বিকল্প কর্মসংস্থান বা বিকল্প ভাবনা!

মোসা: নাছরিন সুলতানা

সময় অনেক সময় কথা বলে! আসলে সময়ের সাথে সাথে প্রকৃতি আমার অনেক কিছু শিক্ষা দেয় যা পরবর্তীতে কাজে লাগানো উচিত! এই করোনা মহামারি ও আমাদের অনেক কিছু শিক্ষা দিচ্ছে, জানিনা পরবর্তীতে এর প্রভাব কতটুকু পরবে! তবে কিছু শিক্ষা সবারই কাজে লাগানো উচিত! তাছাড়া বাংলাদেশের একটা উন্নয়নশীল দেশ এ দেশের বেশিরভাগ মানুষের দিন আনে দিন খায় অবস্থা! তাই এই মহামারির কারণে যে অর্থনীতির ওপর একটা বড় চাপ আসবে বা এসেছে এটা সবার জানা, তা হলে উপায় কি? আজ আমি এর উপায় নিয়েই আলোচনা করব।

আসলে উপায় আপনাকে, আমাকেই খুজেঁ বের করতে হবে! কারণ জীবনটা আপনার; আপনি কীভাবে আপনার মৌলিক চাহিদা পূরণ করবেন এটা অন্য কেউ করে দিবে বা বলে দিবে এটা আশা করা ঠিক না! হয়তো কিছু পরামর্শ দেওয়া বা নেওয়া যেতে পারে এর চেয়ে বেশি কিছুই না! আমরা কথায় কথায় সরকারকে দোষ দেই, সরকার এটা করে না না, ওটা করে না, এটা করতে পারতো? ওটা করতে পারতো ইত্যাদি! সরকার কেন করছে না বা কি করতে পারতো তার জবাব আমার কাছে নেই! কারণ এটা সরকার তার মতো সিদ্ধান্ত নিবে বা করবে! আসলে এসব প্রশ্ন আপনি করতেই পারেন দেশের নাগরিক হিসাবে । কিন্তু মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করুন; আপনি নিজে নিজের জন্য কি করেছেন? তাছাড়া যদি ধরেও নেই সরকার চিন্তা করল এ মহামারিতে দেশের মানুষকে একটু সাহায্য করবে; যেটা অলরেডি শুরু করেছে । তাতে কি সমস্যার সমাধান হবে? সরকার না হয় জন প্রতি ১০০০-৫০০০ করে টাকা দিল । সেটা দিয়ে আপনি কয়দিন চলবেন? অন্যের সাহায্য দিয়ে কখনো নিজের জীবন চালানো যায় না! এটা সাময়িক একটু স্বস্তির কারণ হতে পারে মাত্র!

যাই হোক মূল কথায় আসি । আসলে দেশে মোট জনসংখ্যার ০৫% লোক সরকারি চাকরি করে  আর বাকি ৯৫% লোকই বেসরকারি চাকরি, বিজনেস, অন্যান্য পেশা বা কাজের সাথে জড়িত। যাদের প্রত্যেকের অবস্থা দিন দিন শুধু খারাপের দিকে যাচ্ছে! তাই আমি যেটা বিশ্বাস করি সেটা হচ্ছে কারও যে কোন একটা পেশাকেই নেশা করা উচিত তা নয়, প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু না কিছু প্রতিভা আছে । শুধু একটু যত্ন করে ব্যবহার করা দরকার! তাহলে হয়তো কিছুটা রক্ষা পাওয়া যাবে! ছোট বেলায় দেখতাম আমার বাবা, মা, চাচা, চাচী দাদী, নানীরা বর্ষাকাল আসলে ঘরে বসে বসে অনেক কাজ করত; যেমন মেয়েরা কাঁথা সেলাই, হাতপাখা বানানো, ওল এর জামা, কুশিকাটার কাজ ইত্যাদি। আর ছেলেরা বেত দিয়ে ডুলা, কুলা, ঝুড়ি, মোড়া, জালবোনা আর কৃষি কাজে লাগে এমন অনেক কাজ করত তাদের বিকল্প ভাবনা থেকে! যেহেতু তাদের মুল পেশা ছিল কৃষি তাই বর্ষার সময় কৃষি কাজ থাকত না! এইসময়টাকে কাজে লাগাতে তারা সারা বছরের প্রয়োজনীয় জিনিজগুলো নিজেরাই তৈরি করতো, যাতে পরবর্তীতে এগুলো ক্রয়ে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে না হয়! অথচ আজ এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে এসেও মানুষ কেন বসে থাকে আমার মাথায় আসে না!

