মুনিয়াদের সরকারি সম্পত্তি হয়ে যাওয়া!

ডাঃ আলী জাহান

১. আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যা করে মুনিয়া এখন সরকারি সম্পত্তি। ভাবছেন আপনি কখনো সরকারি সম্পত্তি হবেন না? আপনার ধারণা ভুল হতে পারে। আপনি যদি বাংলাদেশে বাস করেন তাহলে দুর্ঘটনা, হত্যা বা আত্মহত্যার মাধ্যমে আপনি যেকোনো সময় পাবলিক এসেট বা সরকারি সম্পত্তি হয়ে যেতে পারেন। সরকারি সম্পত্তি হয়ে গেলে আপনাকে নিয়ে সরকারের কিছু দায়-দায়িত্ব আছে। আপনাকে বা আপনার পরিবারকে তা মানতেই হবে।আপনার করার কিছু থাকবে না কারণ তখন আপনি থাকবেন মৃত। পরিস্থিতির কারণে আপনার মৃত শরীর নিয়ে সরকারের অনেক কিছু করার আছে। আইন সরকারকে সেই ক্ষমতা দিয়েছে।

২. আপনার মৃত শরীরে নাড়াচাড়া হবে মূলত দুই জায়গায়। প্রথমটি হচ্ছে আপনি যেখানে মারা গেছেন সেখানে। দ্বিতীয় রিপোর্ট তৈরি হবে হাসপাতালের মর্গে। প্রথমটিতে আপনার শরীরের সামান্য কিছু নাড়াচাড়া হবে। দ্বিতীয়টিতে নাড়াচাড়া ছাড়াও আপনার শরীরের ব্যবচ্ছেদ হবে। যাকে বলা হয় পোস্টমর্টেম। তখন আপনি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশ ঘরে পড়ে থাকবেন।

৩. উন্নত বিশ্বের সব খানে এই দুই রিপোর্ট খুবই গোপন এবং সংবেদনশীল। সাধারণ জনগণের এখানে কোন প্রবেশাধিকার নেই। শুধুমাত্র পুলিশের সংশ্লিষ্ট লোকজন, আইনজীবী, বিচারক এবং আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজন তা দেখতে পাবে। শুনানির পর যখন রায় ঘোষিত হবে, তখন কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। তথ্যগুলো মিডিয়ার হাতে আসে। মিডিয়া তখন তা প্রকাশ করে।

৪. এর আগে ধর্ষণের বা ফ্যান্টাসির শিকার আনুশকার মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ডের সময় পুলিশ এবং ফরেনসিক ডাক্তাররা পত্রিকা থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এসে তার শরীরের গোপন অংশ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তাদের সেই বর্ণনা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়েছি। উনাদেরকে কেউ থামাতে আসেনি। উনাদেরকে কেউ বলতে আসেনি যে, যে মেয়েটি মারা গেছে তার শরীরের গোপন অংশ নিয়ে আপনি প্রকাশ্য কথা বলতে পারেন না। আপনি আপনার রিপোর্ট তৈরি করবেন। সে রিপোর্ট গোপন থাকবে। গোপন রিপোর্ট আদালতের কাছে যাবে।আদালতে যখন শুনানি হবে তখন প্রয়োজনে আপনি সেখান থেকে প্রয়োজনীয় অংশ পড়ে শোনাবেন। তার আগে প্রকাশ্যে এসে আপনি সেন্সিতিভ ইনফর্মেশন মিডিয়ায় প্রকাশ করতে পারেন না। করা উচিত নয়।

৫. ২৭ এপ্রিল গুলশানের ফ্ল্যাট থেকে কলেজ ছাত্রী নুসরাত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করার পর তা নিয়ে সারাদেশে তুমুল আলোচনা চলছে। তার এই আত্মহত্যা বা হত্যাকাণ্ডের পেছনে কে দায়ী তা নিয়ে আমি আলোচনা করছি না। আমার আলোচনা হচ্ছে মারা যাবার সাথে সাথে এই মেয়েটি কীভাবে সরকারি সম্পত্তি হয়ে গেল এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ মৃত মুনিয়াকে নিয়ে এখন কী করছে।

