কালো মেয়ের বাবার দুর্ভোগ !

শেখ সাফওয়ানা জেরিন

একজন মানুষকে চিনি যিনি ছোটবেলায় তার চাচাতো বোন অত্যন্ত কালো হওয়ায় সব সময় তাকে কালি বলতেন, এবং তার পাশে দিয়েও হাটতেন না। যুগের বিবর্তনে তার ঘরে একটা কালো মেয়ে জন্মায়, এবং বর্ণ বৈষম্যে ভরা এই সমাজে তার সেই মেয়েটিকে বিয়ে দিতে বেশ কস্টই হয়েছিল। একটা মেয়ে ছাড়া বাকি বাচ্চাগুলো সবাই সাদা হয়েছিল, কিন্ত ঐ একজনকে দিয়েই আল্লাহ তার পরীক্ষা নিয়েছেন।

দুনিয়াতে পক্ষ একটা বড় ব্যাপার, আজ যে ছেলের বাবা হয়ে আরেক কন্যা দায়গ্রস্থ লোকের উপর চাবুক ঘোরায়, কাল সেই মানুষটাই নিজের কন্যার বেলায় আরেকজন ছেলের বাবার কাছে নতজানু।

সমাজের নিয়ম অনুযায়ী মেয়ে পক্ষকে সবসময় চুপ করে থাকতে হয়, ছেলেপক্ষ যা বলে তাই আইন। না মানলে মেয়ের সংসার ভেঙে যাবে ভেবে কতো বাবা মা চোখের জ্বলে আত্মসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে কতো অপমানের কতো অন্যায়ের কোনো জবাব দিতে পারেননি তার হিসাব করা হয়তো সম্ভব না।

এই যারা এতো কথা শুনাচ্ছে তারাই, তাদেরই মেয়েদের বেলায় যখন দাবার ছকটা উলটে যায় ঠিক এভাবেই অন্য কারো কাছে ন্যায় অন্যায়ের ধার না ধরা লোকগুলোর কাছে যখন অপমানিত হন, তখন কী একবারও ভাবেন , একবার ও কী মনে পড়ে অন্য মেয়ের বাবা মা’কে মেয়েটাকে তার পক্ষ থেকে কী কী সহ্য করতে হয়েছে?
অনেকের আবার হিসাব আছে- আমি আমার মেয়েকে এতো টাকার গয়না দিলাম ওতো টাকার ফার্নিচার দিলাম, আর আমার ছেলেকে ছেলের শ্বশুর কিছুই দিবেনা তা কীভাবে হয়? মেয়েকে যেগুলো দিয়েছেন সেগুলো উসুল করতে তখন তারা কোমর বেঁধে নেমে পড়েন। কিন্তু তিনি যে নিজের মেয়েকে যৌতুক দিয়ে জুলুমের শিকার হয়েছেন এটা একবারের জন্য ও মনে করেন না, এবং তিনিও যেন আরেকজনের উপর এমন জুলুম না করেন এটাও কখনো হিসাবে আসেনা।

আজকে ছেলে পক্ষ বলে মেয়েপক্ষকে একদম পাটা পুতায় ঘষে বেটে ফেলছি, কিন্তু আমার ঘরে যে একটা মেয়ে আছে আমি যে কোনোদিন এই জুলুমের শিকার হতে পারি এটা মাথায়ই আসেনা। কার জুলুমের ফল কে ভোগ করবে কেউ জানেনা। আল্লাহ বাবা মায়ের জুলুমের কারনে ছেলেমেয়েকে দিয়ে তার পরীক্ষা করাতে পারেন, প্রতিদান দিতে পারেন একটা সন্তানের জনক জননী এটা কীভাবে না ভাবতে পারে?

এর চেয়ে মনে হয় নিম্নবিত্ত লোকজন অনেক ভালো। একটা অফিসের মহিলা কর্মচারী সঠিক মূল্যে আমাকে একটা কাজ করে দেওয়ার সময় বলছিল- ৫ টাকাও হারাম খাই না, আমার ছেলে-মেয়ে আছে! আমি হারাম খেলে আমার ছেলে-মেয়ের কোনো না কোনো একটা বিপদ হয়, অসুখ হয় সেই টাকা ওভাবেই খরচ হয়ে যায়।
অনেক সময় আমরা যখন কোনো সমস্যায় পড়ি তখন দেখবেন হঠাৎ মনে হয় কোনো একজনের সাথে করা অন্যায় বা কোনো একটা অসঙ্গতিমূলক কাজের জন্যই মনে হয় আমি এই সমস্যায় পড়েছি।
তখন অনুশোচনা হয় ইশ যদি ঐ কাজটা না করতাম। এই ফিলিংসটা আসলে এমনি এমনিই আসে না। এই আক্ষেপ এই অনুশোচনা যার যার ভাগের অনুশোচনা।
আল্লাহই এভাবে মানুষকে নিজের পাপের দুর্বলতায় একটা অস্বস্তিকর অনুভূতিতে ফেলেন। এটা মজলুম ব্যক্তির জন্য আল্লাহর পক্ষের ইনসাফ। বিবেকের কাঠগড়া বড় কঠিন।

মানুষের অন্যের উপর জুলুম করার ব্যাপারে কোন পক্ষ বিচার না করে জুলুম করবো না, জুলুম হতে দিবো না, জুলুমের শিকার হবো না এই নীতি নিজের সন্তানদের জুলুমের অভিশাপ থেকে বাঁচানোর উপায় হতে পারে। মানুষের আহা খুব খারাপ জিনিষ, কারো আহা নিয়ে ভালো থাকা যায়না ………

লেখকঃ সহযোগী সম্পাদক, মহীয়সী ও পিএইচডি গবেষক, হেচিটটেপি ইউনিভার্সিটি, তুরস্ক

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.