রাজনীতির কবি শেখ মুজিবুর রহমান

এম আর রাসেল 

আকবর আলী খানকে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে বলেছিলেন, ‘চৌ এন লাইকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল তিনি ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কে কী মনে করেন। প্রশ্নটা করা হয়েছিল ফরাসি বিপ্লবের ২০০ বছর উদ্‌যাপনের সময়। তিনি বলেছিলেন, ফরাসি বিপ্লবের মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি। বঙ্গবন্ধুর ওপর খুব বেশি গবেষণা হয়নি। আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধু ফরাসি বিপ্লবের মতো বিরাট প্রতিষ্ঠান। তত বিরাট কাজ তিনি করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি, দিনে দিনে সেটা আরও স্পষ্ট হবে। তবে তিনি ইতিহাসের বিরাট মহিরুহ হিসেবে থেকে যাবেন।’ 

বাস্তবিকই বাংলাদেশ নামের সাথে যে ব্যক্তিটির নাম আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবির রহমান। কেননা আজকে যে দেশের আলো বাতাসে আমরা প্রাণভরে নিশ্বাস নেই, বুক ফুলিয়ে পরিচয় দেই আমি বাংলাদেশের নাগরিক। এই বাংলাদেশ নামকরণও তো তারই করা। ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুদিবসে তিনি বলেছিলেন,

‘একসময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে বাংলা কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে… আমি ঘোষণা করিতেছি – আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম হইবে পুর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র বাংলাদেশ।’  

রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু আজকের এই বাংলাদেশের সৃষ্টি ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার প্রধান রূপকার তো তিনিই। আমাদের সবার অত্যন্ত গর্বের ও ভালবাসার মানুষ। যে মানুষটির মাঝে একসময় সবাই স্বদেশকে উপলব্ধি করত সেই মানুষটির রাজনৈতিক দর্শন তো দল-মত নির্বিশেষে সবারই গবেষণার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত? 

শোষণহীন, বৈষম্যহীন সোনার বাংলা আমাদের সবার আরাধ্য হলেও, এর বাস্তবায়নে আমরা সবাই কি ভূমিকা পালন করছি তা ভাবনার আরশিতে দেখে নেয়ার সময় কি এখনও আসন্ন হয়নি? ভাবনার আরশিতে যদি আমরা বঙ্গবন্ধুর দর্শন চিত্রায়িত করতে পারি তবে কিছুটা হলেও আমাদের হতভাগা জাতির ঋণ পরিশোধ হবে। 

১৯৪৮ থেকে ১৯৭৫ এই দীর্ঘ সময়ে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক তৎপরতায় কোন বিরতি বা ছেদ ছিল না। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেভাবে জনগণের ভালবাসা অর্জন করেছিলেন তা ছিল অতুলনীয়। এ দেশের গরীব মানুষেরা বঙ্গবন্ধুকে তাদের শ্রেণীভুক্ত মনে করতেন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মূল্যায়ন হল-

‘শেখ মুজিব মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকেই এসেছিলেন। উচ্চমধ্যবিত্ত নয়, নিম্নমধ্যবিত্ত। প্রথম যখন ঢাকায় আসেন শহরে তার থাকার কোন স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। কিন্তু ওই শ্রেণিতে তিনি আটকে থাকেননি, বের হয়ে গেছেন, বের হয়ে গিয়ে পরিণত হয়েছেন জনগনের নেতাতে, তার জোরটা ছিল ওখানেই। কেবল মধ্যবিত্তের হলে ব্যক্তিগতভাবে উঠতেন নিশ্চয়ই, কিন্তু মহাকাব্যের নায়ক হতে পারতেন না।’

এই দর্শনের প্রতিফলন বর্তমান সময়ের নেতাদের মাঝে দৃশ্যমান হয় কি??

১৯৩৮ সালে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এর সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৪১ সাল থেকেই প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এর পর ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে জনসাধারণের দুর্ভোগ লাগবে কাজ করেন, পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন, ১৯৪৬ সালের গ্রেট কলকাতা কিলিং এ দাঙ্গা নিরসনে কাজ করেন। 

১৯৪৮ সালের ভাষার প্রশ্নে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি দাওয়া আদায়ে নেতৃত্ব দেয়ায় ছাত্রত্ব হারান। সরকারের অনাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুললে দীর্ঘ একটা সময় জেলে কাটান। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় জেলে অনশন করেন। 

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে মন্ত্রিত্ব পান। যদিও এই ক্ষমতা বেশি দিন থাকে নাই। আদমজী মিলে বাঙালি- অবাঙালি দাঙ্গার খবর পেয়ে ছুটে চলে যান। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকবর্গের শোষণ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। এর পথ ধরে ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। যা শাসকশ্রেণী মেনে নেতে পারে নাই। 

নির্বাচন পরবর্তী ঘটনা বাংলাদেশ জন্মের পথ প্রশস্ত করে। অসহযোগ আন্দোলনের পথ দিয়ে আসে সেই কালজয়ী ঘোষণা ‘এবাবের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ২৫ মার্চের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৩৮ থেকে ১৯৭১ প্রতিটি ঘটনায় শেখ মুজিবের ভূমিকা কোনভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বাকশাল গঠনের জন্য তিনি প্রায় নিন্দিত হয়ে থাকেন। সেই বাকশাল সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন,

