নিরাপদ নারীত্বেই সমাজ নিরাপদ!

জিয়াউল হক

ঘটনা ৭১১ খৃস্টাব্দের। রাজা রডারিক কর্তৃক জুলিয়ান কন্যা ষোড়শী ফ্লোরিন্ডার শ্লীলতাহানীতে ক্ষুব্ধ পিতা কাউন্ট জুলিয়ান দিশেহারা, নিজ বন্ধু কর্তক এই চরম অপমানের প্রতিশোধ নিতে দৃড়প্রতিজ্ঞ হন। রাজশক্তির কাছের মানুষ জুলিয়ান এতদিনে উপলব্ধী করেন, সমাজে অত্যন্ত প্রভাবশালী, স্বচ্ছল এবং নেতৃস্থানীয় একজন হয়েও আদরের কন্যার ইজ্জতের নিরাপত্তা দিতে পারেনি, তা হলে এই স্প্যানিশ সমাজের কোটি কোটি মানুষ, যাদের না আছে রাজশক্তি আর না ক্ষমতা, না আছে সামাজিক প্রভাব, আর না আর্থিক স্বচ্ছলতা ,তাদের স্ত্রী কন্যাদের নিরাপত্তা কে দেবে? তারা কিভাবে ইজ্জত নিয়ে বেঁচে থাকবে?

কাউন্ট জুলিয়ান আর রাতে ঘুমোতে পারেন না। কন্যার ইজ্জতের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ পিতা হিসেবে বেঁচে থাকার কোন মানে হয় না। এরকম চিন্তাও মাথায় আসে, পরেই আবার ভাবেন, তিনি যদি আত্মহত্যা করেন, তা হলে মা মরা মেয়েটার আর কে থাকলো এই দুনিয়ায়? মেয়েটা কার মুখের দিকে চেয়ে বেঁচে থাকবে?
বৃ্দ্ধ জুলিয়ানের চোখ দুটো ভিজে আসে। ঠোঁট জোড়া আবেগে কেঁপে উঠে, ক্রোধ আর আক্রোশে বুকের ভেতর থেকে তপ্ত লাভার মত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায় নিজের অজান্তেই! না, তাকে কিছু একটা করতেই হবে। তিনি তার নিজের মেয়ে সহ এ ভূখন্ডের লক্ষ লক্ষ যুবতীকে এক নরপশুর লোভাতুর শিকার হতে দিতে পারেন না।
এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর পরামর্শে কাউন্ট জুলিয়ান মেয়েকে অতি বিশ্বস্থ এক আত্মীয়ার কাছে রেখে সমুদ্র পাড়ি দিলেন, ওপারের মরক্কোয়, সেখান থেকে তাকে সম্মানের সাথে পাঠানো হলো কায়রোয় উমাইয়া গভর্নর মুসা ইবনে নুসাইর কাছে। মুসা সব শুনে বিস্তারিত জানিয়ে দূত পাঠালেন দামেশকে খলিফা ওয়ালিদ ইবনে মালেকের কাছে করণীয় জানতে চেয়ে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই খলিফার অফিস থেকে নির্দেশ এসে পৌছুল কায়রোয়।

খলিফার নির্দেশে মরক্কো থেকে তরুণ সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদকে পাঠানো হলো স্পেন অভিযানে ৭১১ খৃষ্টাব্দে। প্রথম দিকে এ অভিযানের লক্ষ্য ছিল একটাই, কাউন্ট জুলিয়ানের কন্যার অপমানের প্রতিশোধ নেয়া আর রডারিকের লোলুপ দৃষ্টি থেকে স্পেনের মেয়েদের ইজ্জত আর সম্ভ্রমকে রক্ষা করা।
সেই শুরু, এর পরে একাধারে চল্লিশ বৎসর চলে এ অভিযান। ৭৫২ খৃস্টাব্দ নাগাদ আটলান্টিকের কোল ঘেঁসে কিছু পাহাড়ী অঞ্চল ছাড়া পুরো পেনিনসুলা (বর্তমান স্পেন ও পর্তূগাল) ইসলামের ছায়াতলে আসে। শুরু হয় ইতিহাসের এক স্বর্ণোজ্জল অধ্যায়; আল আন্দালুসিয়া।

