গোরের বাতাস

সুমাইয়া আফরোজ

চুপিচুপি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজেকে দেখে লজ্জ্বায় মিশে যায় শিমু। এই ‘দস্যি’ মেয়েটা হঠাৎ ই এমন লজ্জাবতী হয়ে উঠেছে। কৈশোরের চপলতা মিইয়ে যায় নি এখন তবুও কথায় কথায় এই লাজুকতা যেন সেই চঞ্চলতার ভেতরে নারীত্বের এক অপরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টি করে দেয়। আসলে এর রহস্য হলো কিছুদিন থেকে তার বিয়ের সম্বন্ধ আসা শুরু হয়েছে।

ছোটবেলা থেকে সংসারের অভাব অনটন, দিনমজুর বাবার হাড়ভাঙা খাটুনি আর রোগা মায়ের চোখের পানি দেখতে দেখতে প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছে শিমু। তাই বিয়ের সম্বন্ধ এলে পড়াশুনার অযুহাতে বুক ফেটে কান্না আসে না বরং একটা টোনাটুনির স্বচ্ছল ঘর বাঁধার স্বপ্নে এই লাজুকতার পর্দা পড়ে যায় চোখেমুখে।

গরীব বাবা মা মাদ্রাসায় ‘আলিম’ পর্যন্ত পড়িয়েছে এই তার কাছে ঢের, ছেলেমেয়েকে দিব্যি ছোটবেলার পড়াশুনা নিজে করিয়ে দেয়ার যোগ্যতা সে অর্জন করেছে, তাই আর ভাবনা কিসে?

আর সম্বন্ধ গুলোও খারাপ না, বিয়ের বাজারে মাদ্রাসা পড়া নম্র ভদ্র মেয়ের কদর এখনো শেষ হয়ে যায় নি।

অন্তত খাওয়া পরা নিয়ে ভাবতে হবে না। তাই সবাই রাজীও হয়ে যায়।

এর মাঝে হঠাৎ একদিন বিদেশে থাকা কাজিন এর ফোন আসে শিমুর বাবার কাছে, বাবা পরম আনন্দে মেয়ে বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আলোচনা করেন ভাগ্নের সাথে, কথায় কথায় বলে ফেলেন মেয়েটা আল্লাহর রহমতে এখন দেখতে শুনতে বেশ হয়েছে তাই আর চিন্তা নেই…

এসব শুনে ভাগ্নে ‘মামাবাড়ির আবদার’ করে বসে।

মামাকে অভয় দিয়ে বলে তার কলিজার টুকরোকে সে নিজের ঘরে নিয়ে যেতে চায় তখন আর মামার কোন কষ্ট থাকবে না, মেয়েটার সাথে সাথে তাদের সবার দায়িত্ব নিতে সে রাজী।

শিমুর বাবার খুশি আর ধরে না। বিদেশ থেকে কত টাকা পয়সা নিয়ে এসে তার ভাগ্নে মেয়েটাকে বিয়ে করবে, কত সুখের সংসার হবে তাদের…

ভাবতে ভাবতে চোখে জল আসে অপরিসীম পিতৃস্নেহে।

মেয়েকে কাছে ডাকে,

কিছু বলতে পারে না, শুধু চোখের জল মুছে চলে যায়,

শিমু কিছু না বুঝে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, বাবার চোখে জল দেখে নিজের চোখও ছলছলিয়ে ওঠে।

ভাগ্নে কথা রাখে,

দেশে ফিরেই বরবেশে আসে মামাবাড়িতে,

ছোটবেলা থেকেই মামাবাড়িতে তার যেটা পছন্দ হতো সেটা সে সাথে করে নিয়ে তবেই বাড়ি ফিরতো, এবারও তাই হলো সদ্য কৈশোর পার করা মামাতো বোনের লাজরাঙ্গা মুখখানি পছন্দ হওয়ায় একেবারে বৌ সাজিয়ে নিয়ে তবেই সে ফিরলো। অভাবের সংসারের এক কন্যাদায়গ্রস্থ পিতাকে এত সহজে মুক্ত করায় চারদিক ধন্যি ধন্যি পড়ে গেলো।

কৃতজ্ঞ শিমু এখন তার ঘর সাজাতে ব্যস্ত,

আর তার বর আরও বেশি ব্যস্ত তাকে সাজাতে। শিমু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বিদেশ থেকে আনা মেকাপ বক্স, শ্যাম্পু আর বডি লোশনের দিকে, তার চাহনি যেন জানতে চায়

‘এত্ত কিছু আমার জন্য?’ তার বর গর্বের হাসি হাসে আর বলে এ আর তেমন কি!

সুখ স্বাচ্ছন্দ্য মানুষের চেহারাকে আরও দীপ্তময় করে তোলে, শিমুরও তাই হলো।

এরই মাঝে শিমু হঠাৎ অনুভব করল তার অনাগত সন্তানের অস্তিত্ব।

এবার দু জনেই একটু নড়ে চড়ে বসে।

আর এভাবে চলে না,

এবার সংসারী হতে হবে। দায়িত্ব বাড়ছে। জমানো টাকায় রাস্তার মোড়ে বড় একটা দোকান করে ফেললো ছেলেটা আর শিমু বাড়িতে গরু আর ছাগল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

দিন যায় ব্যস্ততা বাড়ে। ছাগলের বাচ্চা হয়েছে তিনটা, তাদের উপদ্রবও কম নয়। শিমু রাঁধে বাড়ে, গরু ছাগলের যত্ন করে, দিন শেষে যখন বর ক্লান্ত হয়ে ফেরে তখন তার সেবাযত্ন করে। তার ভেতরের মাতৃত্বও যেন প্রবল হয়ে উঠেছে। সবাই প্রতি যত্ন তার বেড়ে গেছে বহুগুণ, কমেছে শুধু নিজের ক্ষেত্রে।

সারাদিন বমি বমি ভাব হয়, কিছু খেলে বেশি হয় তাই সে খায় না,

যখন শরীর বেশি দূর্বল হয়ে পড়ে তখন অসময়ে শুয়ে পড়ে, বাইরে থেকে শাশুড়ির উঁচু গলা ভেসে আসে,

“এখানকার বৌ ঝি দের কথা আর কি বলব মা, একটা নয় দুটো নয় অমন পাঁচটা পেটে ধরেছি। ঢেঁকিতে ধান ভেনেছি পুরো আট মাসে, আর এখনকার বৌদের আদেখলেপনা দেখলে কি আর বলব বাছা, আমার মত শাশুড়ি বলে রক্ষে, আর বলার ই বা কি আছে, ভায়ের ঘর থেকে এনেছি, তাই কিছু বলি নে’

টলতে টলতে ঘর থেকে বের হয়ে আসে শিমু, গরুকে খাবার দেয়, গোয়ালঘর পরিষ্কার করে।

বর ফেরে রাতে,

শিমুর শীর্ণ মুখটা দেখে প্রথমটায় কষ্ট পায় সে নিজেও, মেয়েটা রাতেও ঘুমাতে পারে না, চোখের নিচে কালো দাগ। ফোলা ফোলা গাল দুটো কেমন বসে গেছে।

যে মুখপানে চেয়ে তার দিনের ক্লান্তি দূর হতো তা আর আজ নেই, এই কষ্টটা দিনে দিনে নিজের অজান্তেই বিরক্তিতে রূপ নেয়।

সেদিন দোকান বন্ধ করে রাতের বেলা সবে পা দিয়েছে বাড়িতে,

মায়ের চেঁচামিচি শুনে সেদিকে গিয়ে দেখে মা বলে চলেছে,

‘ফকিন্যির ঘরের মেয়ে আজ জমিদার হয়ে গেছে, ওরে একদিন যে ভাতের অভাবে উপোস করে ছিলি আজ সেই হাড়ির ভাত তুই ছাগল দিয়ে খাওয়াস? দুপুরবেলা পড়ে পড়ে মহারাণীর ঘুমাতে হয়, ছাগলের আর কি দোষ দিবো?”

এমনিতেই নানা কারণে মেজাজ ভালো ছিলো না, তারওপরে মায়ের মুখে এসব শুনে সে আর স্থির থাকতে পারে না, দরজার লাঠি হাতে নিয়ে আচমকা দু ঘু বসিয়ে দেয় শিমুর পিঠে।

ঘটনার আকস্মিকতায় শিমু স্তব্ধ হয়ে যায়।

একটু পরে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যায় মেঝেতে।

এবারে খানিকটা ভয় পেয়ে যায় শিমুর বর,

সকালবেলা তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।

কিছুদিন পর দুর্বল শিমুর গর্ভে জন্ম নেয় আরেকটি দূর্বল প্রাণ মেয়ে। বাপের বাড়ি থেকে তড়িঘড়ি করে শিমু ফিরে আসে শ্বশুরবাড়ি, যত কষ্টই এখানে হোক, বুড়ো বাপ মায়ের অভাবের সংসারে থেকে সে আর তাদের দুঃখ বাড়াতে চায় না।

ছোট্ট শিশুটি তাকে আঁকড়ে বড় হতে থাকে আর অপুষ্টিতে তার নিজের শরীর জীর্ণ থেকে জীর্ণতর হয়। সেদিন গরুকে খাবার দিতে গিয়ে পানির ভারী বালতি উঠাতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে যায় শিমু। তারপর গা হাত পা কাঁপতে থাকে,

শাশুড়ি কবিরাজ ডাকে,

কবিরাজ এসে চোখ দেখে বলে “কবরের বাতাস ” লেগে এমন হয়েছে।

মেয়েটা তার থেকে পর্যাপ্ত বুকের দুধ পায় না, সে রাতে নিজেও ঘুমায় না আর মাকেও ঘুমাতে দেয় না। এত ধকল সামলাতে গিয়ে শিমুর মেজাজ অনেকটাই রুক্ষ হয়ে যায়, সে শাশুড়ির কথার জবাব দেয়,

তখন শাশুড়ি তার গোরের বাতাস লাগা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়, তবে ছেলের কাছে অভিযোগ করতে ভোলে না কখনো।

ছেলে ঘরে যায় আর তারপর শিমুর কান্নার উচ্চ শব্দ ভেসে আসে বাইরে।

দিন যায় এভাবেই…

এইতো সেদিন,

শিমুর মেয়ের কান্না কিছুতেই থামছে না, আর একই সাথে চলছে শাশুড়ির বকাবকি, রাগে কষ্টে নিজেকে সামলাতে না পেরে দুধের মেয়েটার নরম গায়ে কয়েকটা থাপ্পড় বাসিয়ে দেয় শিমু, আর সে সময়ে বাড়ি ফেরে মেয়ের বাবা।

তার তারপর…

সেই ঘর ভাঙার আওয়াজ।

আজ শিমু কাঁদে না,

দৌড়ে পালায় না,

তার প্রাপ্য শাস্তি হিসেবে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে থাকে।

আর একসময় লুটিয়ে পড়ে মাটিতে।

সম্বিৎ ফিরে পায় তার বর, হাতের লাঠি ছুড়ে ফেলে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে,

‘এ আমি কি করলাম”

তার মা ছুটে এসে মুখ চেপে ধরে,

‘চুপ কর, তুই কিছু করিস নি, গোরের বাতাস লেগেছে’

ছেলে নির্বাক।

ছোট্ট মেয়েটা হামাগুড়ি দিয়ে মাটিতে ঘুমিয়ে থাকা মায়ে চুল ধরে টানে, মায়ের আঁচল ধরে ডাকে, এই কদিন হলো সে প্রথম ডাকতে শিখেছে ‘মা’ ‘মা’ বলে। যে ডাক শুনে কিছুতেই স্থির থাকতে পারে না শিমু, আজ সেই ডাকে কোন সাড়া নেই তার।

গোরের বাতাস লেগেছে যাকে তাকে কি আর ঘরের ডাকে সাড়া দিলে চলে?

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.