কাশ্মীরের গল্পঃ কবর খনক

মূলঃ মুনাওয়ার হুসাইন

ভাষান্তরঃ হোসেন মাহমুদ

: মিসাম, দ্যাখ ! আমার ফেসবুক পোস্টটাতে অসংখ্য লাইক পড়ছে। সিগারেটটা ধর। আমি আরো লাইক পাওয়ার কৌশল তোকে দেখাচ্ছি।’

: তোর কি মাথা খারাপ! কেউ যদি আমাকে সিগারেট হাতে দেখে ফেলে তখন!

: আরে দ্যাখ দ্যাখ! আমি আমার নিজের স্ট্যাটাসে রি-লাইক দিয়েছি। আমার বন্ধুদের টাইম লাইনে তা আবার দেখা যাবে। যে বোকা প্রথমবার এটা এড়িয়ে গেছে সে এখন এটা লাইক করতে বাধ্য হবে।

: ওয়াও! এ কৌশল তুই কোথায় শিখলি?

: আরে বুঝলি না, আমি এ যুগের মানুষ।

: নেকড়েগুলো গর্জন করতে শুরু করেছে, শিগগিরই তারা দল বেঁধে বেরিয়ে আসবে। তোর কি গত বছরের কথা মনে নেই?

আমরা পাহাড়ের নীচে হাঁটছিলাম, হাসছিলাম, গান গাইছিলাম, কথা বলছিলাম। আমি ও আমার চাচাতো ভাই। তারপর আমরা যখন আমাদের শহরে ফিরলাম তখন দিনের শেষ। পৃথিবীর এ অংশে তখন একটি রাত রেখে আপাতত বিদায় নিচ্ছিল সূর্য। আমরা দেখতে পেলাম, হাজার হাজার লোক শহর চত্বরে জড়ো হয়েছে। তাদের সবাই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে, ‘হাম কেয়া চাহতে- আজাদি’ (আমরা কি চাই- আজাদি)। তাদের গর্জন আকাশে অনুরণিত হচ্ছিল। আমি এর পিছনের কারণ জানতাম। বন্দুকযুদ্ধে কেউ নিহত হলে তখনি এ রকম প্রতিক্রিয়া হয়। সারা কাশ্মীরই তো আজ এক রণাঙ্গন। কয়েক লাখ ভারতীয় সৈন্য অস্ত্রের ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছে। কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে স্বাধীনতা যোদ্ধারা। এই যোদ্ধারা কোনো অভিযানে যায় নিজেদের জীবন দেয়ার জন্যই। শত শত ভারতীয় সৈন্য তখন তাদের ঘিরে ফেলে। কয়েক ঘন্টা ধরে প্রচন্ড বন্দুক লড়াই চলে। তারপর রক্তপিপাসু ভারতীয় সৈন্যরা তাদের হত্যা করে নিজেদের হাত রঞ্জিত করে। বুঝতে পারছি, আবার কাশ্মীরের কোনো সন্তান দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। আমরা সেখানে ছুটে গেলাম।

পরিচয় জানতে পারলাম নিহর্তে। ছেলেটি স্কুলে আমার সহপাঠি ছিল। সাথে সাথে আমার মনে পড়ে যায় কিন্ডারগার্টেনে পড়ার সময় ম্যাডাম একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমার জীবনের লক্ষ্য কি? সে জবাব দিয়েছিল- ম্যাম! আমি একজন ডাক্তার হতে চাই। এক বছর আগে সে নিখোঁজ হয়। পরে নিশ্চিত খবর পাওয়া যায় যে সে স্বাধীনতা যোদ্ধাদের সাথে যোগ দিয়েছে। আমরা দু’জন মসজিদের দিকে দৌড়াই। ফিরে আসি দু’টি বেলচা হাতে।

ওহো! আমার পরিচয়ই আপনাদের দেয়া হয়নি এতক্ষণ। আমার নাম মিসাম, বাবার নাম আলি আহমেদ, তিনি জীবিত নেই। আমার মা বলেন, ’৯০-এর দশকে বাবা সীমান্ত পেরিয়ে ওদিকে চলে গিয়েছিলেন। আর ফিরে আসেননি বা আসতে পারেননি। তার লাশের কোনো খবরও আমরা পাইনি। হাই স্কুল পর্যন্ত পড়ে আর পারিনি। সংসার চালাতে কাজে নামতে হয়েছে। আমাদের পরিবারের পেশা হল কবর খোঁড়া। শুধু কবর খোঁড়াই নয়, সে সাথে দাফনও। অর্থাৎ কোনো লাশ দাফনের জন্য কবর খোঁড়া ও কবর দেয়া আমাদের কাজ।

আমার বয়স চব্বিশ বছর। এ বয়সে আমি ২শ’ কবর খনন ও সেগুলোতে লাশ দাফন করেছি। তার মধ্যে ১শই ছিল কাশ্মীরের স্বাধীনতা যোদ্ধাদের। যা হোক, আমরা দু’জন কবর খুঁড়তে শুরু করলাম। একেকটি কবর খুঁড়তে ঘন্টা দেড়েক সময় লাগে। তা শেষ হওয়ার পর আবেগময় পরিবেশে শহীদের লাশ দাফন সম্পন্ন হল। শান্তিপূর্ণ ভাবে মাটির কোলে চিরদিনের মত শায়িত হল সে। কয়েকজন মাওলানা আল্লাহর প্রশংসা কীর্তন করে এ লাল গোলাপটির বেহেশত নসীবের জন্য প্রার্থনা করলেন।

সহিংসতা কখনোই আমার পছন্দ নয়। একজন পেশাদার কবর খনক হয়েও আমি কখনোই লাশ দেখতে চাই না। যখনি আমি কোনো মৃত মানুষকে দেখি, যখন দেখি চারজন মানুষ কাঁধের খাটিয়াতে একটি মৃতদেহ বয়ে আনছে, তখনি আমার মেরুদন্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়। আমি ভেবে পাই না, যে লোকটি তারই মত আরেকটি লোককে হত্যা করেছে, তার অন্তর কি দিয়ে গড়া। যে একটি প্রাণকে এ পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত করতে পারে, সে কি মানুষ? তার হৃদয়ে কি দয়া-মায়া নেই? সে কি বিশ্বে কারো ভালোবাসা পায়নি? কাউকে ভালোবাসেনি? এ সব প্রশ্ন সব সময় আমাকে তাড়িত করে।

২.

একদিন আমাদের শহরে বৃষ্টি হচ্ছিল। চারদিক নীরব, সব কিছু যেন থেমে আছে। দুপুর বেলা বৃষ্টি বন্ধ হলে আমরা মাঠে গেলাম বাড়ির ভেড়াগুলোর জন্য ঘাস-পাতা যোগাড় করতে। সময়টি এমন যে দিনের বেলাতেও চলাফেরা করা বিপজ্জনক । কয়েক মাস ধরেই কাশ্মীরে স্বাধীনতার লড়াই জোরালো হয়ে উঠেছিল। শত শত তরুণ ও শিক্ষিত লোক বাড়ি ছড়ছিল। নাম লেখাচ্ছিল স্বাধীনতা যোদ্ধাদের দলে।

আমরা একটা বিরাট গাছ থেকে পাতা ভরা ছোট ছোট ডাল কাটছিলাম। এ সময় থেমে থেমে হাসির শব্দ বাতাসে ভেসে আসছিল। হাসির উৎস সন্ধানে চারদিকে ঘুরে ফিরছিল আমার চোখ। তখনি দেখলাম ছয় – সাত জনের একটি দল আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আমরা আমাদের প্লাস্টিক ব্যাগে ডালগুলোর পাতা ভরতে থাকি।

এরা মুক্তিযোদ্ধা। ভারত সরকার তাদের বলে সন্ত্রাসী। আমি আগেও মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেছি। আরে আশ্চর্য! এ দলটিতে একাধিক মেয়েও আছে দেখছি। প্রত্যেকের কাঁধ থেকে ঝুলছে এ কে-৪৭। হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। দলের একটি মেয়ের চুল কেটে ছোট করা, নীল চোখ, জিনস পরিহিত।

মেয়েদের একজন সাথের এক মুক্তিযোদ্ধাকে জিজ্ঞেস করে-

: রাজা ভাই! গাছের ডাল কাটছে, এরা কারা?

রাজা নামের মুক্তিযোদ্ধাটি আমাকে ডাকলেন। তিনি বোধ হয় দলের নেতা। এ জায়গা ও আশপাশের খবর জিজ্ঞেস করলেন। আমি মুখ খুললাম-

: স্যার…

তিনি থামিয়ে দিলেন আমাকে-

: আমি তোমার স্যার নই।

থতমত খেয়ে বললাম-

: আমরা পাশের গ্রামের লোক। প্রায়ই আমাদের পশুগুলোর খাবার সংগ্রহ করতে এখানে আসি আমরা।

: ঠিক আছে, তোমরা তোমাদের কাজ করো। তবে বেশিক্ষণ এখানে থেকো না। ঘাস-পাতা সংগ্রহ শেষ করে বাড়ি চলে যাও।আমাদের কথা কাউকে বলো না।

দলনেতার সাথে কথা বলায় আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। আমার চোখ বার বার চলে যাচ্ছিল তার পিছনে থাকা মেয়ে মুক্তিযোদ্ধাটির দিকে। তার চেহারা থেকে যেন শক্তি ও সাহস বিচ্ছুরিত হচ্ছিল।

আলো ছড়াচ্ছিল সে। আমার ভেতরটা সে আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছিল। আমি তার মুখ থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না। সে আমাকে সম্পূর্ণ মোহিত করে ফেলেছিল। আমি বার বার তার চোখের দিকে চাইছিলাম। সে আমাকে ঐ স্থান ত্যাগ করতে ইশারা করল। ডান হাতে একটি সুন্দর বালা পরেছিল মেয়েটি। আমার সারা হৃদয় জুড়ে তখন মধুর মুগ্ধতার আবেশ। আমি তার সাথে আবার দেখা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকি।

৩.

হঠাৎ প্রচন্ড আওয়াজ হল। তারপর দরজায় কে যেন সজোরে আঘাত করতে থাকে। তাকিয়ে দেখি, ঘড়িতে রাত তিনটা বাজে। এ সময় আমার চাচাতো ভাই আমার নাম ধরে ডাকতে থাকে। তাড়াতাড়ি উঠে দরজা খুলে দিতেই সে বলে-

: সিসাম, পাশের গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ভারতীয় সৈন্যদের লড়াই চলছে। জলদি কাপড় পরে নে। গ্রামের সবাই সেখানে যাচ্ছে। তাদের বাঁচাতে হবে।

সর্বনাশ! বছর তিনেক ধরে ভারতীয়রা এই পথ ধরেছে। স্বাধীনতা যোদ্ধারা কোথাও অবস্থান করছে জানতে পারলেই গাড়ির পর গাড়ি বোঝাই ভারতীয় সৈন্য ছুটে আসে। মুক্তিযোদ্ধারা কখনো এক বা দুজন, কখনো পাঁচ-সাত জনের একটি দল প্রয়োজন অনুযায়ী কোথাও আশ্রয় নেয়। অবস্থানের কথা ফাঁস হলেই তাদের চেয়ে দশগুণ বেশি ভারতীয় সৈন্য এসে গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে। লড়াই যতক্ষণই চলুক তাদের কোনো সমস্যা নেই। কারণ, তাদের গুলি-গোলা, লজিস্টিক সাপোর্ট অফুরান। কিন্তু স্বাধীনতাদের সবই সীমিত। তাদের গুলি থাক আর ফুরিয়ে যাক, ভারতীয় সৈন্যরা কাউকেই আটক করে না। কাউকে আত্মসমর্পণ করারও সুযোগ দেয় না। সেখানেই গুলি করে শেষ করে দেয়। বোঝা যায়, উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তারা এ নীতি নিয়েছে। এটা হচ্ছে ঠান্ডা মাথায় তাজা খুন। কাশ্মীরিরা ভারতীয় সৈন্যদের এ বর্বরতা দেখে শিউরে উঠছে। তাদেরই সন্তানদের এভাবে খুন করা তারা মেনে নিতে পারছে না। তাই যখনি কোথাও এ রকম ভারতীয় অভিযানের খবর তারা জানতে পারে, আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ গিয়ে সেখানে জড়ো হয়। তারা ভারতীয় সৈন্য ও মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে আড়াল হয়ে দাঁড়ায় যাতে ছেলেগুলো সরে যেতে পারে। কিন্তু প্রথম দিকে কয়েকবার এ চেষ্টা সফল হলেও ভারতীয় সৈন্যরা এখন আর তাদের সে সুযোগ দেয় না। তারা এমনভাবে স্বাধীনতা যোদ্ধাদের ঘেরাও করে যে গ্রামবাসীরা আর তাদের মধ্যে ঢুকতে পারে না। তারপরও কাশ্মীরিরা চেষ্টা ছাড়েনি। এ রকম ঘটনা ঘটলেই চারদিকে মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে পড়ে, সবাই দৌড়ায় ঘটনাস্থলের দিকে। চাচাতো ভাই সে খবরই এনেছে।

যত দ্রুত সম্ভব জামা-কাপড় পরে চাচাতো ভাইয়ের সাথে রওনা হলাম। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। হত্যাকান্ড শেষ করে চলে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠছিল ভারতীয় সৈন্যরা ।

সেই নিশুতি রাতে আমি ফিরে এসে দৌড়ে গেলাম মসজিদে। দু’টি বেলচা নিয়ে ফিরে এলাম। এবার আমাকে সাতটি কবর খুঁড়তে বলা হল। তিন বছর আগে আমি একসাথে ছয়টি কবর খুঁড়েছিলাম। চাচাতো ভাইকে ডাকলাম। তারপর মাটি খুঁড়তে শুরু করলাম দু’জন।

কবর খোঁড়ার সময় দুই বৃদ্ধ ব্যক্তির মধ্যকার কথা আমার কানে আসে। তাদের একজন বলছিলেন-

: আহা, আমাদের সোনার ছেলেমেয়েগুলো কিভাবে যে প্রাণ দিচ্ছে! দখলদার ভারতীয়দের কবল থেকে কাশ্মীরকে মুক্ত করার জন্য দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেল তারা। কে জানে আমাদের আর কত রক্ত দিতে হবে! আচ্ছা, হায়েনাগুলো জানল কি করে যে এই মুক্তিযোদ্ধারা এখানে রয়েছে?

দ্বিতীয় বৃদ্ধ বলেন-

: আরে ভাই! তুমি কি ইতিহাসের কথা ভুলে গেছ? আমরাই কি আমাদের বড় শত্রু নই? ভারতীয়রা আমাদের কাশ্মীরীদের মধ্যে চর তৈরি করেছে যেমন ইংরেজরা অগুণতি ভারতীয় চর তৈরি করেছিল। এ চরেরা টাকা পায়। তার বিনিময়ে স্বাধীনতা যোদ্ধাদের খবর পেলেই জানিয়ে দেয় ভারতীয়দেরকে। সে ভাবেই কোন চর যেন এদের খবর জেনে যায়। সাথে সাথে সে খবর পৌঁছে দিয়েছে ভারতীয়দের কাছে। ছুটে আসে হায়েনার দল। ঘিরে ফেলে তাদের। শুরু হয় লড়াই। কেউ সরে যেতে পারেনি। হিংস্র ভারতীয় সৈন্যরা বাঁচতে দেয়নি কাউকে। তুমি কি জান, এ দলে দু’তিনটি মেয়ে মুক্তিযোদ্ধাও ছিল? শহীদ হয়েছে সবাই।

তার কথাগুলো আমার সমস্ত সত্তাকে কাঁপিয়ে দিলো। আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম-

: সে মেয়েটিও কি শহীদ হয়েছে? আমি কি করে তাকে কবর দেব? তাকে কবর দেয়া কি আমার পক্ষে সম্ভব? এই তো, মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেই তো তাকে দেখলাম। সে কি করে মারা যেতে পারে?

কবর খুঁড়তে খুঁড়তে এ প্রশ্নগুলো আমার মাথার মধ্যে অবিরাম ঘুরপাক খেতে থাকে।

*গল্পটির লেখক মুনাওয়ার হুসাইন কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এম.এ করেছেন। ২০১৭ সালে ‘কাশ্মীর লিট’ ( জ্বলন্ত কাশ্মীর) নামক একটি অনলাইন ম্যাগাজিনে তার এ গল্পটি প্রকাশিত হয়। গল্পটির ইংরেজি নাম ‘দি ডুমড গ্রেভডিগার।’

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.