স্বাধীনতার বাস্তবায়ন

সালমা সাহলি

বীজটা রোপণ হয়েছিল একুশে, যার ফল আসে একাত্তরে। আজকের ৭১ থেকে ২১ এই ৫০ বছরের কথাটা একটু গোলমেলে লাগলেও হিসেবটা সহজ। ৭১-২১=৫০ বছরের স্বাধীন এক ভূখণ্ডের লাল সবুজের পতাকায় বিশ্বের মাঝে নিজের পরিচয় নিয়ে থাকা আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশ। যাদের গৌরবদীপ্ত দেশপ্রেম আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা নিজেদের স্বাধীন জাতী রূপে পেয়েছি তাদের স্মরণ করে তাদের জন্য প্রার্থনা করি, মহান আল্লাহ যেন তাদের ত্যাগের উত্তম বিনিময় দান করেন।

স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। পরাধীন জীবন কোন মানুষেরই কাম্য নয়। তাই যুগ যুগ ধরে মানুষ অন্যায় শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলেছে প্রতিবাদ করেছে। একজন মানুষের জীবনে সর্বোচ্চ ত্যাগ, নিজের জীবনের বিনিময়ে নিজেকেই ত্যাগ করে স্বাধীনতা অর্জন করে গেছে দেশ ও দেশের জনগণের জন্য, তবু পরাধীন জীবন যাপন করেনি তারা। তাদের জীবন ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা ভোগ করতে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কিন্তু তাদের যে চাওয়া যে স্বপ্ন ছিল দেশ এবং দশের জন্য তার কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে গত অর্ধশত বৎসরে?

স্বাধীনতা অর্জন খুব সহজ কাজ নয়। স্বাধীনতা উত্তর এর রক্ষাকবজ হওয়া আরো কঠিন। অসংখ্য মায়ের কোল খালি করার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীনতা, অসংখ্য বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া এই ভূখণ্ড, অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে আপনার আমার এই “বাংলাদেশ”। রাজনৈতিক স্বাধীনতা যতটুকু অর্জিত হয়েছে, দল মত নির্বিষেষে মানুষের মৌলিক অধিকার ততটুকু হয়েছে কিনা তা একবার ভেবে দেখা উচিৎ।

“শহীদের রক্ত, মা বোনের ইজ্জৎ, স্বাধীনতার চেতনা” এই কথাগুলো সবার মুখে মুখে খুব শোনা গেলেও এর যথাযত মূল্যায়ন করার মত নৈতিকতা, বিবেক ও যোগ্যতা কি সবার আছে? যদি থাকতো, তাহলে এই দেশে আর একটাও হত্যা গুম ঘটত না। একটাও মেয়ে আর ধর্ষিতা হতো না। যদি তাই হতো তাহলে নিরীহ একটা মানুষও আর কোন জুলুম নির্যাতনের শিকার হতো না।

যতবেশী বুলি আওড়ানো হয়, ততটা যদি সত্যিই স্বাধীনতার চেতনা বুকে ধারণ করা হতো তাহলে আজ ধার করা অপসংস্কৃতি আর অনৈতিকতায় ছড়িয়ে যেতো না সারা দেশ। যারা নিজেরদের দেশপ্রেমিক মনে করেন, তারা কখনো জাতীয় স্বার্থের উর্ধ্বে ব্যক্তি স্বার্থকে স্থান দেয় না। বছর বছর বিশেষ দিনে সারারাত শুধু মাইক বাজিয়ে দেশের গান আর বক্তৃতা শুনিয়ে, আতশবাজি আর সভা মিছিল মিটিং করে দেশ প্রেমিক হওয়া যায় না, দেশের উন্নয়নও সাধিত হয় না। এ জন্য সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

দেশ স্বাধীনতার আজকের এই সুবর্ণ জয়ন্তীতে এসে একবার আমাদের ভেবে দেখা উচিৎ, যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশাল ত্যাগের মাধ্যমের আমাদের এই দেশ স্বাধীন হয়েছে তার কতটুকু সঠিক বাস্তবায়ন হয়েছে।

উন্নয়ন বলতে কেবল প্রযুক্তি, বাড়ী, সেতু আর বিদ্যালয় নির্মাণ বা প্রতিষ্ঠা নয়। মানুষের নৈতিক শিক্ষা, জাগ্রত বিবেক, এবং ন্যায় চর্চায় সমাজ ও দেশের উন্নয়ন প্রতিষ্ঠা হয়, আর এজন্য প্রয়োজন মৌলিক স্বাধিনতার পাশাপাশি বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, অন্যায় নিপীড়নের প্রতিবাদের স্বাধীনতাও বাস্তবায়ন। এক কথায় মৌলিক স্বাধীনতার যথাযত বাস্তবায়ন।

গত অর্ধশত বছরে দেশের সার্বিক উন্নয়ন আশানুরূপ না হলেও তাতে হতাশ না হয়ে নতুন শপথে পূর্ণোদ্যমে মানুষের কল্যাণে স্বাধীনতার সঠিক ব্যবহারে আমরা আমাদের এই সবুজ সতেজ মাতৃভূমিকে উন্নতির উচ্চশিখরে পৌঁছাতে সক্ষম হবো ইন শা আল্লাহ।

সালমা সাহলিঃ লেখক ও গবেষক, লস এঞ্জেলেস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন