‌অসঙ্গতি

সুমাইয়া আরিফিন

(১)
চাষাড়ে জমির বুকে পরিশ্রমী স্বপ্ন চিকচিক করতেই ফসলিয় দাবীতে গিজগিজ করে কৃষকের গৃহ। লাঠিয়াল বাহিনী দেখলেই কানাঘুষা বাড়ে, জানালায় জানালায় লেগে থাকে কানকথা। ‘একতা’ শব্দের মর্মার্থ বুঝি আমরা আর এজন্মে টের পেলাম না।
অন্ধকারের চক্রান্তে আমরা গলাছাড়া হলেই তোমরা আপনজনের দোহাই দাও, নিরাপত্তাহীনতায় ভুক্তভোগী আমরা জীবনের নিভে যাওয়া প্রদীপের দিকে তাকিয়ে চুপসে যাই। তোমরা আবার সুশীলতার সভ্যকরণ করো,
আমরা খুঁজি শুদ্ধিকরণ, বোকা মস্তিষ্কে লালন করা বিশ্বাসঘাতী আচরণের পাল্টানো চেহারা।
শুঁয়োপোকার মতো রক্ত চুষে নিতে নিতেই তোমরা বলে যাও ট্যাক্স আদায়। রাজনীতি এখন ক্যান্সারজনিত রোগে ভুগছে।
তোমাদের মুখনিঃসৃত কথাকে ওয়াদা বলে আশ্বস্ত করলেই আমরা ঈসা নবীর চল্লিশতম দিনের ঘটনায় ডুবে যাই। আশাহত বলো কিংবা প্রতারণাপূর্ণ অভ্যাস, তোমাদের ওইসবে আমরা আমাদের পরিণতি দেখি, ফের একবার মরে যেতে যেতে অনাচার সহায়ত্বে জীবন টেনে নেয়ার ফলাফল।
বন্যাপ্লাবিত এলাকায় ভেসে যায় আশ্বাস, জোয়ার এলেই জীবন যায়, যানবাহন যাতায়াতে রুটিনবাঁধা মৃত্যু। একশো বছর পরপর আমাদের অভিধানে মহামারী বলে কোনো শব্দ নেই, আমরা রোজ মরে যাই, মহামারীকে পিছনে রেখে প্রতিযোগিতা করি জীবন হস্তান্তরের।
সিস্টেম একটা কালো অধ্যায়, জীবন যেখানে বাঁচিয়ে রাখাটাই বিলাসিতা।
(২)
শুকনো জরাজীর্ণ এক পরিবেশের ভিতরে বসে আমি আকাশ দেখি, পৃথিবীর তাপমাত্রা কত হবে এখন! আমার ঘরের ভেন্টিলেটর ভর্তি চড়ুই পাখি, দিনরাত কিচিরমিচির। রাত হলেই তিনটে চড়ুই বারান্দার গ্রিলে বসে থাকে, নিশ্চুপ পাখিগুলোর কি আমার মতো বুক ব্যথা আছে! ওরা ঘর বাঁধেনি কেন!
কোন সাহিত্যিক যেন বলেছিল, তিন সংখ্যাটা শুভ, আসলেই কি শুভ হয় কিছুতে, কিজানি!

মাঝেমাঝে রাত গড়ালেই আমার জীবনবাবুর কল্যাণী হতে মন চায়। অভিমান জমিয়ে জমিয়ে অভিযোগহীন নিষ্প্রাণ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। হুট করেই আশাপূর্ণা দেবী বলেন, মেয়ে জন্মই ছাই।
-আমাদের শৈশব?
-দাসত্ব শিখিয়েছিল।
-অধিকারকে অনুগ্রহ না ভেবে অধিকার ভাববে কবে?
আশাপূর্ণা দেবী প্রেমিকার মতো গভীর চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। হাত চেপে বললেন, সমাজের দায়বদ্ধতা ভাঙ্গতে চাওয়া কঠিন কিন্তু।
পাশের ঘরে রাতভর গোঙানো শব্দ, অরাজনৈতিক অত্যাচারে ঘুমিয়ে যায় যে মেয়েটি তারও কি অভিমান হয়! আমি ওসব বেশিক্ষণ ভাবিনা। আমার ফোনের লো ভলিউমে রবীঠাকুর এসে বসেন,
আয় আর একটিবার আয়রে সখা প্রাণের মাঝে আয়,
মোরা সুখের দুঃখের কথা কবো, প্রাণ জুড়াবে তায়…
ক্যান্সারে মরে যাওয়া আপনজন, বহুদিন পর চালু হওয়া যাত্রীবাহী ট্রেনের হুইসেল কিংবা গরীবের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা নেতাদের কথা, এই মুহূর্তে এসব কিছুই আমায় স্পর্শ করেনা।
অভুক্ত গরীব হাহাকার করে, উপরদলীয়রা তাদের পুতুল বানিয়ে রাজনৈতিক মাঠে দাবার আসর জমায়। আরামে ভাত গেলা আমরা বলি, হোয়াটএবার! উই আর ফাইন।
আমার জ্বরের তাপমাত্রা বাড়ে, চড়ুইগুলোর দিকে তাকিয়ে আমি লম্বা শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করি, আবার বুক ব্যথা বাড়ে।
ঠিক এমন একটা রাতে চিন্ময়ী এসেছিল। ঠুকরে ঠুকরে কাঁদতে গিয়ে বলেছিল, ১২ বছর বয়স থেকে শুরু হওয়া সঙ্গম নামক ধর্ষণের কথা কিংবা শরীরী হত্যায় নিজস্ব না-বলা কথা।
কোনো এক বনে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী লু’চির জন্ম হয়েছিল, টের পেয়েছিলেন কবি কীটস। কাছে পেয়ে হারিয়ে ফেলার চেয়েও না পাওয়াই ভালো। লু’চি কে উপলব্ধি করার আগেই কবি জানলেন লু’চি মরে গেল। কবি লিখেছিলেন, এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্যগুলো সবাই জানতে পারেনা। কবি কি শুধুই লিখেছিলেন নাকি করেছিলেন আফসোস!
উফ্! প্রেম এক বিষাদ, অনুভূতি হলো ভালোবাসা নামক আজন্ম কষ্টের অপর নাম।

