অনিশ্চিত সময়ের মুখোমুখি শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিবাবকরা

এইচ বি রিতা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার জেলা স্কুল এবং পৃথক স্কুলগুলো কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। সম্মিলিত নির্দেশাবলীর সাথে নতুন বছরে স্কুলগুলিতে পূনরায় ক্লাস শুরু করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ইন-পারসন, রিমোট উভয়ের সংমিশ্রিত এবং সম্পূর্ণ অনলাইন এর মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান এবং গ্রহণে অনিশ্চিত সময়ের মুখোমুখি হচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং ‌অভিবাবকরা।
১৮০,০০০ এর বেশী সংখ্যক কোভিড-১৯ আক্রান্ত মৃত্যুর পর শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং প্রশাসকরা দেশ ব্যাপী দূরবর্তী শিক্ষায় জোড় দিয়েছেন। মহামারী চলাকালীন পরবর্তী স্কুল বছরের জন্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করার এটিই সর্বোত্তম উপায় বলে মনে করা হলেও, এই পরিবর্তনে আলোচনা এবং মতানৈক্য প্রচুর হয়েছে।

সিইএ গণনা করে যে, এই বছর স্কুলগুলি আবার চালু না করা হলে ৫.৬ মিলিয়ন পেরেন্সরা শিশু যত্নের কারণে কাজে ফিরতে পারবেন না। অন্যদিকে, এই মাসের ৮ তারিখ থেকে বিল্ডিংগুলোতে ফিরে যাবার পর দুই সপ্তাহের ব্যবধানে শিক্ষক এবং স্কুল কর্মচারীদের মাঝে ৫৫ এর উপর কোভিড-১৯ পজিটিভ সনাক্ত হয়েছে। আতঙ্কিত শিক্ষক ইউনিয়ন ও নির্বাচিত কর্মকর্তাদের চাপে মেয়র ডি ব্লাজিও নিউইয়র্ক নগরের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের সশরীরে উপস্থিতির তারিখ পরিবর্তন করেছেন। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে থ্রি-কে, প্রি-কে ও ডিস্ট্রিক্ট সেভেন্টি ফাইভের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা স্কুল ভবনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে শিক্ষা কার্যক্রমে ‌‌অংশ নেবে। এলিমেন্টারি বা কিন্ডারগার্টেন পর্যায় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে শ্রেণিকক্ষগুলোতে শিক্ষাগ্রহণ শুরু করবে। মধ্য ও উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আগামী ১ অক্টোবর থেকে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়ে শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেবে।

বর্তমান ‌অস্থিতিশীল পরিবর্তন ও পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয় পিএস-সেভেন্টি ফাইভ এর শিক্ষক ভিক্টেরিয়া গার্টস এর সাথে। তিনি বলেন, “কোভিড -১৯ এর এই সময়টি শিক্ষকদের উপর অনেক বেশি চাপ সৃষ্টি করেছে। পিতা-মাতারা তাদের শিশুদের স্কুলে পাঠাতে তৎপর হচ্ছেন কারণ তাদেরও কাজে ফিরতে হবে। এবং এতে করে আমাদের সবার জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। আর কম্পিউটারে পড়াশুনাও খুব কঠিন আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য। ব্যক্তিগত সংযোগ ছাড়া পর্দার মাধ্যমে আমরা তাদের কতটুকু সাহায্য করতে পারবো, তা একটি প্রশ্ন। সামগ্রিকভাবে, এই পরিস্থিতি খুব দুঃখজনক এবং চাপযুক্ত।“

একই স্কুলের ইএনএল এর শিক্ষক মিস্টার লুইস ড্যারিও অর্টিয বলেন, “কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে স্কুল বিল্ডিংগুলো বন্ধ হয়ে যাবার পর শিক্ষা ক্ষেত্রে দ্রুত একটা পরিবর্তন এনেছে যা আগে কখনো আমরা মোকাবেলা করিনি। নতুন শিক্ষন পদ্ধতি, অস্থিতিশীল পরিবর্তন শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিবাবকদের জন্য মারাত্বক একটি চ্যালেন্জ । তবে নতুন এই শিক্ষন পদ্ধতিতে আমরা শিক্ষকরা সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি আগামীর দিনগুলো আমাদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে।”

স্কুল সাইকোলজিষ্ট এবং কাউনসেলর মিশ্যাল আর ব্রিটো মনে করেন যে শিক্ষার্থীদের শারিরীক উপস্থিতি খুব প্রয়োজন। তবে এ মুহূর্তে স্কুলবিল্ডিংয়ে ফিরে যাওয়া বিপদজনক হতে পারে। তিনি বলেন,”আমার ডিওই’র সকল সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তরিক ভালবাসা ও আশার আলো প্রেরণ করছি।”
স্কুলটির নৃত্য শিক্ষক মিস কোলিন্স বলেন, “আমি খুবই হতাশ। সব কিছুই অপরিকল্পিত। সব কিছুর উর্ধে আমি আমার শিক্ষার্থীদের জন্য বিচলিত। আশাকরি শীঘ্রই সব আগের মত হবে এবং আমরা আমাদের শিশুদের কাছে থেকে উন্নত শিক্ষা প্রদান করতে সক্ষম হবো।”

