মৌমাছির মধু তৈরির রহস্যময় ও বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া

আসাদুজ্জামান জুয়েল

পৃথিবীতে সবচেয়ে পরিশ্রমী পতঙ্গ হলো পিঁপড়া। তারপরে কে? উত্তর তো নিশ্চয় জানেন। হ্যাঁ, আপনার ধারণাই সত্য, মৌমাছি। মজার কথা হলো, মৌচাক আমরা সবাই দেখেছি, এটাও জানি যে, একটা মৌচাকে গড়ে ষাট হাজার মৌমাছি থাকে। কিন্তু, এই বিশাল সদস্যের রাষ্ট্রটি(মৌচাক) চলে রাণীর শাসনে।

মৌচাকের ভেতরে রাণীর জন্য একটা বিশেষ ওয়াক্স সেল তৈরী করা হয়। এই বিশেষ কক্ষটির নাম হলো,”কুইন্স চেম্বার”। এখান থেকে রাণী শাসন কাজ পরিচালনা করেন। কোন মৌমাছি নিজের ঘর ছাড়া অন্য কোথাও যেতে পারবে না। শুধু রাণী মৌমাছি সমস্ত রাজ্য অর্থাৎ মৌচাক পরিভ্রমণ করতে পারবেন।

ফুলের পরাগ ও আসবের সংমিশ্রণে বিব্রেড নামে এক ধরণের খাদ্য তৈরী করে খায় মৌমাছি। রাণীর খাবার আলাদা না হলে চলে! তাঁর জন্য তৈরী হয় আঠালো ধরণের এক ধরণের খাবার। নাম হলো,” রয়েল জেলি”। উপাদেয় খাবার খেয়ে রাণী বাঁচে ২-৪ বছর আর শ্রমিক মৌমাছি বাঁচে ২-৪ মাস। ও হ্যাঁ, মৌচাকে তিনটি শ্রেণীর বাস। রাণী, শ্রমিক এবং পুরুষ মৌমাছি। আমরা তো বলি, নারী হলো অকর্মার ঢেঁকি, কোন কাজ করে না। যদিও কথাটা ভুল তবু মৌমাছিদের ক্ষেত্রে এক্কেবারে ঠিক। তবে উল্টোটা। পুরুষ মৌমাছি কোন কাজ করে না শুধু বসে বসে খায়।

মৌচাকে তিন ধরণের ঘর থাকে। মধু উৎপাদনের জন্যে সবচেয়ে বড় এবং গভীর ঘর, পুরুষ মৌমাছির জন্য মাঝারী তবে অগভীর এবং সবশেষে শ্রমিকদের জন্য ছোট এবং অগভীর।

অনেকের ধারণা, মৌমাছি ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। কিন্তু ধারণাটি শতভাগ ভুল। তাহলে কিভাবে মধু তৈরী হয়? এখানে রয়েছে এক মজার তথ্য। মৌচাকের শ্রমিক মৌমাছিদের দায়িত্ব বন্টণ করা থাকে। মৌচাকে থাকে গবেষণা সেল। থাকে অনুসন্ধানী সেলও মানে সার্চ কমিটি। এই সার্চ কমিটির সদস্যরা সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে নেক্টার আছে এরকম ফুল খুঁজতে। পেয়ে গেলেই হলো। মৌচাকের দিকে তাকিয়ে মাথার উপরে লাগানো এ্যান্টেনা দিয়ে মেসেজ পাঠায় মৌচাকে। এবার সংগ্রাহক বাহিনী ঘন্টায় ৮-১৫ কিঃমিঃ গতিতে উড়ে হাজির হয় সার্চ কমিটির ঐ সদস্যের কাছে। সংগ্রাহকের গলায় থাকে একটি ব্যাগ বা থলে। সেটাতে করে নেকটার নিয়ে আসে মৌচাকে। এই নেকটারে ৮০ ভাগ পানি থাকে আর ২০ ভাগ থাকে শর্করা। মৌমাছির পাকস্থলীতে থাকে ইনভারটেক নামের এক ধরণের জারক রস। এই জারক রস নেকটারকে নিষিক্ত করে থ্রোকটোজ ও গ্লুকোজ তৈরী করে। এগুলো জমা থাকে চাকের গভীর কোঠায়। রাতে শ্রমিক মৌমাছি চুষে মুখে নেয় ঐ গ্লুকোজ। তারপর প্রচন্ড গতিতে পাখা চালিয়ে বাতাস দেয়। সেই বাতাসের কারনে নেকটারের জলীয় অংশ ১৭-১৮ ভাগ নেমে আসলে তা খোপে পুরে খোপের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়।

