অহনা কথা বলে না

জুম্মি নাহদিয়া

 

         মিমি

প্রচণ্ড শীতের বাতাসে একটা আলাদা ঘ্রাণ থাকে। সবাই পায় কিনা জানিনা। আমি পাই। ইমরুলকে বিয়ের পর পর জিজ্ঞেস করেছিলাম এই ব্যাপারে। সে পাঁচ সেকেন্ডের মত বাইরে মাথা  বের করে তারপর কষে জানালা বন্ধ করে দিল । খুব সিরিয়াস গলায় বলল, “নাক মুখ বরফ হয়ে গেছে। টোকা দিয়ে দেখ টং করে শব্দ হয়,  তাই মনে হয় ঘ্রাণ জায়গামত পৌঁছাচ্ছে না…সরি মিমি, আমি কোন ঘ্রাণ পাচ্ছি না”

পাশের বাসার এমিলিকে জিজ্ঞেস করতে হবে, দেখি। আসলে এই দেখি পর্যন্তই। আমার হাতে অত সময় আসলে নেই এইসব অনুভূতি, ঘ্রাণ, বাতাস টাতাস নিয়ে গল্প জুড়ে দেয়ার। অহনা জীবনে আসার পর থেকে আমার দিন রাত সব এক হয়ে গিয়েছে। তবু পুরনো খেয়াল মাথায় চাপে হঠাৎ হঠাৎ।  অহনাকে আপাদমস্তক কাপড়ে মুড়ে ঘরের সব জানালা খুলে দিই  আর শীত বাতাসের ঘ্রাণ একদম হৃদয়ের শেকড় থেকে নিই।

কি অসম্ভব ভাল লাগে আমি বোঝাতে পারবো না। আমার ডেকে ডেকে সবাইকে ঘ্রাণ নিতে  বলতে ইচ্ছা করে। সবার নাসারন্ধ্র নিশ্চয়ই ইমরুলের মত বরফবান্ধব না। এখানে অবশ্য আমার খুব বেশী সবাই নেই।  বুড়ি এমিলি, মোড়ের বেকারীওয়ালা জরিস আর সব্জীবিক্রেতা নেদা ছাড়া আমাদের নতুন এলাকার কাউকে আমি তেমন চিনি টিনি না। আর আমরা খুব বেশীদিন হয়নি এখানে এসেছি ।  তিন মাসের বাবু কোলে নিয়ে এসেছিলাম- বয়স এখন কত হল?ছ´মাস… হ্যা,ছ´মাসই তো। এখনই তো একা একা উপুড় হবার কথা, হিজিবিজি কথা শুরু করার কথা।

মেয়েটা ওর বাবার মত অলসের ঝাঁ হয়েছে। ঘুমপ্রিয়ও হয়েছে। পড়ে পড়ে শুধু ঘুমায়। এই যে এখন এই অবেলায় হা করে ঘুমুচ্ছে। আমি ঘুম থেকে তুলে খেলনা সামনে এনে দিলে তবে যদি মহারাণীর মর্জি হয়।  বেবীকট থেকে তুলে এনে ঘুম ভাঙ্গাতে ইচ্ছা করছে খুব। ইচ্ছা করছে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করতে, “অ্যাই মা! তুমি কি বাতাসের ঘ্রাণ পাও? শীত বাতাসের?” কিন্তু থাক। ঝামেলা করে লাভ নেই। হুটহাট বাচ্চাদের ঘুম থেকে তুলতে নেই। বুক ধুকপুক করবে।

       ইমরুল

মিমি জানেনা আজকে যে আমি অফিস ফাঁকি দিয়ে পার্কের বেঞ্চিতে বসে আছি। মন মেজাজ ভাল না। সাধারণত মেজাজ খারাপ থাকলে আমি এখানে আসি। এই বেঞ্চ খালি পেলে বসি নাইলে অন্য বেঞ্চে বসে লোকজন দেখি। লোকজনের কর্মকাণ্ড দেখে আমি যে খুব আনন্দ পাই তা না। এই যেমন সামনে বসে দুই বৃদ্ধ দেশ-সমাজ নিয়ে টক শো করছে< আমার আনন্দ লাগছেনা। কিন্তু ওই বিকেলটা চোখের সামনে বারবার আসে।  বিকেলটা এখানেই আসে, তাই উপায়হীন হয়ে আমিও এখানে আসি। অনেকেই মনে করবে এখানেই বোধহয় মিমির সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল, অথবা আমি ওকে ম্যারি মি এই বেঞ্চের আশে পাশে বসেই বলেছিলাম। আসলে এই ধারণা পুরোপুরি ভুল। এখানে আমি আর মিমি প্রথম এসেছিলাম অহনা যখন মিমির পেটে  সারাক্ষণ গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকত।

গ্রীষ্মের বিকেলে আমরা সেদিন এদিকটাতে বসেছিলাম। পার্কটা একদম চুপচাপ না। সারাক্ষণ এখানে কেউ না কেউ কথা বলছে, জগিং করছে, খেলছে, খেলার ধারাভাষ্য দিচ্ছে। শুধু আমরাই চুপচাপ ছিলাম। আমি চুপ করে আমার প্রথম প্লেনে ওঠার কথা ভাবছিলাম।  মাঝখানের আইলে দুই পাশে দুই  বিরক্তিকর সহযাত্রী নিয়ে সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়েছি ভাবলে এখনও গা শিরশির করে। মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছিল তবু সাহস করে সিট চেঞ্জের কথা বলতে পারিনি। আমার সাহস বরাবরই কম। আমি  ভীতু মানুষ। ভীতু মানুষেরা অনেক সময় বিনা চিন্তায় এমন এমন কাজ করে ফেলে যেটা  করতে গেলে মহাবীর আলেকজান্ডারও বেশ অনেক সময় নিতেন, সময় নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতেন, মন শক্ত করতেন।

বাঁ পাশের বুখারেস্টগামী  ঘুমন্ত প্যাসেঞ্জারের মাতাল মুখের গন্ধ স্মৃতির বুকে বাড়ি মারার সাথে সাথে  সেদিন টের পেলাম মিমি ফুঁপিয়ে উঠলো।  অহনার তখন সাড়ে তিন মাসের কিছু বেশী চলে । আমরা আসলে নামও রেখে ফেলেছিলাম। অহনা। কেন রেখে ফেলেছিলাম কে জানে। চাইনি সন্তান সন্ততি নিয়ে আগাম এত কিছু ভেবে ফেলতে।  কিন্তু হয়ে গেল। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পেতাম একটা কোঁকড়া চুলের ছোট্ট মেয়ে মন খারাপ করে টেবিলের নীচে বসে আছে।  বাসার গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছু যেমন চাবি, ওয়াশিং মেশিনের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল, ধরা পড়ে মায়ের কঠিন বকা খেয়েছে ।  অপেক্ষা করছে বাবার ফেরার। ফিরলেই ঝপ করে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ঝাঁপিয়ে পড়ার পর কি গান শোনানো যেতে পারে সেটাও অবচেতন মন বলে দিত।  ওই যে অন্তরা চৌধুরীর বুলবুল পাখির গানটা।

এই দ্যাখো, কি কাণ্ড! বুড়োরা টক শো বন্ধ করে আমার দিকে তাঁকিয়ে আছে! “কোন বনে কোনখানে বাসা তোদের- ছোট্ট একটা বাচ্চা আছে আমাদের” লাইন দুটো একটু উঁচুতে উঠিয়েই গাইতে হয়। ওঠাতে গিয়ে গলা বেশী চড়ে গেল বোধহয়। হেঁড়ে গলায় ভীনদেশী গান বুড়োদের স্তব্ধ করে দিয়েছে।

            মিমি

ইমরুল কিন্তু খুউব খেতে ভালবাসত। এক বাটি  স্যুপ নুডলসও  ও যে কি রুচী করে খেত! আহারে!  অহনার কারণে অনেকদিন ওর জন্য যত্ন করে রাঁধা হয়না। আজকে তাই ছোট বাচ্চা সামলে সুমলে আমি অনেকগুলো ফেন্সি খাবার রাঁধলাম। সারপ্রাইজ দেব প্ল্যান করেছি তাই ঘুণাক্ষরেও কিচ্ছু বলিনি । আবার এমিলিকে বলেছি ডিনার করতে। বিকেল থেকে এসে বসে আছে। এখন অহনাকে কোলে নিয়ে রাজ্যের রুপকথা শোনাচ্ছে। আমি বলেছি একটু জোরে শোনাও প্লিজ যাতে কিচেন সাফ করতে করতে আমিও শুনি। সেই কবে ছোটবেলায় মা শোনাতো! ঝুঁটির দাড়ি রাজার ছেলের গলপ!

                ইমরুল

বাসটা বেশ ফাঁকা। ইদানিং আমাকে মিমির রোগে পেয়েছে। মাথার ভেতর দুনিয়ার চিন্তা ভাবনা এসে ঘাঁই মারতে থাকে। অথচ আমি চিন্তাশীল লোক কখনোই তেমন ছিলাম না। যদি ছিলামই তাহলে আজকে মিমির টেক্সট পেয়ে সেল ফোনটা আছাড় মেরে ফেলে দিতে ইচ্ছে  হত না।  স্বাভাবিকভাবেই  মলের স্টপেজে নামতাম। মিমির অর্ডারমত হাল্কা কমলা দেখে বাচ্চার জামা কিনে বাসায় ফিরতাম, ক্লিপ সহ। কিন্তু রিপ্লাই দিয়েছি, “বেটার ইউ গো উইথ দ্যাট । দ্যাট নিডস ফ্রেশ এয়ার ফর সাউন্ড স্লিপ।” তারপর অনেক জোরে সেল ফোন পকেটের ভেতরে ফেলে দিয়েছি। আমার ইদানিং মিমিকে সহ্য হচ্ছেনা। একদম সহ্য হচ্ছেনা। আর ওইটাকে আরও না। ড্যাব ড্যাব করে যখন আমার দিকে চেয়ে থাকে তখন আরও বেশী না।  মিমি জেদ করে ওটাকে দু জনের মাঝখানে ঘুম পাড়ায়। ওটার নরম উজ্জ্বল শ্যামলা হাত পা যখন আমার গায়ে লাগে তখন ছুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করে। একদম পিষে ফেলতে ইচ্ছা করে! মিমি মরেই যাবে তাই ইচ্ছেটাকে জোর করে চেপে রাখি।  এত বেশী চাপতে চাপতে কোনদিন আবার আমি নিজে মরে যাই!

                মিমি

নাহ! সবকিছু এখন থেকেই নিয়মে বেঁধে ফেলতে না পারলে পরে দুর্ভোগ হয়। ইমরুলের দেরী দেখে এমিলি সামান্য একটু খেয়ে চলে গেল। আমি খাইনি। তবে অহনাটা এমিলি থাকতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়ার ওর এই অভ্যাস আমি ধরে রাখতে চাই ।  রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত জেগে থাকা বাচ্চাদের সকালে উঠে স্কুলে যেতে অনেক কষ্ট হয়। আমি একটা বড় মানুষ, এই আমি যখন অর্ধেক রাত দোকানে ডিউটি দিয়ে বাড়ি ফিরে আবার শেষ রাতে বেরোতাম  ভোরের ক্লাস ধরার জন্য, ক্লাসে ঢোকার পর কি আমার পড়ালেখা করার কোন অবস্থা থাকতো? কি ভয়ঙ্কর সময় ছিল তখন!

ঠিক এমনই এক সময়ে তুমি  এসেছিলে  অহনা!  আসার খবর পেয়ে সারাটা রাত কেঁদেছিলাম। ভয়ে। নানান আশঙ্কায়। তোমার বাবা পেল অতিরিক্ত ভয় । সে ভীতু মানুষ।  বেশী ভাবলে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেনা। তাই একদম আগ পিছ না ভেবেই আমাকে একদিন দুম করে বিয়ে করে ফেলেছিল। ভাবাভাবি করলে যদি বিয়ের সাহস উবে যায়! আমি কিন্তু মোটেও ভীতু না। কিন্তু আমিও কেন  ভাবনা চিন্তা ছাড়া দুম করে ওকে বিয়ে করে ফেললাম? বেশী সাহস  আর বেশী ভয় একসাথে  মিলে কিরকম তালগোল পাকিয়ে ফেলল বলোতো?

                 ইমরুল

পালিয়ে বাঁচতেই বাসাটা পাল্টেছি। মিমি রাজী ছিল না। এটা সেটা বলে রাজী করিয়েছি। একটা প্রচণ্ড খারাপ লাগা, রাগ- ক্রোধ সবকিছু কাজ করত শাদা দেয়ালগুলোর দিকে তাঁকালে। ক্রমাগত বাজে গ্রেড পাচ্ছিলাম। একদম ক্রমাগত। যদি রিকভার করতে না পারি তাহলে লাথি মেরে ইউনিভার্সিটি থেকে বের করে দেবে। মিমির গ্রেড অবশ্য মোটামুটি ভালই ছিল। এরকম হাড়কালি করা কাজ করে দু ঘণ্টা ঘুমিয়ে এর চেয়ে বেশী গ্রেড আশাও করেনা কেউ। আমি পিজ্জা দোকানের ওপরে  আর তেমন কাজ পাচ্ছিলাম না। সারা জীবন পরিশ্রম না করার অভ্যাস। পিজ্জার দোকানে তেমন সুবিধা করতে পারিনি। ইউনিভার্সিটি লাথি মারার আগে ভুঁড়িওয়ালা পিজ্জা দোকানের মালিক মেরে দিল। এখন অন্য কোথাও কাজ খোঁজো!

বাসায় ফোন করিনা। আমার এই দুঃসাহসিক বিয়ে শাদীর খবর বাসায় জানেনা। মিমির বাসাতেও কেউ জানেনা। ওর বাবা বিশাল এক ব্যবসায়ী পাত্র ওর জন্য ঠিক করে রেখেছে। পাত্র খুবই টিপটপ। সারাক্ষণ কমপ্লিট স্যুট পরে ঘোরাঘুরি করে।  তাই দেখে মিমির মাইগ্রেনের ব্যথা ওঠে।  সেই ব্যথা নামাতে ও নাকি এলোমেলো আমাকে বিয়ে করেছে! আচ্ছা,  ও কি  আমার সাথে ইয়ার্কি করে?

                    মিমি

তুমি তখন মাত্র এসেছ ।কিচ্ছু খেতে পারিনা। কিচ্ছু না। পানিও খেতে পারিনা। পুরো পৃথিবী চোখের সামনে উল্টো হয়ে ঝোলে। রাত বিরেতে দোকানে দাঁড়াতে পারিনা আর। সেদিন গেলাম মাথা ঘুরে পড়ে। পড়ালেখার নাম শুনলে বমি আসে। বই খাতা দেখলে বমি আসে। মানুষ দেখলে বমি আসে। তোমার বাবাকে দেখলে ঠেলে ঠুলে  বমি আসে। আচ্ছা, আমি তোমার সাথে খামাখা এত বকবক করছি কেন? তু্মি কি আমার কথা কিছু বোঝ? এখনও পাশ ফিরে ঘুমাতেও শেখোনি বাচ্চা! আমার নিজের ছোওট্ট…একদম এইটুক একটা মেয়ে! কবে বড় হবে তুমি? তোমার সাথে গল্প করতে পারার ইচ্ছেটা দিন দিন কত বড় হচ্ছে, তুমি বুঝতে পারো?

 

ইমরুলের সাথে কথা বলে আমার পোষায় না। ও কেমন বদরাগী লোকগুলোর মত ঝামটা মেরে কথা বলে। ও বুঝতে পারছেনা ওর সিরিয়াস অ্যাটিচুট প্রবলেম আছে। এত রাগ, এত রাগ বাবারে বাবা! রাগে পাগলই হয়ে গেল! কোথায় কি রাখে কিছু মনে থাকেনা। আমার এইটুক বাচ্চার সাথেও আজকাল মেজাজ দেখানো শুরু করেছে! ছোট্ট একটা সোনার মেয়ে, তার সাথে কিসের এত মেজাজ? আজকে দ্যাখো মা, কিরকম দায়সারা রিপ্লাই দিল! বৃষ্টির মধ্যে আমি এখন তোমাকে নিয়ে বাজারে যাই আর কি! মাথাটা খারাপ হয়েছে আমার, হ্যাঁ? আর আমি এই গোঁয়ার মানুষটার জন্য  তোমাকে অলমোস্ট কোলে নিয়ে দ্যাখো কতকিছু রান্না করলাম! প্রত্যেকটা ওর পছন্দের খাবার।  আমি কি আমার পছন্দের খাবার রেঁধেছি একটাও!

                    ইমরুল

আমি মিমির জন্য কেন উতলা হলাম সেটা আবার মনে আনতে গিয়ে মনে হুট করে অন্য খেয়াল এলো। পথে নেমে পড়লাম। মিমি…মিমি…! তোমাকে ভয়ঙ্কর কষ্ট দিতে ইচ্ছা করে। পারিনা-পিছিয়ে যাই। জামা আমি কিনবো, ক্লিপও কিনবো। তবে হালকা কমলা না। লাল রঙের। টেবিলের নীচে যে চার পাঁচ বছরের বাচ্চাটা মুখ ভার করে বসে থাকে ওর জামার রঙ আমি লালই দেখেছি।  কোঁকড়া চুলে আবার ঝুঁটি বেঁধেছে লাল ব্যান্ড দিয়ে। দেখি খুঁজে দেখি পাই কিনা।

কাল মার্টিনের সাথে ক্যানিবাল হলোকাস্ট মুভিটা নিয়ে কথা না বাড়ালেই পারতাম। একটা মানুষ আরেকটা জীবন্ত মানুষকে ছিঁড়ে খুঁড়ে……একটা মানুষ আরেকটা জীবন্ত মানুষকে ছিঁড়ে খুঁড়ে উফ!! অসহ্য-অসহ্য-অসহ্য!!

উঁহু! আমি ভায়োলেন্স একদম নিতে পারিনা। আমি ভুলতে চাই ওসব। তারচেয়ে বরং জামা কেনার দিকে মনোযোগ দিই। কি রঙের জামা যেন? ও হ্যা লাল। দশ সপ্তাহ বয়সে আলট্রাসনোগ্রাম করার সময় আমরা দু জনেই ডক্টরকে একদম একসাথে জিজ্ঞেস করেছিলাম “ও মাই গড!  ওই লাল ছোট্ট ওইটা কি? “ডক্টর স্মিত  হেসে বলে, হার্ট। ইভেন আ ফিটাস হ্যাজ এ হার্ট অ্যান্ড ইট বিটস ”

হঠাৎ নিজের বুকের কাছে হাত চলে যায়। এলোপাতাড়ি একটা জিনিস খুঁজি।

                 মিমি

রাত বাজে নয়টা। ইমরুল ফেরেনি। ফোনও ধরছিল না। আমিও হাল ছাড়িনি। ছ্যাঁচড়ার মত ডায়াল করেছি বারবার।  ভাল করেছি না?শেষ পর্যন্ত ঘুঘু ঠিকই ফোন ধরেছে। কিন্তু একটা কথাও বলেনি। একটা কথাও না।  আমিও জিজ্ঞেস করিনি, “তুমি কই? কখন আসবা?”

কেন যেন বুকের ভেতরের অভিমান দলা পাকিয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগল। আমি আকুল হয়ে বললাম, “অহনা কথা বলে না! ”

               ইমরুল

আমি আসলে  সময়ে অসময়ে আমার নিজের হৃদয়টাকে খুঁজি। হারিয়ে ফেলেছি মনে হয়, ওটার কোন অস্তিত্ব টের পাইনা।  মিমি যখন উন্মাদিনীর মতো প্রতিদিন নতুন করে অভিযোগ জানায় যে অহনা কথা বলেনা তখন আমি খুঁজে পাওয়ার বিন্দু আশাটাও  হারিয়ে ফেলি।

(চার মাসের পৃথিবী অভিজ্ঞতায় মানুষ কতটা মানুষ হয়ে ওঠে? অথবা মানবিক? ক্ষুধা, পিপাসা, আর ভয়ের অনুভূতি তো তারও থাকে। অ্যামনিওটিক ফ্লুয়িডের ভেতর একটা মানুষ মগ্ন থেকে থেকে মানবিক হবার অপেক্ষায় নিরুদ্বেগ ছিল বেশ। একদিন হঠাৎ ক্ষত-বিক্ষত হবার সুতীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় সে কি কেঁদে উঠেছিল একদিন? আঁকড়ে বাঁচার জন্য খুঁজেছিল কাউকে?

জীবনের অভিজ্ঞতাটা ছিল চার মাসের। সবটুকু শেষ করে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয়া তেমন সহজ বিষয় ছিল না। মাতৃত্বের তীব্র অনুভুতিতে বিপর্যস্ত মিমিকে অর্ডার দিয়ে একটা রি –বরন পুতুল পুষতে হত তারপর; এবং আরও তারপর। সারাদিন একটা মানব শিশুর মতই যত্ন আত্তি করত। আশে পাশের এমিলিদের বাধ্য করত আদিখ্যেতা করতে। শুধু দিন শেষে চিৎকার করে কাঁদত আর অহনার ´কথা না বলার´ কথা বলত।

আর ইমরুল? দান উল্টে ফেলার সুযোগের আশায় অফিস আদালত শিকেয় রেখে একটা পার্কে বসে থাকত। ক্লিনিকের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করত। গুচ্ছের লাল জামা কিনে পুড়িয়ে ফেলতো তবু রি-বরন পুতুলশিশুকে দিত না। ইমরুলের বাসায় ঢোকার চাবিটা মাঝে মাঝে ওয়াশিং মেশিনের ভেতর খুঁজে পাওয়া যেত।)

জুম্মি নাহদিয়াঃ লেখক ও জার্মানি প্রবাসী বাংলাদেশী

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.