আদর্শ বাবাও সন্তান

 

আমার বড় মেয়েটা কোন গল্প জানেনা। একটিও না। সে যা জানে তা হলো ইতিহাস। আমরা তাকে গল্প শুনাইনি কখনও।

প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে সে বলতে, “বাবা, একটা গল্প শোনাও।”
আমি তাকে বুকের উপর নিয়ে নবীদের জীবনী শুনাতাম। সাহাবাদের বিপ্লবী জীবন ও ত্যাগের ঘটনাগুলো শোনাতাম। আস্তে আস্তে তার স্টক বাড়তে লাগলো আর আমার স্টক লাগলো কমতে। তাকে শোনানোর জন্যেই আমাকে তাফসীর পড়া শুরু করতে হলো।

একদিন হঠাৎ করে খেয়াল করলাম, কুরআন মাজীদের প্রায় সব ঘটনাগুলোই সে শিখে নিয়েছে। প্রতিটি সূরার প্রায় আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার কারণ তার জানা।

তারপর কুরআন তেলাওয়াত শুনলেই সে পাশে এসে চুপটি করে বসে শুনতে থাকে। যখন নবীদের নাম, ফেরাউন-লাহাব-নমরুদের নাম আসে তখন তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। আমি জিজ্ঞেস করলে বলে, “এই ঘটনাটা আমি জানি।”
আমার আরবী তেলাওয়াতের অর্থ না বুঝতে পারলেও শুধু নামগুলো থেকেই তার ঘটনাটা মনে পড়ে যায়। আমি বলি, বলো তো এখানে কোন ঘটনাটার কথা বলা আছে?” সে তখন আমাকে শুনিয়ে দেয়।

কুরআনের ঘটনাগুলো মোটামুটি জানানো হয়ে গেলে, তাকে ইতিহাসের মহান মানুষদের জীবনী শোনানো শুরু করি। বছর খানেক আগে সে ভাঙা ভাঙা পড়তে শুরু করে। আমার স্ত্রী বলেন, “আরিবার জন্য কিছু গল্পের বই নিয়ে আসো। তার পড়ার অভ্যাসও হবে, গল্পগুলোও জানা হবে।”

আমার মেয়েটা রাজা-বাদশা, ভূত-প্রেতের গল্প কখনো শুনতো না। বলতে গেলেই বিরক্ত হয়ে থামিয়ে দিতো। আমি জানি, মিথ্যা আর কল্পণা এক নয়। মিথ্যা বললে বা জানলে ক্ষতি, কল্পণারগুলোতে ক্ষতি নেই। আমার সাথে সে একমত নয়। সে ইতিহাস শুনতে চায়। সত্যটা শুনতে চাই।

যাহোক, মেয়েটার জন্য বই কিনতে গেলাম। বাচ্চাদের উপযোগী একটা বইও পেলাম না। মানে আমার মেয়ের বয়সের সাথে উপযোগী বই। যা আছে তাতে হতাশ হলাম। আমাদের কালচারের সাথে বইগুলো কোন ভাবেই যায় না।

বই না নিয়েই বাড়ি ফিরলাম। ম্যাডাম রাগ করলেন। বললেন, “তাহলে কি মেয়েটা পড়া শিখবে না!”
আমি তাকে সমস্যাটি বুঝিয়ে বললাম। সে তখন কিছুটা অভিমান নিয়ে বললো, “তোমরা কি করো! দু’একটা বই তো নিজেরাও লিখতে পারো। বাচ্চাদের উপকার হয়।”

তখনই সিদ্ধান্ত নিই লিখবো এবং লেখা শুরু করি। মনে মনে ইচ্ছে ছিলো, এমনভাবে লিখবো যাতে সব বয়সীরা আনন্দ নিয়ে পড়তে পারেন। আলহামদুলিল্লাহ। আমি খুব সন্তুষ্ট। আমার “বনসভা” বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষককে দিয়ে রিভিউ করিয়েছি। তারা যে কম্প্লিমেন্ট করেছেন তাতে আমি আবেগাপ্লুত।

আরিবার বয়স এখন সাতে পড়লো। সে বইয়ের কিছু অংশ পড়েছে। যতটা পড়েছে তাতেই সে বেশ খুশি। রোজই জিজ্ঞেস করে, “তোমার বইটি কি এসেছে?” এখন সে ক্যালেন্ডার দেখে ফেব্রুয়ারী আসতে আর কতদিন!

এটা আমার জন্য একটা সিদ্ধান্তই বলতে পারেন। আমি কখনো শুধু বিনোদনের জন্যে কিছু লিখবো না। আমি যদি এক কলমও লিখি, লিখবো একটা মেসেজ দিতে। সুন্দরের মেসেজ। নৈতিকতার মেসেজ। সবার দোয়া চাই। আমাদের বাচ্চারা ট্যাব কিংবা মোবাইল নয়, বই নিয়ে বেড়ে উঠুক। নৈতিকতা নিয়ে বড় হোক।

আসাদুজ্জামান জুয়েল- সাহিত্যিক ও উপন্যাসীক 

আরও পড়ুন