তবুও পুরুষের কাঁদতে মানা !

আমরা যখন মমতার কথা বলি, তখন সাথে সাথে কল্পনায় একটা নারীমূর্তির অবয়ব খুঁজে নেই, কারণ আমাদের চিন্তাভাবনায় মমতা শব্দটা নারীদের সাথেই জড়িয়ে থাকে, যেমন আমরা বলি ” মায়ের মমতা ” ‘বোনের ভালোবাসা’, ‘বউয়ের প্রেম’ ইত্যাদি। কিন্তু যখন আমরা পুরুষ শব্দটা উচ্চারণ করি তখন কল্পনায় একজন কঠোর, রাশভারী আর পাথরসম শক্ত হৃদয়ের মানুষের অবয়ব খুঁজে পাই৷ এই পৃথিবীতে মা, মাতৃত্ব আর তার মমতা চাক্ষুস হলেও পুরুষের অনুভূতিগুলো লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে যায়। পুরুষের অনুভূতিগুলো বোঝা হয়ে উঠে না কারও, যেন তা বুঝে উঠতে নেই৷ একজন পুরুষ কখনো বাবা, কখনো ভাই, কখনো স্বামী আবার কখনোও বা পুত্র হয়ে তার পরিবারকে গুছিয়ে রাখতে, পরিবার কে আগলে রাখতে নিজেদের সবটুকু দিতে প্রস্তুত থাকে৷ কিন্তু দুঃখের বিষয় এটাই যে পুরুষরা স্বভাবহেতু তাদের মনের আক্ষেপগুলো প্রকাশ করতে পারে না। বুকের এক কোণায় জমতে থাকে৷ আর একসময় জমতে জমতে সেই অনুভূতি উপচে পড়ার সময় হয়।

কিন্তু পুরুষ তখনো সেই অনুভূতি কে প্রকাশ করতে পারে না, চেপে যেতে বাধ্য হয়৷ কারণ পুরুষ সহজে কাঁদতে পারে না, বা কাঁদতে নেই ।নারীকে কাঁদতে দেখলে মানুষ সহানুভূতি দেখায় । অপরদিকে পুরুষকে কাঁদতে দেখলে হাসে, কটাক্ষ করে। বোকা বলে উপহাস করে । তাই পুরুষের কাঁদতে নেই। সেজন্য কষ্ট থেকেও সহজে নিস্তার পাওয়ার সুযোগ এখানে কম৷ সংসারকে ধরে রাখতে যেমন একজন নারীর ভূমিকা আছে, কষ্টের গল্প আছে, ত্যাগ আছে তেমনি একজন পুরুষেরও ভূমিকা আছে, কষ্ট আছে, আছে লুকানো দীর্ঘশ্বাসের গল্প।

সংসারে নারীর অবদান কে যেভাবে মহিমান্বিত করা হয়, পুরুষের অবদানকে ততটা ফোকাসে আনা হয় না৷ একজন পুরুষ কখনো বাবা হিসেবে তার সন্তানদের থেকে কষ্ট পায়; কখনো স্বামী হিসেবে তার স্ত্রীর থেকে কষ্ট পায় আবার কখনো ছেলে হয়ে বাবা-মার প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে কষ্ট পায়৷ এই বিভিন্ন চরিত্রে তাদের অবদান অনেক ক্ষেত্রেই মূল্যায়ন করা হয় না৷ যথার্থ মূল্যায়নের অভাবে তাদের মনে আস্তে আস্তে যে ক্ষত জমতে থাকে তা তাদের চরম একাকিত্বের দিকে নিয়ে যায়।

একজন নারীর ভালোবাসা প্রকাশের ধরণ, আর একজন পুরুষের ভালোবাসার ধরণে যথেষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান থাকে । সাধারণত পুরুষকে দেখতে বাইরে থেকে যতখানি কঠিন মনে হয়, আসলে কিন্তু ততটা কঠিন তারা নন; অনেক পুরুষেরই ভেতরটা  অনেক নারীর চেয়েও অনেক বেশী নরম হয়ে থাকে৷ তারা হুটহাট করে তাদের খারাপ লাগা, ভালো লাগা, মান-অভিমান প্রকাশ করতে পারে না । আবার তারা তাদের কষ্ট, রাগ আর অভিমান বেশিক্ষণ বয়ে বেড়াতেও পারে না৷ অনেক সময়ই দোটানায় কেটে যায় এক একটি পুরুষের জীবন৷

প্রতিটি পরিবারেই পুরুষের ত্যাগের গল্প আছে, আছে দীর্ঘশ্বাসের গল্প৷ একজন বাবা তার পরিবারের সবার সব রকম চাহিদা পূরণ করার জন্য উপার্জনের তাগিদে যুদ্ধ করে যায় সেই সকাল থেকে। সেই কর্মব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা, কখনো কখনো রাত হয়ে যায়৷ আবার কখনো কখনো তাকে থাকতে হয় পরিবার থেকে অনেক দূরে অন্য কোন শহরে বা অন্য কোন দেশে৷ নিজের স্ত্রী, সন্তানদের মুখ না দেখে, তাদের সাথে প্রাণ খুলে কথা না বলে, বুকের মধ্যে একরাশ দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কাটিয়ে দেয় মাসের পর মাস। দিন গুনতে থাকে কখন বাসায় যাবে, পরিবারের সাথে সময় কাটাতে পারবে।

এতকিছু ত্যাগের বিনিময়েও যদি পরিবারটা সামলে থাকে তাতেই বাবারা খুশি হয়ে যান। পুরুষরা খুব বেশি কিছু চায় না৷ তারা যে সামান্যটুকু চায় সেইটুকু অনেক সময় পূরণ হয়ে উঠে না৷ প্রকৃতি তাকে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত করে রাখে । আর একইসাথে সেই কষ্ট যেন সহ্য করতে পারে তাই তাকে করে তুলে আরও শক্ত, মজবুত।

লেখকঃ

রত্নম অর্জুন

মেডিকেল ছাত্র,  কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ

আরও পড়ুন
1 টি মন্তব্য
  1. Sharmin বলেছেন

    Nice article

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.