যাদের চাকরি নেই, কাজ নেই, ব্যাবসা নেই বসে বসে হায় হুতাশ করছেন । তারা কয়টা কাজ করার চেষ্টা করেছেন, বলেন তো ? আপনি বলবেন আপনার পুঁজি নেই, সুযোগ নেই । এসব মিথ্যা কথা পুঁজি বা সুযোগ কেউ কাউকে দেয় না তৈরি করে নিতে হয়! আপনার কাছেই সব আছে শুধু মাত্র চেষ্টাটুকু নেই। হ্যা আপনি আজকে থেকে ভাবতে থাকুন । আপনি কি কি কাজ করতে পারবেন? শুরুতে একটা তালিকা তৈরি করতে পারেন আপনার সম্ভাবনা দিয়ে! তার পর একটা বাজেট তৈরি করুন এখন আপনার চিন্তা আর বাজেট এর সাথে যে কাজটা মিলে যাবে সেটা দিয়ে শুরু করুন! খুব বেশি পুঁজি লাগে এমন কাজ পরিহার করুন। আপনি নিজে নিজে করতে পারবেন এমন কাজ দিয়েই শুরু করুন! আর এসকল বিষয়ে আমি শুধু কিছু আইডিয়া আর পরামর্শ দিতে পারি মাত্র!

আপনি যে কোন পেশাতে থাকেন, পারেন আবার নাও থাকতে পারেন এগুলো চাকরির পাশাপাশি এবং চাকরি না থাকলেও করতে পারবেন:

১) অনলাইন বিজনেস: বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রয়োজনীয় সাইট হচ্ছে এটা । এখানে আপনি জামা কাপড়, শাড়ি, লঙ্গী, শার্ট, প্যান্ট, গহনা খাবার-দাবারসহ এমন কোন জিনিস নেই যা নিয়ে বিজনেস করতে পারবেন না ! আপনাকে বেছে নিতে হবে কোনটা আপনি পারবেন। এর মধ্যে থেকে যে কোন একটি দিয়ে শুরু করতে পারেন!

২) ইউটিউব চ্যানেল: আপনি আপনার পছন্দের আইটেম দিয়ে একটা চ্যানেল তৈরি করে সেটা দিয়েও ঘরে বসে ইনকাম করতে পারেন।

৩) কাঁচাবাজার: নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস এর মধ্যে আরেকটা হচ্ছে কাঁচাবাজার। এটা লাগে না এমন কেউ নেই । আপনি আপনার সততা আর ভাল ব্যাবহার দিয়ে আপনার মহল্লাকেই টার্গেট করুন যে শুধু আপনি আপনার মহল্লার সবার বাড়ি পৌঁছে দিবেন! যেমন চাল, ডাল, আলু পেঁয়াজ, ডিম দুধ যে কোন একটা আইটেম একটি মহল্লা দিয়ে শুরু করুন। সৎ থাকুন আর বিশ্বাস রাখুন নিজের উপর তাহলে আপনাকে আর পিছনে তাকাতে হবে না।

৪) প্রশিক্ষণ: আপনি যে বিষয়ে দক্ষ অনলাইনে খুব কম টাকা দিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করুন দেখবেন কারও সাহায্যের আশা করতে হবে না!

৫) সেলাই কাজ: আপনি পুরুষ বা মহিলা যেই হোন না কেন; আপনি সেলাই জানেন, তাহলে আজই একটা সেলাই মেশিন কিনে ফেলুন আর শুরু করে ফেলুন। প্রথমে আপনার প্রতিবেশী দিয়ে শুরু করুন তাকে বলুন সাহায্য না করে আপনার কাছেই যেন জামা কাপড় সেলাই করতে দেয় ।  এবং শুরুতে কোন দাম কষাকষি না করে তার বিবেকের উপর ছেড়ে দিন । খুশি হয়ে যা দেয় তাতেই সেলাই করতে থাকুন, আর সাথে সাথে নিজেকে তৈরি করুন!