শরীরে অঙ্গের চেয়েও সংখ্যায় অধিক ক্ষতের দাগ নিয়ে চিন্ময়ী চুপচাপ বসে থাকে। বয়সের চেয়েও অধিক বুড়িয়ে যাওয়া চিন্ময়ীর হাত চেপে শুধাই,
-রবী ঠাকুরের কল্যাণী কেমন ছিল?
-সাহসীকতা একটা অধিকার।
-মতামত?
-ভিতরের কথা কেউ উপলব্ধি করতে পারে কখনো?
সমাজের বুকে কলঙ্কিনী, সংসারের অভিধানে একঘেয়ে নিরস- নিস্তব্ধ, ঘরহীন চড়ুইয়ের মতো চোখভর্তি অসহায়ত্বতা নিয়ে চিন্ময়ী আমার চোখে চেয়ে থাকে। এমন চোখ টের পেয়েই বোধহয় আর্নেস্ট হ্যামিংওয়ে ক্যাট ইন দ্যা রেইন লিখে ফেলেছিলেন। হুট করেই আমার রুদ্র গোস্বামীর লাইন মনে আসে-
ঘরে ফেরা কি এত কঠিন?
ঘরতো আর আকাশ নয়, ফিরতে গেলে পাখি হতে হয়।
আমি ভাবি, ঘর কি হয়! অধিকার নাকি আশ্রয়! ঘরকে সংসারে রূপান্তরিত করতে কী কী বিসর্জন দিতে হয়? মানুষের দুঃখগুলোকে নিজের বুকে পুষে রাখা ব্যতীত আমার ক্ষমতায় আর কিছুই নেই, রাতের পর রাত আমি জানালা ঘেঁষে জ্বর প্রলাপিনী হই, আমার খসখসে হাতে জোনাকি বসে।
আমি আর কল্যাণী হতে চাইনা। আজকে ভোরেই জানতে পারলাম চিন্ময়ী শ্বাস ছুঁড়ে ফেলেই পৃথিবীকে দায়মুক্ত করে চলে গেল।
চুপিচুপি চড়ুইগুলোকে দেখে শুতে গিয়েই মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর গোরস্থান থেকে আগত আগরবাতির সমস্ত গন্ধ চিন্ময়ীদের শরীরের ক্ষত থেকেই জন্ম নেয়।
(৩)
নিজস্ব চিন্তাধারার সাথে অন্যদের খাপ খাওয়ানো কঠিন কিংবা অন্যদের চিন্তার সাথে নিজেদের। আমাদের সমাজ কিংবা দেশের মানুষ নিজেদের বিচার করা ভুলে গিয়েছিল অনেক আগে।
যেই বছর রানা প্লাজা ধ্বসে পরলো সেই বছর আমাদের এলাকা ছিল মারাত্মক গরম। রাতে টেলিভিশনে আমরা সেই ধ্বসে পরা তদন্তের নিউজ শুনতাম। সেই নিউজটা আমাদের কাছে ততটাও বড় ছিলনা, প্রত্যুষের আলো ফুটলেই দেখতাম রাজনৈতিক সমর্থকরা রাস্তার দুধারে অস্ত্রসস্ত্রসহ বসে আছে। প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সময় খুব ভয়ে ভয়ে পা ফেলতাম।

