বিয়ের দিন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় যেভাবে বেঁচে গেলাম

হাফিজা শারমীন সুমী

ঠিক ১৬ বছর আগে এইদিনে গ্রেনেড হামলার দিনে আমার বিয়ের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিলো । গুলিস্তানের ঠিক স্টেডিয়ামের গেট বরাবর আমাদের বিয়ের গাড়ির বহর জ্যামে আটকে পরেছে,,আচমকা বিকট আওয়াজে কেঁপে উঠলাম । কিছু বুঝে ওঠার আগেই কালো ধোঁয়া,মানুষের আর্তচিৎকার, আর রক্তাত্ব মানুষের লাশের বহর । প্রথমে রড দিয়ে পিটিয়ে আমাদের গাড়ির ক্লাসগুলো চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় দূর্বৃত্তরা । তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি আমাদের সামনের গাড়িটাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো । এরপর কোথা থেকে এক বড় পাথরের আঘাতে আমার হাসবেন্ড এর মাথা ফেটে গেল । দেখি তাজা রক্ত।আমার পায়ে এসে পড়লো মস্ত এক ইট । থেতলে গেলো পা । আমার হাসবেন্ড ঐ অবস্থায় আমাকে একটানে গাড়ি থেকে বের করে নিরুদ্দেশের পথে ছুটতে লাগলেন…।

নতুন বউ আমি,,বিয়ের কনের সাজে প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে একটা দোকানে আশ্রয় নিলাম স্বামীর হাত ধরে…।শুনলাম, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে এই গ্রেনেড হামলা । ২১ আগষ্ট গ্রেনেড শব্দটার সাথে পরিচিতি হলাম বিভিষীকাময় অভিজ্ঞতা দিয়ে । চোখের সামনে ডাবল ডেকারে দাউদাউ আগুনের পাশ ঘেসে বঙ্গভবনের পাশে আশ্রয় নিয়ে বাকি সব আত্নীয়দের খোঁজ নিলাম । কানে এলো অনেকের মৃত্যুসংবাদ । কর্তব্যরত পুলিশরা আমাদের অসহায় অবস্থা দেখে এক কোণায় দাঁড়ানোর জায়গা করে দিলো । আরেক দোকানদার দোকানের ঝাপ থেকে বেরিয়ে এসে স্যাভলন আর টিস্যুপেপার দিলো । ফার্স্টএইডের কাজটা কোনরকম এ সারলাম ।আমি নতুন বউ,শুধু কাঁদছি আর কাঁদছি।।

আমার শশুড়বাড়ির সবাইকে পেয়ে মনে হলো জানে পানি পেলাম । ঐদিকে টিভিতে নিউজ দেখে আমাদের ফোনে না পেয়ে আমার আম্মা মূর্ছা যাচ্ছেন কিছুক্ষণ পর পর । রাত ৯টার দিকে পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে রিকশায় করে নববধু শশুড়বাড়ি পৌঁছালাম । আমাদের জীবিত ফিরে পেয়ে পুরো বিয়ে বাড়ির কান্না যেন আর থামছে ন ।।আমি আমার শাশুড়ীমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে দুজনেই কেঁদে উঠলাম । যেন আল্লাহপাক নতুন জীবন দান করলেন । সেই জীবন নিয়েই ২০০৪ থেকে ২০২০ পর্যন্ত  মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন মনি, আমার স্বামীর পাশে আছি ।  গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একজন উপ-সচিব, বিনয়ী ও অসাধারণ মানুষটির সাথে এখোনো পথ চলছি । জীবনে যুক্ত হয়েছে  রূহান তাহলীল নামে অসাধারণ এক পুত্ররত্ন । দোয়া ছাড়া আর কিছুই চাই না ।সবাই প্রাণভরে একটু দোয়া করবেন,,,

লেখকঃ সাহিত্যিক, গবেষক, কণ্ঠশিল্পী ও উপ-সচিবের সহধর্মিণী

আরও পড়ুন