প্রত্যাগত (পর্ব-৪)

আবু সাইফা

সকাল সাতটার মধ্যে আনোয়ার জামা-জুতো পরে, গায়ে আতর খুশবু মেখে যতটা সাজগোজ পুরুষের জন্য প্রযোজ্য সাজলো। তারপর একলাফে গাড়ীতে চেপে বসলো। ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলতে হয়, কারণ চালকের ঠিক পেছনের আসনটাতে শার্শির ধারে সে বসার সুযোগ পেয়ে গেল। জীবনে মাত্র একবার তার বেনাপোল যাবার সুযোগ হয়েছিল, তাই সার্শা উপজেলা শহর পর্যন্ত রাস্তা সম্পর্কে তার একটা ধারনা ছিল।গাড়ী যখন সার্শা ডানপাশে রেখে বামে মোড় নিল, আনোয়ারের জীবনের মোড়ও যেনো বামে ঘুরতে শুরু করেছে।
এক নতুন পথ নতুন গন্তব্য, নতুন দৃশ্য আর একটু নতুন স্বপ্ন, যা তার জীবনে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিনত হয়েছিল। রাস্তার ধারে সারি সারি গাছপালা, পাখি, ইটের ভাটা, বড় চোঙা ওয়ালা টালি  পোড়ানোর ভাটা যা কিছুই তার নজরে এলো, মনে অভাবনীয় ভাবের সঞ্চার করতে শুরু করলো আনোয়ারের।কারণ স্বপ্নের রঙ সবসময়ই একটু মাধুরীময় হয়ে থাকে।যেখানটাতে যশোরের শেষ আর সাতক্ষীরার শুরু, সেখানে গাড়ী পৌঁছানোর পর এক নতুন সমস্যার কথা জানাগেল। নসিমন-করিমন ওয়ালাদের সাথে বাস শ্রমিকদের কি গোলযোগের কারণে সাতক্ষীরায় বাস ঢুকতে পারছে না। আনোয়ারের কপাল ভালো যে, তাদের গাড়ীটা সাতক্ষীরা – ঢাকা, দূরপাল্লার গাড়ী হওয়ায় প্রতিবন্ধকতা অনায়াসে উতরে গেল। গাড়ী এগিয়ে চলল।
মানুষের মন যে কত বিচিত্র তা বোঝা ভারি মুশকিল! কেউ কি তার মনের নাগাল আজ অবদি পেয়েছে?  আনোয়ারের মন নানান দুশ্চিন্তার জাল বিস্তার করতে শুরু করলো। প্রথম বাধাই আনোয়ারের মনের দরোজায় মৃদুভাবে ধাক্কা দিয়ে গেল। অকস্মাৎ তার রঙিন স্বপ্নগুলো কেমন যেনো পানসে মনেহলো। তার একবার  মনেহলো সম্মুখে স্বপ্নের রাজ্যে না গিয়ে পুরনো ডেরায় ফিরে যাওয়াই ভালো। তবে তা ঐ ক্ষণিকের তরেই। তার দৃঢ় সিদ্ধান্ত সে বদলালো না। ‘অর্ধেকের বেশি যখন এসেই পড়েছি, গন্তব্যে পৌঁছেই দেখা যাক।’ ঘড়ির কাঁটা যখন নয়টা চল্লিশে, গাড়ী কলারোয়া উপজেলা মোড়ে থামলো।
আনোয়ারের স্বপ্নে যে বামণখালী অঙ্কন করেছিল, তা ছিল কলারোয়া থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে কোন এক ছায়াবীথি গ্রাম, যেখানে গ্রীষ্মকালে কোকিলে গান গায়। মাছরাঙা টুপ্ করে দীঘির পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অসম্ভব এক সু্ন্দর গ্রাম! বাস থেকে নেমে আনোয়ার কয়েক কদম হাঁটলো দক্ষিণ দিকে। নবাগত হিসেবে একজনের কাছে জানতে চাইলো, বামণখালী কীভাবে যাওয়া যায়?  জানা গেল আরো একটু সামনে থেকে বামণখালীগামী ভ্যান পাওয়া যাবে।সে অগত্যা আরো একটু সামনে এগুলো। তের চৌদ্দ বছরের একটা ছেলে তার ভ্যাগগাড়ীর ড্রাইভিং সীটে বসে কি যেনো ভাবছে। আনোয়ার তার গলার সবটুকু দরদ ঢেলে দিয়ে বালককে ডাকলো, এই খোকা তুমি কি বামণখালী যাবে? — না আংকেল,আমি বামণখালী যাবনা তবে চার রাস্তার মোড় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারি। ওখান থেকে আপনি বামণখালীর অনেক ভ্যান পাবেন। বালক বিনয়ের সাথে জানালো। ভ্যানে চড়ে বসলো আনোয়ার।

চলবে ——–

আবু সাইফা কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন