ইউক্রেন-সংকট : বিভক্ত ইউরোপ ও সংহত রাশিয়া!

।। হাসিবুর রহমান ।। 

মাসাধিককাল যাবত উত্তপ্ত পূর্ব ইউক্রেন ও রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্ত। ইউক্রেনের পূর্ব সীমান্তে রাশিয়ার সামরিক শক্তিমত্তা বৃদ্ধি এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে কার্চ প্রণালিতে ইউক্রেনের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন এতদঞ্চলে আঞ্চলিক সংকট ঘনীভূত করছে। সীমান্তে তৈরি হয়েছে যুদ্ধ-পরিস্থিতি। সোভিয়েত ইউনিয়নের আত্মজ রাশিয়ার এই হুমকিতে বিচলিত বোধ করছে ইউরোপ ও তার প্রতিরক্ষাপ্রধান যুক্তরাষ্ট্র। তারা অনুভব করছে– তাদের পূর্ব সীমান্তের ওপর নজর পড়েছে এক প্রবল শক্তিধর একনায়কের। আর ইউক্রেন বুঝতে পারছে, তার সার্বভৌমত্ব রুশ হুমকির ফলে বিপন্ন।

পরিস্থিতি আজ থেকে সাতবছর আগে গিয়ে থমকে আছে। বিশ্ব সেবার ক্রিমিয়া নিয়ে যে সংকট প্রত্যক্ষ করেছিলো, পূর্ব ইউক্রেন নিয়ে একই পরিস্থিতি আজ প্রত্যক্ষ করছে। সেবারও ইউক্রেন শংকিত ছিল স্বীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা নিয়ে, এবারও তাই। ঘটনাদুটোর সাথে মিল অনেকখানি। তবে অমিল যেটুকু, সম্ভবত সেটা পরিণতি নিয়ে। ২০১৪ সালে সংহত ইউরোপের সামনে তখন ছিল অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত রাশিয়া। আর এবার সংহত রাশিয়ার সামনে বিভক্ত ইউরোপ। তাই দৃশ্যপট এবার এক হলেও তুলির শেষ আঁচড়টা সম্ভবত ভিন্ন হতে যাচ্ছে।

সামরিক সামর্থ্য কিংবা ভূকৌশলগত কারণেই ইউক্রেনের পক্ষে রাশিয়ার মোকাবিলা করা কঠিন। বিষয়টি ইউক্রেনের রাষ্ট্রব্যবস্থাপকদেরও অজানা নয়। সেজন্য ইউক্রেনকে ঝুঁকতে হচ্ছে ন্যাটো আর ইইউর দিকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইইউ কিংবা ন্যাটো কি ইউক্রেনকে সাহায্য করবে এ-বিষয়ে? প্রশ্নটা ওঠছে এজন্য যে, সম্প্রতি ইউক্রেন ইস্যুতে নজিরবিহীন মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে পশ্চিমের শক্তিশালী দেশগুলোর মাঝে।

বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে ক’দিন আগে জার্মানির নবনিযুক্ত চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজের প্যারিস সফরের সময়। যদিও জার্মানি বিবৃতিতে জানিয়েছে তারা ইউক্রেনের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী, তথাপি তাদের আশা জার্মানির মিত্রদেশগুলো তাদের ইউক্রেননীতি পরিপূর্ণরুপে মেনে চলবে। বোঝাই যাচ্ছে, জার্মানি মিত্রদেশগুলোর অভ্যন্তরে মতপার্থক্যের আশংকা করছে। তাছাড়া, জার্মানি নিজেও স্বীয় স্বার্থের প্রতিলোমে ইউক্রেন-ইস্যুতে রাশিয়ার মতো জ্বালানিসমৃদ্ধ দেশকে চটাতে চাইছে না। একই মনোভাব ইউরোপের অন্য দেশগুলোরও। তারা এখন অনুভব করতে পারছে, রণ-ক্লান্ত আমেরিকার প্রতিরক্ষার চেয়ে তাদের পক্ষে অধিক ফলদায়ক হচ্ছে জ্বালানি-উর্বর রুশভূমি। ফলে ইউরোপের ওয়াশিংটনমুখী অনেক দেশই এখন নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির গতিমুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আঞ্চলিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর দিকে। তাই তারা সামরিক সমাধানের বিপরীতে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে বেশি। অর্থনৈতিক অবরোধের প্রতিও তারা তাদের মৌন সমর্থন দিচ্ছে। তবে সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শনের ব্যাপারে তাদের ও ইউরোপের আরো ক’টি দেশের অনীহা সুস্পষ্ট। এমনকি খোদ আমেরিকাও সামরিক সমাধানে আগ্রহী নয়। তাদের মুখে বরং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞারই আলাপ শোনা যাচ্ছে বেশি করে।

