একজন লেডি ডক্টর

নাসুহা তানিশা

১.
রাত এগারোটা। ডিউটি রুম থেকে বের হয়ে হসপিটালের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো ডা.রাইসা। এপ্রোনের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে মায়ের নাম্বারে কল দিল।উদ্দেশ্য মা ঘুমুবার আগে রাতের শেষ কথা বলে নেয়া। টুকটাক কথা বলে কিছুক্ষণ পর কল কেটে দিল। ফোনালাপ আজ ঠিক জমলোনা, মায়ের মেজাজ ভালো না। ছোট বোনটা টেস্টে গাড্ডু খেয়েছে, তার কিছুটা ঝাল রাইসার উপর ঝাড়া হয়েছে।তাছাড়া রাইসা বাসার
বাইরে থাকলে অজ্ঞাত কোনো কারণে মায়ের মেজাজ গরম থাকে। দুই ঝাল মিলে ধুন্ধুমার বকা। অবশ্য মেয়েদের নিয়ে দুশ্চিন্তাকে রাগ দিয়ে আড়াল করতে চান মা, এটা তো ও বুঝে। আর বুঝে বলেই মায়ের উপর রাগ হবার বদলে মায়া হয় ওর। বাবা চলে যাবার পর থেকেই তো ওর বোকাসোকা মা টা এমন হয়ে গেল..
তাছাড়া ইন্টার্নশিপ শেষে ডাক্তার মেয়ে কিছু একটা করে সংসারের হাল ধরবে এতদিন তো এটা ভেবেই নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছিলেন মা। হুট করে একবছর ইন্টার্নশিপ বাড়িয়ে উপজেলায় পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তে ওর মায়ের ভবিষ্যতের সুখস্বপ্ন দেখায় বিঘ্ন ঘটেছে,সাথে মেয়েকে একা এত দূরে পাঠানোর দুশ্চিন্তা.. রাগ তো করবেই।। করাই উচিত।।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডিউটিরুমের দিকে রওনা দিল ও..

অবশ্য মা যদি জানতো আজই রাইসার সাথে তার জীবনের শেষ কথা বলা, তাহলে বোধহয় এতসব বকাবকি করতেন না।

২.
উপজেলা কমপ্লেক্সে রাইসার সাথে আজ ডা.ফয়সালের ডিউটি ছিল। কিন্ত সে নাই,খবর এসেছে হসপিটালে আসার সময় রাস্তায় রিকশা গর্তে উল্টে গিয়ে বেচারা বেশ ভালো ব্যাথা পেয়েছে। এই এলাকাতে রাস্তা বলতে কোনো এক যুগে ইট বিছিয়ে নামমাত্র ঢালাই দেয়া একটা ব্যবস্থা মাত্র। এতদিনে তাতে বিরাট কিছু গর্ত সৃষ্টি আর চলাচলের অনুপযোগী হওয়া ছাড়া আর তেমন পরিবর্তন ঘটে নি। এতে রিকশা উলটে পড়ায় রাইসা অবাক হয়নি, তবে একা পড়ে যাওয়ায় কিছুটা চিন্তিত বোধ করছে।
এমনিতে এদিকে সন্ধ্যা মিলাবার পরেই মানুষ চলাচল কমে যায়, আর এই এগারোটা তো মাঝরাত। একজন নার্স
আর বিমলদাদু এই দুজন মিলে ওরা মানুষ মোটে তিনজন। বিমলদাদু রাতকানা বলে রাইসার মনে তীব্র সন্দেহ, উনি অবশ্য সেটা স্বীকার করেন না আর “মাইয়া দাক্তুরনি” হবার অপরাধে রাইসাকে খুব একটা পাত্তাও দেন না।

লেডি ডক্টর হিসেবে প্রথমদিকে গ্রামের মানুষদের এমন স্পষ্ট উপেক্ষা আর ভরসা না করা মনোভাবে ওর আত্মসম্মানে ভীষণ লাগতো। তবে এখন এসব উপেক্ষা করা শিখে গিয়েছে। কারণ আত্মসম্মানের চেয়েও সম্ভ্রম রক্ষার চিন্তা একজন মেয়ের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর সবসময় গ্রামের মানুষদের সহজসরল ভেবে আসা রাইসা এখানে কিছু মানুষের কুৎসিত নোংরা দৃষ্টি দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। বাবার বয়েসী কোন লোক যখন চিকিৎসা নিতে এসে চোখে লালসা নিয়ে তাকায়, ওর সাদা এপ্রোনের বর্ম ও ওকে যখন রক্ষা করতে পারেনা, “মেয়েমানুষ” হিসেবে জন্ম নেয়ার অপরাধে নিজেকে অভিযুক্ত করা ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা..

অবশ্য সবাই ই যে এমন দানব বিশেষ তা না। কোন অসহায় বৃদ্ধার হাত তুলে করা দোয়া, আঁচলে লুকিয়া আনা একটা পেয়ারা, মাকে সারিয়ে তোলায় কোনো তরুণের ছলছল চোখ এসব ছোটখাটো মায়ার জন্যই মাঝেমধ্যে ক্লান্ত শরীর থেকে একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে..
ভাবে মন্দ কি! বেশ তো আছি!!

৩.
শোরগোল শুনে এলোমেলো ভাবনা ছেড়ে বেরিয়ে এলো রাইসা।
কি সমস্যা দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করলো, অবস্ট্রাক্টেড লেবারের একজন পেশেন্ট নিয়ে এসেছে। বাচ্চা একটা মেয়ে, বছর সতেরো হবে বয়স। এটাই প্রথম বাচ্চা, অজানা আশঙ্কায় মুখ সাদা হয়ে আছে।সারাদিন বাড়িতে নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করেছে।প্রচুর ব্লিডিং হবার পরে যখন যায় যায় দশা তখন হসপিটালে নিয়ে এসেছে।
চিন্তিত রাইসা দেখলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিজারিয়ান সেকশন প্রয়োজন। কিন্ত উপজেলা কমপ্লেক্সে তখন কোনো গাইনি কনসালটেন্টের পোস্ট ছিলনা.. ছিলনা কোন এনেস্থেটিস্ট । এদিকে রোগী হাইপোভলিউমিক শকে চলে যাচ্ছে..রাইসা অতি দ্রুত দুই হাতে আইভি চ্যানেল ওপেন করে ফ্লুইড ইনফিউশন শুরু করলো।
সাথে আসা লোকজনদের গিয়ে বললো, “এখানে আর কিছু করা সম্ভব না। রোগী কে বাঁচাতে চাইলে ইমিডিয়েটলি সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।”

মাঝবয়েসী নির্লিপ্ত মুখে পান চিবাতে থাকা এক লোক, খুব সম্ভবত ইনিই মেয়ের স্বামীপ্রবর..রাইসার পায়ের কাছে পানের পিক ফেলে বললো, “এত রাইতে আর দৌড়াদৌড়ি করতাম পারুম না আফা..উপরে আল্লাহ নিচে মাডি, হায়াত মউত আল্লাহর হাতে,আপনে যা পারেন করেন।”
রাইসা রেগেমেগে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল। লোকটার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছেনা কোনো কথা সে আদৌ গায়ে মাখবে। তারপরও দাঁতে দাঁত চেপে অনেক কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বললো, তাহলে আপনাদের এই ফর্ম গুলায় সাইন করতে হবে, এখানে লিখা আছে রোগীর কিছু হলে আমি দায়ী থাকব না।
লোকটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে কলমের কিছু আঁচড় কাটলো কাগজে…

ঢাল তলোয়ার বিহীন নিধিরাম সর্দার রাইসা মুখ শক্ত করে রক্তে ভেসে যাওয়া প্রায় নিথর মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল। বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে,আল্লাহ সাহায্য করো..সাহায্য করো..সাহায্য….

৪.
অসহনীয় ব্যাথায় আর্তনাদ করতে থাকা মেয়েটা একসময় নিস্তেজ হয়ে গেল।রাইসার মুঠোয় ধরা হাতটা ধীরে ধীরে নিথর হয়ে গেল ও টের পেল।
নাহ,পারেনি সে।
হেরে গেছে ও মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ে। বাচ্চাটাকেও বাঁচানো গেলো নাহ..

পরাজিত সৈনিক এর মতো হেরে যাওয়া চেহারায় চুপচাপ বসে ছিল রাইসা। হঠাৎ হৈচৈ শোনা গেল.. সচকিত হয়ে উঠল ও,আবার কি হলো!?
বিধ্বস্ত শরীরটায় আর উঠতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না.বিমলদাদুকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে.?
“আপনে পালান আফা,পিছনের দরজা দিয়া পালান।ওরা লোকজন নিয়া আসতাছে,আপনে নাকি মা বাচ্চা দুজনরেই মাইরা ফালাইছেন….. ”

বিস্ফোরিত চোখে রাইসা তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কিছুটা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললো,”কিন্ত.. কিন্ত..ওদের কন্সেন্ট.. আমার কাছে পেপারস আছে!আমি…”
“সেসব ছাড়েন। এদিক দিয়া বাইরন,আসেন আসেন..”

হোঁচট খেয়ে খেয়ে রাইসা উপজেলা কমপ্লেক্সের পিছনের অন্ধকার রাস্তায় বেরিয়ে এলো। হৈচৈ এর আওয়াজ ক্রমশ কাছে এসে পড়ছে।একটা ঘোরের মধ্যে ও দৌড়ে চলেছে।মাথায় শুধু একটাই চিন্তা এই মানুষরুপী জানোয়ারদের থেকে তাকে বাঁচতে হবে.. নয়ত ওরা ওকে ছিড়েখুঁড়ে ফেলবে..
“কোনমতে ইন্টার্নশিপটা শেষ হলে যা কিছু হোক একটা চাকরি খুঁজে নিব.ছোটো বরাবরই ম্যাথসে কাঁচা, ওর জন্য একটা টিচার রাখতে হবে..আর মায়ের জন্য গতবার পছন্দ করে রেখে আসা সেই শাড়িটা””…আহ! মাথায় তীক্ষ্ণ একটা ব্যাথা হঠাৎ ওকে অবশ করে দিলো..পরমুহূর্তেই তীব্র এক ধাক্কায় ও মাটিতে পড়ে গেল।এরপর একের পর এক শিলাবৃষ্টির মত কিল ঘুষি নখের আঁচড়ে ক্ষত-বিক্ষত হতে লাগলো একরত্তি মেয়েটা। জ্ঞান হারানোর আগে একবার ফিরে তাকিয়েছিল ও। পান চিবুতে থাকা মেয়েটির সেই মাঝবয়েসী নির্লিপ্ত স্বামীর চোখ তখন হায়েনার মতো জ্বলজ্বল করছে।নির্লিপ্ততা সরে গিয়ে সেখানে তখন জিঘাংসার অশুভ আগুন! সেই আগুনে দুমড়েমুচড়ে যেতে লাগলো ওর মায়ের আদরের রাইসা। পরিবারের হাল ধরতে যাওয়া রাইসা।
ডক্টর রাইসা।।

৫.
রাতে মেয়েটাকে বকা দিয়ে মনটা কেমন অস্থির অস্থির করছিল আয়েশা বেগমের।ঘুমও হয়নি রাতে ঠিকমতো। সকাল হতেই মেয়ের নাম্বারে একের পর এক কল দিয়ে যাচ্ছেন উনি.. বারবার যান্ত্রিক স্বরে একটাই কথা,
” আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছেনা..কিছুক্ষণ পর…..”
উনি তখনো জানেন না এই নাম্বারে আর কখনো উনি মেয়ের আদুরে মা ডাকটি শুনবেন না..
মেয়ের সাথে যে কাল রাতেই তার শেষ কথা হয়েছিল!

লেখকঃ মেডিকেল ছাত্রী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ
সেশন ২০১৭-১৮

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.