তখন আমাদের এলাকার পুরো একটা পরিবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, হয়ে গিয়েছিল বললে ভুল হবে করা হয়েছিল। সেদিন আমার পরীক্ষা ছিল। কলম ধরতেই মনে হচ্ছিল, রক্তে ভেসে যাচ্ছে ক্লাসরুম। দু’সন্তানের লাশ উঠোনে ফেলে এক বৃদ্ধ পিতা অন্য সন্তানের জামিনের জন্যে আদালতে ছুটছে। আর মা! তিনি অন্য সন্তানের আই সি ইউ কেবিনের কাচে স্থির তাকিয়ে অপেক্ষারত। গর্ভবতী বিধবা মেয়েটির বিয়ে হলো মাত্র মাস পাঁচেক। ওই বছরটা ভুলে যাওয়ার মতো নয়।
এখানে যাদের শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তারা আদতেই টিকতে পারেনা, পারেনি। আমরাতো শুধু চিরাচরিত শোষণের বিরুদ্ধে বেঁচে থাকতে চাইছি, অধিকারের শ্বাস নিয়ে লড়াই। কোনোদিন যদি মেরুদণ্ডহীন কারো মস্তিষ্ক সতেজ হয়।
রাজনীতি শব্দটা আমার কাছে কখনওই বিরোধ শব্দ ছিলনা। “আই হেইট পলিটিক্স”- রাজনীতি যার কাছে এটুকুতেই থেমে গেছে সে আর যাই হোক আপনজনকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার সাধ পায়নি। চারপাশে হানাহানি দেখে দেখে চোখ বুঝে এলেই মা বলতো, কবে যে স্বস্তি আসবে!
সেই তখন থেকেই স্বস্তি খুঁজতে চেয়েছিলাম। ওসব আর বলা যায়না। এখন একেকটা স্বস্তিকর নিঃশ্বাসের বিনিময়ে ঢালতে হয় প্রচুর টাকা। বুকে আত্মবিশ্বাস থাকলে থানা, পুলিশ, মামলা, আদালত ওসবে একঘেয়েমি আসেনা। ওই আত্মবিশ্বাসটার আরেক শব্দ ধরে নেয়া যায় বিশ্বাস।
বিশ্বাসটা কি? পরিবর্তন নাকি নীতি! আমি ওসব দেখতে যাইনা। ভাবতে গেলেই মনে হয়, একটা ছেড়ে আরেকটা গ্রহণ তো করতেই হবে। তবে গ্রহণ মানেই নীতিবহির্ভূত মানসিক আপোষ কেন! নীতি বিশ্বাসী জীবগুলোকে প্রচুর রক্ত দিতে হয়। রক্ত দেয়ার ব্যাপারটা এমন নয় যে এই রক্তে রাস্তার ময়লা পরিষ্কার হয়ে গেলে পরবর্তী জেনারেশন হাঁটতে পারবে।
এটুকু ভেবে রক্ত দিলে বৃথা মনে হয়না। কিন্তু নীতিকে বিশ্বাস করে ঠকে গিয়েছে যে তার বিশ্বাসের গন্তব্য কই!
(৪)
সময়ের মৃত মানুষেরা অ’সময়ের ভোটাধিকারে পায় সর্বময় অগ্রাধিকার, তাদেরই জিতিয়ে দেয়া গণতান্ত্রিক সরকারের দেশের নিছক পিঁপড়ে সমতুল্য জনতা আমরা।
আমাদের মাথার উপর পায়ের আঙ্গুল, ওখানে ক্ষমতা থাকে কুঠারের মতো। আমরা নিরুপায় নই, তবুও পা চেটে চেটে ধানের বস্তার মতো তাদেরকে বয়ে বেড়াই। মাকালফল জেনেও প্রতিনিয়ত গিলে খাই তাদের অসুস্থ রাজনৈতিক আশ্বাস, ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট বললে আবার ভুল উপমা হবে নাতো!

উপরদলীয় রঙিন চশমা গিলে খায় বুকের মাপ, আবরণ দিতে দিতে ক্লান্ত হাত পায়ে গিয়ে ঠেকাকেই নাকি আদবকায়দা বলা হয়। লজ্জা শব্দ মাথা খুঁটে মরে গিয়ে বেঁচে গেলেই হলো।
সুযোগসুবিধে ভোগী সুযোগসন্ধানীরা সুযোগ্যতার নামে অর্থ বিলিয়ে দেয়। আমরা অপ্রাপ্তির পাব্লিক, হাতের তালুতে খানিকটুকু এলেই ন্যায্যমূল্য অধিকারকেও পরোপকার বলে বসি।
নিজেদের আত্মবুদ্ধি দমিয়ে রেখে শোষিত হয়ে চুপ থাকাকে কি দেশ ঠকানো বলা যায়না?

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন