২০২১-২০২২ প্রস্তাবিত বাজেটে ভাতা বাড়েনি বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধীদের

এইচ বি রিতা

বৈশ্বিক মহামারি করোনা মোকাবিলা এবং সংকটে পরবর্তী অর্থনীতি টেনে তুলতে ২০২১-২০২২ অর্থবছর এ ‘জীবন ও জীবিকার প্রাধান্য, আগামীর বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দের ক্ষেত্রে তিনটি খাতকে বেশী গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, যথাক্রমে স্বাস্থ্য খাতে, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তা।

প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে আরো থাকছে, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ ও বীজে প্রণোদনা, কৃষি পুনর্বাসন ও সারে ভর্তুকি প্রদান, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়ন, পল্লী উন্নয়ন ও কর্মসৃজন, গৃহহীন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহনির্মাণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি।

দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম বাজেট এটি। চলতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যেখানে বরাদ্দ ছিল ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, সেখান প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতে ১২.৫ শতাংশ বেশী বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা, যা অবশ্যই ইতিবাচক। সেই সাথে আগামী অর্থবছর ১৫০টি উপজেলার সকল বয়স্ক ও বিধবা এবং নতুন করে প্রায় চার লাখ অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধীকে ভাতার আওতায় আনা হয়েছে, যা প্রসংশনীয়।

কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হল, বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে নতুন দরিদ্রদের বিষয়ে ২০২১-২০২২ অর্থবছর এর বাজেটে সুস্পষ্টভাবে কোনো ধরনের হিসাবের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এবং, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হলেও বেশির ভাগ ভাতায়, যেমন- বয়স্ক,বিধবা এবং প্রতিবন্ধি ভাতার পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকছে। বেড়েছে শুধু মুক্তিযোদ্ধা ভাতা।

প্রস্তাবিত বাজেটে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মাসিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার টাকা, যা ২০২০-২১ অর্থবছর এ মাথাপিছু  ১২ হাজার টাকা ছিল। এর ফলে নতুন বাজেটে ভাতায় মোট বরাদ্দ বাড়বে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে তাদের জন্য চার হাজার ১২২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০ হাজার ‘বীর নিবাস’ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।

দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী সারা বছরই অভাবে দিন যাপন করেন। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় মৌলিক অধিকার। তার উপর মহামারি করোনার কারণে অসংখ্য মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আয় কমেছে, বেকারত্ব বেড়েছে। এদিকে নিত্য খাদ্য মূল্যও অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। আগের চেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন যাপন আরো কঠিন হয়েছে। করোনার কারণে সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এর এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশামিক ৩০ শতাংশ। ২০১৮ সালে জিইডি সানেমের গবেষণায় দেখা গেছে, দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৬০ শতাংশে নেমেছিল। কিন্তু সানেমের ২০২০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের গবেষণা বলছে, দারিদ্রের হার বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে।

অথচ, করোনাকালে দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষের সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। সে কারণে নীতিগতভাবে বাজেটে তাদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট করা হয়নি। যেহেতু নতুন বছরে দারিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে এবং ২০২১-২০২২ অর্থবছর এর বাড়ানো বাজেটে উপকারভোগীর সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে, সেক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি যদি খাদ্য ও নগদ অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়, তবে তাদের জীবন যাত্রা কিছুটা সহজ হতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেক বিশেষজ্ঞরা।

২০২১-২০২২ অর্থবছর এর প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বরাদ্দ বেড়েছে। যার মধ্যে রয়েছে-বয়স্ক ভাতা, যাতে মোট বরাদ্দ বেড়েছে ৪৮১ কোটি টাকা। এর আওতায় সহায়তা পাবেন অতিরিক্ত ৮ লাখ মানুষ।বিধবাও স্বামী নিগৃহীতা ভাতায় মোট বরাদ্দ বেড়েছে ২৫৫ কোটি টাকা এবং এতে সহায়তা পাবেন আরও ৪ লাখ ২৫ হাজার নারী।প্রতিবন্ধী ভাতায় মোট বরাদ্দ বাড়তে যাচ্ছে ২০০কোটি টাকা যেখানে অতিরিক্ত ২ লাখ ৮ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সহায়তারআওতায় আসবেন।

দারিদ্র্যতা দূরীকরণে দেশের বয়োজ্যেষ্ঠ দুস্থ ও স্বল্প উপার্জনক্ষম অথবা উপার্জনে অক্ষম বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, চিকিৎসা ও পুষ্টি সরবরাহ বৃদ্ধিতে সহায়তা ও পরিবার ও সমাজে মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৭-৯৮ অর্থ বছরে ‘বয়স্কভাতা’ ‘বিধবা ভাতা’ কর্মসূচি প্রবর্তন করা হয়। শুরুতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বার্ষিক বাজেট থেকে মাসে ১০০ টাকা করে দেয়া হতো। প্রায় দুই দশক পর সেটা হয়েছে মাসিক ৫০০ টাকা।

২০২১-২০২২ অর্থবছর এর প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ‘বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীত নারী এবং প্রতিবন্ধি ভাতা’ প্রকল্পে সুবিধা ভোগকারীর সংখ্যা এবং বাজেট বরাদ্দ বাড়লেও, তাদের ভাতার পরিমান গত পাঁচ বছর যাবত মাসিক ৫০০ টাকাই আছে। এবারো তা অপরিবর্তিত থাকছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ‘মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে বয়স্ক ও বিধবা ভাতাভোগীদের সুবিধা তেমন বাড়েনি। দু’দশক আগে ১০০টাকা দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা ভোগ করা যেতো, এখন একই পরিমাণ পণ্য ও সেবা ভোগ করতে ৩৮৫ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ফলে মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা দরিদ্র, বয়স্ক ও বিধবাদের জীবন যাত্রার ব্যয় মেটাতে কিছুটা ভূমিকা রাখলেও যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসব ভাতা চালু করা হয়েছিল, তা পূরণ হচ্ছে না।’

তাছাড়া, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা যায় যে, বয়স্ক ভাতার সুযোগ গ্রহনে আইডি কার্ড করতে ঘুষের বিষয়টা স্পষ্টতর লক্ষ্যনীয়।

দেশের গরিব ঘরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা খুবই অসহায়। বৃদ্ধাদের বেশীর ভাগই বিধবা। অনেকেরই সন্তান থেকেও নাই। তাছাড়া বয়স এবং অক্ষরজ্ঞানহীনতার দরুণ তারা ঠিকমত নিজের জন্ম তারিখ বলতে না পারায় আইডি কার্ডও করতে পারেন না। ফলে বয়স্কভাতাও পান না। যারাই জন্ম পরিচয়ে স্থানীয় ইউনিয়নের মেম্বার/চেয়ারম্যানের কাছে ভাতা পেতে আইডি কার্ড করতে যান, তাদের ঘুষ দিতে হয়। পর্যাপ্ত ঘুষ দিতে না পারলে তাদের আইডি কার্ড করা হয় না। করা হলেও ঘুষ দিয়েই ভাতা গ্রহণের সুযোগ নিতে হয়।

আমার চেনা নরসিংদী সদরের বৌয়াকুড় গ্রামের এক ৬০ উর্ধ বিধবা মহিলা, যিনি থাইরোয়েড প্রাথমিক ক্যান্সারে ভোগছেন, এখনো কোন বিধবা বা বয়স্ক ভাতার সুযোগ পাননি। বেশ কয়েকবার মেম্বার-চেয়ারম্যানদের দ্বারস্থ হয়ে আশা ছেড়ে দিয়েছেন।তিনি শারীরিকভাবে হাঁটতে সক্ষম নন। বর্তমানে তিনি তার মেয়ের তত্বাবধানেই ব্যয়বহুল চিতিৎসাধীন রয়েছেন। অথচ, সেই মেযেও দুই সন্তানসহ বিধবা।

আবার ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়ার কারণেও ছয় মাসেরও বেশী সময় ধরে আটকে আছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগীদের ভাতা।

অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধীদের জন্য সরকার ২০২১-২০২২ অর্থবছর এ ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের কথা জানিয়েছেন, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৮ লক্ষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাসিক ৭৫০ টাকা হিসেবে ১৬২০ কোটি টাকা প্রদানের থেকে কিছুটা বেশী। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাহিদার তুলনায় এ বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। অন্যদিকে, ভোক্তভোগী এবং বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও প্রতিবন্ধীদের জন্য ভাতার পরিমান বাড়েনি। ভাতা ৭৫০ টাকাই থাকছে। করোনায় কর্মহীন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানে বাজেটে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।

২০০৫ সালে প্রথম প্রতিবন্ধী ভাতা চালু করেন সরকার। শুরুতে মোট ১ লাখ ৪ হাজার ১৬৬ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ২০০ টাকা ভাতা প্রদান করা হতো যা বেড়ে বর্তমানে হয়েছে ৭৫০ টাকা। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, বাংলদেশেপ্রতিবন্ধীদেরমধ্যে থেকে সবচেয়ে বেশি দরিদ্র প্রতিবন্ধী, যাদের আয় বছরে ৩৬ হাজার টাকার মধ্যে সীমিত, এবং ছয় বছরের উর্ধেসকল ধরণের প্রতিবন্ধীদের ভাতা প্রদানের জন্য বিবেচনায় নেয়া হবে। এখানে ছয় বছরের নীচে প্রতিবন্ধি শিশুদের জন্য কোনভাতা উল্লেখ্য করা হয়নি।

একটি শিশু সাধারণত জন্ম থেকে কিংবা জন্মের দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যেই তার বৌদ্ধিক অক্ষমতায় নির্ণয় হয়। আর্লিইন্টারভেনশন অর্থাৎ পরবর্তি অবস্থা নির্ণয়ে অপেক্ষা না করে যত দ্রুত সম্ভব সে সময়টাতে শিশুর যত্ন ও চিকিৎসা শুরু করলে, তা একটি প্রতিবন্ধী শিশুর যথেষ্ট উপকারে আসে। শারীরিক অক্ষমতা যে কোন সময় শুরু হতে পারে। সেক্ষেত্রে, ছয় বছরের নিচেশিশুটির খাদ্য, যত্ন বা সঠিক চিকিৎসায় কি ধরনের সহায়তা আশা করা যায়? যত্ন ও চিকিৎসা পেতে তাকে কি ছয় বছর বয়সেপৌঁছাতে অপেক্ষা করতে হবে?

একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে উপযুক্ত ভাতা পেতে প্রথমে “প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র” সংগ্রহ করতে হয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে।খুব সহজেই যে সেই ব্যাক্তি পরিচয়পত্র হাতে পেয়ে যাবেন, এমনটি আশা করা যায় না। এটি পেতে তাকে একাধিকবার যোগাযোগকরতে হয় অধিদপ্তরে। প্রতিবন্ধিদের বেশীর ভাগ হন নিরক্ষর। যার কারণে তারা দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির সহযোগীতা ছাড়াঅধিদপ্তরে উপস্থিত হতে পারেন না। পরিচয়পত্র পেয়ে গেলেও টাকা তোলার জন্যও তাদের দ্বিতীয় ব্যক্তির সাহায্য প্রয়োজন হয়।গ্রাম এবং শহরভিত্তিক যাতায়াত খরচ একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকেই বহন করতে হয়।

বর্তমানে প্রতি ৩ মাস পরপর প্রতিবন্ধি ভাতা একসঙ্গে পাওয়া হ্য়। সেক্ষেত্রে প্রতিবন্ধি ব্যক্তি এবং তার সাথে বহন করা দ্বিতীয়ব্যক্তির খরচও সেই টাকা থেকেই যায়। তারপর যা যাথে, তা দিয়েই ৩ মাস চলতে হয়।

২০২১-২০২২ অর্থবছর এ সামাজিক নিরাপত্তা খাতের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নতুন কোনো প্রকল্প বা করোনারপ্রভাবের কোনো প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ তাদেরই সর্বাধিক সহায়তার দরকার রয়েছে। বাজেট প্রণয়নে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় অনন্য সুযোগ সুবিধাগুলোর মত, যেমন- মুক্তিযোদ্ধাদ্দের ভাতা বৃদ্ধি এবং গৃহহীণদের জন্য গৃহ নির্মাণের মতোউদ্যোগ গুলোর পাশাপাশি অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের অন্তর্ভুক্ত করা কি দরকার নয়?

একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির যথেষ্ট পরিমানে পুষ্টিকর খাদ্য সহ, রেশনের ব্যবস্থা, গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কেয়ারগিভার সার্ভিসব্যবস্থা, চিকিৎসাধীন অকোপেশনাল থেরাপী, স্পিচ থেরাপী, ফিজিক্যাল থেরাপীর দরকার হয়, যা দেশের সুস্থ্য জনগোষ্ঠীরসার্বিক উন্নয়নে সরকারের দৃষ্টিপাত নিবন্ধ করা জরুরী। কর্মরত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থাসহ সকল প্রতিবন্ধীব্যক্তিদের মাসিক ভাতা ৭৫০ থেকে আরো বাড়ানো জরুরী।

২০১৬ সালের বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্সের তথ্য অনুযায়ী, একজন মানুষের সর্বনিম্ন ক্যালরির খাবারের জন্য দৈনিক খরচ হয় ৬০ টাকা। সেই হিসেবে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মাসে ১৮০০ টাকা খরচ হতো। ৫ বছর পর এই খরচ একই পর্যায়ে থাকার কথা নয়। কারণ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য দ্রব্যাদির মূল্য বেড়েছে। যদি সেই খরচ আনুমানিক দৈনিক ৬০ টাকা থেকে ৮০ টাকাও ধরা হয়, তবু একজন মানুষের ক্যালেরির জন্য মাসে খরচ হবে ২৪০০ টাকা। সে অর্থে, একজন বয়স্ক, বিধবা ব্যাক্তির মাসে ৫০০টাকা এবং একজন প্রতিবন্ধী ব্যাক্তির মাসে ৭৫০ টাকা ভাতা প্রদান তাদের খাদ্য যোগাতেই যথেষ্ট নয়। সুতরাং, জীবনের মৌলিক চাহিদার অন্যান্য সকল খরচ যেমন বস্ত্র, বাসস্থান, ওষুধের জন্য যে খরচ, তা কি ভাবে বহন করবেন তারা?

অন্যদিকে, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী হিসাবে ভাতা নির্ধারণ, তাদের প্রাপ্য এবং এতে কারও কোন আপত্তি থাকা ‌অন্যায় বলে মনে করি। তবে এক জনগোষ্ঠীর জন্য ভাতার পরিমাণ ১২,০০০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকায় আনা হলে, অন্য জনগোষ্ঠীর বেলায় ৫০০ টাকা/ ৭৫০ টাকাই নির্ধারিত রাখা,‌ কতটা বিবেচনাবোধ এবং ‘জীবন ও জীবিকার প্রাধান্যে আগামীর বাংলাদেশ’ এর মাইলফলকের স্পষ্ট ধারণা দেয়?

তাছাড়া, ক্ষমতার বলে এবং ঘুষের বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ভূয়া সনদপত্রের খবর সবার জানা। ভাতা পেতে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য অনেকে বিভিন্ন কায়দায় মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছেন বলে অভিযোগও আছে। সঠিক তদন্তের ফলে ‌অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাও তাদের প্রাপ্য সন্মানী থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

আবার কেউ কেউ অনিয়ম করে সুদে ঋণ নিয়ে, কেউ ছাগল-গরু বেচেও ঘুষের মাধ্যমে পাচ্ছেন বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ভাতা।প্রথম আলোর তথ্য ‌অনুযায়ী, নড়াইলের কালিয়া উপজেলার নড়াগাতী থানার মাউলি ইউনিয়নের মহাজন গ্রামে অন্তত তিনশ ব্যক্তি অবৈধভাবে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য ও তাঁদের সঙ্গে সখ্য আছে এমন ব্যক্তিরা টাকার বিনিময়ে অবৈধভাবে এসব ভাতার বই করে দিয়েছেন। বয়স হয়নি, তবু তাঁরা বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন। আবার বিধবা ও প্রতিবন্ধী নন, তাঁরাও বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। ঘুষ দিতে না পারায় এসব ভাতা পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

এক্ষেত্রে সরকারের করণীয় কি? সরকারের উচিত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, ভূয়া বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী এবং প্রতিবন্ধীদেরচিহ্নিত করে তাদের সুবিধা বাতিল করা, এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া অন্যান্য জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে প্রকৃত বয়স্ক, বিধবা-স্বামীনিগৃহীতা নারী, প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধিতে সামাজিক নিরাপত্তায় সরকারের বৃহৎ কার্যক্রমকে আরও অর্থবহ করা।

সেইসাথে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক অস্বচ্ছলতা বিবেচনায় রেখে তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায়নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নির্ণয়ে বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। এছাড়া, উপকারভোগীদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও যে সব দুর্নীতি হচ্ছে, সেগুলো রোধে যথাযথ কঠিন ব্যবস্থা নেয়াও দরকার।

লেখকঃ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, শিক্ষক ও সাংবাদিক

লেখকের প্রকাশিত লেখা-

আমাদের আর পশুর মাঝে ব্যবধান শুধু বিবেকবোধের

আরও পড়ুন