আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কি সনদ বিক্রির দোকান?

আবু ওবাইদ

কিছুদিন আগে ব্লগার সৈয়দ মাহি আহমেদ-এর একটা লেখা পড়ে অনেকের মতো আমিও আঁতকে উঠেছিলাম। লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘অশিক্ষিতদের বিশ্ববিদ্যালয়’ । লেখাটিতে লেখক বলতে চেষ্ঠা করেছেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান মনে করা হলেও , এখানে যারা পড়ান ও পড়েন তাঁরা জ্ঞান , বিজ্ঞান , প্রগতি , সৃজনশিলতা ও মননশিলতার চর্চা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা করবেন এমনটি কাম্য । কিন্তু তাঁরা এগুলো করেন কি ? না । এখানে অধিকাংশ শিক্ষক চান পদ , আর শিক্ষারথীরা চায় অর্থ ও সনদপত্র । এগুলো পাবার জন্য যা প্রয়োজন তারা তা-ই করেন । দলাদলি , চাটুকারী , তোষামোদি , খুনাখুনি , হানাহানি , মারামারি , পলিটিক্যাল লবিং , ইত্যাদি । তাঁদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এমন কিছু নেই যে তারা তা করতে পারেন না । যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকরা দিনরাত নেতানেত্রীদের তোষামোদী , চামচামি ও তেল মালিশ করায় ব্যস্ত থাকেন,অধ্যাপক , বিভাগীয় প্রধান , ডিন ইত্যাদি পদের জন্য। আর বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখায় মন নেই , তারা সৎ , সংস্কৃতিমনা , রুচিবান ও মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষ হতে চায় না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ গুরু ও শিষ্যরা জ্ঞানের সাথে অসংশ্লিষ্ট , তারা বিজ্ঞান ও গবেষণার চর্চা করেন না , করেন না সৃজনশিলতা ও প্রগতশিলতার চর্চাও । ফলে , এখান থেকে আর আলোকিত মানুষ বের হতে পারছে না , যা বের হচ্ছে- তা হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশিলতা , কুসংস্কার , অন্ধবিশ্বাস , মূর্খতা , গোড়ামি , নোংরামি ইত্যাদি অর্থ ও ক্ষমতালোভী অমানুষ।

আমাদের উচ্চ শিক্ষার মান নিয়ে এ শিরোনাম যে ভিত্তিহীন নয় সেটিই প্রমাণ করলো এশিয়ার সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নাম নেই। তালিকায় জাপান, চীন, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আধিপত্য থাকলেও ভারত, সৌদি আরব, থাইল্যান্ডের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এতে স্থান করে নিয়েছে। এতে আমাদের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের উচ্চ শিক্ষার পার্থক্য স্পষ্টতই পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরা কেবল জ্ঞান বুদ্ধিতে নই, সাধারণ চিন্তাচেতনা থেকেও প্রতিবেশী দেশগুলির চেয়ে পেছনে পড়ে আছি।
তালিকায় ভারতের নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ঠাঁই পেয়েছে। সর্বোচ্চ স্থানটি দখল করেছে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়। তালিকায় জাপানের ১৯টি ও চীনের ২১টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান করে নিয়েছে।

দেশে ৩৮টি পাবলিক এবং ৮৪টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও এর কোনোটিই বিশ্বের সেরা ২০০০ এর মধ্যে নেই। এমনকি এশিয়ার সেরা ৭০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকাতেও নেই দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। ১০০ সেরা তালিকায় জায়গা পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গের আইআইটি খড়গপুর আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।আইআইটি খড়গপুরে মূলত ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয় আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা এবং বিজ্ঞান বিভাগও রয়েছে।

আমাদের দুর্ভাগ্য যে, দেশের ১২২টি বিশ্ববিদ্যালয় মূলত প্রথাগত শিক্ষায়তন হিসেবে কাজ করছে, যা জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের মাঝেই সীমাবদ্ধ। এখানে নিত্যনতুন জ্ঞান সৃষ্টি করার মতো গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি করা যেমন সম্ভভ হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য ডিগ্রি দেওয়া নয়, বরং জ্ঞানসৃষ্টি, অনুশীলন ও গবেষণা। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের লেখাপড়া পুরোপুরি মুখস্থবিদ্যা নির্ভর। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মেধাহীনদের দাপট। বেশির ভাগই সনদ বিক্রির দোকান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ধুঁকছে সেশনজটে। শিক্ষার মান তলানিতে। সব মিলিয়ে উচ্চ শিক্ষায় বিশৃঙ্খলা চরমে।

সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষা বা পুঁথিগত বিদ্যা নয়, দরকার আলোকিত মানুষ গড়ার জন্য সৃজনশীল শিক্ষা। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বকীয়তা নির্ভর করে দক্ষ, মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষকের ওপর। বিদেশে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে অবশ্যই পিএইচডি ডিগ্রিধারী হতে হয়। অন্ততপক্ষে দু’চারটি পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার অভিজ্ঞতা তাদের থাকে। এখানেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রয়েছে বিস্তর ফারাক। উচ্চ শিক্ষায় আমাদের যে হযবরল অবস্থা তাতে আগামী বিশ-ত্রিশ বছরেও আমাদের কোন বিশ্ববিদালয়ের স্থান হবে না ওই তালিকায়।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.