ভাল থাকুক ভালোবাসা, নিজ নিজ বিশ্বাসে

নূরেন নির্ভাণা বৃষ্টি

আমি যে পাড়ায় বেড়ে উঠেছি, সে পাড়ায় হিন্দু বাড়ি নামে একটি বাড়ি ছিলো। অত্রএলাকায়, হাতে গোণা কিছু হিন্দু পরিবারের মধ্যে একটি হিন্দু পরিবার গোটা একটি কম্পাউন্ড জুড়ে বসবাস করতো, তাই বাড়িটির নাম হয়ে গিয়েছিলো হিন্দু বাড়ি। এই বাড়ীটিতে আমরা প্রায়ই যাতায়াত করতাম। পুকুরপাড়ে প্রকাণ্ড এক গাছের শেকড়ের ওপর বসে, বিকেলের বাতাস গায়ে লাগিয়ে, আমরা একটা একটা করে গল্পের পুটলি খুলতাম, আর সেই সাথে এক ঝাঁকা হা হা হি হি তো ছিলোই!!! সেই বাড়ির বড় মেয়ে অঞ্জনা দিদি, এক গাল হাসি নিয়ে ছুটে আসতো আমাদের আড্ডায়। দিদির কাছে মাঝে মাঝে আমরা পানের আবদার করে বসতাম। মায়ের পানের বাটা থেকে পান বাগিয়ে দিদি আমাদের মুখ লাল করার ব্যবস্থা করতেন। পান চিবিয়ে আড্ডার আমেজ বেড়ে যেত দ্বিগুণ। মাগরিবের আযান পড়ার আগ পর্যন্ত চলত ধুম আড্ডা। যেই না আযান শুরু, অমনি আমরা দৌড়াতাম নামায পড়তে আর দিদি দৌড়াতেন তুলশী তলায় পূজা দিতে।

এছাড়াও ছোট খাটো পিকনিক, নিজেদের মাঝে টুকটাক প্ল্যান ছিলো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। দিদি এবং ওই পরিবারের মানুষ গুলোর সাথে আমাদের গভীর হৃদ্যতা ছিলো। এই হৃদ্যতা গড়তে আমাদের কখনও পূজার প্রসাদ খেতে বা সিঁদুর-তিলক পরতে হয়নি। আবার দিদিকেও আমাদের মতো হিজাব পরতে অথবা জায়নামাজে দাঁড়াতে হয়নি। এই বন্ধুত্বের জায়গাটি সম্ভবত অটুট ছিল একে অন্যের বিশ্বাসের প্রতি সম্মানবোধ থেকে।
হ্যাঁ, বিশ্বাসের প্রতি সম্মানবোধ। এই সম্মানবোধের অর্থ কিন্তু নিজের বিশ্বাসকে টলিয়ে অন্যের বিশ্বাসে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া না বা অন্যের বিশ্বাস সংক্রান্ত আচার-অনুষ্ঠানে তাঁদের মতো করেই উপস্থিত থাকা না।

কোন হিন্দু বন্ধুকে যদি কোরবানি ঈদ-এ গরুর মাংস খাওয়ার দাওয়াত দেওয়া হয়, তাতে তার বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন হবে না কি কটাক্ষ হবে?

কোন হিন্দু বন্ধুর ধর্মীয় উৎসবে আমিও যদি তাঁদের মতো একই সাজপোশাকে হাজির হই, সেটা কি আমার নিজের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন হবে না কি কটাক্ষ হবে?
বন্ধুত্ব, হৃদ্যতা, ভালোবাসা কি এতটাই ঠুনকো, যে আমার নিজের বিশ্বাসের যায়গা বিকিয়ে, আমার ভিন্ন বিশ্বাসের বন্ধুটির ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সেই আচার-বিচারেই নিজেকে বিলিয়ে দিতে হবে?

কলকাতার রবীন্দ্রসদনে এক দিদি দৌড়ে এসেছিলেন আমার কাছে। কেন জানেন? আমি তাঁর ঠাকুরদার ভিটের দেশের মানুষ কি না, তা জানতে। ৪৭-এর দেশ ভাগে, এই দেশের ভিটে-মাটি ছেঁড়ে পাড়ি জমাতে হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। সেই দিদির মনের টান আর চোখের মায়ায় এক চুলও রাস টানতে পারেনি আমার মাথার হিজাব। তার সিঁথির সিঁদুর, হাতের শাঁখা-পলা আমাকেও তো পারেনি ছিটকে দূরে সরিয়ে দিতে। একবারের জন্যও তো মনে হয়নি, উনি হিজাব পড়লে বা আমি সিঁদুর পড়লে দুজনের মাঝে জমত বেশ……

ধর্ম যার যার, ধর্মীও উৎসবও তার তার। সম্মান ও ভালোবাসা, সেখানেই। নিজের বিশ্বাসকে বিকাতে হলে তবে আর কীসের সম্মান, কীসের ভালোবাসা???

লেখকঃ কলামিস্ট 

আরও পড়ুন