ইউক্রেন ইস্যুতে সামরিক পদক্ষেপ যথাযথ সমাধান নয়। ভূকৌশলগত বা সামরিক সামর্থ্যের কারণেই রাশিয়া এগিয়ে এ-জায়গায়। দেশটি ইতিমধ্যেই ইউক্রেনকে সমুদ্রপথে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তাছাড়া, যে অর্থনৈতিক অবরোধের ভয়ে পুতিন কিছুটা সংযত ছিলেন, সে ভয়ও চীন অনেকখানি দূর করে দিয়েছে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে। সেজন্য সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে পুতিনকে ভয় দেখানো দুরূহ। তারচে’ কার্যকরী হাতিয়ার হতে পারে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। যদিও এই অস্ত্রের কার্যকারীতা নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। তথাপি চীনের দিকে রাশিয়ার সাহায্যের হাত প্রসারিত করাটাই অর্থনৈতিক অবরোধের ফলাফল অনেকটাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে।

ইউক্রেন-ইস্যুতে জড়িত বিভিন্ন পক্ষগুলো লাভ-লোকসানের অংক কষলেও রাশিয়া এখানে শুধুই লাভের অংক কষে যাচ্ছে; এবং সেটা শুরু থেকেই। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বোঝা যাচ্ছে, পুতিন এই ইস্যুটিকে পশ্চিমাদের সাথে দরকষাকষির একটা সুযোগ হিসেবে নিতে চাচ্ছেন। সেজন্য সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার আগে তিনি কূটনীতির টেবিলও উন্মুক্ত রেখেছেন। যদি বিষয়টি কূটনীতির টেবিলে সমাধান লাভ করে, তবে রাশিয়া এর ফলে আর্থিক দিক থেকে ব্যাপকভাবে লাভবান হবে। আর যদি বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে সশস্ত্র পদক্ষেপ গ্রহন করে রাশিয়া, তবে তা দেশের অভ্যন্তরে পুতিনের “ত্রাণকর্তা” ভাবমূর্তিরই বিকাশ ঘটাবে এবং জার-পুতিনের সাম্রাজ্য সমৃদ্ধ হবে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের জৈবিক অংশের মিলনে।

এছাড়াও এই সংকট রাশিয়াকে আরো ঘনিষ্ঠ করে তুলেছে চীনের সাথে। পশ্চিমবিরোধী এই দুই দু’দেশই পারস্পরিক বন্ধুত্ত্বের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে নিজেদের মাঝে সামরিক, কূটনৈতিক অর্থনৈতিকসহ বিবিধ বিষয়ে পরষ্পর সহযোগিতা বৃদ্ধির অঙ্গিকার করেছেন। বলাবাহুল্য, এই মৈত্রী যেমন ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনে গতিবৃদ্ধিতে পুতিনকে সাহায্য করবে, তেমনি তাইওয়ানেও চীনা আগ্রাসনের গতিবৃদ্ধিতেও শি জিন পিংকে এই মৈত্রী যথেষ্ট সাহায্য করবে।

ফলাফল যাই হোক, রাশিয়াকে যদি দমানো না যায়, তবে আজভ সাগরের তীরবর্তী দুইদেশ মেতে ওঠবে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতে। পূর্ব ইউক্রেন-ইস্যু পুতিনের জন্য বিলাসসামগ্রী হলেও জেলিনস্কির জন্য তা জীবন-মরণের প্রশ্ন। স্বাভাবিকভাবেই নিজের অঙ্গচছেদ রোধে বিনাশক হয়ে ওঠবেন সাবেক কৌতুকাভিনেতা জেলিনস্কি। তবে যাই হোক, ইউরোপ জেগে না ওঠলে সম্ভবত এবার সাময়িকভাবে কপাল পুড়তে যাচ্ছে ইউক্রেন ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলিনস্কি এবং পূর্ব ইউক্রেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ স্লাভিক জনগোষ্ঠীর। আর দীর্ঘমেয়াদে কপাল পুড়তে যাচ্ছে, আমেরিকা ও ন্যাটোর। রাশিয়ার হুমকি থেকে ইউক্রেনকে রক্ষা করতে আমেরিকা ও ন্যাটো ব্যর্থ হলে আমেরিকা ও ন্যাটোর “রক্ষাকর্তা” ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মারাত্মকভাবে। ফলাফল, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের আসন নড়ে ওঠবে অনেকখানি।

লেখকঃ আন্তর্জাতিক বিষয়ে কলাম লেখক 

লেখকের আরও লেখা পড়ুন- শরণার্থীদের নিয়ে জুয়া খেলা বন্ধ করুন

 

ইউক্রেন-সংকট : বিভক্ত ইউরোপ ও সংহত রাশিয়া!ইউক্রেন-সংকট : বিভক্ত ইউরোপ ও সংহত রাশিয়া!ইউক্রেন-সংকট : বিভক্ত ইউরোপ ও সংহত রাশিয়া!ইউক্রেন-সংকট : বিভক্ত ইউরোপ ও সংহত রাশিয়া!

আরও পড়ুন