কুড়ানো মানিক…

শামীমা রহমান শান্তা

যশোর সদর হাসপাতালে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের এক পাশে ছোট্টো ড্রেসিংরুম। এখানে মূলত কাটা, ফাটা ও ভাঙাচোরা রোগীদের সেবা দেয়া হয়। প্রয়োজনমতো ড্রেসিং করা হয়, প্লাস্টার করা হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। এর দায়িত্বে আছেন খুব পুরাতন মানুষ, প্রিয় মুখ, সামসু কাকা।

আমার ডান হাতে ‌ একটা ফ্রাকচার আছে যেটা উনাকে দিয়ে প্লাস্টার করানো হয়েছে। প্লাস্টারের ভেতরে একটা জখম আছে সেটাকে ড্রেসিং করার জন্য কয়েকদিন পর পর উনার ওখানে যাই।

যথারীতি সকাল-সকাল গেলাম। গিয়ে দেখি অনেক লম্বা সিরিয়াল। ভিতরে কারো প্লাস্টার করা হচ্ছে। গগনবিদারী চিৎকার শোনা গেল। হসপিটাল এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু আমার মত দুর্বল হৃদয়ের মানুষদের এগুলো খুব বেশি সহ্য হয় না। আমার সাথে আমার ভাবি গিয়েছেন। উনি বার বার চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে যাচ্ছেন। দুজনে দাঁড়িয়ে আছি।

একটুপর দেখলাম ভেতরের রোগীর বাবা, মা, বোন এক পাশে দাঁড়িয়ে। মা একটু পরপর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বাবা উদাস নয়নে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। বাবার হাতের আঙ্গুলে প্লাস্টার করা।

আমি বাচাল ধরনের মানুষ। মানুষের সাথে কথা না বলে বেশিক্ষণ থাকতে পারিনা। কৌতূহলবশত জিজ্ঞাসা করলাম,
কি হয়েছে? ভেতরে যে আছে কি হয় আপনার?

লোকটি বললেন, “আমার ছেলে রয়েছে আপা। ওর পা ভেঙে গেছে।
প্লাস্টার করা হচ্ছে।”

লোকটার পরনে লুঙ্গি, একটা রঙ জ্বলা মলিন টি-শার্ট। মুখভর্তি  সাফেদ শুভ্র দাড়ি। মাঝবয়সী। চোখগুলো প্রায় কোঠর গত।  কি ভদ্র মানুষ ।শরীরে বিত্তের বৈভব না থাকলেও টানটান একটা আত্মমর্যাদার ছাপ রয়েছে স্পষ্ট। হাতের প্লাস্টারের উপরে রক্তের ছাপ দৌড়ঝাঁপ করছে।

আমি ধরা গলায় বললাম, কি হয়েছে?

রোড এক্সিডেন্ট!

আমিও দুর্ঘটনার শিকার এক রোগী। ভেতরে আরেকটা ভয় খেলে গেল।  তারপরও মনকে শক্ত করে বললাম,

কিভাবে হল?

ওর মা বলে উঠলো…
‘জানেন আপা, এটা কর্মফল!
কতবার বলেছি, মিথ্যা বলিস না বাবা!
মিথ্যা বললে আল্লাহ সহ্য করেন না !
ছেলেটা আমার কথা শুনেনা !
এখন সবাই মিলে সে ফল ভোগ করছি!

ভেতরের কৌতূহলটা গুমরে গলায় এসে ঠেকল। কিছুতেই সহ্য হচ্ছিল না। দাঁড়িয়ে কাছে যেয়ে বললাম, আপা ঘটনাটা বলেন তো শুনি!

এরইমধ্যে ভেতর থেকে ছেলের চিৎকার ও কান্না শোনা গেল। ছেলের মা আরো জোরে কেঁদে উঠল বাইরে থেকে। কথাই বলতে পারছিল না। উপায় না দেখে ছেলেটির বাবা বলে উঠলো:
ছেলের স্কুলে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। খুব ডানপিটে ছেলে আমার। নবম শ্রেণীতে পড়ে!পড়ালেখায় অতবেশী মন নেই। স্কুলে যেয়ে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে শুনে তার মাথা খারাপ।

ওর মা বারবার বলল,
লিখে ফেলো বাবা। হয়ে যাবে। সময় নিয়ে লিখে জমা দিয়ে দাও।

ও নাছোড়বান্দা অত লেখা লিখতে পারবে না। বুদ্ধি করে ঔষধের দোকান থেকে গজ তুলা কিনে ডান হাতটা ব্যান্ডেজ করে স্কুলে যেয়ে ম্যাডাম কে বলল তার হাত ভেঙে গেছে।

এই ঘটনায় তার মা খুব দুঃখ পেল। তাকে কাছে ডেকে বলল
“বাবা মনে রেখো, এই ব্যান্ডেজ তোমাকে খুব শিগগিরই পরতে হবে। এত বড় মিথ্যা কথা আল্লাহ সহ্য করবেন না।”

আমি ভয়ে আঁতকে উঠলাম! পাংশু মুখে বললাম,
বলেন কি? তারপর?

তারপর তো দেখতেই পাচ্ছেন! ছেলের পা ভেঙে গিয়েছে! বাপ-বেটা যাচ্ছিলাম বাসে করে! হঠাৎ করে ড্রাইভার শক্ত করে ব্রেক কষে দাঁড়ালো। বাপ-বেটা পড়ে গেলাম। আমার বেশি কিছু হয়নি। দুটো আঙ্গুল ভেঙেছে শুধু। কিন্তু ওর পা-টা ভালোমতো ভেঙেছে!

আমি আমতা আমতা করে ধরা গলায় বললাম এখন খুব বাস দুর্ঘটনা হচ্ছে! এই দেখুন আমিও তার শিকার!

লোকটি হেসে বলল,
“কি যে বলেন আপা! এইতো তাকদীর।
আল্লাহ যখন যা কপালে লিখে রেখেছেন তাতো হবেই! এতে আমার কোন দুঃখ নেই ! শুধু দুঃখ ছেলেটা আমার মিথ্যা বলেছে! তার ফল ভোগ করছে!
ও যদি ওর মায়ের কথা শুনতো, তাহলে হয়তো আজ এ দুর্ভোগ টা  পোহাতে হতো না । আল্লাহ ভরসা!

পাথরের মত লাগছিল নিজেকে !  এমন ঘটনাও সত্যি সত্যি ঘটে! মায়ের কথায় এত দাম আল্লাহর কাছে!
একজন সাধারন পরিবারের ঈমান ও আমলের উচ্চতা আমাকে নুইয়ে দিল যেন! মনে মনে বলে উঠলাম.. ‘আল্লাহু আকবার’!

ততক্ষণে ছেলেটাকে বের করা হল, ট্রলিতে শোয়ানো লম্বা একহারা সুঠাম দেহ। (যেমনটা খেলোয়াড়দের থাকে) একটা পা পুরা প্লাস্টার করা… যন্ত্রণায় কাতর সুন্দর মুখ….

হাত-পা চলছিল না আমার!
ভেতর থেকে সামসু কাকু ডেকে চলেছেন
‘আম্মা, এসে পড়ো এবার তোমার কাজটা করি…..

শামীমা রহমান শান্তা- কবি, সাহিত্যিক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী।

আরও পড়ুন