উপসাগরীয় রাজনীতিতে ইরান ফ্যাক্টর ও হরমুজ প্রণালী

এম আর রাসেল 

১.
বিশাল তেল ও গ্যাস রিজার্ভের উপস্থিতি পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। অতীতকাল থেকেই এই অঞ্চলের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার খবর শোনা যায়।

এক সময় ইরানকে দিয়ে এই অঞ্চলে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই সময় ইরানকে বলা হত পারস্য উপসাগরের পুলিশ।

MI-6 ও CIA এর যৌথ কারসাজিতে মোসাদ্দাকের পতন, রেজা শাহ পাহলভীর দীর্ঘ শাসন আমল, ১৯৭৯ সালের বিপ্লব, ৫২ আমেরিকানের ৪৪৪ দিন বন্দী থাকা, ইরান-কন্ট্রা কলঙ্ক, যাত্রীবাহী বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ২৯০ জন ইরানি নিহত হওয়া- প্রভৃতি ইতিহাসের আলোচনায় ইরান নিয়ে অধিক উচ্চারিত কিছু ঘটনা।

১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের পর ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এখন পর্যন্ত সম্পর্কের নবায়ন ঘটেনি। বারাক ওবামার সময়ে বিবাদের বরফ গলতে শুরু করেছিল। সেই সময়ে বহুল আলোচিত জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ এ্যাকশন নামের চুক্তি হয়েছিল।

ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে সরে গিয়েছে। বর্তমান বাইডেন প্রশাসন চুক্তিতে ফিরতে পারে এমন আলাপ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সম্ভাবনাকে একেবারে উডিয়েও দেয়া যায় না। তবে মাথায় রাখতে হবে এই ফিরে আসাকে ঠেকাতে ইসরাইল প্রচেষ্টা চালাবে।

ট্রাম্পকে এই চুক্তি থেকে সরিয়ে নিতে প্রভাবশালী ইহুদী লবি AIPAC-এর শক্ত ভূমিকা ছিল। এমনকি এই কাজে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয়েরও খবর প্রকাশিত হয়েছিল।

গত বছরের জানুয়ারি মাসে ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সুলাইমানিকে হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বছরের শেষ দিকে পরমাণু বিজ্ঞানী ফাখরি জাদেহ হত্যার খবরও আমাদের অজানা নয়। বিজ্ঞানী হত্যার জন্য ইরান ইসরাইলকে দায়ী করেছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে সে নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা চলছে। সম্প্রতি বাইডেন ইরানের সাথে নতুন করে আলোচনা শুরুর ইংগিত দিয়েছেন।

ইরান বলছে, আলোচনা শুরু হতে হলে অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু বাইডেন জানিয়েছেন, আলোচনার জন্য অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে না।
এখন কি ঘটে সেটা দেখতে সামনের দিনগুলোতে দৃষ্টি রাখতে হবে।

২.

ইরানের ক্রমবর্ধমান উত্থানে অনেক আরব দেশও ভীতির মুখে আছে। কারণ ইরান শিয়া রাষ্ট্র। শিয়া- সুন্নি দ্বন্দ্বের কথা আমাদের অজানা নয়।

পারস্য উপসাগরীয় রাজনীতিতে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব অন্যতম একটি ফ্যাক্টর। কোনো পর্যবেক্ষক মনে করেন, একদিন শিয়ারা গ্রেটার ইরান বা গ্রেটার পারস্য রাষ্ট্র গঠন করতে পারে।

এই ধারণাকে মাথায় রেখে সুন্নি রাষ্ট্রগুলো ইরানের বিরোধী জোট গঠন করছে। ১৯৮১ সালে জিসিসি-র প্রতিষ্ঠাও ছিল ইরানকে চাপে রাখার প্রথম কৌশলী পদক্ষেপ।

ইরানকে দমিয়ে রাখার নিমিত্তেই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জন্ম নিয়েছে প্রক্সি ওয়ার। প্রতিটি আঞ্চলিক দ্বন্ধ ইরান ও অপর সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থান চোখে পড়ে৷

পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী দেশগুলোর মধ্যে এখন পর্যন্ত সুন্নী রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে সৌদি আরব কর্তৃত্ব ধরে রেখেছে। উঠতি শক্তি সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃত্ব নিতে অগ্রগ্রামী হচ্ছে।

কাতারের সাথে বর্তমানে ইরানের সুসম্পর্ক আছে। জিসিসি ভুক্ত দেশগুলো কাতারের উপর অবরোধ আরোপ করলে ইরান-কাতার সম্পর্ক মজবুত হয়। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের ইরান প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে থাকে। এর বাইরে সিরিয়া, ইরাক, বাহরাইন-এর বেশ কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে ইরানের গভীর যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের শিয়া গোষ্টীর সাথেও ইরানের যোগাযোগ রয়েছে।

এর ফাঁকে কিছু তথ্য জানিয়ে রাখি, পৃথিবীতে ১৬০ কোটি মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে শতকরা ৮৫ ভাগই সুন্নি সম্প্রদায়ভুক্ত। শিয়া অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলো হল- ইরান, ইরাক, বাহরাইন, লেবানন।

তিনটি রাষ্ট্রে মোট জনসংখ্যায় শিয়াদের শতকরা অনুপাত যথাক্রমে ৯০ভাগ, ৬৩ ভাগ, ৭০ ভাগ, ৩৬ ভাগ। এর বাইরে ইয়েমেনে ৩৬ ভাগ, কুয়েতে ২৫ ভাগ, কাতারে ১৪ ভাগ, সৌদি আরবে ৫ ভাগ শিয়া ধর্মভূক্ত।

আরো জানিয়ে রাখি, সাফাভিদ সাম্রাজ্য ইরানে শিয়া ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এর পূর্বে ইরানে সুন্নি ধর্মের প্রচলন ছিল। সাফাভিদ সাম্রাজ্যের শাসনকালের ব্যপ্তি ১৫০১ থেকে ১৭৩৬।

৩.

লেখার শুরুতে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বের কথা বলেছিলাম। চলুন এখন জেনে নেই কি কারণে এই অঞ্চল এত গুরুত্বপূর্ণ?

পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী দেশ হল- ইরান, ইরাক, কুয়েত, সোদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান। দেশগুলির নাম থেকেই ধরতে পারা যায় এদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা৷

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১০ টি তেলক্ষেত্রের ৫ টি এই অঞ্চলে অবস্থিত। অঞ্চল হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য তথা পারস্যীয় অঞ্চলে গ্যাসের বড় রিজার্ভ রয়েছে।

বিশ্বে তেল রিজার্ভে শীর্ষ ১০ দেশের ৫ টির অবস্থান এই অঞ্চলে। সোদি আরব তেল রিজার্ভে ২য়, ইরান ৪ র্থ, ইরাক ৫ম, কুয়েত ৬ ষ্ঠ, আরব আমিরাত ৭ম। কাতারের অবস্থান ১৪ তম।

গ্যাস রিজার্ভে প্রথম ১০ টি দেশের মধ্যে ৪ টির অবস্থান এই অঞ্চলে। ইরান ২য়, কাতার ৩য়, সৌদি আরব ৫ম, আরব আমিরাত ৭ম। ইরাক, কুয়েত ও ওমানের অবস্থান যথাক্রমে ১২ তম, ২০ তম, ২৭ তম।

তেল ও গ্যাসের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। শুধু জানিয়ে রাখি তেলের জন্যই এই অঞ্চলে দুটি যুদ্ধ হয়েছিল। পশ্চিমা বিশ্ব ও চীন, বলতে গেলে পুরো বিশ্বই পারস্য অঞ্চলের উপর নির্ভরশীল।

৪.
ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, শিয়া-সুন্নি দ্বন্ধ, পারস্য উপসাগের গুরুত্ব জানার পর অন্য একটি বিষয় নিয়েও জানা থাকা জরুরি। সেটা হল হরমুজ প্রণালী।

পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি পরিবহনের একমাত্র পথ হল হরমুজ প্রণালি। আর এই প্রণালীর অবস্থান ইরানের সীমানায়। এর উপর ইরানের পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে। এজন্য হরমুজ প্রণালীকে বলা হয় ইরানের ভূ-রাজনৈতিক প্রাণ।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানি ও নিরাপত্তা বিষয়ক কনসালট্যান্সি ম্যাথুস অ্যাডভাইজারি প্রতিষ্ঠাতা টম ওসুলিভান বলেন, “আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক”।

ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের মধ্য দিয়ে আরব সাগরে মিশেছে হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালীর উত্তর উপকূলে রয়েছে আরব আমিরাত ও মুসানদাম নামে ওমানের একটি ছিটমহল। এটি ১৬৭ কি.মি. দীর্ঘ এবং সর্বোচ্চ ৯৬ কি.মি. এবং সর্বনিম্ন ৩৩ কি.মি. প্রশস্ত।

ইরানের সিরিকের কাছে এই প্রণালীর প্রশস্ততা ৩৩ কি.মি (যা পুরো প্রণালির মধ্যে সর্বনিম্ন)। কিন্তু এই স্থানটির মাত্র ৩ কি.মি এর মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারে। আর এই স্থানটিতে ইরানের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

প্রতি বছর বিশ্বের মোট তেল চাহিদার ২০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। পাশাপাশি এক তৃতীয়াংশ তরল প্রাকৃতিক গ্যাসও রপ্তানি হয়ে থাকে এই পথে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরব দেশগুলো প্রতিদিন প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ করে যার ৭৬ ভাগের গন্তব্য চীন, জাপান ও ভারতসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোতে।

এই প্রণালী দিয়ে OPEC ভুক্ত দেশগুলো অর্থের হিসেবে প্রতিদিন ১.১৯৭ বিলিয়ন ডলারের তেল রপ্তানি করে। যুক্তরাষ্ট্র তার তেল আমদানির শতকরা ১৮ ভাই এই পথ দিয়ে আমদানি করে

৫.
আমরা জানতে পারলাম, পরিবহন পথের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণে আছে। এই কারণে প্রায় কথা উঠে ইরান এই প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। ইরানও অনেক সময় বন্ধের হুমকি দিয়ে থাকে।

যদি কখনও এই প্রণালী বন্ধ হয়ে যায় তবে দুটি বিষয় ঘটবে৷ এক. পারস্য গালফের দেশগুলোকে বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। দুই. ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাবে

কিন্তু আদৌ কি ইরান তা করতে পারবে বা পারলেও এর স্থায়িত্ব কতক্ষণ হবে এখন সে বিষয়েও জেনে নেয়া যাক।

প্রথমেই বলে দেই, এই প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার অর্থ একাধিক দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার শামিল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে তা কোনভাবেই করতে দিবে না। এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন করতে পারস্য উপসাগরের প্রতিটি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের সেনাঘাটি রয়েছে। বাহরাইনে রয়েছে পঞ্চম ফ্লিট এর সদর দপ্তর। ইরান কিছু করতে গেলেই যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে সন্দেহ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের এই পঞ্চম ফ্লিটের কাছে ইরানের পুরো নৌশক্তি একেবারেই তুচ্ছ। তাই ইরান এই প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারলেও সাময়িক সময়ের জন্য হলেও বড় একটা বাধার প্রাচীর তৈরি করার ক্ষমতা রাখে।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কেইটলিন তালম্যজ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার বিষয়ে একটি রিপোর্ট লিখেছেন।

তাঁর মতে, ‘ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের চোখ ফাকি দিয়ে মাইন বসাতে চায়, তাহলে তারা আনুমানিক সর্বোচ্চ ৭০০ টি মাইন বসাতে পারবে যা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে যথেষ্ট। এই পরিমাণ মাইন অপসারণ করতে প্রায় এক মাস সময় লাগবে।’

কেইটলিন তালম্যজের তথ্যমতে, ‘ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে ৩৬ টি ব্যাটারি মোতায়েন করে এবং তারা যদি প্রতিদিন একটি করে মিসাইল নিক্ষেপ করে, সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্র যদি ৫০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম হয়, এরপরও ৭২ দিন সেখানে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।’

তাই একেবারেই দেয়ালে পিঠ না ঠেকলে ইরান এমন আত্নঘাতী সিদ্ধান্ত কখনই নিবে না এটা বুঝতে পারা যায়। ইরান সর্বশেষ ইরাক -ইরান যুদ্ধের সময় একবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছিল।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, গবেষক ও কলাম লেখক 

আরও পড়ুন