সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনীতির হালচাল

এম আর রাসেল 

কোথাও শান্তি নেই, চারিদিকেই অশান্তির চিত্র চোখে পড়ে৷ এরপরও জীবন বয়ে চলে। বিশ্বে যেদিকে চোখ ফেলি সেখানেই ঝামেলা দেখতে পাই।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে কৃষক আন্দোলন, তিউনিসায়া রাশিয়ার বিক্ষোভ সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত কিছু ঘটবা। এর মধ্যে নতুন করে যুক্ত হল মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল।যুগ যুগ ধরেই সাধারণ জনগণ শোষিত নিষ্পেষিত হয়ে আসছে। সময়ের সাথে সাথে এই শোষণের ধরণ পাল্টেছে মাত্র। সামন্ত যুগের জমিদারের প্রতিচ্ছবি রূপে হাজির রয়েছে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান।

দীর্ঘ দুই মাস ধরে ভারতে কৃ্ষক আন্দোলন চলছে৷ প্রতি বছরই ভারতে কৃষক আত্নহত্যার খবর পাওয়া যায়। বর্তমানে সরকার ঘোষিত কৃষি আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে।

কৃষি সংস্কারের এই আইনকে কৃ্ষকদের জন্য মৃত্যু পরোয়ানা বলে আখ্যা দিয়েছে কংগ্রেস। ক্ষমতাসীন দলের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলছেন, “এই আইন দেশের কৃষিখাতের উন্নয়ন ঘটাবে”।

সর্বশেষ, ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে কৃ্ষকেরা র‍্যালি করেছে। লাল কেল্লায় শিখ পতাকা উড়ানো হয়েছে। দিল্লী ও উত্তর প্রদেশের মধ্যবর্তী গাজীপুর, সিঙ্গু, টিকরি, শাহজাহানপুর সীমান্তে কৃষকেরা অবস্থান করছেন।

ভারতের প্রামণ্যচিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার লিখেছেন, “যে কোন সময় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামতে পারে এই স্থানগুলোতে।”

অন্যদিকে, আরব বসন্তের সূতিকাগার খ্যাত উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া। বিপ্লব পরবর্তী দেশটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল। এরই মধ্যে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়েছে। বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায় এই আন্দোলনের সূচনা হলেও এর পিছনে আঞ্চলিক রাজনীতির জটিল সমীকরণ রয়েছে তা স্পষ্ট।

আরব বসন্ত পরবর্তী তিউনিসিয়ার ক্ষমতায় আসে আন নাহদা পার্টি। এই দল সেক্যুলারিজমকে সমর্থন করলেও মুসলিম ব্রাদারহুডের কট্টর সমর্থক। মুসলিম ব্রাদারহুডকে অনেক আরব দেশই হুমকি মনে করে।

আরব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর মুসলিম ব্রাদারহুডকে সুদৃষ্টিতে দেখে না। সর্বশেষ জর্ডানও দলটিকে সন্ত্রাসী তকমা দিয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থিত প্রেসিডেন্ট মুরসির করুণ পরিণতির কথা কারও অজানা নয়।

স্মরণ করিয়ে দেই, কাতারের উপর জিসিসি ভুক্ত দেশগুলোর অবরোধ আরোপের সময় ১৩ টি শর্ত দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল- মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ।

তিউনিসিয়ার ইতিহাসে দৃষ্টি দিলে করুণ চিত্র চোখে পড়ে। ১১ মিলিয়ন মানুষের এই দেশে জনগণ বারবার রুটি রুজির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে।

১৯৬৫ সালে দেশটি ফ্রান্সের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। ২০০১ সালের পূর্ব পর্যন্ত এই দেশের শাসক হিসেবে দুইজন ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। একজন. হাবিব বরগুইবা, অন্যজন. জাইন আল আবেদিন বেন আলী।

স্বাধীনতার পর দেশটির হাল ধরেছিলেন হাবিব বরগুইবা। বেন আলী বরগুইবাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেন। এর পর দীর্ঘ ২৩ বছর দাপটের সহিত শাসন করেন।

জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে সম্পদের পাহাড় তৈরি করেন। বিয়ে করেছিলেন হেয়ার ড্রেসার লায়লা নামের তরুণীকে। কথিত আছে এই লায়লা তার প্রিয় আইসক্রিম আনতে ইউরোপের নানা দেশে বিশেষ বোয়িং বিমান পাঠাতেন। বিলাসিতার কি অনবদ্য আয়োজন?

ভূমধ্যসাগরের তীর ছেড়ে কৃষ্ণ সাগরের তীরে যাওয়া যাক। এই সাগর তীরের বিখ্যাত দেশ রাশিয়াতে বিক্ষোভ চলছে।

বিরোধী নেতা অ্যালেক্সি নাভালিনের মুক্তির দাবিতে মস্কো জুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে।

পত্রিকার তথ্য মতে রাশিয়ার জেলগুলো বন্দি দিয়ে ভর্তি হয়ে গেছে। দেখা যাক এই আন্দোলন কোথায় গিয়ে ঠেকে?

রাশিয়ার লৌহ মানব পুতিন দীর্ঘ দিন ধরেই দেশটির একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে আছেন। সমাজতান্ত্রিক এই দেশে কার্যত অন্য দলের সক্রিয়তার খবর খুব একটা পাওয়া যায় না। তাই এই আন্দালনের খবর মনে বাড়তি এক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। এ নিয়ে বিস্তারিত জানতে পাঠ শুরু করেছি।

কৃষ্ণ সাগর থেকে আমরা বঙ্গোপসাগরে তীরে চলে আসি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে পুনরায় সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। এর ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যে আরও দীর্ঘায়িত হবে তা বুঝতে পারা যাচ্ছে।

১৯৪৮ সালের মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভ করে। এর পর থেকেই কার্যত সামরিক বাহিনীই দেশটি শাসন করছে। এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ বছর দেশটি বেসামরিক সরকারের অধীনে ছিল।

২০১০ সালে সূচিকে গৃহবন্দী থেকে মুক্তি দেয়া হয়। সামরিক বাহিনীর সাথে সূচির মধ্যস্থতায় গণতন্ত্রের পথে দেশটির যাত্রা শুরু করে। ২০২০ সালে এসে সেই যাত্রায় আবার ছন্দপতন ঘটল।

এতদিন বার্মায় সূচির দল এনএলডি নামে মাত্র ক্ষমতায় ছিল। মূলত সকল ক্ষমতাই নিয়ন্ত্রণ করত সামরিক বাহিনী বা বলতে গেলে টাটমা-ডা।

টাটমা-ডা হল বার্মায় সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান৷ এটি স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত।

এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য সংসদে ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত আছে। প্রতি বছর এই প্রতিষ্ঠানের জন্য জিডিপির ৩ শতাংশ বরাদ্দ থাকে।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে মিয়ানমারে নির্বাচন হলেও এই বাহিনীর অধীনেই থাকে তিনটি মন্ত্রণালয়- প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্ত।

বুঝতে বাকি থাকে না এতদিন মিয়ানমারে মূলত এই প্রতিষ্ঠানই শাসন করেছে। অং সাং সূচি ছিল এদেরই হুকুমের তাবেদার।

এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান হলেন মিন অং হ্লাই। বর্তমান অভ্যুত্থানে তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এই অভ্যুত্থানের পিছনে চীনের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন। চীন যে এখানে কলকাঠি নাড়বে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।

বিশ্ব রাজনীতির ডামাডোল বাজতেই থাকবে। আমরা আমজনতা শুধু দেখেই যাব। দেখার ও জানার কোনো শেষ নেই।

আরও পড়ুন