যেমন দেখতে চাই নিজের দেশকে

সালমা তালুকদার

নষ্ট সমাজের কষ্ট গুলো উড়িয়ে দিতে কেবল একটি বা দুটি কবিতার লাইনই অনেক সময় যথেষ্ট মনে হয়….সমাজের যত গভীরে প্রবেশ করছি ততোই মনে হচ্ছে প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নিলাম না কেন…হতাম যদি এমন একজন, যার মস্তিষ্ক কোনো কাজের না…. চিন্তার গভীরতা নেই এমন মানুষকে এখন খুব হিংসে হয়….কিংবা জন্মই যদি না হোত….চোখে দেখে, উপলব্ধি করে কিছু বলতে না পারার কষ্ট যে কি তা যার সাথে হয়েছে কেবল সেই-ই বোঝে। সমাজে চলতে ফিরতে কেবল ভালো মানুষ খুঁজি। নিরেট ভালো মানুষ। যার মাঝে কোনো লোভ, লালসা, হিংসা, অহংকার নেই। এই ধ্বংসাত্মক রিপু গুলো থেকে যে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। পথ চলতে কত মানুষের সাথে পরিচয় ঘটে। কত মানুষের সাথে চোখাচোখি হয়। কেন তাদের ভালোমানুষ মনে হয় না? কেবলই মনে হয় এই ভালোর মাঝেই এমন জঘন্য কিছু আছে যা আমি চর্মচক্ষু দিয়ে দেখতে পাচ্ছি না…. কিন্তু আছে।

পুরুষ চরিত্র অথবা নারী চরিত্র আলাদা করে কিছু বলতে চাই না। আমি মানুষ নিয়ে কথা বলতে চাই। এই মুহূর্তে এমন একটা সমাজে বসবাস করছি, যেখানে খুব কম পুরুষের মাঝে নিবেদিত হয়ে কাজ করার আগ্রহ আছে। তারা কেবল নিজে কিভাবে বাঁচবে সেই চিন্তা করে। কিংবা খুব কম নারী আছে, যাদের ভেতর জন্মগতভাবে জন্ম নেয়া মমতাময়ী ব্যাপারটা আছে। সবাই কেমন যেন সবার প্রতিদ্বন্দী। পুরুষরা বলছে দেখ আমরা কি করতে পারি! কোনোভাবে তোদের হাতের নাগালের মধ্যে পেলে হয়। একবার ধর্ষিতার সিল মেরে দেই। তখন দেখবো তোর দেমাগ!

বাসে আজকাল আর পুরুষরা কোনো মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে সিট ছেড়ে দেয় না। মনে মনে ভাবে হয়তো, তোরা না আমাদের সমান মনে করিস নিজেকে। সম অধিকার চাস। তাহলে বাসেও আমাদের মত দাঁড়িয়ে যেতে হবে। আবার মেয়েরা বলে আমরা নারী আমরাও পারি। একটা অনলাইন গ্রুপের নামও দেখলাম এমন, আমরা নারী আমরাও পারি। বলা পর্যন্তই। আদতে নারীরা জানেই না তারা কতটা পারে!

হ্যা, আমরা পারি। আমরা অনেক কিছু পারি। আমরাই প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্ম দিচ্ছি। সমাজ, সংসার চলছে আমরা পারি বলেই। তবে আমরা যা পারি পুরুষ তা কোনোদিন পারবে না। এটা কি আমরা বুঝি? বুঝি না। কারন বুঝলে বলতাম আমরা অনেক কিছুই পুরুষের মত পারি না। আমরা যত্রতত্র বসে টয়লেট করতে পারি না। গরম লাগলে সবার সামনে আমরা জামাকাপড় খুলতে পারি না। বাসে পুরুষের মত সত্যি আমরা পুরোটা সময় দাঁড়িয়ে কোথাও যেতে পারি না। নারীদের মধ্যে কিছু নারী আছে, যারা অন্য নারীদের চেয়ে অনেক কাজ একটু বেশিই পারে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরতিহীন ভাবে ছুটতে পারে। কিন্তু সেটা তো কদাচিৎ।

যেমন অটিজম শিশুদের মধ্যে কেউ কেউ কখনো কখনো সুস্থ জীবন যাপন করতে পারে। অথচ আমরা পড়েছি অটিজম কখনোই ভালো হওয়ার নয়। এমন তো কত উদাহরণই দিতে পারবো। এমন না থাকলে gifted বলে সমাজে কিছু থাকতো না। সৃষ্টিকর্তার নেক দৃষ্টি কখনো কখনো কিছু মানুষের উপর সত্যি থাকে। যার কাজকর্ম সাধারণ মানুষকে অভিভূত করে…কখনো কখনো ভীষন ভাবায়…কখনো হয়তো ভয় পাওয়ায়।

যা বলছিলাম পুরুষ নারীর এই যে বড়ত্ব… বীরত্ব দেখানোর প্রয়াস তাতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সেইসব নারী পুরুষ যারা সাধারণভাবে জীবন অতিবাহিত করতে চায়। সেদিন একটা গল্পে পড়লাম, একজন অবিবাহিত নারী দোকান থেকে কনডম কিনে নিয়ে বাসায় ফিরছে। পেছনে হাঁটতে থাকা অনুসন্ধানী মনের একজন যুবকের প্রশ্নের উত্তরে নারীর ভাবলেশহীন উত্তর, “আমার কলিগ সেদিন ধর্ষিত হয়েছে। আমিও রাত করে বাসায় ফিরি। তাই প্রস্তুতি নিয়ে রাখছি। আমার সাথে এমনটা হলে আমি ব্যাপারটাকে উপভোগ করবো।”

জানি না যিনি লিখেছেন তিনি কেন লিখেছেন! তিনি কি বোঝাতে চেয়েছেন যে ধর্ষন চলবেই। তোমরা এটাকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নাও। নাকি মনের ভেতর দ্বন্দ্ব ছিল, খুব না আমাদের মত চলতে চাও। এবার এভাবেই চলতে হবে। জানি না। অনেক কিছু গুলিয়ে ফেলছি আজকাল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের খবরগুলো তো আছেই। সরাসরি অনেকের মন্তব্য, অনেকের লাইফস্টাইলে নিজের উপলব্ধি হয় কেন এসব দেখছি শুনছি। কেন এগুলো এত ভাবায় আমায়। এই করোনাকে আমরা অনেকে যুগযুগ ধরে চলতে থাকা মহামারির মতোই মনে করছি। নারী পুরুষ সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, হচ্ছে। যার যার জায়গা থেকে survive করার চেষ্টা করছে সবাই। কিন্তু এই মহামারীর কারনে যে নোংরা বিষয়গুলো সামনে চলে আসছে সেগুলো কি শুধু কোভিডের কারনেই হচ্ছে?  নাকি এমনটা সব সময় হতেই থাকে, যা কিনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য এখন বেশি বেশি করে ছড়িয়ে যাচ্ছে। সেটা হতে পারে যৌনতার খোলামেলা চেহারা, হতে পারে অফিস আদালত থেকে অবসরের পর, নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য অন্যকে বিপদে ফেলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা।

চারপাশের অস্থির কার্যকলাপ দেখে কিছুতেই ভাবতে পারি না, এই দেশটা আমার। এই দেশের মানুষগুলো আমারই আত্মীয়,  ভাই, বোন। মানুষের অস্থির মস্তিষ্ক কেবলই ক্ষমতা চায়। কেবই অন্যকে দাবিয়ে নিজে উপরে উঠতে চায়। কেন এই অস্থিরতা! কেন এত নিচতা! আমার অবস্থান থেকে এর একটাই সমাধান দেখতে পাই। আর তা হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য বেশি বেশি মানসিক ডাক্তার তৈরি করা। এলাকা ভিত্তিক এমন ব্যবস্থা নেয়া যার জন্য পারিবারিক, সামাজিক ব্যধিগুলো দূর হয়। বর্তমান সময়ে পারিবারিক সমস্যা পরিবারের মধ্যে রাখলে আর চলছে না। একটা পরিবার একটা সুস্থ সমাজ, রাষ্ট্রের যোগানদাতা। সেখানে পারিবারিক কলহ, অনৈতিক কাজগুলোতে পরিবারে বড় হতে থাকা পরবর্তী প্রজন্মের উপর প্রভাব ফেলছে।

একটা স্বপ্নের বাংলাদেশ কবে দেখতে পাব জানি না। নিজের জীবদ্দশায় যদি দেখতে নাও পাই, তবু মনে প্রাণে চাই এমন একটি দেশ হোক যেখানে কোনো হানাহানি, মারামারি থাকবে না। নারীর প্রতি সহিংস আচরণ থাকবে না। পুরুষ নারী উভয়ে উভয়ের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন মনোভাব পোষন করবে। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি হবে না। সব ধর্মের মানুষ নির্বিঘ্নে নিজেদের ধর্ম পালন করবে। এটাই হচ্ছে আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ।

সালমা তালুকদার লেখক ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন