একজন মুক্তিযোদ্ধার ঘামেভেজা রুমাল

কুলসুম আক্তার সুমী

একজন মুক্তিযাদ্ধার কথা বলছি। তিনি ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের) এর সুবেদার ছিলেন। ১৯৭১ সালে রাজশাহী জেলা হেড কোয়াটারে (ইপিআর ক্যাম্পে) অবস্থান করছিলেন।
সেখানে পাকিস্তানী সৈন্য কম ছিল, তাদেরকে খতম করে সেখানকার দখল নেওয়া যেতে পারে কিন্তু সারা দেশের পরিস্থিতি না জেনে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
২৬ শে মার্চ তিনি বাঙ্গালী সৈনিকদের নির্দেশ দিলেন- ক্যাম্পের বাইরে আত্মগোপন করতে।পরদিন ২৭ তারিখ ২/৪ জন ছাড়া বাঙ্গালীদেরকে পাওয়া গেল না। সন্দেহ হলো পাকিস্তানী সৈনিকদের। তাঁর উপর চালানো হলো গুলি। ১২/১৪ রাউন্ড গুলির হাত থেকে অলৌকিক পারদর্শীতায় তারপর স্বীয় প্রত্ত্যুতপন্নমতিতায় পাঞ্জাবী মেজরকে মুগ্ধ করে সে যাত্রায় বেঁচে গেলেন।
এরপর তাঁর নির্দেশনা পেয়ে রাতে অস্ত্রাগার লুন্ঠন এবং ক্যাম্পে আক্রমন করা হয়। তিনদিনের যুদ্ধে পাকিস্তানীদের পতন হয়। অতঃপর সীমান্ত অতিক্রম করে চূড়ান্তভাবে যু্দ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধ করেন ৭ নম্বর সেক্টরে। পরিবারের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বাড়িতে সেই সুবেদারের অন্ধ মা, স্ত্রী, চার সন্তান। বড় সন্তান কিশোর বয়সী (পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক) শিক্ষিত, মেধাবী, মননশীল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এলাকায় জনমত গঠনে অগ্রনায়ক, পরোক্ষ মুক্তিযোদ্ধা। সপ্তাহে একদিন গিয়ে স্থানীয় পাকিস্তানী সেনা ক্যাম্পে হাজিরা দিয়ে আসতে হয়।
এমতাবস্থায় দীর্ঘদিন কোন রকম যোগাযোগ না থাকার পর দূর সম্পর্কের আত্মীয় মারফত খবর পাঠানো হয়, তিনি নিজ এলাকা কুমিল্লার সীমান্তে অবস্থান করছেন।
অনেক কৌশল আর গোপনীয়তা রক্ষা করে সেই কিশোরকে তার মামা নিয়ে গেলেন মুক্তিযাদ্ধা বাবার সাথে দেখা করাতে। সীমান্ত পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে সেই আত্মীয় ফিরে গেলেন। অন্যজন সেখান থেকে সহচর হলেন।
বন-বাগানের ভিতর দিয়ে দু’ঘন্টা হাঁটার পর বনের এক কোণে একটা কুঁড়েঘর দেখা গেল। এক ভিখিরির ঘর ছিল ওটা, দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে সেই যোদ্ধার চেয়েও ছোট। দূর থেকে দেখা গেল- কেউ একজন ঘরে শুয়ে আছেন- পা গুলি ঘরের বাইরে এসে গেছে। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে তাই পায়ের উপর একটা গামছা দেওয়া, পা দু’টি নড়ছে। সাথের লোকটি – এগিয়ে যেতে হাতে ইশারা দিয়ে নিজে ফিরে গেলেন।
মামা ও ভাগ্নে ঘরের কাছে যেতেই শোয়া থেকে উঠলেন মুক্তিযোদ্ধা বাবা। সেই সময়ে বাপ-সন্তানের সেই আনন্দ-বেদনা মিশ্রিত, আবেগঘন সাক্ষাতের মুহুর্তের বর্ণনা দেওয়ার মতো কলম কিংবা মন কোনটার জোরই আমার নেই।
ফেরার সময় যোদ্ধা তাঁর প্রিয়তম স্ত্রীর জন্য তাঁর সারা শরীরের ঘাম মোছা একটা রুমাল দিয়েছিলেন। যদি আর দেখা না হয়, যদি আর ফিরে না আসে; শেষ স্মৃতিচিহ্ন, শেষ উপহার। উত্তাল সেই দিনগুলোতে সেই মুক্তিযাদ্ধার স্ত্রী স্বামীর শরীরের ঘামের গন্ধমাখা রুমাল জড়িয়ে, চোখের জলেই দিন গুনেছেন।
ফিরে এসেছিলেন সেই যোদ্ধা। স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালে। বেঁচে ছিলেন আরো ৩৪ বছর স্বীকৃতিবিহীন ভাবে।
হাঁটুতে আঘাত পেয়ে বাহিনীতে প্রবেশের সময়ের চেয়ে কম উচ্চতা কিংবা শরীরে ২৭টি বুলেটের চিহ্ন নিয়ে সেই মুক্তিযাদ্ধা কোনদিনই যাননি, তিনি যে যোদ্ধা ছিলেন তা প্রমাণ করতে। এ তাঁর অভিমান কিংবা অহংকার ছিল। ৭ মার্চের স্বাধীনতার ডাক আর ২৫ মার্চের ঘোষণার পর যিনি মৃত্যুভয় তুচ্ছজ্ঞান করেছিলেন। তাঁর এইটুকু অহংকার থাকতে পারে, থাকতেই পারে।
পাঞ্জাবী মেজরের বদান্যতায় সে যাত্রায় বেঁচে না গেলে রাজশাহী ইপিআর ক্যাম্পের প্রথম শহীদ তিনিই হতেন।
যাই হোক, সেদিন তিনিসহ মুক্তিযোদ্ধারা ঠিক ঠিক তাদের কর্তব্যটা বুঝতে পেরেছিল, পালন করেছিল। রাষ্ট্র তার কর্তব্যটা ঠিক ঠিক পালন করতে পারেনি, তাই মৃত্যুতে তিনি পাননি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, রক্ত ঝরিয়ে পাওয়া পতাকায় মোড়ানো হয়নি তাঁর লাশ।
যে শোষণ, বঞ্চনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসানে পিন্ডির বদলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা, সেই জটিলতার বৃত্ত আজো ছিন্ন হয়নি। তাইতো আজো হাজার হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার খবর পাই। বিজয়ের ঊনপঞ্চাশ বছর পূর্তির প্রাক্কালেও সংবাদ দেখি, ভাতা প্রাপ্ত সহস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধার বয়স পঞ্চাশের নিচে।
সামাজিক ন্যায়বিচার আজো প্রতিষ্ঠিত হয়নি যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য। তাই ইতিহাস মানেই গুটিকয়েক মানুষের কথা। আপামর জনতার কথা আসেনি বলেই (আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধার মতোই) মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার আবুল হাশেমের শরীরের ঘামে ভেজা রুমালের আবেগ লেখা নেই, লেখা হয়নি কোন ইতিহাসে।
(বি: দ্র: মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার আবুল হাশেম আমার জন্মদাতা পিতা।)
লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক
আরও পড়ুন