রাতের তারা

সানিয়া আঁখি  

আনন্দের সাথে রাফিন দৌড়ে  বাড়ির দরজা কড়া নেড়ে ডাকলো মা, মা,মা,……..
-জানো, আমি ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছি!…
চোখে মুখে তার আনন্দের ঝিলিক।
-দরজা খুলো মা….
-ঐ তোরে না বলছি স্কুলে যাওয়ার আগে লন্ড্রি থেকে রুবার জামা নিয়ে আসতে । মনে ছিলোনা গোলামের বাচ্চা।   এই বলে রাহেলা বানু দরজা খুলে  কসে এক চড় বসিয়ে দেয় রাফিনের গালে।
হঠাৎ রাফিন সম্বিৎ ফিরে পায়।  আরে ইনি তো ওর আসল মা না। মাতো তিন মাস হলো ওকে ফেলে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
ভুলে গেছে রাফিন। ভুলে গেছে মা  নাই। মনে পড়ে ওর, এইতো দু’বছর আগে, ও যখন ক্লাস  এইটে এ প্লাস পেয়েছিল, তখন বাড়ি এসে মাকে বলতেই মা ওকে জড়িয়ে ধরেন। কপোলে চুমু একে দেন। ওর পছন্দের খাবার রান্না করে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু আজ………  মাতো মা-ই! ও ভেবেছিলো আপন মায়ের মতোই হয়তো এই মা ও ওকে  কপোলে চুমু একে দিবে, আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে।  কত কিছু ভাবতে ভাবতে বাড়ি আসে। অথচ মায়ের কাছ থেকে পায় এমন আচরণ! যা রাফিন ভাবতেই পারেনি।সৎ মায়েরা কেন এমন হয়?  আর আপন মায়েরা কেন এতদ্রুত চলে যায়? ভাবতেই ওর চোখের পাতা ঝাপসা হয়ে ওঠে। কষ্টরা সব দলা পাকিয়ে  বুকের মাঝে এসে চাপা দেয়। আজ খুশির দিনে ওর বুক ভরা কষ্ট! হায় নিয়তি…………lলন্ড্রি থেকে রুবার জামা এনে ও হাতমুখ ধুয়ে বাবার সাথে খেতে বসে।
-রাফিন তোমার রেজাল্ট কেমন হলো?
-এইতো আলহামদুলিল্লাহ্‌,  ভালো। বাবা,  আমি ফাস্ট হয়েছি।
-হুম… ভালো করে পড়তে হবে। এস এস সি তে তোমাকে গোল্ডেন মার্কস পেতে হবে।
-ইন শা আল্লাহ, বাবা।
ছেলের প্রতি বাবার উপদেশ দেখে রাহেলা বানু যেন হিংসায় পুড়ে যাচ্ছেন।
খাওয়া শেষে রাফিন বিছানা শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে লাগলো। ভালো লাগছে না ওর। শুয়ে থাকতেও ইচ্ছে করছে না। একটা চেয়ার টেনে বারান্দায় গিয়ে বসলো।
বিকেলে পাখির কিচিরমিচির সূর ওর খুব ভালো লাগে। কিন্তু আজ পাখির সূরে ওর হৃদয়ের বেদনা আরো বেগবান হচ্ছে। এত কষ্ট ও সহ্য করতে পারছে না। পাখির কলতানে হৃদয়ের বয়ে চলা বেদনা  আর ভালো লাগছে না।
হঠাৎ রুবা পাশে এসে বলল-

-জানো ভাইয়া আমরা নানুর বাড়িতে যাবো।
-কবে?
-কাল যাবো।
-কে, কে যাবা?
-আমি আম্মু আর বাবা।
-আমাকে সাথে নিবে না?
: আমিতো তোমাকে নিতে চাই । কিন্তু আম্মু যে………
-থাক, ভাইয়াকে নিতে হবে না।  আমার অনেক পড়া আছে।
-আচ্ছা ভাইয়া আম্মু যে তোমার সাথে এমন করে, তোমার কষ্ট হয় না।
-আরে নাহ্!  কেন হবে? তাছাড়া আম্মুরা তো একটু বকাঝকা দিবেই।

– মিথ্যে কথা।  আমি জানি তোমার খুব কষ্ট হয়।
রাফিন চুপ হয়ে যায়। তার মানে কি রুবা ওর কষ্ট বুঝে।
-রুবা……….! রাফিনের সৎ মা রুবাকে ডাকছে ;
-আম্মু ডাকছে, যাও।
রুবা  রাফিনের  সৎ মায়ের মেয়ে। ক্লাস টুয়ে পড়ে ও। রাফিন ওকে অনেক আদর করে।রুবাও রাফিনকে ছাড়া কিছু বুঝে না। কিন্তু ওর আম্মু এই মিল সহ্য করতে পারে না। ……..

সন্ধ্যা গড়িয়ে মাগরীবের আজান দিলে রাফিন নামাজ পড়ে প্রতিদিনের রুটিন মতো পড়তে বসে। ওর মায়ের ইচ্ছাটা ওকে পূরণ করতে হবেই।ওকে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবেই। রাত দশটা পর্যন্ত পড়ে রাতের খাবার খেয়ে ও ঘুমোতে যায়। আজ আকাশে জোসনার চাঁদ। জোসনা ওর মায়ের খুব পছন্দ ছিল। প্রতি জোসনার রাতে ওকে নিয়ে মা  ছাদে যেতো। গান গেয়ে ওর ঘুম পাড়াতো।
ঘুম না আসায় ও ছাদে যেতে চাইলো।চুপিসারে আস্তে দরজা খুলে ও ছাদে গেল। আকাশে জোসনার চাঁদ দেখে ওর ভালো লাগে।জোসনার চাঁদের আলোর অনিন্দ্য গাছের পাতার দৃশ্যটি মনের রং তুলিতে একে  যাচ্ছে আর বলছে মায়ের সেই প্রিয় কবিতাটি,

র্নিঘুম চোখের অপলক দৃষ্টিতে
              জোসনার আলো মেখেছি গায়ে ভরা পূর্ণিমা রাতে ।
         চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে পাতায় পাতায়
        অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্যটি এঁকেছি মনের খাতায়।              

চাঁদের সাথে যেন ওর মায়ের খুব সখ্য ছিল। কিন্তু আজ ওর মনে হচ্ছে ওর মা যেন চাঁদের রূপ ধারণ করে ওর সারা শরীরে আলো বিলিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিচ্ছে।  মা ওকে ছুঁয়ে দিচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, ও কল্পনায় মায়ের ছোয়া অনুভব করছে। আজ সৎ মায়ের আচরণটা ও মনে মনে মায়ের কাছে বলছে,আর বিড়বিড় করছে
-জানো মা, ওনার আচরণে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। আমার আনন্দে  ওনার আচরণ এখনও আমায় পোড়াচ্ছে।আনন্দের সময় কেউ কষ্ট দিলে তা ভোলা যায় না। মা তুমি কেন হারিয়ে গেলে।কেন…….!! !
কিছুক্ষণ ছাদে থেকে ও রুমে এসে বিছানায় পিঠ লাগায়।  জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে ওর বিছানা পড়ছে। মায়ের স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে আগামীর সোনালী  স্বপ্ন নিয়ে ও ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে। মায়ের স্বপ্নরা ওকে স্বাগত জানায়। সাথে চাঁদটিও ওকে আলোর পরশ দিয়ে চুমোর রেশ একে দেয়, ঠিক ওর মায়ের মতো।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.