একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মকথন।

আনোয়ার ইকবাল বাদল

আমি আনোয়ার ইকবাল বাদল, যখন
৫২’র ভাষা আন্দোলন তুঙ্গে, আমার
মা, আনোয়ারা তখন রাজপথে মরহুম আব্দুল জলিলের (সাবেক
সাধারন সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়মী
লীগ) সাথে মিছিলে সোচ্চার হতেন
আর আমি তখন তাঁর গর্ভে।

জলিল
মামা কত বারন করতেন মিছিলে না
আসতে কিন্তু মা শুনতেন না, কারন তাঁর মা ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের
নেত্রী। ৫৩’র ৯ ই জানুয়ারি আমি পৃথিবীর প্রথম আলোয় এলাম, কালো
নিকষ অন্ধকার চারিদিকে, গুড়ি,গুড়ি
বৃষ্টি পড়ছে, প্রচন্ড শীত, আমি অবশেষে
এলাম, কন্যা সন্তানের সাড়ে চার বছর
পরে পুত্র সন্তান, কি খুশীটাই না হয়ে ছিলেন আমার বিপ্লবী নানী। আমি বেড়ে উঠছি, পর পর আরো চার বোন জন্ম নিল। অনেক বোনের মাঝে একটি ভাই।

তখন আমরা নওগাঁ শহরে থাকতাম।
এক সময় লেখা পড়ার জন্য সবাই
উঠে এলাম রাজশাহীতে। সেই যে এলাম, হজরত শাহ্ মখদুম রুপোষ (রাঃ) পদচারনায় পবিত্র এই ভূমীতেই আটকে গেলাম।

ছোট বেলায় খুব ভোরে আমার মা সারগাম রেওয়াজ করতেন, সূরের মুর্চ্ছনায় কেমন একটা যেন আবেশ জড়িয়ে থাকত সারাটা
সময়। মা তখন রেডিও পাকিস্তানে
নিয়মিত রবীন্দ্র, নজরুল,গজল গাইতেন, এরপর আমার বড়ো বোনও একই ভাবে রেডিওতে গাইতে শুরু করলেন(অভিনেতা অপূর্বের আম্মা)।
আমি আর অন্য বোনেরা তখন ওস্তাদ
আব্দুল আজিজ বাচ্চুর কাছে সুরবানী
সঙ্গীত বিদ্যালয়ে তালিম নিচ্ছি, লেখা
পড়ার ফাঁকে সমস্তটা সময় মনের ভেতর রাগ রাগীনিরা বিস্তার করে থাকত, রাগ বেহাগ,দরবারী কানাড়া,রাগ বসন্ত বাহার, একসময় সুরের মুর্চ্ছনায় সমস্ত অন্তর এক সুখ সাগরে
ভাষছিল ঠিক তখনি ১১ দফার আন্দোলন আমাকে সুরের জগৎ থেকে টেনে আনল, বুকের মাঝে জেগে উঠল দ্রহের আগুন, স্বাধীকার তখন সকলের ন্যায্য চাওয়া। ওস্তাদ তখন দলবেঁধে
ট্রাকে করে মোড়ে মোড়ে গাইতে বললেন দেশ গান।

আমকে বললেন গানের সাথে ধারাবর্ননা দিতে। বিপ্লবী নানী আর মায়ের রক্ত আমার শরীরের
রক্তে মাদল বাজাল, এদিকে স্বাধিকারের আন্দোলন তখন স্বাধীনতার আন্দোলনে রুপ নিচ্ছে।

আমি তখন রাজশাহী কলেজের ছাত্র
এবং ছাত্রলীগের তরুন নেতা। ৭ই
মার্চ বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন “যার কাছে
যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড় শত্রুর
উপর”…

শুরু হল মাতৃভূমীর মুক্তির লড়াই। তখন একটা কোর্স ছিল ইউ, ও, টি, সি। যেটাতে পাকিস্তানি
সেনারা ছাত্রদের সামরিক ট্রেনিং দিত।
আমি সব রকমের অস্ত্র চালনায় পারদর্শি ছিলাম। শুরু করলাম দল গঠন, থানা থেকে ৩০৩ রাইফেল লুট করে দল নিয়ে চলে গেলাম সাপাহার।
আস্তানা গাড়লাম ই,পি,আর দের পরিত্যাক্ত একটা ক্যাম্পে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক বিশাল ক্যানভাস। নয়মাসে শেষ হলেও এখনো শেষ হয়েছে বলা যায় না। দুবার আহত হয়েছি, মুক্তিযুদ্ধ করার অপরাধে আমার বাবা,দুই চাচা, পাঁচ চাচাতো ভাইকে ওরা
নির্মম ভাবে হত্যা করেছিল। আমি ছিলাম এ্যালাইড ফোর্সের মেজর।
কিন্তু যুদ্ধ শেষে ফিরলাম না সেনা বাহিনীতে, অসহায় বোনেরা আর সুর আমায় টেনে আনলো। পেটের তাগিদে জয়েন করলাম বাংলাদেশ
বেতারে ষ্টাফ আর্টিস্ট হিসাবে।

শুরু হল অন্যরকম একটা যুদ্ধ, পাশে পেলাম জীবন সঙ্গীনি ঝিনুক কে। সম্পর্কে সে ছিল আমার
খালাত বোন। বোনদের পড়াশোনা
শেষে একে একে বিয়ে দিতে বেশ কষ্ট
করলাম ঝিনুক আর আমি। আসলো
জীবনে মেঘলা, মৌসুমী, সাগর আমাদের তিন চোখের মনি।

এর মাঝে জাতির জীবনে এক কলঙ্ক জনক ঘটনা চমকে দিল সবাইকে, জাতির জনক কে পরিবার সহ হত্যা করা হলো, জাতিয় চার নেতাকে হত্যা করা হলো, শুরু হলো এক কলঙ্কের অধ্যায়। জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা অধুরাই
থেকে গেল, শহীদের স্বপ্ন পুরোন হলনা,
গুটিয়ে নিলাম নিজেকে, সুর আর ফিরলোনা, তবে মা , বোন এবং আমার সকল সুর এখন বাসা বেঁধেছে বড়ো মেয়ে মেঘলার কন্ঠে।

হার্টএ্যাটাকের পরে এখন আমার বাসযেন এক নির্জন দ্বীপে, আমি এখন ঈশ্বরের মতোই একলা।

সকলের প্রতি একটাই অনুরোধ, এই দেশকে ভালবেসে, অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষায় এগিয়ে আসুন…

শুভ কামনা সকলের প্রতি।

লেখকঃ আনোয়ার ইকবাল বাদল, মুক্তিযোদ্ধা।

ছবিতে দাঁড়িয়ে থেকে যুদ্ধরত সৈনিক মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার ইকবাল বাদল।

আরও পড়ুন