সময়কালটা খেয়াল করেছেন তো ঠিক মতো? ৭১১ খৃষ্টাব্দ। ঠিক এই ৭১১ খৃষ্টাব্দেই মিশর, মরক্কো, স্পেন এ অঞ্চলের ঠিক উল্টো দিকে আর এক দল নির্যাতিতা নারীর চিৎকার ভেঁসে এসেছিল। স্বরণদ্বীপ (শ্রীলংকা) থেকে নৌকা বোঝাই একদল আরব মুসলমান যাচ্ছিল জেদ্দা, তাদেরও গন্তব্য ছিল দামেশক।
পথিমধ্যে বর্তমান করাচীর সন্নিকটে দেবল বন্দরের কাছে এই নৌকা লুট করে জলদস্যুরা। যাত্রীদের সকল মালপত্র লুট করে, নারীদেরকেও ছিনিয়ে নেয়, কয়েকজনকে নিজেদের কাছে রাখলেও বেশ ক’জন নারীকে সিন্ধুর শেষ হিন্দু রাজা দাহিরকে উপঢৌকন হিসেবে দেয়। রাজা দাহির আরব নারীর লোভ সামাল দিতে না পেরে সে উপঢৌকন গ্রহণ করেন সহাস্য বদনে!
ইরাকে উমাইয়া খেলাফতের গভর্নর তখন চরম অত্যাচারী ও রক্তপিয়াসী বলে পরিচিত হাজ্জাজ বিন ইউসুফ। হাজ্জাজ মুসলমানদের কাছে চরম ঘৃণিত ছিলেন চার চারজন সম্মানিত সাহাবীর (আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা:, যাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা:, সাঈদ ইবনে যুবাইর রা: এবং কামিল ইবনে যিয়াদ রা:) হত্যাকারী হিসেবে।।
এতটা নৃশংস হওয়া সত্তেও নারীর অসম্মানের খবর শুনে হাজ্জাজ রাজা দাহিরের কাছে দূত পাঠিয়ে তাদের ফেরত চাইলেন এবং অপরাধীদের শাস্তিবিধানের কথা বললেন। কিন্তু চরম দাম্ভিক রাজা দাহির সে কথায় কর্ণপাত না করায় হাজ্জাজ মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে একটা সেনাদল পাঠালেন।
খবর পেয়ে রাজা দাহির কতটা দম্ভের সাথে মুসলিম সেনাদের মোকাবেলার কথা ঘোষণা করেছিলেন, সে বর্ণনা ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘চাচনামা’ বিস্তারিত ভাবেই দিয়েছে। তার সে দম্ভ যে কোনো কাজেই আসেনি, তার প্রমাণতো রাজা দাহিরকে দিতে হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের কর্তিত মস্তকখানা দিয়ে!

কেবলই কি তাই? পুরো ভারতীয় সমাজকেই এ অপরাধের মূল্য পরিশোধ করতে হয়েছে নিজেদের স্বাধীনতা হারিয়ে। ঠিক যেমনটি মুল্য পরিশোধ করতে হয়েছিল স্পেনের অত্যাচারী সম্রাট রডারিককে নিজ প্রাণ ও রাজ্য হারিয়ে! এর পরে যা হয়েছে, সে ইতিহাস পুরো বিশ্বের প্রতিটি নাগরিকই জানেন।
ইতিহাসটা আমরাও জানি, কিন্তু এর মধ্যে যে শিক্ষাটা লুকিয়ে আছে, সেটা কি লক্ষ্য করেছি আমরা? শিক্ষাটা হলো; যখন কোনো সমাজে নারী নির্যাতনের শিকার হয় তখন সে সমাজের ভীত নড়বড়ে হয়ে পড়ে। আর যদি ঐ নির্যাতিতা নারীর প্রতি কৃত নির্যাতন ও অবিচারের প্রতিবিধান না করা হয়, তা হলে সে সমাজটা পুরোপুরিই ধ্বসে পড়ে। সে সমাজে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের হাত থেকে ফসকে যায় তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব। যারা ঐসব নির্যাতিতা নারীদের মুক্তিতে এগিয়ে আসেন, তাদের হাতেই গিয়ে পড়ে সমাজের নেতৃত্ব ও পরিচালনার দায়িত্ব।

সৃষ্টির সুতিকাগার, মৌলিক কারখানা হলেন নারী, তিনি যতক্ষণ নিরাপদ থাকেন সমাজ ততক্ষণ নিরাপদ থাকে। আর নারী যখন ভুলুন্ঠিতা হন, তখন ভুলুন্ঠিত হয় পুরো সমাজ, পুরো রাষ্ট্র আর পুরো সভ্যতাই!
নারীর গর্ভে জন্ম নেয়া এ সমাজের কোটি কোটি বীর মরদরা কি সে সত্যটা অনুধাবন করবে না?

লেখকঃ কলামিস্ট ও প্রবাসী বাংলাদেশী, ইংল্যান্ড 

আরও পড়ুন