে মেডিকেল এ ভর্তি করিয়েছি,
এখন তিন ব্যাগ ব্লাড ম্যানেজ করতে না পারলে…
: আরে মশায় থামুন!
আমার ফ্রেন্ড মাহিন এতক্ষণে টাঙ্গাইল পার হয়ে সাভারে,
একটু আগেই কথা হয়েছে।
হয় আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে আর না হয় আপনার অন্য মতলব আছে।

লোকটা পরের উপকার করতে যেয়ে এমন মন্তব্যে আর ধৈর্য ধরতে পারলো না, রাগে ফোন কেটে দিলো।
কিছু সময় পার হলো,
ফেসবুকের হোমপেজে নিউজ দেখছে আবীর,
রংপুর থেকে ঢাকাগামী বাসের সাথে বগুড়ার অদূরে মালবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে…
না, আর নিশ্চিন্ত থাকা যায় না,
হন্তদন্ত হয়ে ফোন দিলো মাহিন কে,
না রিং হচ্ছে কিন্তু কোন রেসপন্স নেই,
অনেকবার ট্রাই করার পর রিসিভ হলো,
একি! এ কার কন্ঠ! গলা কাঁপছে আবীরের,

:কে বলছেন আপনি,
মাহিন কোথায়? কি হয়েছে ওর? ওকে ফোনটা দেন প্লিজ।
:আপনি মাহিনের কে?
:আমি ওর বন্ধু, খুব কাছের বন্ধু, প্লিজ ওকে ফোনটা দেন, আমি ওর কথা শুনতে চাই…
:দুঃখিত, আপনার বন্ধু আর কোনদিন কথা বলতে পারবেন না।

ফোনটা পড়ে গেলো আবীরের হাত থেকে।
কিছুক্ষণ নিশ্চল পাথরের মত দাঁড়িয়ে থেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে,,,
এ তুই কি করলি মাহিন!
কেন একটা মিথ্যা তোকে সবার থেকে এত দূরে নিয়ে গেলো!
কেন আমি তোর কথাটা বিশ্বাস করলাম..?

সুমাইয়া আফরোজা কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন