একটি আত্মহত্যা ও সামাজিক চুক্তি

রিতু কুণ্ডু

‘নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গৃহবধূর আত্মহত্যা’– এরকম খবরের মাঝেই বড় হয়েছি আমরা।তাই সারাজীবন নারীবাদী হয়ে নারীবান্ধব সমাজ গঠনে কাজ করেছি।কিন্তু গতকাল সারারাত ছিল নতুন ভাবনা গঠনের সময়।

ডেঙ্গু আক্রান্ত আমি এখনও অনেকটা দূর্বল, খুব সকালেই ঘুমিয়ে যাই।গতকালও এর ব্যতিক্রম হয়নি।আমি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।১১:৩০ এর দিকে লোকজনের চিৎকারে উঠে পড়ি।গ্রীলে দাঁড়িয়ে দেখলাম পাশের বিল্ডিংয়ের কোন একটা ফ্লোরে স্বামী স্ত্রী ঝগড়া বা মারামারি করছে দেখে মানুষজন জড়ো হয়েছে।।আমি আর বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে আবার এসে ঘুমিয়ে পড়ি। রাত ১২:৩০ বা ১ টা নাগাদ এক জান্তব চিৎকারে আমার অন্তরাত্মা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে।পড়িমরি করে বারান্দায় ছুটে গিয়ে দেখি লোকজন দৌড়া দৌড়ি করছে।

কিছুক্ষণ আগে ঝগড়া করা স্বামী স্ত্রীর মাঝে স্বামী ছাদে উঠে নিচে লাফ দিয়েছে।স্পট ডেড। আর লোকটির মা চিৎকার করছে—

আমার বাবা নাই,বাবা নাই!!!

আজ সকালে শুনলাম দেড় বছরের বাচ্চা আছে।স্ত্রী অন্যজায়গায় পরকীয়াতে লিপ্ত।মাঝে মাঝেই অশান্তি হতো।কাল সব শেষ হয়ে গেল।

আজ কোন পত্রিকায় বা পোর্টালে খবরটা পেলাম না।অতটা গুরুত্ব নেই।কারণ একজন মেয়ে আত্মহত্যা করলে অসহায়,আত্মহত্যায় প্ররোচনা সহ নানাবিধ যুক্তি আছে মুক্তচিন্তায়।কিন্তু একটা ছেলে আত্মহত্যা করলে কাপুরুষ তাই ধামাচাপা পড়ে যায়।আর উচ্ছৃঙখল সমাজে পরকীয়ার রচনা হয় দিস্তা দিস্তা।

শুধু আরেক নারীর অসহায় কান্না ছাড়া–আমার বাবা আর নাই

কিন্তু এই আত্মহত্যার পেছনে দায়ী কে!!!

পরকীয়া! নারীবাদ! আধুনিকায়ন! ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব! পাশ্চাত্য সমাজ ব্যবস্থার অনুকরণ!

জাহেলিয়ার যুগে বা তারও আগে গুহায় জীবনযাপনকালে মানুষ অনিয়ন্ত্রিত ছিল।সমাজব্যবস্থায় কোন রুলস বা রেগুলেশনস ছিল না।গোত্রের শক্তিশালী ব্যক্তিরা তার বা তাদের ইচ্ছামত সম্পর্কে লিপ্ত থাকতো। তারা যথেচ্ছেভাবে নির্বিচারে যেকোন নারীর সাথে বা পুরুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করত।পিতৃপরিচয়হীন শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকলো।এই অনিয়ন্ত্রিত এবং স্বেচ্ছাচারিতা প্রকট হয়ে উঠলে সামাজিক চুক্তির আবির্ভাব ঘটে।মানুষ সম্পদ ও সম্পর্কের খাতিরে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে।এখান থেকেই সমাজে বৈবাহিক চুক্তির বিধান তৈরি হয়।বিয়ে মানে দুজন নারী পুরুষ পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য।ইসলামে এই দায়বদ্ধতা মৃত্যুপরবর্তী অসীম জীবনে মহাপুরস্কার হিসেবে বিবেচিত হবে।

তাই সমাজ বা ধর্মীয় যে দিক থেকেই চিন্তা করা হোক না কেন কোনটাতেই পরকীয়া সমর্থন যোগ্য নয়।এটা যেমন সত্য,তেমনি সমাজে পরকীয়ার সংখ্যা বাড়ছে এটাও সত্য।সেই দ্বাপরযুগে আয়ান ঘোষের স্ত্রী রাধিকার সাথে যখন কৃষ্ণ প্রেমলীলাতে লিপ্ত হল,তখনও সমাজে পরকীয়া নিন্দিত ছিল আবার রবীন্দ্রনাথের সাথে ইন্দিরা দেবীর পরকীয়া প্রেমে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতেও নির্যাতন সেল তৈরি হয়েছিল।আসলে একাধিক বিয়ে করলেও চুক্তি লঙ্ঘিত হয় না কিন্তু পরকীয়া মানে একই সাথে চুক্তির লঙ্ঘন ও বিশ্বাসের স্খলন।আর এই প্রতারণা সহ্য করতে না পেরে কখনও স্বামী আবার কখনও স্ত্রী বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ।যদিও আত্মহত্যা কোন সমাধান নয়।কেউ কারো বিশ্বাস রাখতে না পারলে দূরে সরে যাওয়া সহজ,কিন্তু নিজেকে নিজে হাতে শেষ করা মানে শুধু নিজেই চলে যাওয়া।কেউ কারো জন্য থেমে থাকে না!

একটি পরকীয়া মানে যে শুধু একটা সম্পর্কে ফাঁটল ধরানো তা নয়,বরং একটি পরিবার,অনেকগুলো জীবন,সন্তানের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবকিছুকে বাজি রাখার মত।তারপরও নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি অন্ধভাবে অনুকরনের মোহ, ইসলাম ও আল্লাহর ভয় থেকে দূরে সরে যাওয়া, পরিবারে একক কর্তৃত্বের অভাব, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনে শিথিলতা সর্বোপরি যান্ত্রিক প্রতিযোগিতার যুগে স্বল্পতে তুষ্ট না থাকতে পারার প্রবণতা ঝুকিপূর্ণ করে তুলছে প্রত্যেকটি বৈবাহিক সম্পর্ককে।

ইসলাম আমাদের পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপনের কৌশল শিখিয়ে দিয়েছে।আমাদের জন্য এ এক অনবদ্য নেয়ামত।শুধুমাত্র স্বদিচ্ছা,প্রতিটি পরিবারে সঠিক ইসলামিক বিধানের অনুশীলন ও পালন,আল্লাহর প্রতি ভয় ও ব্যভিচার থেকে দূরে থাকার শিক্ষাই আমাদের এই সামাজিক ও জৈবিক ব্যাধি পরকীয়া থেকে দূরে রাখতে পারে।নইলে আত্মহত্যা করতে পারে যে কেউ,যখন তখন।

অথচ পাথর মেরে হত্যা করা উচিত ছিল বিবাহিত ব্যাভিচারী বা ব্যাভিচারিনীকে‌‌!!!

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং রিভারটেড মুসলিম

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.