৬) সবজি চাষ: ঢাকা শহরে প্রতিটি বাড়িতে ছাদ আছে কিন্তু বেশিরভাগ ছাদই ফাকাঁ । তাই আজই বাড়িওয়ালাকে মেনেজ করে সবজি চাষ শুরু করুন । পুঁইশাক, লালশাক, ডাটাশাক দিয়ে, এটা শুরু করে খাওয়ার উপযোগী হতে মাত্র দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে । আর বিক্রি শুরু করুন আপনার বাড়ির অন্য ভাড়াটিয়াদের দিয়ে । মনে রাখবেন একবার কেউ এই টাটকা সবজির মজা পেয়ে গেলে আর বাহিরে যাবে না সবজি কিনতে!

৭) মাছ চাষ ও হাস মুরগি পালন: যেখানে পুকুর আছে তারা মাছ চাষ করতে পারেন। যাদের বাসার নিচে জায়গা আছে তারা হাস মুরগিও পালন করতে পারেন!

৮) হাতের কাজ: মেয়েদের খুব পছন্দ হাতের কাজের জিনিস । অনেকে আছে এগুলো বানাতে পারেন, হাতের কাজের অনেক কিছু আছে যা আপনি ঘরে বসে বসেই অবসর সময়ে বানাতে পারেন যেমন কাঁথা সেলাই, ওয়ালমেট, জামাকাপড় ডিজাইন করা ইত্যাদি অনেক আইটেম আছে যা আপনি চাইলে ইউটিউব থেকেও সাহায্য নিতে পারেন!

৯) সাপ্লাইআর/ডেলিভারি ম্যান: আপনার যদি একটা সাইকেল বা মটরসাইকেল থাকে তাহলে চাকরির পাশাপাশি মাল ডেলিভারির কাজটাও খুব সহজে করতে পারেন!

১০) রাইড শেয়ায়: এখন তো উবার, পাঠাও ইত্যাদি বিভিন্ন রাইড আছে যা কাজের পাশাপাশি করা যায় । কোন আলাদা পুঁজির প্রয়োজন হয় না । যারা পারেন তারা এগুলোও করতে পারেন!

আসলে আপনি একজন শিক্ষিত লোক আপনি এসব কাজ করলে কে কী বলবে? কী ভাববে? এগুলো চিন্তা না করে আমি বলব কাজকে কাজের মতো মূল্যায়ন করুন কোন কাজকে ছোট করে; না দেখে যদি বিকল্প কর্মসংস্থান মনে করেন এবং আপনার ভাবনাটা একটু পরিবর্তন করতে পারেন দেখবেন আপনাকে কাজ খুজঁতে হবে না কাজই আপনাকে খুঁজবে! আমিতো শুধু কয়েকটা কাজের কথা বললাম এমন হাজার হাজার কাজ আপনার কাছে আছে, আপনার শুধু দরকার চরম ইচ্ছা শক্তি আর ধৈর্য্য! কে কী ভাব,ল কী করল, কী বলল এগুলো চিন্তা না করে যদি শুধু এটুকু চিন্তা করেন আপনি আপনার পরিবারকে ভাল রাখবেন, তাহলেই দেখবেন আপনি সফল! এসব ধারণা পরামর্শ ও তথ্য শুধু মাত্র আমি আমার মতো করে বুঝাতে চেয়েছি । আশাকরি আপনি এর চেয়েও ভাল ভাবনা চিন্তা ও পরামর্শ নিয়ে এগিয়ে যাবেন আপনার লক্ষ্যে। শুভকামনা রইল সবার জন্য!

লেখক মোসা: নাছরিন সুলতানা

লেখকঃ কলামিস্ট ও থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, লালবাগ, ঢাকা।

 

আরও পড়ুন