বর্তমান শিক্ষন পদ্ধতিতে সন্তানদের প্রভাব এবং পারিপার্শিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেন কয়েকজন অভিবাবক।
মাসুম আহমেদ, যিনি একজন ‌অনলাইন এক্টিভিষ্ট জানান, তাঁর মেয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে এবং ছেলে কিন্টারগার্ডেনে পড়ে। তিনি মনে করেন যে, পেন্ডামিকের কারণে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থেকে বাচ্চাদের মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাই অলাইনে ক্লাস শুরুর কারণে ঘরবন্ধি থেকেও বাচ্চারা পড়াশুনার সাথে যুক্ত থাকতে পারছে। তিনি বলেন, “অনলাইন ক্লাসের অসুবিধা কিছু আছে। প্রথমত ক্লাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থী মুখোমুখি শিক্ষণ প্রক্রিয়ার অনেক মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা ও সঠিক শিক্ষা থেকে বাচ্চারা বঞ্চিত হচ্ছে। তাই অনেক বিষয়ে পড়াশোনায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া ডিভাইসের স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় বসে থাকায় বাচ্চাদের চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা এবং ঘাড়ে ও পিঠের মেরুদণ্ডে ব্যথা হতে পারে। অনেকেই ক্লাস বা পড়ার অজুহাতে বাচ্চারা সারাক্ষণ ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের সঙ্গে এরা নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে। যেটা একটা বাচ্চার জন্য বা পিতামাতার জন্য খুব একটা সুখকর নয়।”

প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সাংবাদিক মুহাম্মদ মন্জুরুল হকের ছেলে ২য় শ্রেণিতে পড়ে। তিনি ছেলেকে ব্রেন্ডেড লার্নিং এ দিলেও তার স্কুল থেকে এখন দূরবর্তী লার্নিং এ যুক্ত করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, শিশুদের স্কুলে শারীরিক উপস্থিতি দরকার। তবে নিরাপত্তামূলক বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। মন্জুরুল হক বলেন, “এ এক বিশাল পরিবর্তন। দূরবর্তী শিক্ষন পদ্ধতিতে শিশুরা ‌অনেকেই পড়াশুনা ফাঁকি দিয়ে সে সময়টাতে অনন্য গেইমস ডিভাইসগুলো ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে। দীর্ঘক্ষন কমপিউটারে বসে থাকাও একটি শিশুর জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। আশা করছি খুব শীঘ্রই অবস্থার পরিবর্তন হবে।”

লেখক স্বপ্ন কুমার এর মেয়ে মাহা একাদশ শ্রেণিতে পড়েন এবং ছেলে দোহা সপ্তম শ্রেণিতে পড়েন। তিনি
বলেন, “আমার ছেলে-মেয়েদের আমি দূরবর্তী শিক্ষন পদ্ধতিতে রেখেছি। কারণ এই মুহূর্তে তাদের জীবনের নিরাপত্তা আগে। পড়াশুনায় সামান্য হেরফের হলে সমস্যা নেই। তবে একটা বিষয় লক্ষ্যনীয় যে, আমাদের অনেক শিশুরাই এখন মাল্টিটেক্সটিংয়ে অভ্যস্ত হয়ে পরছে। অনলাইন পড়াশুনার পাশাপাশি তারা অনন্য ডিভাইস ও ব্যবহার করছে নিজেদের খুশীমত, যা পড়াশুনার ক্ষতি করতে পারে।”

নতুন শিক্ষন পদ্ধতি, অস্থিতিশীল পরিবর্তন, অনিরাপত্তা, শিক্ষকদের উপর নির্দেশনা, এবং আগামী ভবিষ্যত নিয়ে শিক্ষক, সাইকোলজিস্ট এবং অভিবাবকদের সাথে আলাপচারিতার পর এখানে একটা বিষয় লক্ষনীয় যে,
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন অনেক শিক্ষক এবং অভিবাবকরা। অনেক অভিবাবকরাই নিজ সন্তানের নিরাপত্তায় দূরবর্তি শিক্ষন পদ্ধতি বাছাই করলেও, তাতে সন্তুষ্ট থাকছেন না কেউ কেউ। নিরাপত্তার তাগিদে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ব্রেন্ডেড লার্নিং থেকে অব্যাহতি নিয়ে দূরবর্তি শিক্ষন পদ্ধতিতে যুক্ত হচ্ছেন। অনেক শিক্ষক প্রযুক্তির ব্যবহারে অদক্ষ বলে অবসর গ্রহন করছেন। অভিবাবকরা নিজেদের সন্তানদের স্কুল বিল্ডিংয়ে ফিরে যেতে রাজি হয়েও এখন আতঙ্কে দিনযাপন করছেন।

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং ইউ এস এ প্রবাসী প্রথম আলোর সাংবাদিক

 

আরও পড়ুন