এবার আসে করুণ পরিণতি। এত কষ্টে তৈরী হওয়া মধু চলে যায় গবেষণা ল্যাবে। যাদের মধু খাঁটি তারা তা চাকে সংরক্ষণের সুযোগ পায়। যাদের টায় ভেজাল বা বিষ আছে, তাদেরটা ছুঁড়ে ফেলা হয় এবং ভেজাল মধু উৎপাদনকারীদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। কেন এই নির্মমতা? পরে বলছি।

আগে বলে নিই, মধু হলো একমাত্র খাদ্য যা কখনো পচে না। এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা কুড়ি হাজার প্রজাতির মৌমাছি পেয়েছেন। ইঙ্গিত দিয়েছেন, অচিরেই এই সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাবে।

মৌমাছিরা এই সায়েন্স শিখলো কিভাবে! মৌচাকের যে কোঠা বা খোপ তৈরী হয়, তা হয় ষড়ভূজ আকৃতির। এই জ্যামিতি তারা কোথায় পেল। বাসা বাঁধতে হবে কোথায়, সেটাই বা জানলো কিভাবে! চলুন ঘুরে আসি আল-কুরআনের মৌমাছি সূরা থেকে। মৌমাছির আরবী হলো, “নাহল”। সূরা-নাহলের ৬৮-৬৯ নং আয়াতে মহান স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা বলেন-

তোমার মালিক মৌমাছিকে নির্দেশ দিয়েছেন, পাহাড়ের গায়ে, গাছের ডালে, এবং অন্যকিছুর উপর যা তোমরা বানাও (ঘরের চাল বা ছাদ) তার ওপর নিজেদের থাকার ঘর নির্মাণ করো। অতঃপর প্রত্যেক ফল থেকে (রস/ নেকটার আহরণ করে তা) খেতে থাকো, অতঃপর তোমার মালিকের (নির্ধারিত) পথ ধরে পূর্ণ আনুগত্যের সাথে (সেদিকে) এগিয়ে চলো। এভাবে তার পেট থেকে রং বেরঙের পানীয় দ্রব্য বের হয়, যার মধ্যে মানুষের নিরাময়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এতে নিদর্শণ রয়েছে তাদের জন্য যারা আল্লাহর সৃষ্টি বৈচিত্র্য নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে।

বলেছিলাম, ভেজাল মধু উৎপাদনকারী মৌমাছিকে কেন মেরে ফেলা হয়, পরে বলবো। উত্তর নিশ্চয় পেয়ে গেছেন। হ্যাঁ, যা আল্লাহ মানুষের জন্যে রোগের নিরাময় বলেছেন তাতে ভেজাল মেশালে তো মৃত্যুদন্ডই হবে। এটা তো আর মানুষের আইন নয়। ভেজাল ঔষধ উৎপাদনকারীরা এদেশে পুরষ্কার পেলেও মৌচাক আইনে এটা মৃত্যুদন্ডে দন্ডনীয় অপরাধ।

বুখারী শরীফে মুহাম্মাদ (সাঃ) এর একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেখানে তিনি বলেন,

মধু সকল রোগের মহৌষধ আর কুরআন সকল মানসিক রোগের মহৌষধ। এজন্য আমি তোমাদের দুটো প্রতিবিধান সুপারিশ করছি, কুরআন আর মধু।”

আসাদুজ্জামান জুয়েলঃ লেখক ও পাখি বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.