প্রয়োজন নিয়ম মানার প্রবণতা বাধ্যকরণ

এস এম মুকুল

বাঙালিরা নিয়ম মানতে যেন নারাজ। নিয়মের কথা বললেই তাদের মাথায় পড়ে বাজ। যত্রতত্র নিয়ম ভাঙ্গাই যেন তাদের কাজ। ড্রাইভার নিয়ম মেনে গাড়ি চালায় না। পথচারি নিয়ম মেনে পথ চলে না। সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা নিয়ম মেনে কাজ করেন না। তাই ব্যবসায়ীরা ব্যবসায় নিয়ম মানে না। শিক্ষকের মাঝে নিয়মানুবর্তিতার প্রবণতা নেই, তাই শিক্ষার্থীদের নিয়মের প্রতি শিষ্ঠাচার নেই। যারা নিয়ম বা আইনের প্রণেতা এমপি বা মন্ত্রী তারা এবং নিয়ম যারা কার্যকর বা বাস্তবায়ন করবে প্রশাসন ও আইনশৃক্সখলাবাহিনী তারাই নিয়ম মানে না, তাই জনগণেরও এমন একটা ভাব যেন- তারা নিয়ম কি জিনিস তা জানেই না।

তারই বাস্তব প্রতিফলন করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারের জারি করা লকডাউন মানছেন না সর্বস্তরের জনগণ। বরং কৌতুক করে মানুষ বলছে- ‘লকডাউন অনেকটা লুঙ্গীর মতো, উপরে লক করা {আটকানো }নিচে  ওপেন {খোলা}।’ এই অহেতুক কৌতুকের খেসারত দিচ্ছেন এখন। এ কারণেই দেশে করোনা ভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ব্যাপক হারে বাড়ছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতিতে যখন মানুষকে ঘরে রাখা ছিলো খুবই জরুরি। তখন  নির্দ্বিধায় বাইরে ঘুরে বেরিয়েছেন জনগণ। এই ঘুরে বেড়ানোকে নিয়ে কৌতুক করে একজন বলেছেন- ‘দেশের প্রধানমন্ত্রী বললেন, ঘরে থাকুন, জনগণ শুনলো- ঘুরতে থাকুন।’ আজব দেশের আজব জনতা- বাহ্।  তা না হয়তো কি, মানুষ যেন তোয়াক্কা করছে না করোনাকে। যদিও করোনা কাউকেই করুণা করে না, তারপরও ভ্রুক্ষেপহীন অদম্য বাঙালিরা চলছে, ফিরছে, ঘুরেছে, খাচ্ছে…।

বলতে দ্বিধা নেই, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের নানা দপ্তরের সমন্বয়হীন প্রচেষ্টার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতারও অনেক ঘাটতি আছে। কুসংস্কার থেকে শুরু করে নিয়ম না মানার প্রবণতা জাতির জন্য নিন্দনীয়। কারণ আমাদের সচেতনতার অভাবে আমরা অনেক মানুষকে যেমন হারিয়েছি, তেমনই আক্রান্ত হচ্ছেন অনেক অনেক মানুষ। যাদের ঘরে থাকার কথা তারা ঘরে নেই। কাঁচাবাজারগুলোতে উপচে পড়া ভিড়, অলিগলিতে আড্ডা, রাস্তায় অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরা করা মানুষেরও কমতি নেই।  নিয়ম না মানার এই প্রবণতা জাতি হিসেবে আমাদেরকে অনেক পিছিয়ে রেখেছে। নিয়মের কথা বললেই আমরা সরকারের দোষ খুঁজি, দোষ বলি। আমাদের বুঝা উচিত, সরকারও আমাদের- আমরাও সরকারের। তাই সরকারের নির্দেশনা মানতে হবে। এই নিয়ম মানার প্রবণতাই একটি জাতিকে সভ্যতার উচ্চতর নিরিখে পৌছে দিবে।

সমাজে নিয়ম না মানার এই চিত্র ভয়ঙ্কর অস্বাভাবিকতায় রূপ নিচ্ছে। একইভাবে মানুষের ভেতর সহমর্মিতা, ভালবাসা, সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা, স্নেহ অনেক কমে গেছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে গেছে। সহানুভুতির জায়গাগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে- অসহিষ্ণুতার মনোভাব প্রকট হয়ে উঠছে। ক্ষোভের বহির্প্রকাশ ঘটছে ভয়ঙ্কর মৃত্যুফাঁদে। আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা না থাকা এবং আইনশৃক্সখলাবাহিনীর ওপর আস্থার সংকট এই পরিস্থিতিকে উস্কে দিচ্ছে। পরিত্রাণের জন্য দরকার সরকারের নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

এ বিষয়ে অনেকের অভিমত, ছোট অপরাধের জন্য বড় শাস্তির ব্যবস্থা কার্যকর হলে সমাজ থেকে অপরাধ প্রবণতা ৭৫ ভাগ কমে আসবে। যেমন আইন মানতে বাধ্য করা, অপরাধ প্রমানিত হওয়া মাত্র শাস্তি দেয়া, ভেজাল-ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম-দায়িত্বে অবহেলা-প্রতারণা-দখল-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ইত্যাদির ক্ষেত্রে অপরাধ যত ছোট পর্যায়ের হোক না কেন শাস্তি আর জরিমানা বেশি হলে এমন প্রবণতা কমতে পারে। যেমন- খাদ্যে ভেজাল, খাদ্য মজুদ, ট্রাফিক আইন না মানা, পথচারির ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করা এমনসব অপরাধের জন্য জেল এবং জরিমানা উভয়দন্ড কার্যকর হওয়া উচিত। এমনসব অপরাধীর শাস্তির খবরও ফলাও প্রচার করা দরকার। উন্নত বিশ্বে সরকারের নিয়ম অমান্য করলেই অপরাধ ধরে তৎক্ষণাৎ শাস্তি দেয়া হয় বলে সেসব দেশে রাস্তায় কেউ কলার ছোলা বা চিপসের প্যাকেট ফেলার কথা ভাবতেও পারে না। বাংলাদেশে সময় লাগলেও এমন আইন মান্যতার প্রবণতা সৃষ্টি করা অসম্ভব নয়। তবে এজন্য জনসংখ্যার অনুপাতে- পুলিশ বাহিনীর বিভাগ ও কলেবর বাড়ানো দরকার আছে।

মনে রাখতে হবে, আইন না মানাও এক ধরণের প্রবণতা। একটা উদাহরণ দিয়েই বলি। জাপান সরকার তাদের জনগণের জন্য মাঝে মাঝে কিছু নির্দেশনা দেয়।  যেমন, পাওয়ার সেভ করার জন্য সোম আর বৃহষ্পতিবার দেশের জনগণ লিফট ব্যবহার করবে না। দেখা গেছে জাপানিরা সরকারের পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত সোম ও বৃহষ্পতিবারে লিফট ব্যবহার করছে না। তারা সবাই সিড়ি দিয়ে উঠানামা করছে। আবার সরকার যখন বলবে অফিস কিংবা বাসায় এয়ারকুলারের তাপমাত্র ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে স্থির রাখতে হবে। জাপানের জনগণ ঠিক তাই করবে। নিয়মানুবর্তিতা বা সরকারের নির্দেশনা মানার এমন প্রবণতা দেখে সে দেশে অবস্থানকারি এক বাঙালি এক জাপানির কাছে জানতে চাইলো- ‘আচ্ছা তোমরা নিয়ম ভাঙ্গো না কেন?’ তার প্রশ্ন শুনে জাপানি ভদ্রলোক বিস্ময়ে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে  থেকে বললো- ‘কি বলছ, কিছু বুঝতে পারছি না। নিয়ম ভাঙ্গবো কেন?নিয়ম তো তৈরিই করা হয় মানার জন্য।’ এই হলো বাঙালি আর জাপানিদের প্রবণতার ব্যবধান।

আমরা বাঙালিরা নিয়ম ভাঙ্গতেই বেশি পছন্দ করি। দশ হাত দূরত্বের মধ্যে একটি ফুটওভারব্রিজ আর একটি আন্ডারপাস থাকা সত্বেও বাঙালিরা দৌড় দিয়ে রাস্তা পারাপার হয়। আমরা আইনের কথা বলি- কিন্তু নিজেরা আইন মানি না। আইনের কঠোর শাসনের কথা বলি। দেখা গেছে করোনাকালে পাবলিক অযথা ঘর থেকে বের হওয়ার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দুয়েকজনকে কান ধরে উঠবস করিয়েছে বা লাঠিপেটা করেছে। আর ফেসবুকে এ নিয়ে তুলকালাম প্রতিবাদে সোচ্চার নিয়ম ভঙ্গকারি বাঙালিরা।

আইন না মানার প্রবণতা থেকে সমাজকে বের করে আনতে হবে। একটি সমাজে তখনই আইন না মানা বা আইন ভাঙার প্রবণতা  তৈরি হয় যখন দেশে আইনের শাসনে ঘাটতি থাকে। একই কথা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ব্যবসায়ীরা নিয়ম মেনে ব্যবসা করছেন কিনা সেটা নিয়মিত তদারকি করা হলে পুকুর চুরি, টাকা পাচার, কাজে দুর্নীতি, অনিয়ম এমন পর্যায়ে যেত না । আইনের বালাই নেই বলেই তাদের মধ্যে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই খেয়াল-খুশি মতো ব্যবসা করা যায়। তাই এখন সরকারকে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে এই বার্তাটি পৌঁছাতে হবে যে, ‘আইন মেনে চলা প্রতিটি নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য।‘ আর এজন্য সরকারকে কঠোরভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইন সবার জন্য সমান- এ সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সমাজে বিরাজমান বিশৃঙ্খলা ঠেকানো যাবে না।  দেশ উন্নত হলেও দেশের মানুষের মানসিকতার যদি উন্নয়ন না হয় তাহলে জাতি হিসেবে আমরা সভ্যতার প্রমাণ দিতে পারবো না। আর তখনিই উন্নয়ন কোনো ফল দিবে না।

লেখকঃ সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন