অতঃপর এমন পরিণতিই আশঙ্কা করেছিলাম অং সাং সূচির

হাসান আল বান্না

লিখাটি যখন লিখছি তখন মনে পড়ে যাচ্ছে ইতিহাসের কুখ্যাত নারী অ্যার্জেবেত বাথোরি। হাঙ্গেরিতে ১৫৬০ সালে জন্ম, তার গল্প কোনো ভৌতিক ছবির কাহিনীর মতো শোনাবে। বলা হয়ে থাকে, ৫৪ বছরের জীবনে তিনি ৮০ থেকে ৬০০ জনকে খুন করেছিলেন। যাদের খুন করতেন, তাদের রক্ত দিয়ে গোসলও করতেন অ্যার্জেবেত বাথোরি। ভয়ঙ্কর খুনি হিসেবে গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম আছে তার। অংসাং সূচিকে নিয়ে লিখতেই এই কুখ্যাত নারীর নাম কেন আসলো তা শেষে বলবো।

অংসাং সূচির ক্ষমতায় আসার পর সারা পৃথিবীর সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সমূহ অভিনন্দন জানিয়েছিল। সূচির স্বামী ও সন্তান বিদেশি নাগরিক হওয়াই রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন নাই কিন্তু সামরিক জান্তা বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে উপদেষ্টা পদ গ্রহণ করে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা নেন। সূচি ক্ষমতা নেওয়াই বিশ্ব মুখিয়ে ছিল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শাসকদের বর্বরতা থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু ১৫ /১৬ সালে স্মরণকালের সকল বর্বরতা শুরু হয় রোহিঙ্গাদের উপর। নতুন করে ১০ লাখ শরনার্থী ঢল নামে বাংলাদেশের উপর। বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহানুভবতায় সীমান্ত খুলে দেয়। সারাদেশের মানুষ তাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ায়। আমি নিজেও কিছু সাংবাদিক, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল নিয়ে ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করি। নির্যাতিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে লোমহর্ষক বর্ণনা শুনি। সবারই একই বক্তব্য ছিল, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতা থেকে সূচির আমলের বর্বরতা আরো ভয়াবহ। মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং সূচি একই মূদ্রার এপিঠ ওপিঠ।
গণতন্ত্রের ছদ্মাবরনে ক্ষমতায় এসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর বর্বরতায় সূচি কোন প্রকার দুঃখ প্রকাশ করেই নি বরং বিবিসি সাংবাদিককে রোহিঙ্গা নাগরিক না বলে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী বলতে নির্দেশ দেন। এখানেই শেষ নয় বরং ১৯ সালে গাম্বিয়া যখন ‘ দি হেগে ‘ অবস্থিত আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা নিপীড়নের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে তখন সূচি নির্লজ্ব ভাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পক্ষ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে ডিফেন্স টিমের নেতৃত্ব প্রদান ও সাফাই গায় বা (Advocacy) করে।

এবার আসি লিখার শুরুতে হাঙ্গেরীর কুখ্যাত নারী অ্যার্জেবেত বাথোরির কথা। সেই নারী কুখ্যাত হয়েছেন কখনও শান্তি বা গণতন্ত্রের তকমা দিয়ে নয়। ইতিহাসে এমন আরো হিংস্র নারী বর্বরতা বিভিন্ন যুগেও ছিল কিন্তু তারা তাদের নিজেদেরই হিংস্র হিসেবে দাবি করতো। কিন্তু পৃথিবীর কুখ্যাত সব নারীদের ইতিহাস ছাপিয়ে অং সাং সূচি হচ্ছে সেই বর্বর মহানায়িকা, যে বিশ্বকে বোকা বানিয়ে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে ক্ষতমতায় এসে পৃথিবীতে চেঙ্গিস খাঁ ও হালাকু খাঁর হিংস্রতা আর বর্বরতার সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে।

আজ মিয়ানমার সেনাবাহিনী পুনরায় ক্ষমতা দখল করে সূচিকে তার পুরনো জায়গায় ( গৃহবন্দী) করে পাঠিয়ে দেয়৷ যদি মিয়ানমারে ক্ষমতায় এসে সূচি বিশ্ব জনমতের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পক্ষে ভূমিকা রাখতেন তবে আজকের এই পরিনতি নাও হতে পারতো। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক! তা কেন? খুবই সহজ কথা, যদি মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের পক্ষে সূচি থাকতেন তবে পশ্চিমা বিশ্ব, জাতিসংঘ এবং ওআইসি সহ সকল বিশ্ব শক্তি গত ৫ বছর সূচির পাশে সর্ব শক্তি নিয়ে অবস্থান করতো ফলে আজকের এই পরিনতি নাও হতে পারতো। গত ৫ বছর সূচি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর যে নির্লজ্ব দালালী করেছে তাতে সূচির আজকের পরিনতি আশঙ্কা করেছিলাম বহু আগ থেকেই৷ সব শেষে জানিয়ে রাখি এর মাধ্যমে সূচির ইতিহাস কবর রচনা হলো। বিদায় একবিংশ শতাব্দীর হিন্দা অং সাং সূচি…

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

আরও পড়ুন