‘আত্নসমালোচনা না করলে আত্নশুদ্ধি করা যায় না। আমি ভুল নিশ্চয় করব, আমি ফেরেশতা নই, শয়তানও নই। ফেরেশতা হইনি যে সবকিছু ভাল হবে। হতে পারে, ভালো হতে পারে। উই উইল রেকটিফাইট ইট। এই সিস্টেম ইন্ট্রিডিউস করে যদি দেখা যায় যে খারাপ হচ্ছে, অল রাইট রেকটিফাইট ইট। কেননা, আমার মানুষকে বাঁচাতে হবে।’ 

মানবিক চিন্তার কত উচ্চ দর্শন ভাবলেই বিবেক জাগ্রত হয়ে উঠে। এই মহামানবের কদর এইজাতি আর কবে উপলব্ধি করবে? মনের সরোবরে কবে উঠবে তরঙ্গ, যে স্রোতে ভেসে যাবে আমাদের কদর্য ভাবনার কলুষিত বাণী।  

বিশেষ কোন দিবস বা বিশেষ কোন উপলক্ষ্য ঘিরে আমাদের সবার মাঝে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়, সে উপলক্ষ্যের প্রেক্ষাপট ও এর মর্মবাণীর উদ্দীপনায় যদি আমাদের হৃদয় দীপ্তিমান করতে পারতাম কতই না ভাল হত। বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন যদি এদেশের সর্বসাধারণ দল মত নির্বিশেষে হৃদয়ে ধারণ করতে পারত তবে এতদিনে বাংলাদেশ সোনার বাংলা হয়েই যেত। 

পাকিস্তানি শাসন আমলে শিল্পী হাশিম খানের ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ পোস্টারটি বেশ সমাদৃত হয়েছিল। বর্তমান সময়ের বাংলায় যে হরিলুটের মহোৎসব চলছে এর পোস্টার কে অংকন করবে? আমরা বঙ্গবন্ধুকে মুখে ধারণ করলেও হৃদয়ে ধারণ করতে পারে নি।

তবে একটা বিষয়ে কথা না বললেই নয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গঠনে তিনি নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলীম লীগ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস আমাদের সেই কথাই শুনিয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশ সৃষ্টির পর সেই বিরোধী দল সৃষ্টি হতে দেন নাই। এ প্রসঙ্গে ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বই-এ উল্লিখিত রাজ্জাক স্যারের কথা স্মরণ করা যায়,

‘ইতিহাস শেখ সাহেবরে স্টেটম্যান অইবার একটা সুযোগ দিছিল। তিনি এইডা কামে লাগাইবার পারলেন না।’ 

শেখ মুজিবকে মূল্যায়নে আহমদ ছফা বলেছেন, ‘বীরত্বের উপাদান তাঁর মধ্যে ছিল কিন্তু ইতিহাসের আসল প্রেক্ষিতের সঙ্গে তার মিলন ঘটেনি। তাই তিনি একজন প্রকৃত বীর হয়ে উঠতে পারেননি।’ 

সব কিছু বিবেচনায় শেখ মুজিব ছিলেন একজন রাজনীতির কবি। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর তার কিছু কাজকে সমালোচনার কুঠার দিয়ে আঘাত করা যায়- এটা সত্য। তাই বলে উনার সব কিছুকেই বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়ার জন্য যারা নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন তা কখনই প্রশংসার যোগ্য হতে পারে না। বল্গাহীন আবেগ আর যাই হোক সৃষ্টিশীল কিছুর জন্ম দিতে পারে না। মুজিব চরিত্রকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আহমদ ছফা লিখেছেন,

‘জান খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিল যাঁর দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিল, ভালবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হল মানুষটির সাহস। আর জ্যোন্সারাতে রূপালি কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মত যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি ও নিশ্চয়তার বোধ জাগিয়ে তোলে তা হল তাঁর ভালবাসা। জান খোকা তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান।’ 

সত্যিই তাই শেখ মুজিবুর রহমান নামটি ইতিহাস থেকে কখনই মুছে যাওয়ার নয়। ছফার সুরেই বলতে হয়, ‘সমস্ত দোষত্রুটি এবং সীমাবদ্ধতাসহ বিচার করলেও তিনি অনন্য।’

শেষ করার পূর্বে সাবেক বিচারপতি হাবিবুর রহমান খানের একটি আপ্তবাক্য স্মরণ করিয়ে দেই৷ তিনি লিখেছেন, ‘ব্যক্তিবন্দনার অতিরঞ্জন ও স্তাবকতায় একজন বড় মানুষও ছোট হয়ে যায়।’ 

ব্যক্তিবন্ধনা ও স্তাবকতার অতিরঞ্জনে বদনবুক দূষিত না করে আসুন আমরা সবাই এই মহান মানুষটির জীবন ও কর্মের শিক্ষায় আমাদের ভাবনার জগত অতিরঞ্জিত করি, বিশুদ্ধতার সরোবরে মনোজগত প্রশস্ত করি, সুরে সুরে মানবিকতার জয়গান করি। 

লেখকঃ গবেষক ও কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন