নায়রি (শেষ পর্ব)

ফারহানা শরমীন জেনী

মেয়ে বাবা ভক্ত মারাত্মক। বাবা অন্ত প্রাণ। মেয়ের হাঁটা চলা হাসি কথা সবই যেন মাঝির কাছে উপভোগ্য।মেয়ে তার খুব আদরের।  সে তার বউকে বলে “শুন্যা রাখ্ বউ আমি আমার বিটিকে ছেল্যার মত কর‍্যা মানুষ করভহেনি।আমি মাছধরা থাইক্যা নৌকা বওহা সব শিখাভো”! বলেই মেয়েকে ঘাড়ের ওপর নিয়ে নাচতে থাকে আর গান করতে থাকে। আর মেয়ে খিলখিল করে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে।বাপ আর মেয়ের আহ্লাদীপনায় মাঝে মাঝে নায়রির মায়ের বুকটা কেঁপে ওঠে। মনে মনে বলে ওঠে এত সুখে কারও বিষ দৃষ্টি যেন না পড়ে। নৌকা বাওয়া ও মাছ ধরে যে আয় রোজগার তাতে তাদের খেয়ে পড়ে বেশ ভালোই চলতো।সংসারে প্রাচুর্য ছিল না ঠিকই কিন্তু স্বচ্ছলতা আর নিষ্কলুষ ভালোবাসা ছিল।বাবা ও মেয়ের মুখের হাসি দেখে নায়রির মায়ের হৃদয় ও চোখ দুটোই জুড়াত।

মেয়ের যখন চারবছর বয়স তখন থেকে বাবা মেয়ে সারাক্ষণ একসাথে। নদী পারাপার করা থেকে শুরু করে মাছধরা পর্যন্ত মেয়েকে সাথে নিয়ে কাজ করে মাঝি।কখনও মেয়েকে চোখে হারায় না।এর মাঝে নায়রীর একটা ভাই জন্ম নেয়। নায়রীর মা সেই নবজাতক সন্তান নিয়ে ব্যাস্ত।একদিন মাঝি সারাদিন যাত্রী নিয়ে নদী পারাপারে ব্যাস্ত থাকে। সারাদিন মেয়েকে কাছে পায়না।মেয়েও বাবাকে না পেয়ে অস্থিরতায় ভুগতে থাকে। সন্ধ্যার অনেক পরে নায়রীর বাবা বাসায় ফিরে আসে।মেয়ের অস্থিরতা ও মন খারাপ বাবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।রাতে আবার মাছ ধরার ক্ষ্যাপ আছে।বর্ষার ভরা নদীতে পূর্ণিমায় শেষ রাতে প্রচুর মাছ ধরা পরে। এজন্য শেষ রাতে জেলেরা মাছ ধরার আয়োজন করে। সেবার নায়রীর এক জ্বীদ বাবার সাথে সে যাবেই যাবে।অনেক বোঝানোর পরেও মেয়ের জ্বীদের কাছে হার মানে স্নেহপ্রবণ পিতা।নায়রির মায়ের মনটাও কেন যেন খুব অস্থিরতা ভুগছে।কিছুটা দূরে আম বাগানে থেমে থেমে কুকুরের  কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।গরম ভাত,ডাল ভর্তা আর ডিম ভাজা দিয়ে বাবা মেয়ে পরম তৃপ্তিতে খেয়ে রওনা হলো।বাবা মেয়েকে বিদায় দিয়ে অনেকক্ষণ পথের দিকে তাকিয়ে থাকলো লালবানু যতক্ষণ তাদের দেখা যায়।ওরা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ মেঘে ঢেকে যেতে লাগলো। মনের মধ্যে অসন্তোষ আর কেমন যেন অজানা তোলপাড়। মাঝি  মেয়েকে সাথে করে মাছ ধরতে নৌকা নিয়ে নদীতে চলতে শুরু করলো।আবহাওয়া বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে  ভালো না।একেকবার মাঝির ফিরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। একদিন মাছ না ধরলে কি হয়?নিজে নিজের মনকে প্রশ্ন করছিল।মাঝ নদীতে যখন নৌকা তখন নায়রি লক্ষি হয়ে বসে আছে নৌকার ছইয়ের নিচে।আজ নায়রিও চুপচাপ। হঠাৎ আকাশে ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো সাথে মেঘের গুড়ুম গুড়ুম শব্দ। সেদিন তেমন কোন নৌকাও নাই নদীতে মাছ ধরার।হঠাৎ দমকা বাতাস আর সাথে এলোপাতাড়ি বৃষ্টি। ডিঙি নৌকা কিছুতেই যেন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। পাড়ে চলে এসেছে নৌকা বলা চলে এমন সময় হঠাৎ নৌকা উল্টে গেল। হাটু পানিতে উল্টানোর সাথে সাথে পানিতে সৃষ্ট কারেন্টের ঘূর্ণি তলিয়ে নিয়ে গেল ছোট্ট নায়রিকে।

খুব কাছাকাছি থাকা এক নৌকায় একজন জেলে ছিল।সে শুনতে পেয়েছিল নায়রির আর্তনাদ।মাঝি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। পরে সকালে মাঝিকে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায় ততক্ষণে তার সম্বিত ফিরেছে ঠিকই কিন্তু কন্যা হারিয়ে বুদ্ধি বিভ্রম ঘটে। তাকে আর কোন ভাবে ঘরমুখো করা যায়নি।সারাক্ষণ নদীর ধারে পড়ে থাকে। তার বিশ্বাস সে তার নায়রিকে ফিরে পাবে। ছেলে বউ এসে মাঝে মাঝে জোর করে বাড়ি নিয়ে গেলেও আবার চলে আসে এই চরে। তার ধারণা নায়রি কোন এক ঝড়ের রাতে নিশ্চয় ফিরে আসবে আর তার বাবাকে যদি খুঁজে না পায় তাহলে আবার যদি হারিয়ে যায়।

কিভাবে চলে নায়রির মায়ের সংসার জানতে চাইল তৃণা নায়রির মায়ের কাছে।নায়রির মায়ের কাছে জানলো তৃণা অবর্ণনীয় দুঃখকষ্টের করুণ কাহিনী। কতদিন না খেয়ে থাকতে হয়েছে। শুধু শাকপাতা সেদ্ধ করে খেয়ে থেকেছে।কখনও হয়তো বাড়ির সাথে একফালি জমিতে  লাগানো গাছের লাউ পেপে কুমড়া এগুলো বিক্রি করে সংসার চালিয়েছে।মাঝি কষ্ট করে দু’বিঘা জমি কিনেছিল।শতকষ্টেও নায়রির মা জমি বেচেনি কারণ সে তার পিতাকে জমি বিক্রী করে নিঃস্ব হতে দেখেছে।শুধু ছেলেটা একটু বড় হওয়ার অপেক্ষা করেছে। নায়রির কোন চাচা ছিলনা।পাঁচ ফুফু।তাদের খুব আদরের ছোটভাই ছিল নায়রির বাবা।নায়রির মামা খালা ও ফুফুরা সে সময় অনেক সাহায্য করেছে। কিন্তু নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সবাই কত আর পারবে। নিজেরাই কোন রকমে খেয়ে পড়ে বেঁচে আছে। তবুও নায়রির মায়ের বক্তব্য তার কোন আত্মীয় স্বার্থপর নয়।তাদের যতটুকু সম্ভব সাহায্য করে। নায়রির মা কথা বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে ওঠে। বলে “বহিন বিটি ভ্যাস্যা গেলছে, স্বামীখানও পাগলা হইয়্যাছে একটুও কান্দিনিখো।ব্যাটাখানকে বুকে আ্যাগল্যা পাথর বাইন্ধ্যাছি।কিন্তু আফনাকে দেইখ্যা মরা বিটির কথা এত মুনে পহঢ়ছে ক্যানে বুঝছি না।তৃণা পরম আদরে নায়রির মাকে বুকের সাথে আগলে নিয়ে বললো মনে করো মা আমি তোমার সেই ভেসে যাওয়া মেয়ে। তুমি কাঁদো মা তাহলে হালকা হবে। মুহূর্তে পরিবেশ বেশ ভারী হয়ে উঠলো।সবার চোখে পানি।একসময় নায়রির মা থিতু হলো। তখন তৃণা তাদের কাছে বিদায় নিয়ে রওনা দিল বাসার উদ্দেশ্যে।ঠিক তখনই বাঁধের ওপর দোকানের চৌকিতে বসে থাকতে দেখল নায়রি পাগলাকে।উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।হয়তো আকাশের তারার মাঝেও খুঁজে ফিরছে নায়রিকে।

কয়দিন থেকে নায়রি নিয়ে ভাবতে ভাবতে তৃণাও যেন ডুবে গিয়েছিল ছোট্ট নায়রির মধ্যে। রাতে অনেকক্ষণ সে তার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বান্ধবী সাদেকার সাথে কথা বললো।তৃণা জানতে চাইল নায়রির বাবাকে এই সিভিয়ার ইল্যুশন থেকে বের করা যায় কিনা।তৃণা দৃঢ় সংকল্প আটলো যেভাবে হউক নায়রির বাবাকে সে সুস্থ করবে যতটা সম্ভব।

রাতে ঘুমের মাঝে তৃণা স্বপ্নে দেখলো এক বুক পানি থেকে উঠে আসছে পরীর মতো একটি মেয়ে আর তাকে আব্দার করছে আমার বাবাকে তুমি কি সুস্থ করবে? তৃণা মেয়েটির ছোট্ট হাত ধরে হেঁটে চলেছে পূবের নতুন সূর্যের প্রত্যাশায়।

ঠিক সেসময় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো আর দূর থেকে ভেসে আসছে গগন বিদারী আওয়াজ না–য়–রি—না—য়–রি—ই–ই—-।

সমাপ্ত।

ফারহানা শরমীন জেনী কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন