বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বাণী

সেন্ট্রাল আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশের কানে কানে

নাজমা বেগম নাজু

সেন্ট্রাল আফ্রিকার কাগাবান্দরোয় একটিই মাত্র সরকারি হাসপাতাল।এই হাসপাতালে কোন গাইনিকোলজিস্ট নেই। আমাদের লেবেল- টু হাসপাতালে দক্ষ এবং নিবেদিত প্রাণ গাইনিকোলজিস্ট আছেন, স্হানীয়রা জানে। তাদের অনুরোধ অবহেলিত এই জনপদের মা এবং শিশুদের স্বাস্হ্যসেবায় আমরা যেন সহযোগিতার হাত বাড়াই।শুধু সহযোগিতা নয়, সহমর্মিতা — সমমর্মিতা– আন্তরিকতা এবং স্বজন আপন বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে আজ ছুটে এসেছি আমরা।সঙ্গে গাইনিকোলজিস্ট, সার্জিকাল স্পেশালিস্ট, এ্যানেসথেসিওলজিস্ট, সনোলজিস্ট (আমি নিজে), নার্স, মেডিকেল এ্যাসিসট্যান্ট, ল্যাবরোটরি টেকনিসিয়ান, দোভাষী এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের ঔষধ।সকালের প্রথম প্রহরেই সেক্টর হেড কোয়াটার্স ছেড়েছি আমরা।সামনে পেছনে প্রতিবেশী (রুয়ান্ডা) ইউনিটের সশস্ত্র এসকর্ট মাঝে আমাদের মেডিকেল ইউনিটের গাড়ি বহর।তখনো খর রোদের মত্ত কলতান শুরু হয়নি, চারদিকের ঘনসবুজে নরম রোদের মাখামাখি।এই নরম রোদের আকাশটাকে চলার পথের সঙ্গী করে কাগাবান্দরো হাসপাতালের সদর দরজায় পৌঁছে যাই আমরা।দুজন নিরাপত্তা কর্মী ছিলেন গেটে। তারা আগেই অবগত ছিলেন।খুলে যায় বিশাল দুটি পাল্লার দরজা।আমরা ভেতরে যাই।বিশাল এলাকা জুড়ে হাসপাতাল চত্বর। বিচ্ছিন্নভাবে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো ধাঁচের লাল ইটের বিল্ডিংগুলো। সবগুলো ডিপার্টমেন্টের জন্য আলাদা আলাদা বিল্ডিং।ডিসিন, সার্জারি, গাইনি, পেডিয়েট্রিকস্— কোনটার সাথে কোনটার সহাবস্হান নেই। হঠাৎ দেখলে মনে হবে খুব ছোট্ট পরিসরের সংক্ষিপ্ত এক লোকালয়।

 

এই হাসপাতালের পরিচালক একজন নারী, ডাঃ আন্দ্রে তার নাম। তিনি নিজেই স্বাগত জানিয়ে তার অফিস কক্ষে নিয়ে যান আমাদের। রোগী দেখার জন্য তার অফিস রুমটিও আমাদের জন্য ছেড়ে দেন তিনি।একই সাথে পাঁচজন চিকিৎসক মিলে একটানা রোগী দেখব আমরা। তা না হলে উপচে পড়া এই রোগী শেষ করতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।নিজেরাই ঘুরে ঘুরে আরো জায়গা খুঁজে বের করি।দ্রুত গুছিয়ে ফেলি চিকিৎসার সরঞ্জামাদি যত।এক কোণে অস্হায়ী ভিত্তিতে একটি ল্যাবরেটরি এবং মেডিসিন স্টোরও গড়ে তোলা হয়।সঙ্গে একজন রেডিওগ্রাফারও এসেছিলেন। খুত তাড়াতাড়ি আলট্রাসনোর বেড এবং মেশিনও নিখুঁতভাবে সেট করে ফেলেন তিনি।রোগী দেখা শুরু করব ঠিক এ মূহুর্তেই শুনি চিৎকার এবং গোলমালের শব্দ। অবস্থা জানতে বাইরে আসি।আমাদের সাথে কম্বোডিয়া এবং মিশরের শান্তিরক্ষী ছিলেন।তারাও আমার পাশে এসে দাঁড়ান।অনেক বেশি উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে তাদের। ব্যাপার আসলে সিরিয়াস কিছু না।রোগিরাই নিজেদের মাঝে গোলমাল বাঁধিয়েছে।কাগাবান্দরো হাসপাতালের দুজনকে রোগীদের সিরিয়াল করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।তারা নাকি পক্ষপাতিত্ব করছেন– অনেক পরে আসা রোগিদের সিরিয়াল রাখছেন প্রথম দিকে।এরপরে রোগীরা সবাই মিলে আমার কাছেই নালিশ দিতে থাকে। তাদের সান্তনা দিই, শান্ত থাকতে বলি। বুঝিয়ে বলি আমি দেখছি পুরো ব্যাপারটা।

 

আমার (বাংলাদেশের) মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্টকে বলি নতুন করে সিরিয়াল করতে। বেশ কিছু সময় নষ্ট হয় এতে। কিন্তু তারপরেও পরিবেশে স্বস্তি ফিরে আসে।রোগী দেখার শুরুতেই আরেক বিপত্তি। আমাদের সাথে দোভাষী( বাংলাদেশী)ছিলেন, ফ্রেঞ্চ ভাষায় যার উল্লেখযোগ্য দখল আছে।কিন্তু রোগীদের মাঝে হাতে গোনা কজনই আছে যারা ফ্রেঞ্চভাষী।প্রায় অর্ধেকের মত সাংগু ভাষায় কথা বলছে, বাকীরা আরবী ছাড়া আর কোনো ভাষা জানে না।স্থানীয়  সাংগুভাষী একজনকে পওয়া যায় যিনি ইংরেজিটা মোটামুটি জানেন।তারপরেও দুশ্চিন্তার মেঘ আমার কাটে না।আমার অবস্হা দেখে মেজর নিসরেন এগিয়ে আসেন।অত্যন্ত রুপবতী এই মিলিটারি অফিসার এসেছেন মিশর থেকে।বিনম্র হাসিতে জানান– আরবী তো আমার মাতৃভাষা, ওটা আমার হাতে ছেড়ে দাও। চারজন দোভাষী নিয়ে চার রকম ভাষায়( ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, সাংগু এবং আরবী) রোগী দেখতে শুরু করি আমরা।

 

আজ শুধু মা এবং শিশুদেরই দেখব বলে ছিলাম কিন্তু অপেক্ষমান রোগীদের মাঝে দেখি বেশ কিছুসংখ্যক পুরুষও আছেন।মহিলাদের মাঝে বেশিরভাগই প্রেগনেন্সি, ইনফার্টিলিটি, হেপাটাইটিস, স্কিন ডিজিস, পেপটিক আলসার, কোমরে ব্যথা, জরায়ুর সমস্যা, এইচ আইভি- এইডস, জ্বর, সর্দি- কাশি নিয়ে রিপোর্ট করছে।সবচেয়ে অবাক হলাম ম্যালেরিয়া রোগি একজনও নেই।কারন জানিনা, তবে এখন বর্ষা মৌসুম ম্যালেরিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি এখনই এবং আমাদের ব্যানমেডেও তুলনামূলকভাবে ম্যালেরিয়া রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি এখন।অল্প সময়েই বেশ কিছু আলট্রাসনোগ্রামের রোগী জমে যায়, ওদের আর অপেক্ষায় রাখা ঠিক হবে না।

 

আমি শুরু করি। প্রথমেই আসে প্রায় বিশ সপ্তাহের একটি প্রেগনেন্সি।এর পরে জরায়ুর টিউমার, ওভারিয়ান সিস্ট, পেলভিক ইনফেকশন। একটি এক্টোপিক প্রেগনেন্সিও পাই।অনেকগুলোর নরমাল ফাইনডিংস্। আলট্রাসনো শুরু করার আগে সবগুলো রোগীরই ডিটেইলস্ হিস্ট্রি নিই। পাশের চেয়ারে বসে বিরামহীন আরবী থেকে ইংরেজি অনুবাদ করে মেজর নিসরেন আমাকে সহায়তা করছিলেন।

 

এর মাঝে দুজন মিডিয়া কর্মীও চলে আসেন। একজন টিভির, অন্যজন একটি দৈনিক পত্রিকার।তারা আমার সাক্ষাৎকার নেন।চারদিক ঘুরে ঘুরে চিকিৎসারত চিকিৎসক এবং রোগীদেরও অনেক ছবি তুলেন।দুপুর দুটার মধ্যেই রোগী দেখা শেষ হয় আমাদের।আমার ইউনিট সদস্যরা খুব অল্প সময়েই জিনিসপত্র গুছিয়ে গাড়িতে তুলে ফেলে। এবার ঘরে ফেরার পালা।আবারো প্রতিবেশি ইউনিটের সদস্যরা সযত্নে সুরক্ষা নিশ্চিত করে আমাদের।তাদের সশস্ত্র প্রহরায় ঘরে ফেরার পথে নামি আমরা।

 

কেন যেন আজকের দিনটাকে অনেক অনেক বেশি অর্থবহ মনে হয়।মনে হয় সত্যিকার অর্থেই ভাল কিছু করেছি।এ যেন এক চির অম্লান মংগলপ্রদীপ– যা মানবতার অন্তহীন কল্যাণে, রোগ শোক দারিদ্রের অতল আঁধার ঘুচিয়ে চিরশান্তির সূর্যময় পরশ রাখে।অশেষ শান্তির এই সুশীতল স্পর্শ তাই আপন হৃদপিন্ডের বহতা রক্তস্রোতে পাই আমি নিজেও ।

( চলবে)

 

লেখকঃ সাহিত্যিক ও জাতিসংঘের প্রথম কন্টিনজেন্ট নারী কমান্ডার

 

 

 

 

 

 

 

 

সেন্ট্রাল আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশের কানে কানে এর আগের পর্ব

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.