৪. গুলশান থানার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা মুনিয়ার যে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেছেন তা কিছু পত্রিকা প্রকাশ করেছে। অথবা তিনি পত্রিকার মাধ্যমে তা প্রকাশ করেছেন। আমি সেই রিপোর্ট পড়ছিলাম এবং ভাবছিলাম আমরা কোথায় গেলাম। রিপোর্টের কিছু অংশে খুবই সংবেদনশীল বর্ণনা রয়েছে যা আমি এখানে পুরোপুরি উল্লেখ করতে পারবো না। শরীরের গোপন অঙ্গের বর্ণনা রয়েছে। সেখান থেকে কোনো তরল পদার্থ বের হচ্ছে কিনা তাও বলা হয়েছে। মৃত শরীরের বুক, পেট এবং পিঠের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও আরেক অনেক বর্ণনা রয়েছে ‌ যা এখানে আমি হয়তো লিখতে পারবো না।

৫. যিনি এই বর্ণনা লিখেছেন তা সঠিক আছে। এটি তাঁর দায়িত্ব।সুরতহাল রিপোর্ট এভাবেই তৈরি করতে হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সেই সুরতহাল রিপোর্টতো একটি অতি গোপনীয় ব্যাপার। এই অতি গোপনীয় ব্যাপার মিডিয়ার কাছে কীভাবে প্রকাশ করা হয়? বাংলাদেশের প্রচলিত আইন কি তা সমর্থন করে? যদি সমর্থন করে থাকে তাহলে সে আইন নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। যদি সমর্থন না করে থাকে তাহলে তা বন্ধ হওয়া উচিত। এক্ষুনি।এই মুহূর্তে|

৬. মেয়েটি হত্যার শিকার হয়েছে না আত্মহত্যা করেছে তা এখন আদালতের ব্যাপার।মেয়েটির শরীরের বর্ণনা মিডিয়াতে কেন দেয়া হচ্ছে? সুরতহাল রিপোর্ট পত্রিকার কাছে কীভাবে আসলো? আমার এখন ভয় হচ্ছে না জানি কখন ফরেনসিক ডাক্তার তার রিপোর্ট নিয়ে মিডিয়ার সামনে হাজির হন!

৭. প্রতিটি মৃত্যু হচ্ছে কষ্টের। মুনিয়ার মৃত্যুর জন্য আমরা শিল্পপতিকে দায়ী করতে পারি। মুনিয়া এবং তার পরিবারকেও দায়ী করতে পারি। চূড়ান্ত বিচারেকে দোষী অথবা নির্দোষ তা আদালত নির্ধারণ করবে। আদালতকে সাহায্য করার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু সেই তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে উন্মুক্ত করে দেয়া কি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে? তাহলেতো কোর্টের আর বিচার করার প্রয়োজন পড়ে না।আমরা আমজনতাই বিচারকার্য সম্পন্ন করে ফেলতে পারি!

৮. যুক্তরাজ্যের পুলিশ সার্জন (Forensic Medical Examiner ) হিসেবে ৫ বছর কাজ করেছি। অসংখ্য রিপোর্ট তৈরি করতে হয়েছে। কোর্টের আদেশ পেয়ে অসংখ্যবার রিপোর্ট তৈরি করেছি। মাঝেমধ্যে আদালতে যাবার ডাক পড়েছে। আমি কখনো কল্পনায়ও চিন্তা করতে পারিনা আমার রিপোর্টের কোন অংশ আদালত এবং উকিল ছাড়া অন্য কেউ দেখবে। এসব তথ্য হচ্ছে চরম গোপনীয় তথ্য। এ গোপনীয়তা ভাঙ্গার কোন সুযোগ নেই। গোপনীয়তা ভঙ্গ হলে আমাকেই আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

৯. বাংলাদেশ এই গোপনীয়তা কেন রক্ষা করা যাচ্ছে না তা নিয়ে ভাবছি। কিন্তু কোনো কূলকিনারা করতে পারছি না। তাহলে কি আমাদের সাধারন বিচারবুদ্ধি এবং বিবেকের মৃত্যু হয়েছে! হয়তোবা।সে কারণেই মুনিয়া বা আনুশকার শরীরের সংবেদনশীল অংশের বর্ণনা গোপন না থেকে সবার হাতে চলে যাচ্ছে|

                লেখক ডাঃ আলী জাহানের গ্রাফিতি

লেখকঃ প্রাক্তন পুলিশ সার্জন (Forensic Medical Officer),যুক্তরাজ্য পুলিশ

আরও পড়ুন