মুবাশশ্বিরের কৌতূহল

হাছনা বিনতে বোরহান

সব ব্যাপারেই মুবাশশ্বির কৌতুহলী।ওর থেকে লুকিয়ে বা ওকে এড়িয়ে কোনো কিছুই করা যায় না।কি,কিভাবে,কেন হচ্ছে,কেন হয়নি ইত্যাদি প্রশ্নে ওর আম্মু মাঝে মাঝে খুব বিরক্ত হন।ওর কৌতুহলী প্রশ্নের কয়েকটি উদাহরণ থেকে ওর  আম্মুর বিরক্তির কারণ বুঝা যায়।যেমন-সকালে ওদের বাসার মেইড রেশমী খালার সামনেই বলে ফেললো, ‘আম্মু রেশমী খালা কি অমুসলিম, হিজাব পরে আসে না যে? ‘আবার সন্ধ্যায় ওর আব্বুর অফিস কলিগগরা ওদের বাসায় এসেছিল,ওনারা চলে যাওয়ার পর ওর আব্বু কে বললো, ‘আব্বু আপনি বিধর্মী দের অফিসে জব করেন?’বিস্মিত হয়ে ওর আব্বু বললেন, না,তো বাবা,  আমাদের অফিসের সবাই ই মুসলিম। ছোট্ট মুবাশশ্বির আফসোস এর সাথে ভাবলো, কেমন মুসলিম ওনারা? কারো ই দাঁড়ি নেই, ইশার আযানের পরে কেউই মসজিদে গেলো না।হিন্দি গানের মিউজিককে মোবাইলের রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করছে।মুবাশশ্বির ওর আব্বু কে প্রশ্ন করলো, আব্বু আপনি এই আংকেলদেরকে সাবধান, সচেতন হওয়ার জন্য কখনো কিছু বলেছেন? ওর প্রশ্নে নির্বাক হয়ে গেলেন ওর আব্বু।

ইদানীং মুবাশশ্বির প্রশ্ন করা কমিয়ে নিজে নিজে উত্তর জানার চেষ্টা করায় ওর আব্বু আম্মু কিছুটা স্বস্তি পেলো।প্রত্যেক শুক্রবার আসরের পরে ওদের এলাকার মসজিদের ঈমাম সাহেব কুরআন-হাদীসের বিষয় ভিত্তিক আলোচনা করেন।মুবাশশ্বির অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে নিয়মিত  ঐ আলোচনা শুনে।ও দার্সুল কুরআন কম বুঝলেও দার্সুল হাদিস, বিভিন্ন মাসায়েল ও সাহাবীদের ঈমানদীপ্ত কাহিনী শুনতে খুবই  ইন্টারেস্টেড।ইসলামি আদব যেমন- ছোট বড় সবাইকে সালাম করা, ধন্যবাদ না বলে জাযাকাল্লাহ বলা, টাটা বাইবাই না বলে আল্লাহ হাফিজ বলা, কোনো কাজ করার ইচ্ছা বা পরিকল্পনা করলে ইনশাআল্লাহ বলা, খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলা, খাওয়ার শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা, সবসময় একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করা, ভালো কাজে আহবান করা ও খারাপ কাজে নিষেধ করা ইত্যাদি সে ঈমাম সাহেবের আলোচনা থেকেই শিখেছে। তাইতো সে মসজিদে যাওয়ার সময় সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে ওর সাথে যেতে  রিফাত, রাহাত, মারুফ, মাসরুর, শাকির, শাহেদদের ফ্লাটে কলিং বেল দিয়ে যায়।কিন্তু ওদের বাহানার অন্ত থাকে না।কেউ বলে, ওর এখন ড্রয়িং টিচার আসবে, কেউ বলে কোচিং এ যাচ্ছে, কেউ বলে হোমওয়ার্ক করছে, কেউ বলে আজকে ভালো লাগে না অন্যদিন যাবে ইত্যাদি।কেন যে ওদের আব্বু আম্মু ওদের কে মসজিদে পাঠায় না ভেবে খুব বিস্মিত হয় মুবাশশ্বির।

সেদিন খুতবার পরে ঈমাম সাহেব বলেছিলেন, ‘ইসলামে গান বাজনা হারাম, পর্দার বিধান ফরজ, মেয়েদের সাজসৌন্দর্য প্রদর্শন হারাম, টিপ, নূপুর, ভ্রু-প্লাক ইত্যাদি বিধর্মীদের নিদর্শন।’ মুবাশশ্বিরদের  বিল্ডিং এর চারতলার তোহার আব্বু, পাঁচতলার সাবিহা আপুর আব্বু তখন মসজিদে ঐ খুতবা ও আলোচনা শুনে ছিলেন, হারাম জেনেও কেন যে তোহার আব্বু তোহা কে সারেগামা ট্রেনিং সেন্টার এ ভর্তি করে গীটার ও হারমোনিয়াম কিনে দিল?সাবিহা আপু যে হিজাব ছাড়া টিপ,লিপিষ্টিক দিয়ে,নূপুর পায়ে খুব সেজেগুজে কলেজে যায় উনার আব্বু আম্মু উনাকে কিছু বলে না কেন ভেবে পায় না মুবাশশ্বির। আরও কতশত ভাবনা এসে জড়ো হয় ওর মনে।! তাহমীদ ভাইয়া,মাহমুদ ভাইয়া ও আহমাদ ভাইয়ার ব্যবহার কত সুন্দর! সবসময় হাসি খুশী থাকে, সবার উপকার করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকে।বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকে।ওনাদের কাছে গেলে ওনাদের কথা ও কাজ দেখে এক অন্যরকম প্রশান্তি অনুভব হয়।কিন্তু কোনো অজানা কারণে অনেকেই উনাদেরকে এড়িয়ে চলে। এই তো সেদিন আহমাদ ভাইয়া মাসরুর কে “মাহে রমজানে করনীয়-বর্জনীয় ” শীর্ষক আলোচনা সভায় নিয়ে যেতে চাইলে মাসরুরের আব্বু নিষেধ করে বললেন,’এখনো এসব আলোচনা সভায় যাওয়ার বয়স হয়নি’।আরেক দিন তাহমিদ ভাইয়া আর মাহমুদ ভাইয়া মসজিদে যাওয়ার সময় মাহির কে ডাকতে গেলে মাহিরের আব্বু বলেছে,’ওকে আর ডাকতে এসো না, যখন সময় হবে ও নিজেই যাবে।’সেই মাসরুর আর মাহিরকে আজকাল এলাকার বখাটে মুহিব সরদার ও মানিক পোদ্দারের সাথে ঘুরাফেরা করতে দেখা যায়।অপলক দৃষ্টিতে ওদের ধূমপানের দিকে তাকিয়ে মুবাশশ্বির ভাবে,এখন কি মাসরুর আর মাহিরের সময় হয়েছে বখাটেদের সাথে সময় কাটানোর/ধূমপান করার!!

আহমাদ ভাইয়ার সাথে আলোচনা সভায় গিয়ে মুবাশশ্বির এর খুব ভালো লেগেছিল। এত লেখক,গবেষক, জ্ঞানী, গুনীজনদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনে সে মুগ্ধ। অজান্তেই বক্তা হওয়ার, লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সেদিনের সভায় বক্তাগন রমজানে রোযা থাকার সাথে সাথে একনিষ্ঠ সালাত আদায়,অর্থব্যখ্যা সহ শুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত, হাদীস ও ইসলামি সাহিত্য অধ্যায়ন এবং যাকাত ফিতরা আদায় ও দান সদকা করে গরীবদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার প্রতি উদাত্ত আহবান করেছেন।মুবাশশ্বির এর ভেবে খুব আফসোস হচ্ছে যে,সবাই যদি এ কথাগুলো জানতো বা জানার চেষ্টা (আলোচনা সভায় গিয়ে,বই পড়ে,ভালো মানুষ দের সাথে চলাফেরা করে) করতো তাহলে তো সমাজ অনেক সুন্দর হতো। বিশেষ করে গরীব অসহায়রা তাদের প্রাপ্য যাকাত ফিতরা পেলে তারাও স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটাতে পারতো। এই যেমন-ওদের এলাকার ওয়াসীমরা খুব ধনী। বাড়ি,গাড়ি, মার্কেট, হাসপাতাল সহ দেশ বিদেশে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে তাদের।তারা যদি যথাযথ ভাবে যাকাত-ফিতরা আদায় করত তাহলে তো  তাদের এলাকার গরীবদের অবস্থার পরিবর্তন হতো। নিশ্চয়ই তারা যাকাত ফিতরা আদায়ের গুরুত্ব সম্পর্কে জানে না অথবা জানলেও  না আদায়ের পরিণাম,পরিণতি বা শাস্তিকে ভয় করছে না।ওদের মেইড হাবীবা খালার সন্তানরা তো ঈদের দিনও রাস্তার পাশে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।ওয়াসীমের আব্বু আম্মু যদি নফল ইবাদত হিসেবে দান সদকা না করতে চায় অন্তত ফরজ যাকাত ফিতরা প্রদান করে তবে ওদের মেইড আর দারোয়ান পরিবারের সদস্যদের পোষাক ও খাবারের ব্যবস্থা করে ওদেরকে ও আনন্দিত করতে পারতো।! ছোট্ট মোবাশ্বের ভাবছে আর ভাবছে।ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অর্থাৎ ভ্যানগাড়ি ও ফুটপাতের বিক্রেতাদের প্রতি ওর খুব মায়া হয়।সেদিন স্কুল থেকে আসার পথে দেখে নোমানের আম্মু ফুটপাতের লেবু ওয়ালার সাথে পাঁচ/দশটাকা নিয়ে দামাদামি করছে।বেচারা লেবুওয়ালা আরও পাঁচ টাকার জন্য খুব মিনতি করছে। অথচ নোমানদের ড্র‍য়িং রুমে বিশাল এক শোকেসে দেশি বিদেশি কত দামী দামী শোপিস সাজানো আছে।এ অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো শুধুমাত্র শখের বশেই অনেক টাকা দিয়ে কিনেছে ওরা।তখন তো ফিক্সড প্রাইস দিয়ে ঠিকই কিনেছিল,ওগুলো দামাদামি করতে আত্মমর্যাদায় লেগেছিল কিন্তু এখন সামান্য টাকার জন্য কতটা চেঁচামেচি করছে।যত্তসব আজব কাহিনী।!

মুবাশশ্বির এর ভাবনার লিষ্টে আরও একটি বিস্ময়কর ঘটনা হলো-সপ্তম রমজানে সকালে ওর আব্বুর সাথে রাফসানদের বাসায় গিয়ে দেখে রাফসান আর ওর বড় ভাই রায়হান বার্গার ও কোক খেতে খেতে মুভি দেখছে।অথচ রাফসানের আব্বু আম্মু ধার্মিক হিসেবে সুপরিচিত। নিজেরা নামাজ, রোযা করলেও সন্তানদের কষ্ট হবে ভেবে ইবাদতে তথা ইসলামী বিধান মেনে চলতে উৎসাহিত করছে না। বিদেশী মুভিগুলো পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটায়,শরীর ও চিন্তা চেতনার উপর বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে জেনেও  সাময়িক বিনোদনে বাঁধা দিলে সন্তান মন খারাপ করবে ভেবে অভিভাবকরা মুভি দেখতে নিষেধ করেন না।কিন্তু এ ভালোবাসার ক্ষতিকর প্রভাব যদি তারা বুঝতেন তবে ছোটো বেলা থেকেই সন্তানদের কে আদর্শ শিক্ষা দিতেন। আফসোস সেসব অভিভাবক দের জন্য যাদের অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও গাফিলতির কারণে সন্তানদের জীবন ইসলামী পথ থেকে লাইনচ্যুত হয়ে ধ্বংসাত্মক পথে ধাবিত হয়।ফলশ্রুতিতে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে সফল হওয়া যায় না।ছোট্ট মুবাশশ্বিরের মনের রাজ্যে কৌতুহলের ভীড় বেড়েই  চলছে। সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে ইসলামী বিধানের পরিপূর্ণ অনুসরণ করা হলেই এ কৌতুহলের অবসান হবে।

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.